সূয্যি গেল পাটে – মঞ্জুরি দাস

গল্প সাহিত্য
Spread the love

“আকাশ জুড়ে মেঘ করেছে । সূয্যি গেছে পাটে খুকু গেল জল আনতে / পদ্মদীঘির ঘাটে। পদ্মদীঘির কাল জলে | হরেক রকম ফুল ।

হাঁটুর নীচে দুলছে খুকুর / গােছ ভরা চুল।” | ‘ওরে আমার বুবুসােনা, সােন্টা মনা, পুতু সােনা খেয়ে নাও সােনা। আর মাত্র তিন দলা খেলেই বুবু সােনার খাওয়া শেষ। এরপর আমরা কোন ছড়াটা বলব বলাে?’ চার বছরের বুবুকে রােজ কার মা শ্বেতা ছড়া বলে ব্যালকনিতে এসে ভুলিয়ে খাইয়ে দেয়। মায়ের মুখে ছড়া না শুনলে তার এক গরাস ভাতও গলা দিয়ে নামে না। বুবুদের ব্যালকনির ঠিক উল্টো দিকের শােবার ঘরের বস্ জানলার ওপরে বসে টুকটুকে ফরসা গােলগাল তানি করুণ চোখে তাকিয়ে বুবুর মায়ের ছড়া শােনে। ছয়-সাত বছরের তিনি কখনও হাসে না কখনও ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে। দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সে ভাবে তার মা নেই কেন? কেন ওভাবে মা তাকে খাইয়ে দেয় না ছড়া বলে না। তবে যে বাবা বলেছিল মা এসে তাকে ছড়া শােনাবে। কই মা তাে এখনও এলাে না। তানি অভিমানে জানলার ওপরে রাখা তার খেলনাগুলাে ছুড়ে ছুড়ে নীচে ফেলে দেয়। মুখ গােমড়া করে বসে থাকে। রােজকার মতাে তানি সেদিনও কঠিন বায়না জুড়ে বসল। সে খাবে না স্নানও করবে

| পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই শৈলদি তানির দেখাশােনা করে। শৈলদি তানির ঘরে ঢুকতে বলল, ‘এসাে গাে দিদিভাই এবার তােমাকে স্নান করিয়ে ভাত খাইয়ে দি। তানি বড় একটা হাঁ করে বলল, না। আমি মায়ের কাছে করব।’ শৈলদি মুখ টিপে হেসে ‘শােনাে গাে মেয়ের কথা, মা কোত্থেকে আসবে? রােজ রােজ এই রকম বায়না করলে বাবা কি করে কাজ থেকে ফিরে আসবে তােমার জন্য। বল আমার সােনা! বাবা কেমনভাবে কাজ করবে ? শৈলদি তানির কাছে গিয়ে মাথায় গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে গল্প করে কত চেষ্টা করল ভােলাতে। কিছুতেই তানির জেদ কমল না। সেই এক গো মেয়ের। কত বেলা হয়ে গেল। শেষে ফোন করে বসল তার দাদাবাবুকে।

খানিকবাদে কলিং বেলের আওয়াজ পেয়ে শৈলদি দরজা খুলে দেখে দাদাবাবু হাজির। শৈলদির কাছে সব শুনে দেবাংশু হেলমেটটা মাথা থেকে টেবিলের ওপর রেখে তানি তানি বলতে বলতে তানির কাছে গেল। তানি মাথা নীচু করে তার জামার এক কোণা দাঁত দিয়ে ছিড়ছিল। দেবাংশু তানিকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে বলল, “কি হয়েছে সােনা মায়ের?

তানি ফুপিয়ে কেঁদে বলল, তুমি বলেছিলে চলে আসবে। এখনও তাে মা এলাে না। তুমি মিথ্যে বলেছে আমাকে। মা আর আসবে না কখনও!’

দেবাংশু কাজের ফাঁকে শৈলদির ফোন পেয়ে সেছে। ভাগ্যিস | কাছেই ডাক্তার ঘােষের চেম্বার। তার সাথে আজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট

দেবাংশুর। চেম্বারে প্রচুর পেশেন্ট-এর ভিড় আজ। তাই সে এক ফকে আসতে পেরেছে। আজ দেবাংশুর কাজের প্রচুর চাপ। ঘােষের চেম্বার থেকে দত্ত, নাগ, দাস সব ডাক্তারের চেম্বার হয়ে

অফিস তবে বাড়ি। মাথায় কাজের চিন্তা তার ওপর তানির বায়না। | কি করবে দেবাংশু ভেবে পায় না। তানিকে এগালে ওগালে চুমু | খেয়ে কতরকমের কথা বলে তখনকার মতাে শান্ত করল। কিন্তু | তানি দেবাংশুকে কিছুতেই ছাড়তে চায় না, শেষে দেবাংশু তানিকে | তার মায়ের ছবির অ্যালবামটা দিয়ে শান্ত করল। দেবাংশু হেলমেট

টা হাতে নিয়ে সাঁই-সাঁই ছুটল। শৈলদি সেই সুযােগে তানিকে স্নান খাওয়া করিয়ে দিল।

ঘড়িতে রাতটা দশটা ছুঁই ছুঁই। তানিকে খাইয়ে ঘরে গিয়ে | ঘুমন্ত তানির গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে, আস্তে করে চুমু খেল গালে। শৈলজি রােজকারের মতাে এককাপ লিকার চা দিয়ে গেল। এরপর দেবাংশু নিজের ঘরে গিয়ে নিউজ চ্যানেল খুলে দিয়ে গা এলিয়ে দিল সােফায়। কখন যেন ক্লান্তিতে দুচোখের পাতা | ঘুমে ঢলে পড়ল। স্বপ্ন দেখতে শুরু করল, দেবলীনা এসে তার | মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তার নরম হাতের স্পর্শে দেবাংশুর | গায়ে শিহরন জাগছে। কি যে ভালাে লাগছে! তার কপাল টিপে দিচ্ছে। তাকে আদর করছে।

হঠাৎ পাশে পুজোর বাজির আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে গেল | দেবাংশুর। এদিক ওদিক তাকিয়ে মনে হল দেবলীনা তাে কোথাও

নেই। সে তাে কত বছর হয়ে গেছে তাকে তানিকে ছেড়ে নির্বিঘ্নে | নিশ্চিন্তে চলে গেছে। বাবা মা সকলকে ছেড়ে ডানাকাটা পরীর মতাে দেখতে দেবলীনা সেদিন এক কাপড়ে তার সাথে চলে এসেছিল এই দু-কামরার ফ্ল্যাটে। বিয়ের আগে দেবলীনার সাথে তার প্রথম আলাপ হয় ফুলবাগানে তার পাড়ার ক্লাবে। দুর্গাপুজোর

প্যাণ্ডেলে। একটা নাচের অনুষ্ঠান করতে দেবলীনা গ্রুপের সাথে এসেছিল। দেবাংশুর নায়ক নায়ক হ্যাণ্ডশাম চেহারা দেখে নিজেকে সামলাতে পারল না। একে তাকে ধরে দেবাংশুর ফোন নম্বর | জোগাড় করে অল্পদিনের মধ্যেই পাঠিয়ে ফেলল। দেবাংশুও দেবলীনার রূপে মুগ্ধ হয়ে মানসিক দৈহিক প্রেম নিবেদন করল, সবে দেবাংশু বি.এস.সি পাস করে মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভের কাজ জুটিয়েছে। একবছর হতে না হতেই বিয়ে করে বসল। বছর

ঘুরতেই তানির জন্ম।

তানি হবার একবছরের মধ্যেই সংসারের খরচা বেড়ে গেল। দেবলীনা নতুন করে নাচের স্কুলে জয়েন করল। শুরু কলকাতার বাইরে নাচের প্রােগ্রাম। তানির ওপর নজর কমিয়ে দিল। তানির দেখাশােনা করবার ভার পড়ল শৈলদির ওপর। দেবাংশু তাকে কতবার বাধা দিয়ে বলেছে তানি একটু বড় হােক, তারপর না হয় যেও। উত্তরে সে বলেছিল তানির জন্য তার কেরিয়ার নষ্ট হতে দেবে না। দেবাংশু যা টাকা রােজগার করে তা সংসারে লেগে যায়। দুমদাম খরচা করার উপায় নেই। দিনের পর দিন দেবলীনার চালচলন, সাজগােজ পাল্টে গেল। দূরত্ব বাড়ল তানি দেবাংশুর সাথে। দেবলীনার দৌরাত্ম্য বেড়েই চলল। কারণে অকারণে তানিকে বকাবকি করছে চিল্কার করে। দেবলীনার নাচের স্যার আদিত্য বসুর সাথে দিল্লীতে নাচের প্রােগ্রাম করতে গিয়ে আলাপ হল সৈকত সাহার সাথে। সৈকতের উঁচু লম্বা হােমরা-চোমরা চেহারা। কলকাতার বাইরে বেশ কয়েকটা হােটেল-এর মালিক সে। তার চরিত্রের সব চাইতে বড় দিক হল নিত্য নতুন মেয়ে আর ড্রিঙ্কস্! দেবলীনার সাথে আলাপ হবার পর দেবলীনার রূপ দেখে তাকে টাকার প্রলােভন দেখাল। একঘেয়ে জীবন তানিকে নিয়ে, দেবাংশুকে নিয়ে সেই ঘরে বন্দী। পা দেয় সৈকতের ফাঁদে। সিপ্যাথি দেখাতে গেলে লাইফ শেষ। যতদিন বেঁচে থাকবে সে মস্তি করে কাটাতে চায়। শুরু করতে যায় নতুন জীবন দেবাংশুকে ছেড়ে সৈকতের সাথে। | দিনটা ছিল ২ মে। শনিবার। চারিদিকে তাপের হলকানিটা তখনও রয়ে গেছে সূর্যটা নীল রং-এর সাততলা ফ্ল্যাটের পেছনে লাল হয়ে আস্তে আস্তে ডুবছিল। তানি খুব কাঁদছিল। শৈলদি কিছুতেই সামলাতে পারছিল না দেড় বছরের তানিকে। পাশের ঘরে দেবলীনাকে গিয়ে বললে সে বলেছিল শৈলদিকে ‘তােমাকে টাকা দিয়ে কি করতে রাখা হয়েছে?’ শৈলদি তানির কাছে চলে গেল। একটু বাদেই দেবলীনা তানির কান্নাকে তুচ্ছ করে হাতের মােবাইলটা কানে ধরে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে চলে গেল। বাড়ি ফিরে দেবাংশুও তানির কান্না সেদিন থামাতে পারছিল না। বাধ্য হয়ে দেবলীনাকে অনেকবার ফোন করল। দেবলীনার ফোনটা সুইচ্ অফ করা ছিল।

রাত এগারােটার সময় দেবাংশু তার মােবাইলে মেজেসটা পড়ে চমকে উঠেছিল। আর কোনওদিন দেবলীনা ফিরবে না। সে সৈকতের সাথে নতুন করে সংসার করবে। তাকে যেন কোনওদিন কেউ ডিসটার্ব না করে।

সৈকতের ঢেউ এর বাড়ি খেতে খেতে দেবলীনা আজ ক্লান্ত। একের পর এক ঢেউ এর হাতছানিতে সে সৈকতের খুব কাছে এগিয়ে গেছে। সৈকতের মধ্যে যে হিংস্র পশু লুকিয়েছিল তা

দেবলীনা বুঝতে পারেনি। আজ সে বার ড্যান্সার। সৈকতের মতাে। কত হিতাকাঙ্ক্ষী তার দেহটা খুবলে খাচ্ছে! তানির কথা তার প্রতি মুহূর্তে মনে হয়। তাকে দেখার জন্য মনটা ছটফট করে। কিন্তু এই ক্ষতবিক্ষত মুখটা নিয়ে কি করে দাঁড়াবে দেবাংশুর সামনে! সৈকতের অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে। যে টাকার জন্য সংসার ছেড়ে ছিল, আজ ঘেন্না হয় সেই টাকার প্রতি। কিন্তু আজ মৃত্যু ছাড়া পালাবার পথ নেই তার সামনে।

দেখতে দেখতে অনেকগুলাে বছর কেটে গেছে। দেবাংশুর কাজেরও বেশ উন্নতি হয়েছে। তানি ক্রমশ বারাে বছরের। ক্লাস সেভেন-এর ছাত্রী। লেখাপড়ায় খুব মনেযােগ তার। তেমনি বাবার দিকেও বেশ তার খেয়াল। দেবাংশু অফিস থেকে এলে জল এগিয়ে দেওয়া। শৈলদির হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে একছুটে বাবার টেবিলে দিয়ে আসা। মাথা টিপে দেওয়া। এমনকি দেবাংশু কোন কালারের শার্ট পরবে তার রং পছন্দ করে দেওয়া। অফিস থেকে। ফিরলে দেবাংশুর গায়ে লেপ্টে বসে তাকে স্কুলের একগুচ্ছ গল্প শােনানাে। শৈলদিকে বলে বাবার জন্য টিফিন বানানাে। ঠিক যেন দেবাংশুর ছােটবেলার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। একবারে চোখে হারায় দেবাংশু তানিকে। উঠতে বসতে তানি আর তানি। | ২৫ ডিসেম্বর। আজ তানির জন্মদিন সারাদিন বাপ-বেটিতে মিলে খাবার-দাবার সাজগােজের আয়ােজন করছে। বিকেল পাঁচটা বাজতে না বাজতেই স্কুলের বান্ধবীরা তানির জন্মদিনে চলে আসবে। সবকিছুর ফিনিশিং টাচ্ চলছে। তানি দেবাংশুকে কাছে কাছে—বাবা সামনের দরজার ওপরটাতে আর একটা বেলুন বাদ পড়েছে। দেবাংশু একটা বেলুন তাড়াতাড়ি ফুলিয়ে দরজার ওপরে আটকে দিল। ডাইনিং টেবিলটা খালি করে ওখানে বড় একটা কেক রেখে দিল। শৈলদি অর্ডার নিয়ে দিয়ে যাওয়া খাবারগুলাে ঢেকে ঢুকে রাখছে। সারাদিন খুব পরিশ্রম গেছে দেবাংশুর। এক বার শেষবারের মতাে ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখেছে সব ঠিক আছে কিনা। কেননা তার বেশ কয়েকজন বন্ধুও আসবে। দু-পাঁচ মিনিটের জন্য দেবাংশু ডিভাইনের ওপর নিজের শরীরটা এলিয়ে দিয়ে নিউজ চ্যানেলটা খুলল। খবরটা কানে পৌছাতেই ধড়ফড় করে উঠে বসল। বিখ্যাত হােটেল ব্যবসায়ী সৈকত সাহা খুন হয়েছে। তার গার্লফ্রেণ্ড দেবলীনা মিত্রর হাতে। ডিসেম্বরের ঠান্ডাতেও খবরটা শুনে দেবাংশুর যেন ঘাম দিল। হঠাৎ চমকে গিয়ে আবার কেমন নিথর হয়ে গেল সে। দেবাংশুর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল দেবলীনার সাথে তার ভালােবাসার দিনগুলির কথা। | মুহূর্তের মধ্যে ভুলে গেল আজ তার বাড়িতে এক অনুষ্ঠান।

| তানি ঠিক শুনতে পেল নীচের সিঁড়ি দিয়ে একপাল কচিকাচার দল হৈ হৈ করতে করতে তানিদের ঘরের দিকে আসছে। তানি | ছােটাছুটি শুরু করে দেয়। চিৎকার করে বাবা বাবা বলে সিঁড়ির কাছে উঁকি দিতে থাকে। তারপর দেবাংশুর কাছে এসে বলে বাবা ওরা সব এসে গেছে। দেবাংশুর কান দিয়ে যেন কোনও কথা ঢােকে না। শেষে তানি বাবা করে ডেকে একটু ঠেলে দেয় দেবাংশুকে। বলে বাবা টিভিটা বন্ধ করে দাও। | দেবাংশু দেখে, দেবলীনাকে দুজন মহিলা পুলিশ ধরে নিয়ে জিপে তুলছে। তানি আবার ডাকল, বাবা! দেবাংশু চমকে উঠে টিভি বন্ধ করল। সূর্য তখন সবে অস্ত গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *