শ্যামলী – কাজল চ্যাটার্জী

গল্প সাহিত্য
Spread the love

শ্যামলী একটি ছােট্ট হাবা, বােবা মেয়ে, এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম হয়েছে তার। জন্ম থেকেই শ্যামলী মূক ও বধির, ঈশ্বর যাকে যেমন ভাবে সৃষ্টি করে, নিয়তির ফলের নিয়মে বাধ্য হয়ে তাকে মেনে নিতে হয়। চেষ্টার কেউ কোনাে ত্রুটি রাখে না, শ্যামলীর বাবা, মা, অনেক চেষ্টা করেও তাকে ভাল করতে পারে নি, তার কথা ফোটেনি ঠিকই, তাই বলে তার চেতনার বিলুপ্তি ঘটেনি, আকারে ইঙ্গিতে সে সবকিছু। উপলব্ধি করতে পারত, বােঝাতে পারত। | বিধাতার নিয়মকে কেউ খণ্ডাতে পারে না, চেষ্টা করে মাত্র। শ্যামলীর মা প্রতিমা দরিদ্র পরিবারকে বাঁচানাের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে, সে লােকের বাড়ি বাড়ি কাজ করে বেড়ায়। অনেক বাড়িতে কাজ নিয়েছে, তা না হলে এতগুলাে লােকের খাওয়া, পরা, বা বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। নামটা তার সার্থক হয়েছে, রূপ হয়ত তার অত ছিল না, কিন্তু গুণ ছিল অসীম। অসীম আকাশের মত বিস্তৃত, অফুরন্ত ভালবাসা, আর কোমল হৃদয়, সদা হাস্যময়, এত দুঃখ বা দারিদ্রতার মধ্যেও কখনও বিরক্তি ছিল না। এলাকার সকলের সঙ্গে মেলামেশা ছিল অবাধ, অবসরে সকলের বাড়িতে একবার যেত, সবাই ভালবাসত প্রতিমাকে। | নিবারণ ছিল শ্যামলীর বাবা, খুবই নিরীহ শান্তশিষ্ট, লােকের বাড়ি দিন মজুরির কাজ করে। কিম্বা রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করে, যেটুকু অর্থ সাহায্য পেত, তা প্রতিমার হাতে তুলে দিত। নিবারণ মুখ বুজে কাজ করে যেত, কোন রাগ বা অভিযােগ ছিল না। কারাের সঙ্গে কোনাে দিন, ঝগড়া ঝাটি করত না, সকলকে হেসে হেসে কথা বলত। সে যা বলত তা করার চেষ্টা করত। তাদের দুটি মেয়ে ও একটি ছেলে ছিল। তিনটি সন্তানের মধ্যে বিনয় ছিল বড় ছেলে। তার পরে শান্তি ও সবশেষে শ্যামলী।

সকল পিতা মাতার যেমন, শখ আহ্লাদ বা ইচ্ছা থাকে তাদের সন্তানদের ভালভাবে মানুষ তৈরী করবে। এদেরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সেই মত, বিনয় আর শান্তিকে স্কুলে ভর্তি করা হলাে। শুধু বিধাতার করুণ নিয়তির জন্য শ্যামলীর ঠাই হলাে না কোনাে পাঠশালায়। সে বাড়িতে একাকী বেড়ে উঠতে লাগল। মা, বাবা,

দাদা, দিদি ছাড়া সে বাইরে জগৎকে খুব একটা চিনত না। আস্তে আস্তে বড় হল, সমাজ এবং লােককে চিনতে শিখল। সবকিছু বােঝাতে শিখেছে, শুধু সময়ে করতে পারে নি হৃদয়ের অনুভূতিগুলােকে। পাড়ার সবাই শ্যামলীকে খুব ভালবাসত। সে কাছে পিঠে সবার বাড়িতে ঘুরে বেড়াত। যখন যে যা দিত, হাত পেতে নিত, খেয়াল খুশি মতাে ছিল তার আচরণ, সবাই তাকে নজরে রাখত, মনের দুঃখ প্রকাশ করত সকলে। তার | মাঝে যেন সে তিলতিল করে বেড়ে উঠতে লাগল।

দুঃখ এবং দারিদ্রতার মধ্যেও তারা বেশ ভালই ছিল যখন যা পেত, সবাই মিলে পরম আনন্দে উপভােগ করত। বাইরের আনন্দ কিছুটা থাকলেও, প্রতিমার অন্তরটা মাঝেমধ্যে কেঁদে উঠত। যতই হােক মা তাে, সেও তাে একজনের মেয়ে, মা হয়ে শ্যামলীর এই দীর্ঘ জীবনের পরিণতির কথা ভাবত। হাবা, বােবা মেয়ে তাদের অবর্তমানে কে দেখবে তাকে। যদি কেউ

দেখে তখন কি অবস্থা ওর হবে। ভাবত আর কঁাদত। কিন্তু ঈশ্বর যাকে সৃষ্টি করে পাঠিয়েছে তার জন্যে কোন কোন উপায় রেখেছে বইকি। না হলে এত বড় জগৎ সংসার চলছে কি করে, কে জানে কি আছে শ্যামলীর কপালে। এত দুঃখ কষ্টের মধ্যেও প্রতিমা, নিবারণকে যখন, কোন কিছু চিন্তা করতে দেয়নি, পুরুষ মানুষের গতরটায় সম্পদ, দিনরাত লােকের

ক্ষেতে পরিশ্রম করে বেড়ায়। ওর শরীরটা যদি চিন্তা করতে। করতে খারাপ হয়ে যায়, তখন খাবে কি ওরা, তাই যা কিছু ঝক্কি ঝামেলা সে নিজের হাতেই সামাল দিত। সবার মনে কিছু

কিছু চিন্তার অনুভূতি হতাে, হতাে না শুধু শ্যামলীর। সে হেসে খেলেই ঘুরে বেড়াত, এটাই ছিল এদের সান্ত্বনা। অল্পতেই শ্যামলী বড় সন্তুষ্ট ছিল, ছিল না কোন আবদার। যে যখন ডাকত, তার কাছেই চলে যেত। বড় শান্ত মেয়ে।

বিনয় বা শান্তি, আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল তারা এখন হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছে, গ্রামের দুচারজন শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা, তাদেরকে একটু আধটু দেখিয়ে দেয় পড়াশােনাগুলাে, আর স্কুলে। যা দেখে সেটাই তাদের প্রকৃত শিক্ষা, এতেই তাদেরকে পাস করতে হয়, টিউশনি দেবার মত পরিস্থিতি এদের নেই। নুন আনতে পান্তা ফুরানাের মত অবস্থা। প্রতিদিন নিবারণের কাজ থাকে না। তার উপর কঠিন পরিশ্রমে শরীরে কিছুটা অবনতি হয়েছে, বিভিন্ন রােগের একটু একটু লক্ষণ দেখা দিয়েছে, প্রতিমা কয়েকটা বাড়িতে কাজ করে যেটুকু আনে তা দিয়েই চালাতে হয় প্রতিমাকে। সামান্য কিছু চাষের জমি আছে। যেটুকু ধান, গম পায় তা দিয়ে কিছুদিনের আহার যােগাড় হয়। বাকিটা লােকের বাড়ি কাজ করে যােগাড় করতে হয় তাদের, নিবারণকে প্রতিমা সবদিন মাঠে যেতে দেয় না, বলে কিছু হয়ে গেলে, তােমাকে কে বাঁচাবে? ছেলেমেয়েরা বাবাকে বকাবকি করে, তাই নিবারণ সবদিন যেতে পারে না।

প্রতিমার পরিশ্রম বেড়েই চলেছে, তারও মাঝে মধ্যে শরীরে অস্বস্তিবােধ হয়। কিন্তু কাউকে কিছু জানতে দেয় না। বিনয় বুঝতে শিখেছে। তাই পড়ার ফাঁকে মাঝ মধ্যে কাজে যায় সে, শান্তিও মায়ের কাজ করে দিয়ে আসে কখন সময় মা যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে। কি হবে তাদের, প্রতিমা বলে তােরা তােদের পড়াশােনায় মন দে, আমি ঠিক করে নেব। কিন্তু কত দিন, রক্ত-মাংসের শরীর, লড়াই করতে করতে, একদিন তাে ক্ষয় হবে। সংসারের খরচ বাদ দিয়ে, বাড়তি খরচ করা সম্ভব হয়

, তাই ঘরে এখন বিদ্যুৎ নিতে পারে নি। হ্যারিকেনের আলােতে বিনয়, আর শান্তিকে, পড়াশােনা চালাতে হয়, এরা এখনও বাবার কাছে নালিশও করেনি কারণ তারা তাে সব কিছুই | বােঝে, সবই দেখে।

এক সময় বিনয় ঠিক করল, সে আর পড়াশােনা করবে না, কাজে মন দিয়ে, সংসারটাকে বাঁচাতে হবে, শান্তি বড় য়ে যাচ্ছে। তার বিয়ে থা দিতে হবে, বাবা, মায়ের শরীর ভাল থাকছে

, ওদেরকে রেহাই দিতে হবে, এবার, সে তার মাকে বলল, মা আমি আর পড়া করতে চাইনা। প্রতিমা চমকে উঠল, ভাবল হয়ত ঠিকমত বই খাতা না পেয়ে বিনয় পড়া ছেড়ে দিতে চাইছে। প্রতিমা বলল, দেখ বাবা কষ্ট করে হলেও পড়াশােনাটা চালিয়ে যা, আমি জানি বই খাতার যােগান, বা টিউশুনি।

কোনটাই দিতে পারি না আমরা তাে গরীব, এমনি করেই আমাদের চলতে হবে। প্রতিমার গভীর দুঃখে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। এ অন্তরের দুঃখ একমাত্র অন্তরযামী ছাড়া আর | কেউ বােঝে না, বাইরের কাউকে দেখান যায় না, বর্তমান সমাজে ভাল কেউ চায় না, সবাই ঠাট্টা তামাসা করবে, হাসবে, কেউ এগিয়ে আসে না, তার মধ্যেও ব্যতিক্রম আছে বইকি, তবেই তাে সবাই একসাথে থাকতে পারি। | বিনয় বলল না মা তুমি যা ভাবছ তা নয়, আমি সংসারের এই অবস্থার জন্যই ছেড়ে দিতে চাইছি, বাবা ঠিক মত কাজে যেতে পারে না। তােমার শরীর ভাল নাই। বােনটা বড় হয়েছে।

ওর একটা ব্যবস্থা কিছু করতে হবে। দিনকাল মা খারাপ, কখন | কি হয় বলা যায় না। তাছাড়া শ্যামলী, ওর জন্যেও তাে কিছু

করতে হবে, তােমরা আর কত করবে। আমরা গরীবের ছেলে, | পড়াশােনা বেশী দূরতাে হবে না। কেউ ঠকাতে পারবে না,

এই যা, চাকরি বাকরি তাে আর হবে না। কোথায় পাব অত টাকা? আজকাল টাকা না দিলে চাকরি হয় না, আমি বলি এখন থেকে কাজে লাগি, তবে তােমরা বেঁচে থাকতেই সব গুছিয়ে নেব। প্রতিমা ওর কোন উত্তর দিতে পারে নি। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল তার অন্তর থেকে। চোখের

জল বাধ মানে না। অঝাের ধারায় গড়িয়ে পড়েছিল দুই চিবুক | দিয়ে। আঁচলে মুখ মুছতে, মুছতে সেখান থেকে চলে গেছিল।

সব মনে পড়ে বিনয়ের। | নিবারণের শরীরটা ভাল নেই, তাই বেশ কিছুদিন কাজে | যেতে পারে নাই। কাজে খুবএকটা ডাকও আসে না। কারণ

কাজের বাজার খুব ভাল যাচ্ছে না। জিনিসপত্রের যা দাম বেড়েছে, তাতে মানুষ পাকা ঘরের কাজ প্রায় বন্ধ রেখেছে। গৃহস্থ বাড়িতে চাষের কাজ এখন কম। আবার ধান উঠলে, তখন কাজের ডাক আসবে। বেচারা মন মরা হয়ে বসেই থাকে। এতবড় সংসারে খরচ না দিলে কি করে চলবে। ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে। মেয়েটা বড় হয়েছে ছেলেটার পড়াশােনা, তা ছাড়া একটা বােবা মেয়ে ঘরে সেও আস্তে আস্তে বড় হয়ে যাচ্ছে। খরচ বেড়েই চলেছে তার উপরে বসে থাকা, | বড় দুশ্চিন্তাই ফেলে দিল তাকে, জীবনে এই প্রথম হয়ত এত ভাবনা এল নিবারণের। এর আগে প্রতিমা তাকে কোন চিন্তাই করতে দেয়নি। নিবারণ ভাবছে, একবার জমিটার দিকে ঘুরে আসবে, কেমন ধান হয়েছে দেখবে। তাই গামছাটি কাঁধে নিয়ে যাবার প্রস্তুতি করছিল।

এমন সময়, গ্রামের গণ্যমান্য এক বিত্তশালী লােক, বিপ্রদাস বাবু এসে হাঁক দিল, নিবারণ ও নিবারণ বাড়ি আছ নাকি, সবাই শুনতে পেল সেই ডাক। নিবারণ হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল।

এবং নমস্কার জানিয়ে সামনে দাঁড়াল। বিপ্রদাসবাবু বড় ভাল | লােক। গরীবের দুঃখ কষ্ট সে বােঝে, সকলেই তাকে মান্য করে,

সকলের উপকারও করে সে। সে শুনেছে নিবারণ এখন কাজে যেতে পারে না। তাই একবার খোঁজ নিতে আসা।

বিপ্রদাস বাবু বলল, কি নিবারণ তুমি অসুস্থ এখবর তাে আমাকে দাও নি। দীর্ঘদিন কাজকর্ম করাে না, চলে কি করে তােমার? নিবারণ একটা দীর্ঘশ্বাসকে মুক্ত করে হাসি বের করে বলল, ঐ কোন রকম চলে বাবু। একবেলা খেয়ে না খেয়ে, শরীরটাতাে ভাল নেই, তাই ছেলে মেয়েরা আর যেতে দেয়

বিপ্রদাসবাবু সবই বুঝতে পারল, মনে মনে ভাবল, এখন যদি এদের পাশে না দাঁড়াই তবে এরা না খেতে পেয়ে মারা যাবে।

বিপ্রদাসবাবু নিবারণকে বলল কাল থেকে তুমি কাজে যাবে, দীর্ঘদিন ধরে তুমি যে শ্রম আমাকে দিয়েছ, তা যথেষ্ট, আর অত পরিশ্রম নাই বা করতে পারলে, আমি যেমন পারি তােমাকে সাহায্য করব। তুমি শুধু তদারকি করবে। | সেইমত নিবারণ প্রতিদিন বিপ্রদাসবাবুর ক্ষেতে কাজে যেতে লাগল, যখন পারে যায়, যখন পারে না যায় না। বিপ্রদাসবাবু নিবারণকে চাল, মুড়ি, চাষের ফসল, এমনকি কিছু কিছু টাকা পয়সা, সাহায্য করতে লাগল। মােটামুটি দুবেলা আহারের অভাবটা ঘুচল। বিপ্রবাবুর মত লােকেরা, এখন এসমাজে বেঁচে আছে আর আছে বলেই নিবারণের মত লােকেরা বেঁচে আছে। হঠাৎ একদিন নিবারণ তার ছেলে বিনয়কে সঙ্গে নিয়ে বিপ্রদাস বাবুর কাছে হাজির হলাে। বলল, বাবুমশায়, আমার ছেলেটাকে কাজে নিন। আমি থাকতে থাকতে ওকে সব দেখিয়ে দেব, বিপ্রদাসবাবু জানত, বিনয় বড় ভাল ছেলে, সে পড়াশােনায় ভাল। ভাল রেজাল্ট করেছে, ও যদি কাজ করে, তবে ওর পড়াশেনােটা বন্ধ হয়ে যাবে। জীবনটা খেটে খেটে শেষ হয়ে যাবে।

বিপ্রদাসবাবু বিনয়কে ডেকে বলল, বিনয় তুমি পড়াশােনা ছেড় না। চালিয়ে যাও। একদিন কিছু না কিছু হবে। বিনয় বাবুমশায়কে বুঝিয়ে বলল, সব কথা। সংসারের দুঃখের কথা। শ্যামলীর কথা। বিপ্রদাসবাবু বলল—আমি তােমার সংসারকে দেখব। তােমাকেই সাহায্য করব। তুমি আমার গর্ব। পড়া তােমাকে করতেই হবে। বিনয় আর প্রতিবাদ করতে পারেনি, বলল বেশ, তাই হবে, সেই মত বিনয় আবার পড়াশােনা করতে শুরু করল। এবং ভাল ফল করল। বিপ্রদাসবাবু, যখন যা দরকার হয়েছে বিনয় এবং তার পরিবারকে দিয়েছে।

একদিন সুসংবাদ পেল বিনয়, তার একটা সরকারি চাকরির খবর এসেছে। হাওড়া জেলায়, বিনয় কাজে যােগদান করলাে। এখন তাদের সকল দুঃখ মােচন হয়েছে। এবার সে শ্যামলীর জন্য টাকা জমাতে শুরু করেছে, তাকে বড় আদরে রেখেছে, সে বড় বােনের দিয়ে দিয়েছে, গ্রামের একটি ছেলে যে

করণিকের কাজ করে, বিনয়ের পরিচিত, খুবই ভাল ছেলে, যাক একটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেছে। বিনয় একটা ভাল ধুতি, পাঞ্জাবী কিনে, এবং কিছু মিষ্টি নিয়ে, বিপ্রদাসবাবুর পায়ে, প্রণাম করলাে। বিপ্রদাসবাবু দুহাত ভরে আশীর্বাদ করলাে। ওনাদেরকে তাে অন্য কিছু দিয়ে অপমান করা যায় না, তাই টাকা পয়সা ফেরত দেয়নি বিনয়, বিনয়ের আজ সব কিছু সম্ভব হয়েছে, সব বিপ্রদাসবাবুর জন্যেই। বেশ সুখে এবং স্বাচ্ছন্দে চলছিল ওদের, কিন্তু এই হিংস্র সমাজ কারুর ভাল দেখতে পারে না, বিনয়কে বারে বারে কোন এক রাজনৈতিক দল চাপ দিচ্ছিল, দলে আসার জন্য, বিনয় এসব দলাদলি, রাজনীতি, কিছুই পছন্দ করে না। তাই নানা রকম ভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা করছিল তারা, শুধু পারে নাই, বিপ্রদাসবাবুর মত লােক ওদের পাশে ছিল বলে। কিন্তু মনে মনে প্রতিহিংসার জাল তারা বিছিয়ে রেখেছিল। শুধু সুযােগের অপেক্ষা।

শ্যামলী দিন দিন আরও উন্মত্ত হতে লাগল, উদ্ধত যােবনা, এক সর্বাঙ্গসুন্দরী নারীতে পরিণত হলাে। তবু এ সমাজে তার জায়গা নাই, হাবা বলে কেউ বিয়ে করতে রাজি হয় না। আজ যদি জোর করে ওর বিয়ে দেবার চেষ্টা করে, লােভী সমাজ টাকার লােভে বিয়ে করবে। কিন্তু কোন সামাজিক মর্যাদা পাবে , একদিন হারিয়ে যাবে তার অস্তিত্ব।

তাই প্রতিমা আর চেষ্টা করেনি, বিনয়ের সম্বন্ধ আসল। এবং সংসারে পরিণত হলাে, নিবারণ এখন বুড়াে হয়ে গেছে। তাই আর কাজে যায় না। বিপ্রবাবু আর ডাকে না, সে বুঝেছে নিবারণ আর পারবে না। প্রতিমাও সব বাড়িতে কাজ ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু বিপ্রদাসবাবুর বাড়িতে যায়, এত উপকার করেছে লােকটা তাই তাকে ছেড়ে দিতে পারে না। | রাজ্যে কত নতুন দল এল, দল বদল হলাে। নতুন রাজ্য তৈরী হলাে। কিন্তু হিংস্রতা আরও বেড়ে গেল। চারিদিকে শুধু অশান্তির আগুন জ্বলতে শুরু করল। বিনয়কে কেউ বাগে আনতে পারল না। সে নিজের মত করেই চলতে লাগল, কিন্তু সবার ভাল বােধহয় বিধাতা সহ্য করতে পারে না। অবশেষে নেমে এল এক ভয়ঙ্কর দিন। সবকিছু ওলট পালট হয়ে গেল বিনয়ের জীবনে। প্রতিমা নিবারণের যে দুঃখ ছিল সে দুঃখই থেকে গেল। বিনয়কে তারা মানুষ করতে পেরেছে, তার ব্যবস্থা করতে পেরেছে। কিন্তু পারেনি শ্যামলীর জন্য কিছু করতে। | একদিন সবাই যে যার কাজে চলে গেছে। নিবারণ একটু বেরিয়েছে বড় মেয়ের বাড়ি, বিনয় গেছে কাজে। প্রতিমা খাওয়াদাওয়ার পর, একবার বিপ্রদাসবাবুর বাড়িতে গেছে কিছু কাপড় জামা মেলা আছে সেগুলি তুলতে। ধরিত্রীর বুকে ক্রমশ সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সব কিছু যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। ঝড় আসার আগে প্রকৃতি যেমন নিঝুম হয়ে যায় কোন সাড়া শব্দ থাকে না। সন্ধ্যাবেলায় যে যার বাড়িতে সন্ধ্যারতির কাজে ব্যস্ত।

তখন এক অশনি সংকেত নেমে এল, শ্যামলী একা ছিল ঘরে, ঘর ফাকাই ছিল প্রতিমা ভেবেছিল, এখুনি যাবে আর চলে আসবে। বেশি দেরিও করেনি প্রতিমা। বিনয় কাজের থেকে বাড়ি আসছে, একটু দেরি হয় তার আসতে। অনেকটা রাস্তা। নিবারণ আজ আসবেন, কি আর হবে, এই সন্ধ্যাবেলাই এই ভরসাতে শ্যামলীকে একা রেখেই ওর মা গেছিল। কিন্তু বর্তমান সমাজের বিশ্বাস, ভরসা সব কিছুই জলাঞ্জলি গেছে। তা এই সদা সরল মানুষগুলি বুঝতে পারেনি। শয়তানের লালসা কোন কিছুই রেহাই দেয় না, তারা বােঝে না কে হাবা, কে বােবা, শ্যামলী বােবা হলেও সেওতাে রক্ত মাংসে গড়া এক জীবন, তারতাে শরীরটা আছে।

কেউ বাড়িতে নাই দেখে, শয়তানের দল যারা মানুষরূপী পশু আজকের সমাজে, তারা হুড়মুড় করে বাড়িতে ঢুকে শ্যমলীকে তুলে নিয়ে গেল। কারণ তারা জানত, শ্যামলী চেঁচাতে পারে না। শয়তানের কুদৃষ্টি পড়ল তার উপর। তার মুখে হয়তাে কথা নেই। কিন্তু চেতনা আছে। সে চিনতে পেরেছিল তাদেরকে। হাত জোড় করে অনুনয় করেছিল, কিন্তু পশুর দল কিছুই শােনে নি, তারা শ্যামলীকে নিয়ে এক ঘন জঙ্গলের দিকে চলে গেল। কেউ তাদেরকে দেখতে পেল না। সেখানে তারা শ্যামলীকে নিয়ে শরীর খেলায় মত্ত হল, সে কোনদিন বােঝেইনি, দেখেইনি, কি সেই পাশবিক অত্যাচারের মর্ম।

অজ্ঞান হয়ে গেছিল শ্যামলী। জ্ঞান ছিলাে এলাে। সারারাত জঙ্গলে পড়েছিল। শয়তানরা পরম তৃপ্তিলাভ করে। আনন্দে যে যার বাড়ি চলে গেছিল। একবার তাদের হৃদয় কাঁপেনি। পাপীরা তাে পাপের সাজা পাবেই। আজ না হােক কাল।

সারারাত খোঁজাখুঁজির পর, তাকে পাওয়া গেল। জঙ্গলের ভিতর থেকে মুখের শুধু একটা গোঁ গোঁ আওয়াজ স্বম্বিত ফিরে এসেছে, কে একজন সেটা শুনতে পেয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখে শ্যামলী পড়ে আছে। একরত্তি মেয়েটার যে অবস্থা হয়েছে, জানে

বাঁচবে কিনা। খবর পেয়ে সকলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। সেখানে পুলিশি তদন্ত শুরু হলাে। খবরটা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল, শয়তানরাও মনে হয় ভিড়ের মাঝে উঁকি

মারছিল। মজা দেখার জন্য। বিপ্রদাসবাবু এলেন খবরটা পেয়ে, তিনি পুলিশ কর্তাকে বললেন, যেমন করেই হােক, এই কাজ যারা করেছে তাদেরকে ধরতে হবে, পুলিশ পুরনাে শত্রুতার বিচারে তদন্ত শুরু করল। আসামী ধরা পড়ল।

শয়তানের বিচার শুরু হলাে প্রথমে গ্রাম্যসভা। সঠিক বিচার হলাে না। কারণ তারা তাে তাদের লােক। বিচার, শয়তানদের কোর্টে সাড়া দিল বেশি। সমস্ত খরচ খরচা বাবদ জরিমানা আদায়। এ বিচার কেউ মেনে নিতে পারল না। বিপ্রদাসবাবু ক্ষেপে আগুন হয়ে গেলেন। তিনি আইনের বিচারে দ্বারস্থ হলেন। আইনের বিচারে তাদের সাজা হলাে।

কিন্তু জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করতে করতে জীবন যুদ্ধে হেরে গেল শ্যামলী। চিরদিনের মত বিদায় নিল পৃথিবীর বুক থেকে। সাজান সংসার ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল বিনয়ের। বার্ধক্যের কারণে নিবারণের মৃত্যু হলাে। সমস্ত শােক এসে পড়ল প্রতিমার উপর, | সেও একদিন মৃত্যুর কোলে ঢােলে পড়ল। শয়তানরা আজও মাথাচাড়া দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দাপিয়ে বেড়ায় পুরাে এলাকা জুড়ে, শুধু পারল না শ্যামলী। অকালেই তাকে ঝরিয়ে দিল মানুষরূপী পশুরা। বিনয় এখন একা হয়ে গেছে, সবাই হারিয়ে গেছে। একমাত্র বড় বােন, গ্রামে আছে, ভালই আছে। তাই সবকিছু তাকে দিয়ে, সে হাওড়া শহরে কোন এক জায়গায় বাড়ি কিনে চলে এসেছে। সে এখন আর গ্রামে যায় না। কিন্তু ভুলতে পারে না সে দিনের সেই স্মৃতির কথাগুলাে। কোনদিন হয়তাে পারবেও না। | বিনয় একদিন গল্পের ছলে কথঅগুলাে আমাকে বলেছিল, আজ আমি লিখতে বসে, মনের মণিকোঠায় জমানাে কথাগুলি কাগজের পাতায় গেঁথে দিলাম। ঈশ্বরের চরম বিচারের আশায় বিনয় থাকল। আমিও থাকলাম। শ্যামলী হয়ত আর ফিরে আসবে না, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, শ্যামলীর আত্মা যেন শান্তি পায়। শ্যামলীর মত কত মেয়ে আজ এই সমাজে নির্মমভাবে শিকার হয়, প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত, জানি না এর কোন শেষ হবে কিনা। তবু ঠাকুরের কথাতেই বলি—“ওদের চৈতন্য হােক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *