ভারতবর্ষ ও ভারত – ভবেশ দেবনাথ

গল্প সাহিত্য
Spread the love

অনুমেয় ৩২৭ খ্রিঃ পূর্বাব্দে আলেকজাণ্ডার ভারত আক্রমণ করেন এবং পরে দেশে ফেরার উদ্যোগ নেন, কিন্তু সেলুককে ভারতের মাটিতে রেখে যান। অর্থাৎ ভারত আক্রান্ত হয়েছে তবুও বহু জনগগাষ্ঠীর আশ্রয়দাতা ভারতবর্ষ। সহনশীলতার ধারক ও বাহক ভারতবর্ষ। আর এই সহনশীলতার সাথে স্বেচ্ছায় অনিচ্ছায় এই ভূখণ্ডের আদি প্রজাতির মনুষ্যকুল একই বন্ধনে বাঁধা পড়েছে। ভারতবহির্ভূত অনেক দেশেই এই দৃষ্টান্তের উপস্থিতি খুবই কম। হয়তাে একটি জাতিগােষ্ঠীর উপস্থিতিতে আর একটি জাতিগােষ্ঠীর অপসারণ ঘটেছে। যদিও প্রাচীন যুগের সাহিত্যে উল্লিখিত রাজচক্রবর্তী উপাধিভূষিত হওয়ার নেশা অনেক নরপতির ছিল তা মহাভারতের যুগে লক্ষণীয়। কিন্তু এরা ভারত ভূখণ্ডের বাইরে অন্য কোনও মহাদেশ বা দেশে পা রাখেননি। এই প্রবৃত্তিও নরপতিদের ছিল না।

বৈদিক যুগে একমাত্র বর্ণবাদের দূষণ ব্যতিরেকে আর্য সভ্যতার অনেক রীতি গ্রহণযােগ্য। বিশেষ করে এরা ছিল প্রথমে কৃষিজীবী। উৎপাদনের যুগে এদের ভূমিকা উল্লেখযােগ্য। সেই ক্ষেত্রে সামাজিক সভ্য জীবন গড়ার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা ছিল। যদিও হরপ্পামহেঞ্জোদাড়াের যুগের জাতিগােষ্ঠীর নগর পরিকল্পনায় বসবাস ও সভ্যতারই ইঙ্গিতবাহক। যা অন্যান্য জাতিগােষ্ঠীর গ্রহণযােগ্যও বটে। আর্যদের পশুশিকার একসময় পশুপালনের পথ তৈরি করেছে। যা পশুপালন ও পশুচারণ এর মাধ্যমে ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে এবং চাষবাসের স্বপ্ন দেখিয়েছে। উৎপাদনশীল জগতে কৃষিবিদ্যাকে আয়ত্ত করেছে। যদিও ভারতের সিন্ধুনদীর পশ্চিমতীরে সিন্ধুপ্রদেশের লারকানা জেলায় মহেঞ্জোদাে সভাতার সন্ধান মেলে বৈদিক যুগের আগের অনুরূপ সভ্যতা হরপ্পা। এ ছাড়া বৈদিক সভ্যতা সাহিত্য ও ধর্মকে একটি বিশেষ স্থান দিয়েছে এবং তাদের আচার আচরণ আর্যাবর্ত ব্যতিরেকে ভারতের মধ্যভাগ বিন্ধ্যপর্বত পার হয়ে দাক্ষিণাত্যেও প্রবেশ করেছে এবং দ্রাবিড়, কিরাত নিষাদ দাম জনগােষ্ঠীর সঙ্গে মিলেমিশে মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে।

আর্য উত্তর ভারত (২) পরবর্তীকালে অনেক শতাব্দী পেরিয়ে খ্রিস্টীয় ৭ শতাব্দীতে মহম্মদ বিন কাশিমের সিন্ধু আক্রমণ ও দখলের পথ ধরে আরবিয়ান জনগােষ্ঠীর অনুপ্রবেশ এবং ইসলামের আবির্ভাব ও বিস্তার ঘটার পথ সূচিত হয়। যা হজরত মহম্মদের জন্মের পর এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই সাড়া ফেলেছিল। সেই প্রভাব বিস্তার এর ক্ষেত্রে শাস্ত্রও অস্ত্র হয়েছিল ধর্মযুদ্ধের ক্ষেত্রভূমি ও সাম্রাজ্য বিস্তার যা পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশে ইসলাম ও খ্রিস্টান প্রসারের ভাগ্যফল

নির্ণয় করে এবং ভারতের মতাে দেশে বর্ণবাদের আক্রমণে পরবর্তী কালে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অবক্ষয় ও খ্রিস্টান ইসলামের বিস্তার লাভ। যদিও ভারতের মতাে ভূখণ্ডে ইসলামের প্রসার ঘটেছিল বেশি করে।

৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদের মৃত্যুর একশত বৎসরের মধ্যে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরােপ তিনটি মহাদেশে ইসলামের আধিপত্যের বিস্তার লাভ ধর্মবিজয়ে সম্ভব হয়নি। সেখানে শাস্ত্রবাক্যের মধ্যে প্রসার লাভ ততটা হয়নি যা হয়েছে অস্ত্রের সংঘাতে যুদ্ধবিজয়ের মাধ্যমে যা খলিফা ইতিহাস সাক্ষ্য রেখেছে। এ ছাড়া কারবালা প্রান্তরে এজিদ বাহিনীর সঙ্গে হােসেনবাহিনীর যুদ্ধ ইসলামকে কলুষিত করেছে। সেক্ষেত্রে মহম্মদ দৌহিত্র হাসান হােসেন-এর মর্মান্তিক মৃত্যু সাম্রাজ্য দখলের ইতিহাস তৈরি করেছে যা সাম্রাজ্যবাদের করুণ ইতিহাস, আর সেখানে ধর্মের উপস্থিতি হিংস্রতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। ভারতের মাটিতেও পরবর্তীকালে ধর্মকে সামনে রেখে ইসলামের বিজয় ঘটেছে। সেখানে বিধর্মীকে শত্রু চিহ্নিত করে ইসলাম এগিয়েছে। সেক্ষেত্রে আরবিয়ানদের চিন্তাচেতনা বর্তমান শতাব্দীতেও উগ্র মৌলবাদের চেহারা নিয়ে সারা বিশ্বের কাছে একটা ভয়ঙ্কর বিপদ হিসাবে উপস্থিত হয়েছে। যা নিজেদের মধ্যে বর্তমানেও চলছে। কিন্তু ভারতের মাটি উক্ত ধর্মাবলম্বী নানা জাতিগােষ্ঠী যারা ভারতের বৈদিক প্রাক্ ও বৈদিক যুগের তাদেরও একটি অংশ ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে ভারতকৃষ্টিকে হিন্দুমুসলমান সমন্বয়ের পথ তৈরি করেছে। যদিও ইংরেজ যুগের দেশভাগ মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে বড়ই ক্ষতিকর হয়েছে। যদি ভারত ধর্মনিরপেক্ষ না হত এর কুফল প্রত্যক্ষ হত। কাশ্মীর ভূখণ্ডের দাবি এরই ইঙ্গিত বাহক। অছচ মুসলমান বসবাসের ক্ষেত্রে এই ছােট্ট ভূখণ্ড যথেষ্ট নয়।

বিষয়টিকে একটু বিস্তারিতভাবে বললে বলতে হয় বর্তমান

ভারতে যে মুসলমান জনসংখ্যায় যদি দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাবা হয় ভারত পাকিস্তান মৌলবাদের দৃষ্টিতে গােটা কাশ্মীর ছাড়লেও ইসলামিদের বসবাসের জায়গা থাকত না, যা ভারতীয় সনাতন চিন্তাভাবনা এই সমস্যাকে অনেকটাই লঘু করেছে। এই বিষয়ে মুসলমানদেরও সৌজন্য দেখানাে উচিত সার্বিকভাবে। কারণ হিংসা হিংসার জন্ম দেয়।

সেদিক দিয়ে ভাবতে গেলে বৈদিক যুগের আর্যসভ্যতার সময়ে তাদের দ্বারা সৃষ্ট ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব বেদ এবং ধারা ও হিন্দুধর্ম তার গহ্বরে পরবর্তীকালের অনুপ্রবেশ একসময় সহনশীল ধর্মমত ও জাতিগােষ্ঠীর বিকাশ ঘটিয়েছে। রাজন্যবর্গের সাম্রাজ্যবাদী সংঘাত থাকলেও সামাজিক জীবনে ব্রাহ্মণ্যবাদের বর্ণবৈষম্যের শাসন ও শােষণ শ্ৰেণী বৈষম্যের ইতিহাস বহন করে। যা সাম্রাজ্যবাদের চেয়েও কঠিন আধিপত্যতা। যার ফসল খ্রিস্টজন্মের পরবর্তীকালে ইসলাম প্রভাব বহন করে। সেক্ষেত্রে পৃথিবীর নানা মহাদেশে হিন্দুধর্মের প্রয়ােজন হয়নি হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের অপ্রতিদ্বন্দ্বী জিঘাংসা। ভারতের অভ্যন্তরের রাজন্যবর্গের যুদ্ধবিগ্রহ, ধর্মনীতি, রাজনীতি অনেকটাই রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে সাবধানে পা ফেলেছে। খ্রিঃ পূর্ব বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপ নিয়েছে কিন্তু দেশটাই ভূখণ্ডের বাইরে যুদ্ধবিগ্রহের মধ্য দিয়ে এই ধর্মের প্রসারের ইতিহাসে বিরল।

যদিও ইসলামিয়া তর্কের খাতিরে তা স্বীকার করবে না। কিন্তু বহুলাংশে সত্য যার বর্তমান রূপরেখা বিশেষ করে ইসলামের ক্ষেত্রে ওরা পৃথিবীতে বাহান্নটি মুসলিম রাষ্ট্র বর্তমান এবং পৃথিবীতে এমন কোনও দেশ নেই যেখানে মুসলিম নেই। এই প্রসার শাস্ত্রবাক্যে সম্ভব হয়নি, সেখানে ধর্মভিত্তিতে সাম্রাজ্যবাদের অবস্থান ঘটেছে। সেই বিচারের নিরিখে বিভিন্ন রাষ্ট্রে যখন মুসলিম জেহাদেরা বিস্ফোরণ ঘটায় তখন মনে হয় সারা পৃথিবীটা মুসলিম রাষ্ট্র হলেও জেহাদ কার্যকলাপ শেষ হবে না এবং মুসলিম ভূখণ্ড দখলের নেশাও বন্ধ হবে না। কিন্তু বেদনার বিষয় এই কার্যকলাপে পৃথিবীতে মুসলিম ধর্মের মানুষরাই বেশি করে নিপীড়িত, শােষিত। কারণ ইসলাম প্রসারের ইতিহাসে যত পিছিয়ে পড়া মানুষের অনুপ্রবেশ দেখা গেছে সে ক্ষেত্রে সম্ভ্রান্ত মানুষের উপস্থিতি কম। তাই সমস্যাটা অন্য জায়গায় চলে গেছে।

এইভাবে চলতে থাকলে হিন্দু মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন বিবিধ ধর্মমতের সংঘাতের মাঝখানে পড়ে বঞ্চিত তা তাদের শ্রেণী মিত্র চিনতে ভুল করছে। ধর্মে আগলে বাঁধা পড়ে নিজেরাই খুনােখুনি করছে। যা মনুষ্যত্বে বিচারে যে কোনও ধর্মের প্রসারে ধর্মীয় মৌলবাদ মানববিকাশের অন্তরায়। জনসংখ্যার বিচারে যে ধর্মে যতবেশি বঞ্চিতরা অবস্থান করতে তত বেশি করে শােষণ ও বঞ্চনার শিকার হবে। তাই সার্বিকভাবে ভারতের মতাে দেশে হিন্দু মৌলবাদ যতটা না বিপজ্জনক তার অধিক দুশ্চিন্তা পৃথিবীর ক্ষেত্রে মুসলিম মৌলবাদ। কারণ চেতনাই নয় সংখ্যাটা একটু ভাববার বিষয় আছে। কারণ এরা একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে স্বর্গ দেখার ও যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, যা ভয়ঙ্কর। সেই বিচারে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের বাদ দিয়ে যদি আমরা

হিন্দু মুসলমান মৌলবাদকে নিয়ে আলােচনা করি পরাধীন ও স্বাধীন ভারতে মৌলবাদের তাসখেলায় কেউ পিছিয়ে নেই, সে ক্ষেত্রে ইসলামের ভূমিকাও নিন্দনীয়। পরাধীন ভারতে জিন্নারা মুসলিম পাকিস্থান তৈরি করেছিল কিন্তু ভারতীয় ভূখণ্ডের কংগ্রেস বা অন্য দলের যৌথ ভাবনায় ভারত ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের জন্ম দেয়। সেখানে ভারত ভূখণ্ডের পূর্ব-পশ্চিম মিলে আশি লক্ষ মানুষ ভারতে প্রবেশ করে যারা হিন্দু, কিন্তু মুসলমান জনসংখ্যার ক্ষেত্রে সেই ঘটনা ঘটেনি। যার জন্য হিন্দু মৌলবাদের হাতে শুধু ভুল বােঝাবুঝির নিরিখে স্বাধীনতার জনকপুরুষ মহাত্মা গান্ধিকে প্রাণ দিতে হলাে। সেক্ষেত্রে মহম্মদ আলি জিন্নার ভূমিকা হিন্দুদের প্রতি প্রশ্নচিহ্নের সামনেই দাঁড়ায়। যেহেতু তিনিও জননেতা বলে নিজেকে দাবি করেছিলেন। তাছাড়া স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও পাকিস্থান ভূখণ্ডের শাসকের ভূমিকা মৌলবাদের পক্ষে।

কংগ্রেস যদিও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে অনেক কিছু আপস করেছে সেক্ষেত্রে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কাল থেকে আজকের একুশ শতাব্দীতে এসেও ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িক প্রশ্নে ভারতের কমিউনিস্টরা আপসহীন। অর্থাৎ, এই ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা | সাম্প্রদায়িক প্রশ্নে যতটা উজ্জ্বল অন্যদের ক্ষেত্রে তা নয়। তবুও সেখানে বর্তমান ২০/৯ এর লােকসভা নির্বাচনে মুসলিম জনসংখ্যার ভূমিকাও মৌলবাদকে এড়াতে পারেনি। অথচ বামপন্থীরা একটা দীর্ঘসময় যে দৃষ্টিভঙ্গিতে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। | সেখানে প্রায় সার্বিকভাবে তার রাজ্যের একটি মৌলবাদী দলকেই গ্রহণ করল, যেটা বর্তমান শাসকদল। আর হিন্দুরাও সে কাজটাই করল। তাই মৌলবাদের বিচারে হিন্দু মুসলিম পাল্লা দিয়ে এগােচ্ছে। একথা বললে ভুল হবে না। তবে একথা সবিশেষ উল্লেখযােগ্য যে, হিন্দু মৌলবাদ আর যাইহােক দেশদ্রোহী বা দেশবিরােধী কার্যকলাপে আদৌ জড়িত নয়; কিন্তু মুসলিম মৌলবাদের ভূমিকা সেক্ষেত্রে ঠিক উল্টোযা দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে ভীষণভাবে বিপজ্জনক। আর এই নিখাদ সত্যটা ডান বাম নির্বিশেষে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলাে ভােটসর্বস্ব রাজনীতির স্বার্থে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে নারাজ এবং এবিষয়ে তাদের ভূমিকাও নেতিবাচক। | উপরি উল্লিখিত কথার অর্থ হল ধর্মসহিষ্ণুতা অন্যধর্মমতের প্রচারে ও প্রসারে ব্যাঘাত ঘটায় না যেটা মুসলমান শাসক আকবরের ছিল, প্রসঙ্গত জিজিয়ার প্রত্যাহার। কিন্তু ঔরঙ্গজেব পুন চালু করে। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের শাসকের ভূমিকায় ধর্মসহিষ্ণুতার স্থলে ধর্ম বিভাজন বাড়িয়েছে তার অতিরঞ্জিত ধর্মের ভূমিকায়। যেটা রাজনীতিতে ধর্মের প্রবেশ। সেক্ষেত্রে বর্তমান বর্ষের কি কেন্দ্র | কি রাজ্য উভয় শাসকের ভূমিকায় মৌলবাদের চেহারাই বাস্তবরূপ। নিয়েছে যা ভারতের মতাে দেশে বিপজ্জনক। এ ক্ষেত্রে স্বাধীন। ভারতেও বর্তমান শতাব্দীতে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক প্রশ্নের অভিনয় হিন্দু মুসলমান কাজিয়ায় শুধু হিন্দুরা দায়ী নয়। এই একপেশে। রাজনৈতিক ভূমিকা নিন্দনীয় হওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *