সামাজিক দূরত্ব – শ ং কর কুণ্ডু

গল্প সাহিত্য
Spread the love

থানায় খবরটা দিয়েছিল অজ্ঞাতনামা কেউ, ফোন মারফত। অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর শিঞ্জিনী জিপ আর দলবল নিয়ে স্পটে দৌড়ােলেন, সত্যি না মিথ্যে যাচাই করতে। বসের নির্দেশ ছিল অবশ্য। | অন্ধ শিশুদের আবাসিক স্কুলে সােশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং মানা হচ্ছে না।

—শিঞ্জিনী দেখে এসাে তাে, কী ব্যাপার। কথা শুনছে না কেন এরা ? | ওসি সুরঞ্জন ভঞ্জ চিন্তিত মুখে বলেছিলেন শিঞ্জিনীকে।

শুনশান রাস্তা উজিয়ে ড্রাইভার জাহানারা মিনিট পাঁচেকের মধেই ব্লাইণ্ড স্কুলের গেটে পৌঁছে দিল জিপ।

“এনলাইটেন স্কুল ফর দ্য ব্লাইণ্ডস।” সাইনবাের্ডে বাংলা হরফে স্কুলের ইংরেজি নাম লেখা। —তােমরা বাইরেই অপেক্ষা করাে।

লন পেরিয়ে স্কুলে ভিতরে ঢুকলেন সহকর্মী রূপিন্দর সিং ভানােতকে নিয়ে।

স্কুলের দারােয়ান নটবর পাহাড়ি পুলিশ দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিল। ইয়েস ম্যাম, নাে ম্যাম করে কিছু বলতে চেষ্টা করেছিল।

—প্রিন্সিপাল কোথায় ? ডাকো তঁাকে। জলদি। দৌড়ে গিয়ে নটবর প্রিন্সিপালকে ডেকে আনল।।

মুখে প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে প্রিন্সিপাল মাইকেল বক্সি ভিতর থেকে এগিয়ে এলেন শিঞ্জিনীর দিকে।

বলুন ম্যাম? —আপনার স্কুলের বাের্ডাররা কোথায়? দেখব একটু। —ইয়েস। অফ কোর্স। আসুন।

অফিস পেরিয়ে ভিতরের মাঠের সামনে শিঞ্জিনীদের নিয়ে গেলেন মাইকেল।

গােটা তিরিশেক অন্ধ শিশু সারিবদ্ধভাবে ছােট্ট মাঠটায় ঘুরছে। মাস্ক পরা সবাই। প্রত্যেকের ডানহাত সামনের ছেলেটার কাঁধে রাখা।

একদম সামনের ছেলেটা মাঠের এক প্রান্তে গিয়ে ঠিক বাঁয়ে বাঁক নিল। হাতে স্টিকটিক কিছু ছিল না। শিঞ্জিনী ভাবছিলেন, পাঁচিলে ধাক্কা খাবে বুঝি। খেল না! আশ্চর্য!… দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শিঞ্জিনী। কত কী যে জানা বাকি জীবনে!…

—এই সময়টাতে ওদের একটু রােদে হাঁটাহাঁটি করতে হয়, ম্যাম। ভিটামিন ডির জন্য। তারপর দুএকটা গান করে, ওদের পছন্দমতাে নাচও করে ইচ্ছে হলে। সুস্থ থাকতে হবে তাে। বুঝতেই পারছেন। স্কুলের টিচাররা দেখভাল করেন সর্বদা।

কারুর কিছু নেই তাে? মানে জ্বর, সর্দিকাশি, এইসব? —না, ম্যাম। একদম সুস্থ ওরা। প্রতিদিন সকালে ডক্টর দেখে যান। —কী করে চলে এই স্কুল? জানতে চান শিঞ্জিনী।

থেকে যা পাওয়া যায়।

জানিনা, কতদিন এভাবে চালানাে যাবে। | প্রিন্সিপালের চোখ ছলছল করে ওঠে। মুখ নিচু করে সামলে নেন তিনি। তারপর বলেন, বসুন, ম্যাম। একটু চা খেয়ে যান।

—না না। আমাদের একদম সময় নেই। চলি। আর হ্যা। কোনােরকম দরকার হলে বলবেন। থানায় ফোন করবেন। কিংবা এটা আমার মােবাইল নাম্বার রেখে দিন। আমাকে মেসেজ পাঠাবেন। চললাম।

—হা নিশ্চয়ই, নমস্কার, ম্যাম। দুপা এগিয়ে শিঞ্জিনী কী মনে করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ব্যাক পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে দেখলেন। দুটো হাজারের নােট বের করে প্রিন্সিপালের হাতে দিয়ে বললেন, এটা রাখুন আপাতত। | আর একটা কথা বলি। এই রূপিন্দরকে দেখছেন। ও খুব ভালাে গান গায়। বাংলা, হিন্দি। একদিন সবাইকে গান শুনিয়ে যাবে।

—কী সৌভাগ্য। ওরা তাে শােনার জন্য মুখিয়ে আছে। দৃষ্টি নেই, কিন্তু শ্রবণ তাে কর্মক্ষম!

—রূপিন্দর, একদিন শুনাকে যাও বস্ফোঁকো, তুমহারা ট্যালেন্ট এস্তেমাল হােগা কুছ ওয়াক্ত কে লিয়ে। ঠিক হ্যায় না? একগাল হাসে রূপিন্দর, লজ্জা পায়।

—ম্যায় সমঝতি হু সবকুছ। হা হা।..চলাে। লেটস গাে। ওকে দেন। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। | বুটের খটাখট শব্দ করে অফিস থেকে বেরিয়ে জিপে ওঠেন শিঞ্জিনী।

—রাবিশ। স্বগতােক্তি করেন শিঞ্জিনী। জাহানারা গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে বলে, কিছু বললেন ম্যাম?

—নাঃ। কিছু না। জীবনে কী কী না দেখলে জীবন ব্যর্থ হয়েছে। বলা যাবে, বলতে পারাে, জাহানারা ? | এর উত্তর জানে না জাহানারা। শুধু একটু বােকা বােকা হাসে ম্যামের দিকে তাকিয়ে। তারপর গাড়ি স্টার্ট দেয় ফের। | শিঞ্জিনী মােবাইলে ধরে বসকে, একটা কথা বলি স্যার?

-বলাে।

—এই ধরনের ফোন যারা করে, সেই ঢ্যামনাদের ইয়েতে আছােলা কোনও বস্তু সসম্ভ্রমে প্রবেশ করাতে পারেন, স্যার?

—কেন? কী হল? হাসি চেপে ওসি বলেন। শিঞ্জিনীর এই রকম ভাষার ব্যবহারে অল্প কদিনেই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন তিনি। নইলে, এই ঘােড়াচ্ছিমের চাকরিতে কমিক রিলিফ বলে কিছু না।

—কিছু হয়নি, স্যার। অল গ্রিন। আপনি হাসছেন? আপনি গােপনে কবিতা লেখেন আমি জানি। তা, একদিন আপনার লেখা কবিতা শুনিয়ে যাবেন অন্ধ শিশুদের। এদের অন্ধকার তাের দূর করতে পারব না আমরা। দুঃখের সমুদ্রে কয়েক বিন্দু উজ্জ্বল মুহূর্তের আয়ােজন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *