রূপান্তর – সুবীর কুমার মুখােপাধ্যায়

গল্প সাহিত্য
Spread the love

হতাশার মেঘ, মনের আকাশে ছেয়ে গেছে। কেন? আবার কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয়? এসব প্রশ্নের উত্তরও অমিল। এভাবে চলা যায়? আবার এভাবে চলা দায়। কিন্তু চলা তাে থেমে থাকে না, আর থেমে থাকতে পারে, কিন্তু ব্যয় সচল, গতিশীল। মনে হয় ক্ষুধা, নিত্যই সমস্যা সৃষ্টিকারী; মনের ক্ষুধার নিবৃত্তি হয়

প্রায়ই, দেহের ক্ষুধার চাহিদা সম্পূর্ণ মেটে না। সব মিলিয়ে সর্বত্র, সর্বদাই হতাশার প্রকাশ। রবির ক্ষেত্রেও যথেষ্ট রয়েছে হতাশা। রবি অর্থাৎ রবিরতন রায়। কোনওক্রমে টলতে টলতে ম্যাট্রিকের গণ্ডি পেরিয়েছে। রবি দাদাদের ধরে চাকরি বহু চেষ্টা। করেছে, শাসক, বিরােধী সব দলের দাদাদের ধরেছে। বারবার। কিন্তু ফুটবলের মতাে এ পায়ে থেকে ও পায়ে পাশ হয়ে গেছে। কাজের কাজ কিছু হয়নি। চূড়ান্ত বিষাদে, মনােকষ্টে নিয়ে, একপ্রস্থ হতাশা নিয়ে চলে আসে কামনেশ্বর বাবার কাছে, অনেকেই এসেছে, ছেলের চাকরি, মেয়ের বিবাহ, বশীকরণ, মারণ, উচাটন, প্রক্রিয়ার জন্য এবং শীঘ্রই ফলপ্রাপ্তির জন্য। পােড় খাওয়া বশে তাড়ানাে, মা-খেদানাে অপদার্থ ছেলে রবি বেশ ভালাে করেই লক্ষ করেছে সবকিছু। লাইন দিয়ে এক, এক করে যেতে হয় ওনার সামনে, তার আগে ওনার চেলারা প্রত্যেকের নাম, ঠিকানা, ফোন নং এবং আসার উদ্দেশ্যের বিষয় সব লিখে রাখছেন। পাশ থেকে বিশেষ উৎসাহ নিয়ে রবি সব দেখছে, লালটিপ কপালে, লালবস্ত্র পরনে, মাথায় পাগড়ি বাঁধা, একটা চৌকিতে বসে আছেন কামনেশ্বর বাবা। ব্যাপারটা এইরকম, একজন সামনে আসতেই বাবা বললেন-হা, সমস্যা তাে বেশ জটিল, তবে সমাধান আছে উনি বলতে চাইলেন আমার মেয়ে — উনি হাত দিয়ে থামিয়ে বলেন, হ্যা, ঐ মেয়ের কথাই হচ্ছে, উলা হয়াে না, মেয়েকে চোখে চোখে সাবধানে রাখবে নাম, গােত্র দিয়ে যাও, সঙ্গে সঙ্গে এক চেলা এসে সব লিখে নিল বলল। ঠাকুরের সেবায় কিছু দেবেন কি? লােকটি একশাে টাকা দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে অতি বিনয়ের সহিত চেলাটি বলে খুব ভালাে, তবে কি জানেন, ঠাকুরের অমৃত ভােগ নিবেদন হবে আপনাদের কল্যাণে। তাই যদি ২০১ টাকা দেন, খুব মঙ্গল হবে। উনি দিয়ে দিলেন। এরপর এলেন এক মহিলা, কাছে আসতেই বাবা কামনেশ্বর বলে ওঠেন-তীব্র জ্বালা মনে, তাই তাে! অশান্তি দানা বেঁধেছে, আমার ছেলে বেকার, মেয়ে হাত দিয়ে থামিয়ে দিয়ে বলেন হ্যা, মেয়ে নিয়েও জুলছাে, বুঝতে পারছি, বাবা ওই মহিলার দিকে তাকিয়ে পজ (বিরাম) নেন, ঐ ফঁাকে মহিলা মানে বিবাহ .. বাবা হা, বিবাহে সমস্যা … আবার মহিলা জামাইটা ।

বাবা হা, সেই কথা বলছি বিবাহের মধ্যেই সমস্যা হয়েছে পুরােপুরি মঙ্গলের দোষ, গ্রহশান্তি না করলে ঐ মহিলা আমরা তাে ডিভাের্স চাইছি। কারণ বাবা বনিবনা হচ্ছে না, ছেলে বা ছেলেদের বাড়ির সব সুবিধার নয়, হয়ে যাবে ব্যবস্থা। ছেলের চাকরির একটা সমস্যা আছে!

ঐ মহিলা, না, চাকরিতে সমস্যা নেই, মানে ভালাে আয়ের জন্য বাবা এততা, ভালাে আয় যাতে হয়, আরও ভালাে চাকরি যাতে পায় মানে ঐ চাকরির সমস্যা তাে লেগেই আছে, বুধের | ফলে হচ্ছে সব। মাঝে মাঝে মাথা গরম করে ফেলত! মহিলা

হ্যা বাবা ঠিক বলেছেন। সত্যিই আপনি অন্তর্যামী বাবা বুধের প্রতিকার। আবার মেয়ের জন্য মঙ্গলের মা বগলার বিশেষ প্রতিকার। তবে কাল থেকে সব কাজ শুরু হয়ে যাবে। করিত

বাবু একবার দেখুন। পূজার আশীর্বাদী ফুল নিয়ে আসুন ধরিতবাবু। এই করিতবাবু আর ধরিতবাবু হচ্ছেন বাবার চেলা, আর একটি আছে তিনি হচ্ছেন চলিতবাবু। ধরিতবাবু প্রসাদি ফুল দিলেন মহিলার হাতে “ বলেন যত্ন করে রেখে দেবেন ঠাকুরের আসনে। সামনে চলে আসেন করিতবাবু – মাসিমা, নাম বলুন, ঠিকানা, ফোন নং, ছেলের নাম, মেয়ের নাম, জামাইয়ের নাম, ছেলের বৌয়ের নাম… মহিলা ছেলের তাে বিয়েই হয়নি, দৃষ্টি তীব্র করে বাবা বলেন মনযােগের অভাব, কেন? ওনার ছেলের যে বিয়ে হয়নি সেতাে আমি জানি, তুমি তাে দেখেছ ওই ব্যাপারে কোনও কথা বলিনি। ওনার ছেলের ভালাে কর্মযোেগ প্রয়ােজন মহিলা-হা বাবা, আপনি যথার্থ বলেছেন, একটু তাড়াতাড়ি করুন। আসরে আবার করিতবাবু, এবার ঠাকুরের বিশেষ পূজার জন্য, ব্যবস্থা করুন। মহিলা কত লাগবে, কি দিতে হবে? এবার সামনে আসেন চলিতবাবু শুনুন, ঠাকুরের পূজায় বিশেষ ভােগ হয়, আপনাদের নামে আহুতি প্রদান হয়, আরও অনেক আছে, তবে ভােগের ব্যবস্থা হচ্ছে, স্ত্রী ভােগ, আনন্দ ভােগ, চমক্কার ভােগ, প্রসন্ন ভােগ, প্রশান্ত ভােগ, অমৃতভােগ এবং সুগন্ধ ভােগ আপনি মা কোনটা দিতে চাইছেন? তবে যা শুনছি সেখানে আপনার প্রসন্নভােগ দেওয়াই মঙ্গল। বুধ আর মঙ্গলের প্রতিকার তাে! মহিলা কত খরচ হবে? চলিতবাবু তা প্রায় দুহাজার পড়ে যাবে। মহিলা বাবা দুহাজার ? ধরিতবাবু মাসিমা কাজটা বুঝুন মেয়ের একটা, ছেলের আর একটা, তারপরে জানেন প্রসন্ন ভােগে কত কি লাগে, ডাবের জল, কাজুবাদাম, কিশমিশ, জায়ফল, জয়িত্রী, সুগন্ধী চাল, ঘি, দুধ, ক্ষীর, পাঁচ প্রকার ফল, পাঁচ প্রকার ফুল, বস্ত্র, গামছা ইত্যাদি। চাইলে এসব কিনেও দিতে পারেন। মহিলা বুঝলেন এতসব দুহাজারে হবে না, তারপর এসব কেনা ঝক্কি আছে। তার থেকে দুহাজার দেওয়াই ভালাে, এবার মহিলা বলেন আজ হাজার রাখুন, কাল হাজার দিয়ে যাব, চলিতবাবু ঠিক আছে, কাজ হয়ে গেলে ফোন পাবেন। দূর থেকে সবই লক্ষ করছে রবি, এতে রবির দিব্য, কর্ণ, চক্ষু, নাসিকা, বুদ্ধি সবই এক দিব্যজ্ঞান প্রাপ্ত হইল। শুরু হল রবির সক্রিয়তা। প্রথমেই একদিন রাত্রে চেলা তিনটে নিয়ে বসে পড়ে রবি, একান্ত আলাদাভাবে। মদ আর চা খাইয়ে বলে রবিতােমাদের পার্সেন্টেজ কত? তিন চেলা মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে, বলে চলিত এসব কি বলছেন? রবি মাল হাতে মিথ্যা বলবে না? আমি সব জানি, একসময় থানার খােচর ছিলাম। তাহলেই বােঝ, আমি সব জানি। মােক্ষম চালে বাজিমাত। প্রথমেই করিতবাবু আমি শুরু মাত্র পাঁচ পার্সেন্ট পাই, তবে আমি আর থাকব না।

এবার চলিত বাবু-আমি দশ পার্সেন্ট পাই, ওই ধরিতও পায় দশ পার্সেন্ট। একটা কথা বলুন তাে? আপনার উদ্দেশ্য কি?

রবি-আপনাদের সবাই ডবল পাবেন যে দশ পার্সেন্ট পাচ্ছেন, সে পাবে কুড়ি পার্সেন্ট। যে ৫ পার্সেন্ট পাচ্ছেন সে পাবে দশ পার্সেন্ট।

করিতবাবু কি কাজ? আমরা পারব তাে? দেখবেন যেন গ্যারেজ হই।

রবি কতবার গ্যারেজ হয়েছ সঁদুরা? জেলের জল পেটে পড়েছে ভালােই।

চলিতবাবু প্রত্যেকেই হ্যাট্রিক করেছে, তবে ছােটখাটো।

ধরিতবাবু বেশির ভাগই সেশান ৩৪ এর কেস, ছাড়া পেয়ে গেছে।

চলিতবাবু খােলসা করে বলুন তাে, ঠিক কি চান?

রবি-যা করছেন, তাই করতে হবে। শুধু জায়গাটা পাল্টে যাবে। আর সাধুবাবাটি হবেন বাবা সর্বেশ্বর।।

করিতবাবু – তা তিনি কে? একটু যদি চিনিয়ে দেন। রবি – আমি নিজে, আমিই সেজে উঠব বাবা সর্বেশ্বর।

চেলারা – আপনি পারবেন? অনেক ঝক্তি আছে, অনেক রকম লােক আসে।

রবি – এবার শুনুন প্রথমে করিতবাবু – যে আসবে নাম, ফোন নং ঠিকানা, লিখে জানবেন কোন উদ্দেশ্যে এসেছেন, যেমন বশীকরণ, উচাটন, ধারণ, মেয়ের বিয়ে, ছেলের বিয়ে, পুলিশ কেস সব লিখে নেবেন। চলিতবাবু তারা বলবে কেন?

রবি বলতে হবে বিভিন্ন ক্রিয়ার চার্জ বিভিন্ন, তাই জানতে চাওয়া।

ধরিতবাবু – তাছাড়া স্লো অ্যাকশন, কুইক অ্যাকশন আছে তাে? রবি-একদম ঠিক, তাহলে সামনের শনিবার থেকে কাজ চালু।

করিতবাবু – ডেরা কোথায় হবে? রবি – ওর পাশেই হবে। আপনাদের কাছে মােবাইল থাকবে, যাঁরা আসবেন খুঁচিয়ে জেনে নিয়ে মােবাইলে জানিয়ে দেবেন। যেমন ধরুন, আমার কানে লুকানাে থাকবে ছােট্ট হিয়ারিং কানেকশান, রামবাবু এলেন সাদা জামা পরে, এসেছেন মেয়ের বিবাহের জন্যে, বিবাহ হচ্ছে না। এই খবরটা জানাবেন। যখন রামবাবু আমার সামনে আসবে, তখন। বলবেন সাদা জামা এই জন্য এসেছে মেয়ের বিবাহের ব্যবস্থা। ব্যস আপনার কাজ শেষ। এবার আমার খেলার পালা। কেস ফিট, আপনারা একজন এগিয়ে আসবেন, চার্জ, ফিশ সব আদায় করবেন। সবশেষে হিসাব, পেমেন্ট, সব পরিষ্কার হয়ে গেল। | লাতখাের, প্রায় অনাথ রবি, হয়ে উঠল বাবা সর্বেশ্বর, ঘরের চারিদিকে দশমহাবিদ্যার ছবি, নামে শিবের ছবি। সাথে রয়েছে বজরঙ্গবলীর ছবি এবং শনিদেবের ছবি। সামনে রাখা হয়েছে চৌকির উপরে ত্রিশূল, বাঁশি, এবং খাঁড়া। পরনে গেরুয়া, মাথায় উইগের জটা, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, স্ফটিকের মালা, তুলসী মালা, কপালে তিল সাদা চন্দন, এবং সিন্দুরের টিপ-অর্থাৎ কিছু বাদ নেই কারণ উনি সর্বেশ্বর। এদিকে চেলাবিহীন হয়ে কামনেশ্বর কানা, ব্যাবসা লাটে। শুরু হয়েছে রবির কর্মযােগ, এসেছেন মুরলীধরবাবু, বড় ব্যবসায়ী, গাড়ি করি নেমেছেন অর্থাৎ বেশ মালদার। কায়দা করে জানা গেছে, ছেলের ব্যবসায় মন নেই আর। ব্যাবসা আরও বৃদ্ধি চান। মুরলীবাবু সামনে আসতেই, রবি-হা বৈষ্ণবীদেবী, মুরলী-হা, সাধুবাবা, বৈষ্ণোদেবী দর্শন হয়েছে, চমৎকার জেনে গেছেন, বাঃ বাঃ। রবি ব্যবসায় ছেলেকে বসাতে পারবেন না, কারণ পিছনে লােক আছে।

মুরলী-একদম ঠিক বলিয়াছেন। ওকে নষ্ট করে দিল একটা বাঙালি মেয়ে, খালি পয়সা নিয়ে যাচ্ছে।

রবি-হা, আরও আছে …, মুরলী কি বলব মহারাজ লজ্জার কুথা, কত যে লেড়কিদের ফোন আসে, সব বাজে আছে। ব্যবসায় বসে না, রবি-বসবে না, মন চঞ্চল, সময় লাগবে ব্যবস্থা হবে, অনেকের সাথে মিলে আছে।

মুরলী – একদম সচ্চি বাত, সব জেনে ফেলেছেন মহারাজ। আপনি তাে দেখছি অন্তর্যামী আছেন, লেকিন … রবি মানে সর্বেশ্বর বাবা লেকিন, ব্যাবসা চাঙা হােনা চাইয়ে, যেইসে লক্ষ্মীমাইয়া কি কৃপা হাে যায়ে।।

মুরলী বাবা বহুত আচ্ছা বলিয়েছেন, মনের কুথা সব বুঝে। গিয়েছেন, আপনি সব ঠিক করিয়ে দিন।

রবি-জয়-শিব-শম্ভু জয় মা তারা জয় মদনমােহন রবি চোখ। বুজে, স্থির হয়ে বসে। চলিতবাবু এগিয়ে এসে বলেন শেঠজি, এদিকে আসেন, এখন উনি সমাধিস্থ হয়েছেন, যােগে আছেন, আপনার যা করতে হবে বলে দিচ্ছি। মুরলী হঁা জি বলেন, এতাে বহুত বড় সাধু আছেন। ব্যাবসার শ্রীবৃদ্ধির জন্য বিশেষ পূজাযজ্ঞ। আহুতি সব দিতে হবে, আর ছেলের দোষ কাটাতে “নারী-উচাটন, বিনষ্টকারী যজ্ঞ করতে হবে, ছেলের নাম বলুন, গােত্র বলুন, আপনার নাম, ফোন নং, মেয়ে দুএকটির নাম বলুন সব লিখে নেওয়া হল। এবার পাশে আছে ধরিতবাবু – এসব ক্রিয়া খুব কষ্ট, তিনদিন উপবাস করে, বিশেষ যজ্ঞ করে। এক লক্ষ বার মা ছিন্নমস্তার জপ করতে হবে। মুরলী বাপরে মা ছিন্নমস্তা, উনি দারুণ কঠিন দেবী। হাঁ, বলেন কত টাকা লাগবে। ইতিমধ্যে কাপে করে কফি নিয়ে আসে করিতবাবু – শেঠজি আপকে লিয়ে মুরলী কফি খেতে খেতে বলে – আপনারা লিবেন না? চলিতবাবু – না, মহাপূজা না-হলে আমরা কিছু খাই না। মুরলী – বেশ, সাধুর সঙ্গে থাকতে থাকতে আপনারাও বেশ সাধু হয়ে গেছেন, বলেন কত টাকা লাগবে?

ধরিতবাবু – আপাতত দশ হাজার দিয়ে যান, তারপর গুরুজির ধ্যান ভাঙলে, জানব বিশেষ পূজায় বিশেষ কি লাগবে? ফোনে জানিয়ে দেব, এ ছাড়া যেদিন, যেদিন কাজ হবে, আপনাকে নিরামিষ খেতে হবে।

মুরলী – হ্যা, আমি নিরামিষই বেশি খাই। দশ হাজার লিন। মুরলীধর চলে গেলেন। একটা আত্মতৃপ্তি নিয়ে। এদেরও ভালাে কাজ হয়ে গেল। এভাবে বেশ চলছিল। এবার রবি সিদ্ধান্ত নিল। এখান থেকে যেতে হবে। কারণ একই জমিতে বারবার চাষ করলে ধার কমে যায় এবং একটা রিস্ক থেকে যায়। বেশ কায়দা করে রটিয়ে দেওয়া হল বাবা সর্বেশ্বর যাবেন মা, কামাক্ষ্যা মন্দিরে, বিশেষ বিশেষ পূজা দিতে। বাসনা আছে বাবা বিশ্বনাথের কাছেও যাবেন ভক্তের মনােস্কামনা জানাতে। হঠাৎ একদিন সব বন্ধ করে দেওয়া হল। এমন সময় সবাই চিন্তিত কোথায় যাওয়া যায় এবং কোথায় নতুন করে ডেরা বাঁধা যায়। ভাবতে ভাবতে করিতবাবুর প্রস্তাব, ওর বিধবা পিসি কমলাদাসী থাকেন গ্রামে একা, ওখানে

যাওয়া যেতে পারে। যাওয়া হল কমলাদাসীর গ্রাম বদরপুরে। এখানে সপ্তাহে দুদিন হাট বসে খুব ভিড় হয়। পিসির ঝুপড়ি বাড়িটা হাটের যাবার রাস্তার মাঝে। ওখানেই দুটো বেড়াঘর বানিয়ে নেওয়া হল। সাজিয়ে গুছিয়ে, ধুনচি জ্বালা হল, সামনে যজ্ঞবেদি করা হল পােড়া ছাই, কাঠ, কিছু বেল পাতা ফুল দিয়ে সাজানাে হল ওর মধ্যে তেল, ঘি ঢেলে, ধুনাে ছিটিয়ে বেশ ধোঁয়ার সৃষ্টি হল, এতে মানুষ সব আকৃষ্ট হতে লাগল। এখানেও ব্যাবসা জমে গেল বটে, কিন্তু গােল বাঁধল অন্য জায়গায়। এখানে যে রাঁধুনি এসেছে, বাসন্তী, সে ভালােই কাজ করে। সে এবার ধরেছে রবি মানে বাবা সর্বেশ্বরকে তার বাড়িতে গিয়ে তার রুগ্ন মেয়েকে একবার দেখতে। স্বামী পরিত্যক্তা বলে কমলা পিসি ওকে সাহায্য করে থাকে। কিন্তু রবি তাে রুগি ভালাে করতে পারবে না, আবার | যাদের ভালাে করবে আশ্বাস দেয়, একটু ঠেকিয়ে, বিধান দেয় ঈশ্বরকে নিবেদন করব। এবার ওনার যবে দয়া হবে ততদিন বিশ্বাস রেখে পুজো করতে হবে। কাজ হয়ে গেলে মানত পূরণ বিশেষ পুজো হবে। এখনও বেশ কয়েকটি মানত পূরণ পুজো হয়েছে। এতে রবির কোনও কেরামতি নেই, ওই ঝড়ে বক মরা মতাে আরকি? এত মানুষের মধ্যে, কয়েকটা এমনিই ভালাে হয়ে যায়, তখন চেলাদের বক্তৃতা – “এই তাে এনার মানত পূরণ হয়েছে, সর্বেশ্বর বাবার পুজোয় দেবতা সন্তুষ্ট হয়েছেন। দেব, দেবী প্রীত হলে সুফল মিলবেই। এই মহিলার সুফল এসেছে প্রায় তিনমাসের মাথায়। ওনার ঈশ্বরের প্রতি ছিল অটুট বিশ্বাস, আর ছিল অচলা

ভক্তি, তাতেই পেয়েছেন শক্তি, হয়েছে মুক্তি। প্রচারের ঠেলায় | আরও ভিড় বাড়ছে। ব্যাবসা জমে উঠেছে। ওদিকে অতি উৎসাহ নিয়ে বাসন্তী বাবা সর্বেশ্বর, হতভাগির আবেদন কি সাড়া দেবেন

? কি হলে আপনি একবার দর্শন দেবেন? রবি ভাবছে যে আচ্ছা, মুশকিলে পড়া গেল। কিভাবে কাটানাে যায়। কিন্তু কাটানাে বেশ দায়। বদরপুর গ্রামটি এখন আধা শহরের মতাে, মেয়েরা এখানে সাইকেল চালিয়ে হাটে যায়, নদীর ধারে প্রেম করতে যায়, মােবাইলের ব্যবহার তাে আছেই। এই গ্রামের অন্য প্রান্তে আছে একটি মনোেস্কামনা দেবীর মন্দির, বাস্তবে ওখানে পূজিতা হন দেবী কালিকা। তাঁর মূর্তির সামনে আছে যজ্ঞদেবী, শেষ কবে যে যজ্ঞ হয়েছিল সেটা মনে করতে হবে। কারণ পুজো পড়ছে কম, মানুষজন আসছেন কম। এতে খুবই বিষগ্ন, চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তান্ত্রিক লােহিতেশ্বর এবং তার চেলা, হারবােলা, বখাটে, বেকার যুবক ল্যাটা, না, না মাছের নাম নয়, যেহেতু ও বাঁহাতে বেশির ভাগ কাজ করে, সেই থেকে পাড়ার মানুষের দেওয়া নাম ল্যাটা। লােহিত আর ল্যাটার সব থেকে বড় অসুবিধা বাংলা মালের জোগানের অভাব কারণ টাকার অভাব। লােকজনের ঠাকুর, দেবতার উপর ভক্তি, শ্রদ্ধা কলিতে কমেছে তবুও দুচারটে মাঝে মাঝে আসত। এখন তাও বন্ধ। অনুসন্ধানে ল্যাটা জেনেছে যে এসবের মূলে আছে ওই সর্বেশ্বর, শালা ভুইফোড়, উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। তবে ভালাে ব্যাবসা ফেঁদেছে। ওকে টাইট না দিলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে, এসবই জানিয়েছে ঐ

লােহিতেশ্বরকে। শুনে বলেছেন – মা যা, করবেন তাই হবে। বিরক্ত ল্যাটা আরে উনি তাে মাটির পুতুল, কানে শােনা না, মুখেও বলে

, আবার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, নড়াচড়াও করেন না, তার উপর ভরসা করা ঠিক নয়। শুনেই চটে যান লােহিতেশ্বর, মূখ, এসব বলাও পাপ। শােনাও পাপ, এ সব বলিস না, এতকাল তাে মায়ের নামে খেয়েছি, পড়েছি, মা নিয়েছেন আমার ভার। শুনেই ল্যাটা বলে- দেখ তুমি নিজেই একটা ভড়। তােমার নেই চার, কিছুই অলৌকিক গল্প রটিয়ে দাও। দেখবে লৌকিক ফল মিলবে, আসলে পাবলিক তাে ছাগল, যা খাওয়াবে, তাই খাবে, ছাগলে কি না খায়। বিরক্ত লােহিত – যা তা বকা ছাড়, এবার থাম ল্যাটা – এতে হবে না কাম, বিধি বাম, ছড়াতে হবে নাম।

আসলে সর্বেশ্বরের প্রচার মাধ্যম বেশ চাঙা। তিনটে চেলা ভাষণে ওস্তাদ, আবার রেশনে বাজিমাত। হাটের দিনগুলােতে রাস্তা পর্যন্ত ভিড়। এরই মধ্যে কেউ একজন এসেছে, বলছে তার মানত ফলেছে। এতদিন বাদে মেয়ের বিবাহ স্থির হয়েছে। করিতবাবু জেনেছে মেয়েটার দোজবরে বিবাহ ঠিক হয়েছে। ঝড়ে বক্ মরেছে। হ্যান্ড মাইকে তা ঘােষণা হল যে “এই ভদ্রলােকের মানত পূরণ হয়ছে। মেয়ের বিবাহ স্থির হয়ে গেছে। এসব সম্ভব হয়েছে বাবা সর্বেশ্বরের মহিমায়- জানবেন বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। ধৈর্য ধরবেন ফল পাবেন। ব্যস ধ্বনি উঠল জয় বাবা সর্বেশ্বর। ভিড় বেশ ভালােই। এবার রবি অন্যরকম কায়দা করে। চলিতবাবুকে ডেকে বলেন “আমি সমাধিতে চলে যাচ্ছি। যােগ সাধনায় লিপ্ত হচ্ছি। মাইকে ঘােষণা করে দেবে” বলেই রবি চোখ বুজে ফেলে। ভিড় হয়েছে, সবাই অপেক্ষায়। মাইকে ঘােষণা “বাবার সমাধি হয়েছে। কাল আবার দেখবেন। চলে আসবেন, ঈশ্বরের সঙ্গে সমন্বয়, সংযােগ রক্ষা করতে যােগ সাধনায় উনি চলে যান, সকলের মঙ্গলের চিন্তায় অনেক সাধনা করতে হয়। এসবই তাঁরই ইচ্ছা “ঘােষণার পর সমবেত ধ্বনি “জয় বাবা সর্বেশ্বর”, রবি, এত ভিড় থাকতে বন্ধ করে দিল। কারণ পাবলিক ডিমান্ড তৈরি হল এবং নিলোভের কথাও ছড়িয়ে পড়ল, এর ফলে আগামীতে ব্যাবসা আরও চাঙা। এই ব্যাবসা আর রাজনীতি দুটোই নির্ভর করে জনগণের উপর এবং এতে কোনও মূলধনের প্রয়ােজন পড়ে না। শুধু চাই মন মাতানাে ডায়লগ, যাতে পাবলিক খায়। ব্যস কোনও চিন্তা নাই নেতা হয়ে গেলেই শুধুই কামাই, বন্যার জলের মতাে টাকার স্রোত চলে আসবে, চালিয়ে যেতে হবে চদার বুলি, কানে, চোখে, ঠুলি, বাড়াতে হবে সঞ্চয়ের থলি। এ সব মডার্ন পলিসির কথা রবি জানে, সেই মতাে চলে, লােকে তাকে মানে। মুশকিল হয়েছে ওই বাসন্তীকে নিয়ে, তার বিশ্বাস আমার দেখাতেই নাকি তার মেয়ে ভালাে হয়ে যাবে আর উৎপাত শুরু করেছে ল্যাটা। খদ্দের ভাঙিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য খুবই কম। তবুও বিরুদ্ধ পক্ষকে ছােট করে দেখা বােকামি এবং ভুল। আজ আবার কমলা পিসি বলেছে। ওই বাসন্তীর ব্যাপারটা দেখতে। রবি, এবার অপেক্ষাকৃত বেশি চালাক চতুর ধরিতবাবুকে ডেকে বলে হাটের দিন যে ডাক্তার আসে বােধহয় ডাক্তার চন্দন প্রধান, তাকে একবার

ডেকে আনতে হবে। বুঝে গেছেন ধরিতবাবু। সময়মতাে এক হাঁড়ি মিষ্টি, আর খানিকটা ফুল, বেলপাতা নিয়ে উপস্থিত হয়ে যায় ডাঃ চন্দন প্রধানের কাছে – নমস্কার প্রধান সাহেব, বাবা সর্বেশ্বর আপনাকে পাঠিয়ে দিলেন পূজার প্রসাদ, আর প্রসাদি ফুল বলেছেন উনি একজন অপ্রধান হয়ে প্রধানের কাছে প্রসাদ আর ফুল পাঠাতে সচেষ্ট হয়েছেন, দয়া করে গ্রহণ করুন। অপ্রস্তুত ডাঃ প্রধান ঠিক আছে, ওনাকে আমার নমস্কার জানাবেন। ধরিতবাবু – একটা নিবেদন যে উনি আসতেন। কিন্তু উনি এলেই এখানে ভিড় হয়ে যাবে। তাই যদি দয়া করে একবার আসেন। আপনার সময় মতাে। খুবই বাধিত হবেন। ডাঃ প্রধান – বেশ, আপনি হাটের শেষে, ওবেলা যাব। কথা ধরে নিয়ে ধরিতবাবু তাহলে, বিকালে রিকশা নিয়ে চলে আসব স্যার। ডাঃ প্রধান আসবেন, বিকাল পাঁচটায়। গােপনে মিটিংতে বসে রবি, চেলাদের নিয়ে। বলে যেভাবে বাসন্তীর মেয়েকে দেখার জন্য টান সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে গাঁটের পয়সায় ডাক্তার দেখিয়ে পরিত্রাণ পেতে হবে। না হলেই পর্দা ফাস। কারণ রুগি ভালাে করার রাস্তা জানা নেই। সুতরাং দেখাও নেই, দায় নেওয়াও নেই। সুতরাং চলিতবাবু ডাক্তার নিয়ে যাবে বাসন্তীর ঝুপড়িতে। বাকি যা বলার বলব, করব। এলেন ডাক্তার প্রধান। সর্বেশ্বর আসুন, আপনার দর্শনে প্রীত আমি। বিশেষ প্রয়ােজনে আপনার সাহায্য প্রার্থী, একটি রুগী দেখতে হবে। দয়া করে ফিষ্টাও নেবেন, এসে গেল কফি। মিষ্টি। ডাঃ প্রধান বিনা পয়সায় পেলে ভালােই খেতে পারেন, জানেন। ডাঃ প্রধান ঠিক আছে তাহলে রুগী দেখি। সর্বেশ্বর দয়া করে ফোন নম্বরটা দেন এবং নেন, হল সব। -ডাক্তার প্রধানকে দেওয়া হল সন্দেশ। বেশ খুশি হলেন, গেলেন বাসন্তীর বাড়ি। রুগি বছর দশকের রুগ্ন, শীর্ণ, মেয়ে দুর্গা, পিতৃহীন, তবে মা-ই দেখাশােনা করে। ডাঃ প্রধান দেখেই বলেন ভালাে হয় যদি হাসপাতালে পাঠানাে যায়, তাছাড়া রক্ত পরীক্ষা, আরও অন্য কিছু পরীক্ষার প্রয়ােজন। চলিতবাবু যা করার করুন এবং এখানেই করবেন খরচ আমরাই দেব। তবে একটা কথা, কোনও কিছু বাইরে বলবেন না এটাই অনুরােধ। সবই জানানাে হয়েছে রবিকে। বুঝতে পারছে বেশ কঠিন রুগী, বাঁচানােই দায়। ডাঃ প্রধান প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা নিতে শুরু করেন।

আজ ল্যাটা, লােহিতেশ্বরকে বলেছে গুরু খেলা জমেছে, ওই সর্বেশ্বর, বাসন্তীর মেয়ের জন্য ডাক্তার পাঠিয়েছে, অধবা মাগির জন্য কি প্রেম? তবে যাই বলাে, বাসন্তীর বেশ গতর, দেখতেও মন্দ নয়, একলা বেশ যুবতী, চান্স তাে লেবেই। লােহিত তাের এত ফাটছে কেন? ওর যা ইচ্ছে, করছে। ল্যাটা বলব কি মাইরি। শালিকে কত বলেছি, তবুও আমার দিকে ফিরেও তাকাল না, প্রেস্টিজে হাফ সুল। লােহিত-শালা, নেই ঘটি, বাটি, থালা, জানিস, মেয়ে মানুষ পােষার জ্বালা ? পুড়ে যাবি, ডুবে মরবি, ল্যাটা কেন? তােমার বশীকরণ কি করতে আছে?

লােহিত – ও সব ছাড়, দুচারটে খদ্দের ধরে নিয়ে আয় ওদের পিছনে টিকটিকির কাজ না করে, কাজের কাজ কর।

ল্যাটা-বললেই কি খদ্দের ধরা যায় ? জলের মাছই ধরা।

মুশকিল। আবার পাবলিক ধরা ? তবে ওর ব্যাবসার বদনাম হলে আমাদের ব্যাবসা বাড়বে। একটা গন্ধ পাচ্ছি, বাসন্তীকে ও ধরেছে। ডাঃ প্রধান জানিয়েছেন যে বাসন্তীর মেয়ের রােগটা হচ্ছে থ্যালাসেমিয়া। মাসে অন্তত একবার রক্ত দিতেই হবে। এর জন্য ওকে মাসে একবার যেতে হবে নার্সিংহােমে। সব শুনে বলে রবিযা করবার এখানেই করবেন। ডাঃ প্রধান বাড়িতে ব্যবস্থা করলে টাকা বেশি লাগবে। রবি – তা লাগুক, নেবেন দেব। ডাঃ প্রধান ঠিক আছে। ব্যবস্থা হবে সেইরকম। সর্বেশ্বর বেশ চিন্তায় পড়ে গেছে, মনে হচ্ছে এখান থেকে চলে যাওয়াই ভালাে। আবার অসহায় বাসন্তীর কথা ভেবে ভাবে, যদি জীবনে একটা সকাজ করা যায় পুণ্য হতে পারে। দোটানায় রয়েছে রবি। প্রথম দিন রক্ত দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে ডাক্তার, বাসন্তী আর রবি সবাই মিলেই হাত লাগিয়েছে, তার আগে ভালাে করে ঘর জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে। অবাক কাণ্ড, রক্ত দেওয়ার শেষে দুর্গা উঠে বসেছে, বেশ সুস্থ দেখাচ্ছে, বাসন্তীর চোখে আনন্দাশ্রু। কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে রবির দিকে। ফিরে এসে রবি, বাসন্তীকে ডেকে বলে, মুখে কুলুপ আঁটতে, কোনও কথা বাইরে প্রকাশ করা যাবে

, তাহলে মেয়ের ক্ষতি হয়ে যাবে। এদিকে অতি উৎসাহে খুশিতে বাসন্তী, কমলাপিসিকে বলেছে – জান পিসি, সর্বেশ্বর বাবা আমার বাড়িতে পা দিতেই মেয়ে উঠে বসেছে, উনি সত্যিই অসাধারণ সাধক। পিসিও খুশি, মেয়েদের পেটে কথা থাকে না, খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে। বেশি সুনাম হয়েছে সর্বেশ্বরের বাড়ছে ভিড়, বাড়ছে রােজগার, অবশ্য খরচাও হচ্ছে দুর্গার জন্য। তবুও দুর্গার কল্যাণে পাবলিশিটি তাে হয়েছে জবরদস্ত। ফলে মনােকষ্ট বেড়েছে ল্যাটার। মনে মনে ভাবছে শালার কি কপাল, টাকা পাচ্ছে। সাথে যুবতীর গতর বেশ রসে বশে আছে ঐ শালা সর্বেশ্বর। আবার ভাবে ওর তিন তিনটে চেলা, দলে ভিড়ে গেলে কিছু রােজগার হতে পারে। ওদিকে লােহিতেশ্বরের ওখানে লােকজন নেই। শালা বাংলার খরচই উঠছে না। খুবই চিন্তায় ল্যাটা।

মাসে ডাঃ প্রধান রক্ত দিয়ে থাকেন। খরচটা সবই দেয় ওই রবি। রক্ত দেবার সময় ও নিজেই উপস্থিত থাকে, ছােট্ট মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, এতে মেয়েটি মানসিক আনন্দ পায়। বাসন্তীও বেশ খুশি হয়। এদিকে পাশের বাড়ির ফুলির আসা, যাওয়া

বেড়েছে, ফুলি বছর কুড়ির একটা তরতাজা যুবতী। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এই ফুলির সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়েছে ধরিতবাবুর। ফুলির স্বভাব, চরিত্র ভালাে নয়। এটা জানা গেছে কমলা পিসির কাছে। অন্য মত যেহেতু পাশের বাড়ির সঙ্গে সীমানা নিয়ে বিরােধ আছে তাই কমলা পিসি ওদের ভালাে চোখে দেখে না ওদের যথেষ্ট বদনাম, নিন্দা-মন্দ করে থাকেন। ঘটনাচক্রে সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে লােহিতেশ্বর, অমাবস্যার কালী পূজায় এবং বিশেষ করে বারবার অনুরােধ করে গেছেন। অগত্যা ধরিতবাবু বাদে, পিসিসহ সবাই চলে যায় কালী মন্দিরে। বেশ খাতির করেই বসায় সবাইকে। পূজার আয়ােজন সম্পূর্ণ, ল্যাটা এসে গ্লাসে পিসি বাদে সবাইকে তরল বাংলা নিবেদন করে বলে এটা মায়ের মহা প্রসাদ। গন্ধ শুকেই রবি বলে এসবে অভ্যেস নেই, খাবও না। এদিকে হয়েছে আর এক কাণ্ড। ধরিতবাবু বাড়ি ফাকা পেয়ে ফুলিকে ডেকে নেন। ফুলির স্বভাব ছেলেদের গা ঘেঁষে চলা। বেশ ফুলি এসেই ধরিতবাবুকে চটুল দেহের নেশা ধরিয়ে দিল। আগুনে, ঘি পড়লে যা হয়, এক্ষেত্রেও তাই হল। চুটিয়ে দেহ প্রেমে মশগুল হয়ে পড়ে ওরা দুজনে। দুজনে দুজনার সঙ্গে আটকে আছে অজ্ঞাত কোনও ফেভিকলের কল্যাণে। চূড়ান্ত সুখের পর ফুলি আবার কবে পাব তােমাকে? ধরিতবাবু অন্য কোথাও ব্যবস্থা করে জানাব। আর পাঁচশাে টাকা নিয়ে যাও। একটা শাড়ি কিনে নিও। কেমন। ফুলি,

, না, গন্ধ বাসনা তেল, লিপস্টিক, সেন্ট, রুজ, পাউডার এসব কিনতে হবে, রাস্তায় বেরােলে এগুলি লাগে। ধরিতবাবু তাহলে তাে সবাইকে চমকে দেবে। ফুলি সবাই তাে চমকেই যায়, আড়চোখে ইশারায় কত কিছু বলে, ওসব বুঝি, তােমাকে ভালাে লেগেছে, তাই তােমাকেই সব দিলাম। তবে বে কবে করবে বল ? ধরিতবাবু এখনিই ওসব নয়, দু এক বছর আগে প্রেমটা জমে আইসক্রিম হােক, তারপর না হয় দুজনে গলে এক হয়ে যাব। ফুলি – তুমি মাইরি বেশি ডায়লগ জান। আসলে শহরের মাল তাে বটে, ক্যাবলা নয়। বেশ এসমার্ট আছে, সেই জন্যেই লাইন ছেড়ে, অন্য কাজ ধর। দূরে নিয়ে সংসার করব, দুজনে কামাব। তুমি একটা জুটিয়ে নেবে, আর আমি দু বাড়ি রান্না করব। দিব্যি চলে যাবে। মানে দৌড়বে, সব হবে তাে ? ধরিতবাবু-এখন ওসব কল্পনা রাখ, পরে ভাবা যাবে, এখন যাও, ওরা এসে পড়বে। যাও।। | ফুলি – যাচ্ছি যাবার আগে একটু আদর করে যাই। তুমি মালটা | বেশ টাইট আছ, বেশ ঘূর্তি হয়েছে। আবার হবে তাড়াতাড়ি বে করে নাও। যাচ্ছি। প্রায় একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে ধরিতবাবু ওকে স্বস্থানে পাঠিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর সবাই চলে আসে। সামান্য জল, মিষ্টি খেয়ে ফিরেছে, পূজার জন্য পাঁচশাে টাকা দিয়ে এসেছে রবি। ওই লােহিতশ্বরকে। এদিকে কালীপূজায় প্রাঙ্গনে রাত্রে বসেছে আসর। চলছে বাংলা মদ, সঙ্গে চাট আনুষঙ্গিক। আসরে আছে এলাকার মস্তান ট্যাঙাদা, ট্যাঙাদা বার চারেক, জেল ঘুরে এসেই নাম করে ফেলেছে, একটা খেলনা পিস্তল নিয়ে রংবাজি করে। এদিকে, ওদিক থেকে তােলা তােলে, ওই সব করেই চলেছে। তবে এরা মায়ের একনিষ্ঠ ভক্ত, তবে অসুর। সুযােগ বুঝে ল্যাটা,

ট্যাঙাদাকে সব বলেছে ওই সর্বেশ্বরের ব্যাপারে। মানে ওকে উস্কে দিয়েছে, তােলাবাজি করার জন্য। কানভারী করেছে ওই বাসন্তীর কথা বলেও। ট্যাঙাদার আবার মেয়েলি ব্যাপারে বেশি উৎসাহ। ওর ধারণা এলাকার স্বামীহীন মহিলা মানেই বেওয়ারিশ মাল। এই বেওয়ারিশ মালের দায়িত্ব তাে ওরই একচেটিয়া। মাছের গন্ধে যেমন বিড়াল পাগল হয় ট্যাঙাদা কেমন যেন বিলম্বিত আগত সুখ স্বপ্নে বিভাের। ভাের হয়েছে, পূজাও শেষ। লােহিতেশ্বর সবাইকে যজ্ঞের ফোটা পরিয়ে দেয়, সবাই ওই প্রাঙ্গনেই ঘুমিয়ে পড়ে। | আজ সর্বেশ্বরের ওখানে বেশ ভিড় হয়েছে। এসেছেন এখানকার এক রাজনীতির নেতা, তিনি সর্বদাই শাসক দলেই থাকেন। রংটা গিরগিটির মতাে পাল্টে যায়। তবে সবসময় থাকেন চামচে, বেলচা পরিবেষ্টিত। উনি মানে ফটিকচন্দ্র বাগ মহাশয় এসেছেন। নিজের বিষয়ে জানতে। সর্বাগ্রে সুযােগ দেওয়া হল তাকে। ফোনে সবই জেনেছে সর্বেশ্বর ওরফে রবি। সামনে আসতেই সর্বেশ্বর আগামীর চিন্তায় খুবই চিন্তিত তাে! মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে, এখন তাে আছেন শাসক দলে, জানতে হবে সুযােগ আছে কোথায়?

ফটিক – বাঃ চমৎকার, মনের কথা সব জেনে ফেলেছেন দেখছি। অবশ্য আপনার সম্বন্ধে সবাই সুখ্যাতি করছে, ভাবছি ছেলেকে … রবি ধরে নিয়ে – ছেলেকে নামবেন তবে ধীরে ধীরে ফটিক – মানে ওর ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়ে যেতে চাই, তবে রবি – ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, আর ওর মতিগতি … ফটিক – ঠিক ধরেছেন, ওর মতিগতি, চাল, চলন … রবি – আপনার মনের মতাে নয়, ঠিক কিনা ?

ফটিক – একদম ঠিক, আপনার কাছে আসা। | রবি – ওকে ফিট করে দিতে হবে, এইতাে, তাছাড়া ওর বান্ধবী…..

ফটিক – অতি উত্তম, সঠিক বলেছেন ওই মেয়েগুলি তাে ওর মাথা খেয়েছে, পয়সা উড়ে যাচ্ছে, তার মধ্যে…

রবি – তার মধ্যে একটি মেয়ের সঙ্গে চলছে বেশ বাড়াবাড়ি।

ফটিক – আপনি দেখছি জাদু জানেন, মনের কথা সব জেনে ফেলেছেন, ওই মেয়েটি তাে …।

রবি – আপনার পছন্দ নয়, ওকে ছেলের বৌ মানতে নারাজ।

ফটিক – যথার্থ, সত্যিই এতদিনে সঠিক মানুষের সন্ধান পেয়েছি, বলুন, কি করতে পারি আপনার জন্য। যদি বলেন এই ঘরটা পাকা করে দিতে পারি, সামনে লােকেদের বসার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা করে দিতে পারি, যদি বলেন ভিড় সামলানাের জন্য রােজ চারটে ছেলে পাঠিয়ে দিতে পারি।

রবি – সে তাে আমি জানি, আপনার অসীম ক্ষমতা, তবে যেসব ফাটকা টাকা পেয়েছেন, রাহুর কৃপায়।

ফটিক – হা, ওসব ব্যাপারে, বেশ। রবি – চিন্তায় আছেন বেশ, ঠিক আছে গ্রহের প্রতিকার হবে। ফটিক – আমাকে শুধু বাঁচিয়েদিন, আমি আপনাকে…

রবি – দেখবেন, ফটিক – নিশ্চয়ই আপনি দেবেন আর আমি দেব না? নামে ফটিক, কাজে স্ফটিক। 

রবি – হ্যা স্ফটিকের মতাে স্বচ্ছ, চন্দ্রের মতাে উজ্জ্বল, বাঘের মতাে সাহস…

ফটিক একগাল হেসে – হা, সাহসী তাে বটেই, আর স্বচ্ছতা না রাখলে রাজনীতিটাই অচল। রবি – তবে আপনি সচল।

ফটিক – খুব ভালাে বলেন, আপনার ফিস্ কত?

সর্বেশ্বর আপনাদের মতাে নেতাকে দিতে হয় কি, অর্থাৎ নাে ফিস।

ফটিক – তবে আমার কাজটা কবে হবে? এর জন্যও তাে খরচ আছে।

সর্বেশ্বর – ফোন নং দিয়ে যান। একটু ভেবেনি, জানিয়ে দেব।

ফটিক – ঠিক আছে, স্মরণে রাখবেন, নমস্কার। রবি বুঝতে পারছে, এখান থেকে যাবার সময় হয়ে আসছে, নীতিহীন মানুষের থেকে দূরে থাকাই শ্রেয় এরা বিষধর সাপের থেকেও মারাত্মক। এদিকে ফুলির আনাগােনা বেড়েছে, যেটা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এ বিষয়েও খুব অস্বস্তিতে রয়েছে রবি। প্রতি মাসেই বেশ খরচ হচ্ছে, দুর্গার জন্য। রবি, চেলাদের বলছে কিছু কম নিতে, কারণ একটা ভালাে কাজ, জীবনের স্বার্থে কিছু ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু চেলারা বলেছে ওসব বাইরের মানুষের জন্য ভাববার প্রয়ােজন নেই, আমাদের জন্য কে কবে ভেবেছে? সর্বোপরি বাসন্তীর প্রতি আপনার দুর্বলতা থাকতে পারে, তাতে আমাদের কি এসে যায়? রবি – ওই মুমূর্ষ বাচ্চা মেয়েটিকে দেখে তােমাদের মায়া হয় না? ধরিতবাবু – আমাদের কেউ ছায়া মাড়ায় না, আমাদেরও মায়া হয়

। রবি – ছিঃ ছিঃ তােমরা কি মানুষ? একটু ভাব। | চলিতবাবু – কি ভাববার আছে, আজ যে আপনি লােক ঠকিয়ে চলেছেন, সেটাতাে আপনার পেটের জন্য। যখন বেকার ছিলেন দুয়ারে দুয়ারে লাথি খেয়েছেন। কেউ পাশে আসেনি। | করিতবাবু – ঠিক আছে ওস্তাদ, আমরা মাসে এক হাজার দেব। আর বেচাল নয়, তবে এটা বেশি দিন চলতে পারে না।

রবি বুঝে গেছে। দিন ফুরিয়ে এসেছে। মাস দুয়েকের মধ্যেই চলে যাবে এখান থেকে। একাই চলে যাবে কোনও অজানায়। শুধু এদিক ওদিক করে চলার দিন শেষ। কথা হয়েছে রবির ডাঃ প্রধানের সঙ্গে। এ মাসের রক্ত দেওয়ার দিন হচ্ছে আগামী বুধবার। এখনও পাঁচদিন বাকি। আজ এসেছে ল্যাটা, বাবা সর্বেশ্বরের সাথে দেখা করতে, উদ্দেশ্য আজ একটু বিলাতি খাওয়াতে হবে। রবি কিন্তু নারাজ, ওর সাথে মদের আসলে বসলে, এইটাই ও চাউর করে দেবে, তাতে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু বেজায় চটে যায় ল্যাটা, আশায় বালি, এটা তাে একপ্রকার অপমান। বেশ খেপে গেছে ল্যাটা যাওয়ার সময় শাসিয়ে গেছে – দেখে নেবে ও। ল্যাটা চলে এসেছে কিন্তু আঁতে ঘাত লেগেছে, ভালােবেসে, ভালােভাবে একটু বিলেতি চেয়েছে, এতেই অপমান। কিছুই পাওয়া গেল না, শালা হাড় কিপ্পন, এর বদলা নিতেই হবে। এরই মধ্যে এক মহিলা রেগে বলে গেলেন – তার মেয়ের বিবাহ ভেঙে গেছে, প্রজাপতি যজ্ঞে কোনও ফল হয়নি, অথচ অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে। চলিতবাবু এগিয়ে এসে বলেন মাসিমা, উত্তেজিত হবেন না, গণনা

করে দেখতে হবে, কি হয়েছে। একটু বসুন, ওদিকে ওই সময়ে মানিকবাবু এক হাঁড়ি মিষ্টি নিয়ে এসে হাসতে হাসতে বললেন ছেলের চাকরি হয়েছে, মানত ফলে গেছে। যথারীতি ফলাও করে মাইকে ঘােষণা করা হল মানিকবাবু মাইকে বললেন – অসাধারণ ফল পেয়েছি, এখান থেকে গিয়ে কদিন বাদেই দেখি অ্যাপয়েন্ট লেটার এসে গেছে, ছেলে জয়েন করেছে, ওনাকে প্রণামি দেব, প্রণাম জানাব, সত্যিই উনি মানবদরদি, প্রকৃত সাধক, ওনার পূজা অর্চনা, যাগযজ্ঞের ফলে লাভ হয়ে থাকে। সবাই ধন্য ধন্য করছে। এই সুযােগেই চলিতবাবু এসে ওই মহিলাকে বলেন – দেখলেন মাসিমা চোখের সামনেই প্রমাণ, কোন, কোন কাজে একটু সময় লাগে, মনে হচ্ছে আপনার মেয়ের অন্যত্র ভালাে বিবাহ হবে তিন মাসের মধ্যেই, চেষ্টা চালিয়ে যান, ফল হবেই, সর্বেশ্বর বাবা তাে আছেনই চিন্তা করবেন না। ব্যবস্থা হচ্ছে, হবে।

মাসিমা – ঠিক আছে, আরও কিছুদিন দেখা যাক এর মধ্যে যদি মেয়ের বিয়ে হয় তাে ভালাে, না-হলে যা নিয়েছ সব ফিরত দিতে হবে। আমার নামও নিস্তারিণী, আমার হাত থেকে নিস্তার নেই, মনে রেখাে। | এইরকম নিস্ফলা কেস যদি, সর্বসমক্ষে বেশি আসে তবে তাে সত্যিই নিস্তার নেই। তিনমাসের আগেই কেটে পড়তে হবে। সব দেখে ধরিতবাবু বলে খবর এসেছে আমার মার অবস্থা খারাপ। চলে যেতে হবে। আসলে ফুলি অনবরত চাপ দিচ্ছে – বিয়ের জন্য, তারপর নিস্ফলা কেস আসতে শুরু করেছে, সুতরাং আপনি বাঁচলে বাপের নাম, সব শুনে চলিতবাবু গত বছরেই তাে তাের মা মারা গেছে বলেছিলি, কামনেশ্বর বাবার থেকে টাকা নিলি, আবার মা? ধরিতবাবু বুঝলেন যে মিথ্যাটা ধরা পড়ে গেছে, বলেন – তুই ভুল শুনেছিস। তাছাড়া আমার বাবার তাে দুটো বিয়ে, আরেকটা মা অবস্থা সংকটজনক। যেতেই হবে, তবে চলে আসব তাড়াতাড়ি। চিন্তা করিস না, চলিতবাবু বুঝে গেছে, ও জলজ্যান্ত একটা ঢপ মেরে নিজেকে বাঁচিয়ে নিল। মৌসুমি হাওয়ার মতাে ধরিতবাবু ধরা, ছোঁয়ার বাইরে। ব্যাপারটা জেনেই ফুলি খুব মুষড়ে পড়ে। এই নিয়ে তিন তিনবার সে থােকা খেল, সবাই লুটে নিল, কিন্তু বিয়ে কেউ করতে চাইল না, তবে চেষ্টার ত্রুটি রাখবে না পরের বার, মালা বদল করেই ছাড়বে, তবে পাত্র খুঁজতে হবে পুরােদমে। কাজে নেমে পড়েছে ফুলি, তার নজর পড়েছে এখন চলিতবাবুর দিকে। দেখাই যাক না, আর নয় এবার যাবার সময় হয়ে এসেছে। দলও ভাঙছে। রবিও মনস্থির করে ফেলেছে, ও চলে যাবে একাই, অন্য কাজ অন্যত্র খুঁজে নেবে, না হলে রিকশা চালাবে দূরের কোনও জায়গায়। এই উদ্দেশ্যে রটিয়ে দেওয়া হল সর্বেশ্বর বাবা যাবেন কামাক্ষ্যায় অনেক কাজ সিদ্ধি করতে বিশেষ পূজাযজ্ঞ হবে সেখানে। শুনেই সর্বাচলে আসেন নেতা ফটিকবাবু। ওনাকে দেখেই সর্বেশ্বর বাবা চিন্তা নেবেন চিন্তাময়ী। গ্রহণ লাগে, আবার গ্রহণ ছাড়ে, উতলা হলে কি চলে, ছেলে তাে … ।

ফটিক – আপনি তাে সবই জানেন, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারছে, রােজ টাকা নিচ্ছে আর –

সর্বেশ্বর – ব্যস আর বলতে হবে, না টাকা ওড়াচ্ছে অসৎ কাজে ফটিক – হ্যা ঠিকই বলেছেন মানে ঐ মদ আর …

সর্বেশ্বর – মদ আর মেয়ে ছেলেই তাে সবশেষ হয়। এসব করাচ্ছে রাহু। আপনার কষ্টের টাকায় জলে যাচ্ছে।

ফটিক – ঠিক ধরেছেন, পরের বার আর ভােটে দাঁড়াব না.. সর্বেশ্বর – টিকিট পাবেন তাে?

ফটিক – আপনিই অন্তর্যামী, ধরে নিন পাচ্ছি না, এবারে টিকিট পেতে গেলে বেশ খরচ আছে। অত টাকা দিয়ে, তারপর জিততে

পারলে, সব গেল। | সর্বেশ্বর – একটা ব্যাবসা করুন, শপিং মল করুন, সব আইটেম রাখবেন, বেশ চলবে। | ফটিক – ঠিক বলেছেন, ভেবে নিয়েছি, আজ এই খামটা রাখুন একবার ভালাে করে ভেবে, দেখে বলবেন আমি জিতব কি না? | সর্বেশ্বর – এখনও সময় আছে, জানিয়ে দেব, ছেলের ব্যাপারে রাহুর প্রতিকার কোনও ভালাে পূজারিকে দিয়ে ছিন্নমস্তার পূজা দেবেন।

ফটিক – আপনি করে দিন। সর্বেশ্বর – ওটা এখানে হবে না, আপনাকে যেতে হবে রাজারাপ্পা, বা বিষ্ণুপুরে। ইতিমধ্যে একটা ফোন পেয়ে ফটিক – আজ যাই, এখনি জরুরি কাজে যেতে হবে, রাজনীতি করার এই জ্বালা? সর্বেশ্বর বুঝে গেছে যে নেতার চোখ, ল্যাটার বিরােধিতা, দল ভেঙে যাওয়া, এসবই অশুভ লক্ষণ, অতএব শীঘ্রই পলায়ন শ্রেয়।

এদিকে লােহিতেশ্বর বাবা মন্দিরে মানুষ টানার জন্য বেশ কায়দা করে একটা ফ্লেক্স টানিয়ে প্রচার করছে, অভিনব প্রচার। এখানে বিভিন্ন ধরনের পূজা হয়। এইসব পূজা সাধারণভাবে হয় না, এখানে মনের বাসনা পূরণের নিমিত্তে এই সব পূজার আয়ােজন হয়। পূজাগুলি – বাঁশুনী দেবী, জাহ্নবী মা, উদীচ্যাঙ, উলাইচন্ডী, জাগেশ্বরী, নােয়াজন, যােগাদ্যা, ব্রহ্মা পূজা, তারাখ্যা দেবী, কংকাবতী, নিস্তারিণী, শংকরী মা, কৌশিকী, ভদ্রাবতী, ভাঙালী, বিশ্বমাতা, মগধেশ্বরী, ইতু, সেঁজুতী পূজা (কুমারীদের জন্য), | কিরিটেশ্বরী, ফুলমণী, সর্বতারিণী, রাজরাজেশ্বরী – এইসব পূজাগুলি। নিষ্ঠাসহকারে করা হয়। | সর্বেশ্বরের ওখানে সবাই চলে যাচ্ছে, এইভাবে প্রচার করলে যদি কিছু লােক আসে। না-হলে তাে খরচা উঠছে না। দৈনন্দিন একটা খরচ আছে তাে। বেশ নতুনত্ব আছে ভাবনার, একটা চান্স তাে নেওয়া যাক। ল্যাটারও ওটাই মত। লােকজনকে টানতে হবে, তবেই কারবার জমবে। গ্রাম্য পরিবেশে, মানুষজনদের নিয়ে এই টানাটানির খেলাটা রবি একদম অপছন্দ, তাছাড়া চলে যাবার | সিদ্ধান্ত পাকা। বলে যাবে এখানে, শীঘ্রই ফিরে আসছি, কিন্তু আসলে আর এখানে ফিরবে না এবং নিজেকেই সে হারিয়ে ফেলবে, পাল্টে ফেলবে নিজেকেই চূড়ান্তভাবে। সর্বেশ্বরের খােলস ত্যাগ করে হবে সত্যিকারের। সাধারণ মানুষ। জীবনযাপন হবে অতি সাধারণ। রবি কমলাদাসীকে পিসি, চলে যাব ঠিক করলাম, এই খামটা নেতা ফটিকবাবুকে দিয়ে দেবেন। আর আপনি পাঁচ হাজার

রাখুন, অনেক করেছেন। কমলা – তা বাবু পিসিকে ভুলে যেও না, মাঝে মাঝে এসাে। রবি নিরুত্তর, কারণ, আর ঢপ মানে মিথ্যা বলতে ইচ্ছে করছে না। ঢপেতে রােজগার হয়েছে বটে, তবে মানুষের বিশ্বাস নিয়ে এভাবে খেলতে আর ভালাে লাগে না, মন সায় দেয় না, বিবেক দংশন করে অশান্তি ঘিরে ধরে, বারবার মনে হয়েছে অলক্ষ্যে একজন দেখছেন। তিনি ক্ষমা করবেন না। প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে, প্রয়ােজনে পরিশ্রম করব। দিন-মজুর খাটব। রাস্তায় ফেরি করে বেড়াব, একটা পেট ঠিক চলে যাবে। তবুও মনে পাব প্রশান্তি এই ভেবে সাচ্চা রােজগার। লােক-ঠকানাে পেশার লােভের টাকা নয়। লােভে পাপ, পাপে মৃত্যু। মানে মানে সরে পড়া, সঠিক সময়ে সঠিক পথ ধরাতেই প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া যাবে।

চলে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রবি, পথের মাঝে, আজ বুধবার শেষবারের মতাে দুর্গাকে দেখে যাবে। আজ এসেছেন ডাঃ প্রধান, রক্ত দিয়েছেন থ্যালাসেমিয়া রুগী দুর্গাকে। মাথার সামনে বসে মাথায় হাত বুলাচ্ছে, রবি, দুর্গার ভালাে লাগছে। মনে হচ্ছে যেন পিতার স্নেহস্পর্শ। রবি ডাঃ প্রধানকে বলে ডাক্তার বাবু আমি চলে যাচ্ছে। এদের একটু দেখবেন। দশ হাজার টাকা রেখে গেলাম ওর মা বাসন্তীর কাছে। বাসন্তীর হাতে টাকা দিতেই কেঁদে ওঠে বাসন্তী। এমনি দুর্ভাগা, একজন দেবতাকে হারালাম। নিঃস্বার্থভাবে, এভাবে কেউ অনাথির পাশে দাঁড়ায় সেত মূর্তিমান দেবতা। রক্ত দেওয়া শেষ, তবে আর একটু দেখবেন ডাঃ প্রধান। এই সময় একটা ফোন ডাক্তারবাবু প্লিজ শিগগির আসুন, ভেরি সিরিয়াস। ডাঃ প্রধান সর্বেশ্বরবাবু, একটু বসুন, চেম্বার থেকে একটু ঘুরে আসি, গাড়িতে যাব, আসব, বেশিক্ষণ লাগবে না। চলে যান ডাঃ প্রধান। ঘরের দরজা বন্ধ। যাতে ইনফেকশন না হয়। এমন সময় দরজায় টোকা মারে ল্যাটা। দরজা খােলে সর্বেশ্বর। মুহূর্তে ঘাড় ধরে বাইরে আনে ল্যাটা। বাইরে অনেক মানুষ বলে ল্যাটা এই শালা মাগিবাজ, স্বামী ছাড়া থাকে বাসন্তী, তার সঙ্গে চলছে ফষ্টিনষ্টি, দেখছেন তাে, দরজা বন্ধ করে মেয়েছেলে ভােগ চলছে, এটা তাে বেশ্যাখানা নয় ? এই শালা সাধু সেজে এই সব চালিয়ে যাচ্ছে। একে ছাড়া নেই। বলেই ল্যাটা মাটিতে ফেলে মারে কয়েকজন সহ। বেশ আহত হয়েছে সর্বেশ্বর। বাসন্তী বেরিয়ে এসে চিৎকার করছে “একটা দেবতার মতাে মানুষকে বদনাম দিচ্ছে, মারছে একি অন্যায় ? কেউ দেখার নেই …’ চিৎকার করে এগিয়ে আসেন, কমলা পিসি কার এত ক্ষমতা যে আমার বেটার গায়ে হাত দেয়, তার বংশ নির্বংশ করে দেব, এই যে ল্যাটা মস্তানি আর জায়গা পাওনা? তােমার কীর্তি তাে সব জানা, এই বাসন্তীকে তুই তাে কুপ্রস্তাব দিয়েছিলি, ও তাের কথায় কান দেয়নি বলে, এসব রটাচ্ছিস, চল থানায় আজ তাের একদিন কি আমার একদিন, বলতে বলতেই এসে পৌঁছেছেন ফটিকবাবু, আর ডাঃ প্রধান। ডাঃ প্রধান আপনার ডাকে যেতে না যেতেই, শুরু হয়ে গেছে, এখানে মস্তানি।

কমলা – ফটিক, তােমাদের জমানায় কি ভালাে লােককে এভাবে মারা হবে? বাসন্তী সর্বেশ্বর বাবা, মেয়ের চিকিৎসার খরচ দেন,

দেখতে এসেছেন, যা নয় তাই বলে যাচ্ছে, জানেন রাস্তায়, পথে ওই জানােয়ার আমার গায়ে হাত দিতে আসে, কুপ্রস্তাব দেয়, আর আপনারা? | ফটিক – এই একে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখ গাছের সঙ্গে, সব শুনেছি ডাঃ প্রধান বলেছেন, উনি যে এতবড় মনের মানুষ তাও জেনেছি, ছিঃ ছিঃ সেই মানুষের গায়ে হাত? লজ্জার কথা। থানায় ফোন করেন ফটিকবাবু। নিজে গিয়ে দেখে স্তম্ভিত। মার খেয়েও বাচ্চা মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিচ্ছে – “সব ঠিক হয়ে যাবে” বলেন – এখন এখানে বিশ্রাম নিন, ব্যথার ঔষধ দিয়েছি, সঙ্গে টক্সাইড আর ঘুমের ওষুধ দেওয়া আছে একটু গরম দুধ খেয়ে এখানেই শুয়ে থাকুন। ফটিকবাবু – হ্যা, এখানেই এখন বিশ্রাম করুন, আমি আছি সর্বেশ্বর – আপনার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছি পিসির কাছে।

কমলা ফটিককে মুখবন্ধ খামটা দেয়। ইতিমধ্যে চেলারা ল্যাটা বেঁধে বেশ কয়েক ঘা বসিয়ে দিয়েছে। বাসন্তী পিসি এনারা আছেন। তুমি বাড়ি যাও। কমলা সর্বেশ্বরকে দেখে চলে যান। মুখবন্ধ কাম খুলে দেখে, লেখা আছে “আর লােভ করবেন না।” ফটিক – সর্বেশ্বরবাবু অভ্রান্ত নিদান দিয়েছেন, আমারও মন তাই বলছে, অসংখ্য ধন্যবাদ। শুনলাম, আপনি চলে যাবেন, কেন যাবেন? আমি আমরা সবাই আছি, আপনার পাশে। আপনি নিঃস্ব হয়ে নিঃস্বার্থভাবে যেভাবে সাহায্য করেছেন, আমি পাশে থেকে কিছুই করতে পারিনি, এটা আমার লজ্জা, তবে এবার থেকে আমিও দেখব। সব শুনে ডাঃ প্রধান – সর্বেশ্বরবাবু বেশ তাে মিলেমিশে আছেন, এঁদের সুখে দুঃখে, থাকুন এখানে, আর এরকম হবে না।

সর্বেশ্বর – কিন্তু ডাক্তার, আমার যাবার সময় হল …

ফটিক – কিন্তু দেব না বিদায়। কোন ফঁাকে এসেছেন লােহিতেশ্বর বাবা – সর্বেশ্বরবাবু, সবার হয়ে, ওই চেলা ল্যাটার হয়ে ক্ষমা চাইছি, ক্ষমাই পরম ধর্ম। সর্বেশ্বর – মনস্থির করে ফেলিছি, যাব তাঁর ডাকে … ফটিক – সবাই এখানে থাকবে পাহারায়। কি করে যান দেখি, সুস্থ হবেন, আবার কাজ করবেন, পাশে আমরা।

সর্বেশ্বর বুঝেছে আপাতত চুপ থাকাই ভালাে, সুযােগ খুঁজে পালাতে হবে। ইতিমধ্যে পুলিশের গাড়ি এসে ল্যাটাকে ধরে নিয়ে গেছে।

ফটিক – আপাতত সবাই এখানে থাক কখন কি লাগে, আমি কিছু খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি, দেখবে কোনও ত্রুটি না হয়, অসুবিধায় ফোন করবে।

ফটিক – আবার দেখা হবে সর্বেশ্বরদা, আরে আপনার মতাে দাদাকে কে ছাড়ে? নিশ্চিন্ত হওয়া যায় আপনার কথায়, ভরসা করা যায় আপনাকে, চলি।

সর্বেশ্বর ভাবছে যে এরা এত ভালাে মানুষ, আর এদের ঠকিয়ে গেছি? নিজের কাছে, নিজের প্রশ্ন? খুবই লজ্জার, খুবই অনুতাপের, এদের বিশ্বাসের কি অমর্যাদাই হয়েছে? আমি কি মানুষ? সভ্য, অসভ্যের বিচার পরে হবে। মনুষ্যত্বের এই কি প্রকাশ ? অনুশােচনায়, মাথা নিচু করে পাথরের মতাে বসে আছে বাবা

সর্বেশ্বর। দরজা ফাক করে দেখা গেল, পাহারায় কেউ বসে নেই।

বাসন্তী আর দুর্গা অঘঘারে ঘুমুচ্ছে, এই সুযােগে বেরিয়ে পড়তে হবে, সকাল হলেই সবাই আটকে দেবে, তাহলে আর সৎপথে ফেরা হবে না, লােক-ঠকানাে আর ভালাে লাগছে না। অথচ পয়সার লােভে, বেকারির জ্বালায়-জুলে, উপায় না দেখেই, এই পথে নামতে বাধ্য হয়েছে রবি, রূপান্তর ঘটেছে রবি থেকে বাবা সর্বেশ্বরে, তাহলে রবি সমাজে মূল্যহীন, রবি খােলস পরলে হয়ে যায় সর্বেশ্বর, সে কিন্তু মূল্যহীন নয়, খােলস তবুও তার মূল্য আছে, অর্থ আছে, সম্মান আছে, প্রতিষ্ঠা আছে। খােলসের দাম আছে, আসলের দাম নেই বাঃ, বারে দুনিয়া সত্যিই গেলে, ভাবনায় গেলে, কর্মেও গােল, বাঁধবে গণ্ডগােল। সুতরাং আর ভাবা নয়, এই গােলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে পড়তেই হবে। মিথ্যা দিয়ে সত্যের ভিত গড়া সম্ভব নয়। সত্য, সত্যই এবং চিরসত্য যাবার আগে সব গুছিয়ে নেয়, বাসন্তীর উদ্দেশ্যে কয়েক কলম আঁচড় রেখে যায়। বাসন্তী, দুর্গার মায়া কাটিয়ে যেতে কষ্ট হলেও, যেতে হচ্ছে। পিসিকে নিয়ে একসাথে থাকলে মঙ্গল হবে। একলা যুবতীর এভাবে থাকা সঠিক নয়। পিসিকে প্রণাম জানালাম। সর্বেশ্বর। বেরিয়ে পড়ছে রবি অন্ধকার পথে, হেঁটে হেঁটে, চলেছে নিকটবর্তী রেল স্টেশনের দিকে। ভােরের ফার্স্ট ট্রেন ধরে চলে যাবে বহুদূরে। এমন সময় পিছন থেকে এসে একটা ভ্যান এসে দাঁড়াল – স্টেশন যাবেন বুঝি ? ভ্যানওয়ালা চালক নিমাই ভালাে করে দেখে – বাবা এত সকালে? সর্বেশ্বর – সকাল এখনও বাকি। দূরের পথ স্টেশন।।

নিমাই – আমি নিমাই, আপনার কাছে গিয়েছিলাম। আপনি যজ্ঞ করে কবচ্ দিলেন, খুব কাজ হয়েছে, অর্থকষ্ট দূর হয়েছে, এখন চারটে পয়সার মুখ দেখছি। ভােরবেলা হাটে যাই, মাছ, সবজি কিনে ফেরি করি ভালােই হচ্ছে বাবা আপনার কৃপায়। আপনার ওখানে যাব, যাব করছি, কিন্তু সময় করে উঠতে পারছিনে, আপনাকে কয়েকটা টাকাও দেবার ছিল, বসেন ভ্যানে পৌঁছেদি স্টেশনে, ঐ দিকেই তাে যাব।

সর্বেশ্বর – এই নাও কুড়ি টাকা, ভাড়া।।

নিমাই – ছিঃ ছিঃ কি যে বলেন কত্তা, আপনি এত উপকার করলেন। দুঃসময়ে কেউ দেখেনি, আপনার কাছে গিয়ে দিন ফিরেছে। আর আপনার কাছ থেকে ভাড়া নেব, উপরওয়ালা ছাড়বেন না, এ পাপ করতে পারব না, বসেন পৌছেদি। জানেন মানুষই দেবতা। সর্বেশ্বর একপ্রকার বাধ্য হয়েই বসে ভ্যানে, কোনও কথা নয়। নিমাই বাবা ঠাকুর, গেরামের লােকজন সবাই আপনার নাম করে, কত কিছু বলে, আপনি ভালাে গুণিন, কেউ বলে তান্ত্রিক, কেউ বলে হঠযােগী, কেউ বলে, আপনি নাকি ঈশ্বরের সাথে কথাও বলেন আপনার চোখ দুটি যেন জ্বলে, কথায় মধু ঝরে পড়ে তবে যাই বলেন, আপনার মধ্যে একটা ভালাে শক্তি আছে, সৎ মানুষের শক্তিই আলাদা। একাই বলে চলে, এবার রাস্তা শেষ হয়েছে। স্টেশন এসে গেছে।

সর্বেশ্বরকে প্রণাম করে একশাে টাকা দেয়। সর্বেশ্বর বলে না, লাগবে না। নেব না।।

নিমাই – এখন এর থেকে বেশি দেবার ক্ষমতা নাই, পয়সা হলি, নিশ্চয়ই দিয়ে আসব বিশ্বাস করেন। কথা দিলাম টাকা দিয়েই

আসব। আপনার উপকার, দয়া ভুলতে পারব না, দয়া করে গরিবের এই টাকাটা নেন সাধুবাবা, না-হলে শান্তি পাব না, নেন, চোখের জল দেখে, সর্বেশ্বরকে টাকাটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিতে হল। নিমাই চলে গেল, বলে গেল আশীর্বাদ করবেন। যেন দাঁড়াতে পারি। পেন্নাম। সামান্য ভ্যানওয়ালা তার আমার উপরে এত বিশ্বাস, ভক্তি অথচ এসব এমনি হয়েছে, তার কোনও অবদান নেই, তবুও উপরি পাওনা। একজন ঠগিকে টাকা দিল একজন কর্মযােগী। এই পাপ সইবে না, ভাবতে ভাবতে নিজেকে অপরাধী মনে করছে। না আর সর্বেশ্বরকে সঙ্গে রাখা যাবে না। সর্বেশ্বরের খােলস মানে লাল জামা। কাপড়, জটার উইগ, আন্য সব আনুষঙ্গিক সব ছেড়ে সাধারণের মতাে জামা, প্যান্ট পরে ফেলে, হয়ে গেল আবার রবি। সর্বেশ্বরের সব কিছু পুঁটুলি করে বেঁধে ফেলল। দূরে কোথাও এটাকে ত্যাগ করতে হবে। | ইতিমধ্যে ভােরের ফার্স্ট ট্রেন এসেছে, রবি উঠে জানালার ধারে বসেছে। পুঁটুলিটা বিসর্জন দিলে কি বাবা সর্বেশ্বর বিলীন হবে? তবে সব ছেড়ে দিলেও, সাথে রেখেছে তামার ঘটটা, এটাতেই সশীষ ডাব বসিয়ে বিভিন্ন পূজা হত। কত বশীকরণ, উচাটন, মারণ, বিভিন্ন কবচ প্রক্রিয়া হয়েছে, সবটই কি মিথ্যা? কিছু মানুষের কাজ হয়েছে, তবে অনেক সময় এমনিই হয়, তার কর্তৃত্ব কি তার প্রাপ্য? সব স্মৃতি, কথা মনে পড়ছে, যাক ঘটটা ছাড়া সব বিসর্জন দেওয়াই শ্রেয়। যা অতীত, যা ভুলতে চাই, তাই নিয়ে ফিরে তাকানাের বােকামি না করাই ভালাে, সর্বেশ্বর অতীত, বর্তমানে সে লুপ্ত। এই সব ভাবনার জাল বুনছে, এমন সময় ট্রেনটা সিগনাল না পেয়ে থেমে গেল, একটা ব্রিজের উপর। অন্ধকার কেটে | গেছে, আস্তে আস্তে আলাের ছটা ছড়িয়ে পড়ছে, এমন নিচে তাকাতেই দেখে, নিচে নদী বয়ে চলেছে, ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে চলমান যানটা এখন স্থবির, অচল। হঠাৎ মাথায় খেলে গেল উপস্থিত বুদ্ধি-এইতাে সুযােগ বাবা সর্বেশ্বরকে শেষ করে দেবার। ভাবামাত্রই ফেলে দিল সর্বেশ্বরের পুঁটুলিটা, দেখা যাচ্ছে জলে ভাসতে ভাসতে ঐ পুঁটুলিটা চলে যায়, দৃশ্যান্তরে চির বিদায় নিলেন বাবা সর্বেশ্বর ফিরে এসেছে সেই রবি। চলতে, শুরু করেছে ট্রেনটা, সূর্যদেব রক্তিম আলাে ছড়িয়ে উঠে আসছেন। সব দেখছে রবি জানলা দিয়ে, আপনমনে গেয়ে ওঠে “তুমি ডাক দিয়েছ, কোন সকালে … গান শেষে আবার হৃদয়ের অন্তর থেকে উঠে আসা বেদনার মূৰ্ছনা আবার হৃদয়ের অন্তর থেকে উঠে আসা বেদনার মূৰ্ছনা” জীবনে যত পূজা হল না সারা … চোখ বুজে একমনে গান গাইছে রবি, গানেই বিভাের। অন্তরের ক্লেদ, ক্লান্তি, সর্বেশ্বরের বােঝা মুক্ত হওয়ার প্রকাশ, সঠিক পথের দিশায় রবি আজ অন্য অনুভূতিতে বর্তমান। এদিকে সহযাত্রীরা গান শুনছেন, পাশে রাখা ঘটে টাকা, পয়সা সব দিয়ে যাচ্ছেন। রবি, চাওয়ালা ডাকে সাড়া দিয়ে বলে ভাই, চা হবে। চাওয়ালা চা দিয়ে দেয়, ছুটে চলে যায় “বলে পয়সা লাগবে না, গান গেয়ে যান” চোখ পড়ে ঘট ভর্তি টাকা পয়সার দিকে, চমকে ওঠে রবি, একি স্বপ্ন না বাস্তব ? সর্বেশ্বর বাবা চলে গিয়েও মুক্ত হস্তে দান করে গেলেন। সব হারিয়েও রবি

আজ মুক্তিনাথের মুক্তেশ্বর। এটা কি কম পাওয়া? |

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *