ময়না মুদির দোকান – অভিজিৎ দেব

গল্প সাহিত্য
Spread the love

সম্বন্ধ করে মানে দেখাশােনা করে বিয়ে হয়েছিল ময়নাকাকুর সাথে কাকিমার! কাকিমার মুখেই শুনেছি সেই গল্প। ময়না কাকুর আসল নাম প্রশান্ত ঘােষ। কিন্তু সবাই তাকে ময়না কাকু বলেই ডাকে। পাড়ার কয়েকজন বয়ােঃজ্যেষ্ঠ অবশ্য প্রশান্ত বলে, তবে তা হাতে গােনা কয়েকজন মাত্র। আসলে কাকুর মুদির দোকানটার নাম ময়না মুদির দোকান। দোকানের নাম থেকে তার নামও ময়নাকাকু। প্রথম যখন বিয়ের পর কাকু দোকান দিল, সবাই মনে করেছিল কাকিমার নাম হয় ময়না। কিন্তু পরে জানা যায় কাকিমার নাম মন্দিরা, তাহলে কাকু দোকানের নাম ময়না দিল কেন? কাকুকে এই নিয়ে প্রথম প্রথম অনেকবার নানারকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ময়না কে ? ময়না নামটাই দিলেন কেন? আরও কত কি? কিন্তু প্রতিবারেই । ময়না কাকু মুচকি হেসে এড়িয়ে গেছে সেই সব প্রশ্ন। এখন পাড়ায় কানাঘুষাে শােনা যায় মন্দিরা কাকিমাকে কাকু ভালােবেসে ময়না বলে! সকাল থেকে ময়না কাকু একাই থাকে, বেলা বারােটা বাজতে না কাকিমা চলে আসে দোকানে। কাকিমা দোকানের সামনে দাঁড়ালেই ময়না কাকুর মনে যেন হাজার ওয়াটের আলাে জ্বলে ওঠে। যত খদ্দের দাঁড়িয়ে থাকে, কাকিমাকে আগে দোকানের ভিতরে আনবেই। তাতে যদি দুএকজন খদ্দের ফিরে যায় তা যাক! কাকুর কাছে সবার আগে কাকিমা। গতবছর কাকিমার যখন জ্বর হয়েছিল কাকু তাে চিন্তায়। ডাক্তার বদ্যি সব এক করে ফেলেছিল, যতই সবাই বােঝায় সাধারণ ঠান্ডা লেগে জ্বর, কিন্তু কাকু শােনার পাত্র নয় মােটেই।। টানা সাতদিন দোকান বন্ধ রেখে কাকিমার দেখাশােনা করেছে। এ পুরাে সুস্থ হওয়ার পর কাকিমা জোর করে দোকান না খােলালে কবে যে আবার ময়না মুদির দোকানের ঝপ উঠত ভগবান জানেন!

ময়না কাকুর প্রতি কাকিমার ভালােবাসাও দেখার মতন। এক কথায় যাকে বলে যেমন দেবা তেমনি দেবী! কাকুর মুখেই শুনেছি এই দোকানের পিছনে কাকিমার যথেষ্ট সহযােগিতা যেমন ছিল তেমনই ছিল অনেক বড়াে আত্মত্যাগ! সে সব গল্প অন্য একদিন বলব! কাকিমা বারােটার সময় দোকানে এসে ময়না কাকুকে কাজকর্মে সাহায্য করতে থাকে, কিন্তু তার চোখ থাকে দেওয়াল ঘড়ির দিকে। ঠিক যখন দুপুর একটা হবে হবে করছে আর কোনাে উপায় নেই। কাকিমা কাকুর হাত ধরে জামা ধরে বাচ্চাদের মতন বায়না শুরু করে! অনেক খদ্দের হাসাহাসি করে বুড়াে-বুড়ির কাণ্ড দেখে। তাতে বয়েই গেল ষাট ছুই ছুঁই কাকিমার! পঁয়ষট্টি বছরের এই মানুষটা ছাড়া আর কে আপন আছে কাকিমার! কোনাে কোনাে খদ্দের আবার মাঝে মাঝে বাড়াবাড়ি করে কাকিমাকে কিছু বােঝাতে

চায়। কাকিমার এক ধমকেই অবশ্য যা কাজ হওয়ার তা হয়ে যায়!

এরপরও যদি ময়না কাকু দেরি করে দোকান বন্ধ করতে, ব্যস! কাকিমা হাঁটা দেয় বাড়ির দিকে! ময়না কাকু ভালােই জানে কাকিমা রেগে গেলে রাগ ভাঙাতে তাকে অন্তত দুদিন দোকান বন্ধ রাখতে হবে! তাড়াতাড়ি কাকুও হাঁটা লাগায় কাকিমার পিছন পিছন।

| সে যাই হােক, আজ দুদিন আমরা সবাই লক্ষ করেছি, ময়না কাকু বেশ মনমরা হয়ে দোকানদারি করছে! কাকিমাও বারােটায় হাজিরা দেওয়া বন্ধ করেছে। বিকেলেও দোকানের দিকে দেখা যায় না কাকিমাকে! কি হল ব্যাপারটা! অনেকেই কিন্তু লক্ষ করছে কাকু বেশ অন্যমনস্ক দুদিন ধরে!

আমরা চিন্তা করছি কাকিমার কি শরীর খারাপ হল না অন্য

কিছু। সবাই মিলে গেলাম কাকুর কাছে। আমি প্রথম কথাটা তুললাম কাকুর কাছে। কাকু কাকিমা আজকাল দোকানে আসাবন্ধ করে দিয়েছে একদম, কি ব্যাপার গাে? শরীর ঠিকঠাক আছে তাে? | কাকু বেশ কিছুক্ষণ দেখল আমাদের, তারপর হাতের ইশারায় আমাদের দাঁড়াতে বলল। দুজন খদ্দেরকে ছেড়ে দিয়ে দোকানটা বন্ধ করে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল কাকু। একদম ভেঙে পড়েছে লােকটা। খুব খারাপ লাগছে এভাবে ময়না কাকুকে দেখে। রসিক মানুষটাকে এমন মনমরা অবস্থায় দেখতে কখনও ভালাে লাগতে পারে আপনারাই বলুন!

আমরা তাে কাকুর উত্তরের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি; কাজল আবার জিজ্ঞাসা করল ‘ও কাকু কি হয়েছে গাে?

এবার কাকু বলতে শুরু করল, “তােদের কাকিমা পরশু দিনও তাে দুপুরে দোকানে এসেছিল। বাড়ি ফিরে হাঁসের ডিমের কষা আর পােলাও খেয়ে যখন ঘুমােতে গেলাম, তখনও সব ঠিক ছিল। বিকেল থেকেই দেখি তােদের কাকিমার মুখভার। কিছু বললে ঠিক করে উত্তর দেয় না। মাঝে মাঝেই কেঁদে কেঁদে চোখ লাল করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ছে! কতবার বলছি কি হয়েছে বলাে, আমার কথায় আরও হাউ হাউ করে কেঁদে উঠছে! | ময়না কাকুর কথা শুনে আমরা তাে সবাই হাঁ হয়ে গেলাম। বলে কি কাকু! এ আবার কেমন ঘটনা! বিনা মেঘে বজ্রপাত একেবারে। সব শুনে সুদীপ বলল, কাকু, তুমি এখন বাড়ি যাও, আমরা বরং বিকেলে কাকিমার সাথে কথা বলব।’

কাকু গুটি গুটি পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগাল। আমরা সবাই ঠিক করলাম আজ বিকেলে কাকিমার সাথে কথা বলতে যাব। কথামতন আমি, কাজল, সুদীপ আর ভােম্বল বিকেলে গেলাম ময়না কাকুর বাড়ি, কাকু যদিও তখন দোকানে দোকানদারিতে ব্যস্ত।

কাকিমা আমাদের দেখে তাে অবাক! কী ব্যাপার রে? তােরা সবাই একসাথে? তােদের কাকু ঠিক আছে তাে?

কাকিমার কথা শুনে আমরাও তাে অবাক! যার সাথে ভালাে করে কথা বলছে না তার জন্য এত চিন্তা! একেই হয়ত বলে আসল ভালােবাসা।

না না কাকিমা, কাকু তাে দোকানে। আমরা তােমার সাথে দেখা করতে এলাম। কাজলের কথা শুনে যেন ধড়ে প্রাণ এল কাকিমার। | আমাদের বসতে বলে গরম পিঁয়াজি আর চা নিয়ে এল। কাকিমার হাতের পিঁয়াজি কিন্তু একদম ফাটাফাটি। পিয়াজি আর চা শেষ করে আমতা আমতা করে কাকিমার কাছে কথাটা বলল ভােম্বল। কথা শুনে কাকিমার চোখের জল তাে আর বন্ধ হয় না! প্রায় দশমিনিট অতিক্রান্ত!

‘কাকিমা এরকম করলে কি হবে বলাে? কি হয়েছে আমাদের বলাে, যদি আমরা কিছু করতে পারি!

আমার কথা শুনে কাকিমা চোখ নাক শাড়ির আঁচলে মুছে আমাদের দিকে মুখ তুলে দেখল। কান্নাকাটিতে কাকিমার চোখগুলাে লাল জবার মতন দেখাচ্ছে, তার পাশাপাশি বাঁদিকে নাক থেকে সাদা সর্দিও বেরিয়ে আসছে! কিন্তু এখন তাে আর সে সব কথা কাকিমাকে বলা যায় না! কাকিমা এবার শুরু করল, “পরশু দিন

তােদের কাকু বিকেলে দোকান যাওয়ার সময় মােবাইলটা বাড়িতে ফেলে গিয়েছিল। আমি মােবাইলটা দোকানে দিয়ে আসব বলে ভাবছি, এমন সময় দেখি হােয়াটস অ্যাপে রত্না নামে একটা মেয়ের মেসেজ এলাে!’ বলেই আবার কাঁদতে শুরু করেছে কাকিমা।

কাকিমা কী মেসেজ ছিল?’ ভােম্বল জিজ্ঞাসা করে। আবার চোখ নাক মুছে কাকিমা শুরু করল, বলে রাখি এবার আর কোনাে সর্দি নেই কাকিমার কোনাে নাকেই! | ‘কি আর বলব তােদের। ছেলের মতন তােরা। তাও শােন রত্নার মেসেজ এসেছে কবে যাব? কখন যাব? তােদের কাকু আবার লিখেছে দেখলাম এখন না। সময় হলে জানাব। পরশু দিনের সেই মেসেজ লিখেছে। আমি যাচ্ছি। দুপুরে দোকানে থেকো কিন্তু।

আমরা তাে আকাশ থেকে পড়লাম কাকিমার কথা শুনে, কাকুর কি বুড়াে বয়সে ভিমরতি হল! কার সাথে আবার ফস্টিনস্টিতে জড়িয়ে পড়ল বুড়ােটা! সবারই খুব খারাপ লাগছে কাকিমার জন্য।

তুমি চিন্তা করাে না কাকিমা! আমরা আজ রাতেই দোকান বন্ধ করার সময় কাকুর সাথে কথা বলব।’ কথাগুলাে বলে সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ময়নাকাকুর বাড়ি থেকে।

চারজনে তক্কে তক্কে ছিলাম। রাত দশটা নাগাদ দোকান বন্ধ করতেই কাকুর কাছে গেলাম আমরা। কাকুকে কাকিমার সব কথা বলে আমি জানতে চাইলাম, এই বয়সে এসে এসব কি করছ কাকু ? কাকিমা কত দুঃখ পেয়েছে জানাে?

সব শুনে কিছুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হা-হা করে হেসে উঠল কাকু। আমরা তাে মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। পাগল হয়ে গেল নাকি লােকটা!

হাসি থামিয়ে কাকু বলল, ওরে তােরা যেমন আর তােদের কাকিমাও তেমন! এই বয়সে আমি কি প্রেম করব? ঠিক আছে, কালকেই রত্নার সাথে তােদের দেখা করিয়ে দেব! তবে হ্যা কাকিমাকেও তােরা দোকানে নিয়ে আসবি ঠিক দশটায়!’ কথাগুলাে বলেই হাসি-হাসি মুখে বাড়ির দিকে পা বাড়াল কাকু।

পরের দিন দশটায় আমরা কাকুর দোকানে দাঁড়িয়ে আছি। কাজল অনেক ভুলিয়ে কাকিমাকে দোকানে নিয়ে এসেছে। দোকানে মুখ গােমড়া করে বসে আছে কাকিমা। আমরাও খুব উৎকণ্ঠায় অপেক্ষারত কখন আসবে রত্না! | এমন সময় বাইকে করে একটা ছেলে এল। পিঠের বড়াে ব্যাগটা থেকে সবুজ রঙের কতকগুলাে প্যাকেট বের করে ময়না। কাকুকে দিয়ে বলল, ‘প্রশান্তদা একটু দেখবে, খুব ভালাে ডিটারজেন্ট। নতুন প্রােডাক্ট কিন্তু দারুণ কাজ দেবে!

প্যাকেটগুলাের দিকে চোখ যেতেই আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। প্যাকেটের গায়ে লেখা রত্না ডিটারজেন্ট!

ময়না কাকুর দিকে তাকাতেই কাকু দেখি কাকিমার হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে! আমরা আর দাঁড়াইনি দোকানের সামনে। শুধু সেদিন বিকেলে অজ্ঞাত কারণে ময়না মুদির দোকান বন্ধ আর পরের দিন সকালে নির্দিষ্ট সময় দোকান খুলেছিল।

দোকানে কাকিমার হাজিরাও আবার আগের মতন শুরু হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *