ভীমরুল – শুভায়ু দে

গল্প সাহিত্য
Spread the love

এমনিতেই ঠান্ডা পড়েছে জাঁকিয়ে; তার ওপর গ্রামের বিকেল বলে কথা। হপ্তায় এই একটাই দিন আসতে হয় গ্রামে। পাড়ার ডাক্তার; সমীরবাবুর কাছেই প্রস্তাবটা নিয়ে যায় বুলান। | “সমীরদা, একটা দিন আমরা চাইছি তুমি আমাদের এই গ্রামের ডিস্পেন্সরিতে বসাে, অনেক মানুষ আছে, এদিকে গাড়িভাড়া করে সবসময় আসতে পারে না ডাক্তার দেখাতে; যাতায়াতের ভাড়া আমরাই দিয়ে দেব, একটা দিন একটু দেখ।” 

বরাবরের ভালাে মানুষ এই সমীরবাবু না করতে পারেন না। যাওয়ার একটু ঝকমারি এই যা, ট্রেন দুবার চেঞ্জ করতে হয়।

একটু বেশি দেরি হয়ে গেছে; একঘণ্টা অন্তর ট্রেন, ৪.১৬-এরটা বেরিয়ে গেলে সেই ৫.২৫ এর ট্রেন, বাড়ি পৌঁছাতে সেই সন্ধে গড়িয়ে রাত হয়ে যাবে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন, একটা টোটোও পাচ্ছেন না আজকে।

| “কি বাবু টেশন যাবেন?” পিছনে . ঘুরে দেখেন একটা সজি বিক্রেতা ভ্যান # নিয়ে এদিক পানেই আসছে।

খানিকটা অবাক হয়ে বলেন, আবার একটু ভয়ও পেলেন, এদিকটায় খুব একটা চেনা নেই তার। তার ওপর এই গ্রামে নতুন ডাক্তার আসছে এই কথাটা মােটামুটি চাউর হয়ে গেছে, এ আবার অন্য কোনও মতলবে নেই তাে? যা দিনকাল পড়েছে। | “উঠে আসুন, আমার ওই পথেই

যাওয়া আছে; আমি চিনি আপনাকে,

আগের সপ্তায় আমার মা আপনাকে দেখাতে এসেছিল, আমিও বাইরে ছিলাম। টোটো আর অটোতে হেব্বি। ঝামেলা হয়েছে আগের দিন, তাই এখন কয়েকদিন টোটোওলারা গাড়ি বন্ধ রাখবে। অটো এদিকে চলে না আপনাকে অনেকটা হাঁটতে হবে।”

সমীরবাবু মনে মনে ভাবলেন দেরি হয়েই গেছে, তেমন হলে মেন রাস্তায় উঠে অটো নিয়ে যাবেন কোনও অসুবিধা হলে। ওইটুকু রাস্তা তাে যাওয়া যাক। | সমীরবাবুর এক ছেলে; কর্মসূত্রে বাইরে থাকে, উনি আর স্ত্রী থাকেন বাড়িতে। খুব একা একা লাগে মাঝে মাঝে। পেশেন্টদের সাথে তাে আর বসে গাজানাে যায় না। খুব একটা গম্ভীর না হলেও আর যাই হােক ডাক্তার তাে। একটু রাশভারী মেজাজটা রাখতেই হয় আর কি; তাই অবসরে স্ত্রীর সাথে টুকিটাকি গল্প করেন, টিভি দেখেন, বই পড়েন। | “নাম কী তােমার?” জিজ্ঞেস করেন সমীরবাবু। 

“আমার নাম ইমরুল; একটা মজার কথা বলি আপনাকে, আমার বাড়ি ওই ভীমপাড়ার দিকে, তাই লােকে আমাকে ভীমরুল বলে ডাকে। জানেন ওই যে বুলান দা যে আপনাকে এখানে নিয়ে। এসেছে ওর বাবা তাে স্কুল মাস্টার ছিলেন, কি ভালাে মানুষটা ছিলেন, তবে আমাদের বুলান দা-ও খুব ভালাে হয়েছে, পুরাে বাপকা বেটা। এখানে কত রক্ত নেওয়ার প্রােগ্রাম করে, ওষুধ এনে দেয়, আরে বলুন না এখান থেকে কলকেতার আম্পাতালগুলাে কত দূর! টেরেন করে গিয়ে লাইন দাও রে, বাসে চাপাে রে, তারপর বলবে আজ সেই ডাক্তার আসেনি কো, আবার ফিরে আসা। কঠিন অসুখে নিয়ে যাওয়া সাজে কিন্তু এই জ্বর হলে, কাশি হলে এর জন্যেও এদিকে ভালাে ডাক্তার নেই কো। আপনি এলেন সে যে কি ভাগ্যি আমাদের!”

মনে মনে ভাবেন, যাক মানুষটা সত্যি সরল। সত্যিতাে ব্যস্ত চেম্বার ছেড়ে কে আসতে চায় চ্যারিটি করতে।

“আপনাকে মেন রােডে অটোতে তুলে দি তাহলে।”

“নাঃ সময় আছে, চলাে তুমি নিয়ে চলাে, তবে একটু জোরে চালিও ৫টার ট্রেনটা ধরতেই হবে।”

“আরে আমি আপনাকে টেরেন ধরাবােই দেখুন-ই-না।”

সমীরবাবু ভাবলেন না মন্দ লাগছে না, অচেনা মানুষের সাথে অনেক সময় কথা বলতে খুব ভালাে লাগে। কারণ নিজের মিথ্যে মেজাজ ধরে রাখতে চেনা মানুষের সাথে অভিনয় করে যেতে হয়। | “জানেন, আমার বৌ এর ধুম-জ্বর, বাচ্চা হওয়ার সময়; কলকেতা নিয়ে যেতে যেতে বড় দেরি হয়ে গেল গাে। বৌটারে নিয়ে কলকেতা যাব, পয়সা নাই, ভালাে ডাক্তার দেখাব, কেউ। সাহায্যই করলে না। বড় আম্পাতালে সেই যাই হােক করে নিয়ে গেলাম, বেড পেলাম না, বৌটা কষ্ট পেয়ে মরে গেল, কিচ্ছুটি করতে পারলুম না।”

বলেই চলল ইমরুল, “কটা টাকা দিয়ে একটা ঘুমটি ভাড়া নেব ভেবেছিলাম, পঞ্চায়েত থেকে ঘর দিয়েছে দোকান করার জন্যে, আমার চেনা বেশ এক বড়লােককে বললেম দেখাে না, একটু তােমার তাে চেনাজানা আছে একটু ব্যবস্থা করে দাও নাকো। উনি বললেন, “দেখ ইমরুল আমি আমার এই পঞ্চায়েত আপিসে

কাজটাও কাউকে ধরাধরি করে পাইনি। দেখিস ই তাে সব বড় বড় নেতার হাত, আমি কি করব বল। অথচ জানেন আমরা সবাই খুব ভালাে জানি ও এক বড় নেতাকে ধরাধরি করে পেয়েছে। চাকরিটা। জানেন আমি অনেক লােককে বললাম, একটু ব্যবস্থা করে দিতে কেউ করল না।। | সব নিজের আখের গুছিয়ে নিল।

| এই দুনিয়ায় তিন ধরনের লােক আছে জানেন, এক হচ্ছে নিপাট ভদ্দরলােক, এদের সংখ্যা খুব কম; এরা সত্তাবে বাঁচবে ভাবে। এরপর আসে শয়তানগুলাে, শুধু গুণ্ডা-মস্তানি করে বড় বড় নেতা হয়েছে। তবুও এরা ভালাে, সবথেকে বদের ধাড়ি হল ওই মিচকে শয়তানগুলাে, নেতারও খাবে আবার ভালােও সাজবে।

নিন, ডাক্তারবাবু বলেছিলুম না, টেরেন ধরাবই, দেখুন গপ্পো করতে করতে চলে এলুম।” | শীতের ঠান্ডা, গ্রামের দিক, একটু ফাকা ট্রেন। কেন জানি সমীরবাবুর কয়েকটা কথা মনে পড়ে বড় খচখচ করছে। সমীরবাবুর এক ছেলে, তার যােগ্যতা বিশেষ ছিল না। বড় নামী লােক হওয়াতে একে ওকে ধরে বড় চাকরির ব্যবস্থা করে দেন পুনেতে। সেই ছেলে যদিও বাপ-মাকে একটুও পাত্তা দেয় না। বাড়িতেও আসতে চায় না। ওই ভিডিয়াে-কলেই কাজ সেরে নেয়। এতে বড্ড একা হয়ে পড়েছেন তাঁরা। এই কথাটা কিন্তু কাউকেই খােলসা করে বলতে পারছেন না। সমীরবাবু যদিও কারও কাছেই স্বীকার করেননি কোনওদিন যে ছেলেকে চাকরিতে ঢােকাতে কত হাত-পা ধরতে হয়েছে; বরং চিরদিন উল্টো সুরই গেয়ে এসেছেন। আজকের একটা সামান্য ঘটনা তাকে কেন জানি বড় ছােট করে দিয়ে গেল। মনে মনে ভাবেন, “কাকে পড়ালাম এত টাকা দিয়ে, এত কাণ্ড করে চাকরি পাওয়ালাম, কি লাভ হল। পুজোতেও আসতে চায় না। আমাদেরও তাে চিন্তা হয়, লাটসাহেব হয়ে গেছে, মা-বাপকে ফোন করেই খালাস। ভেবেছিলাম মাঝে মাঝে বুড়াে বয়সে একটু শান্তি পাব। ওর পিছনে খাটতে খাটতেই জীবন চলে গেল। হােক না হােক, বাবা তােক বুঝবে। বাপ-মায়ের যে কি জ্বালা।”

শরীরের ভিতরটা এত খালি লাগছে যে, ঠান্ডাটা যেন একটু বেশিই লাগছে সমীরবাবুর। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *