বড় পুকুর – সুকুমার পাল

গল্প সাহিত্য
Spread the love

সেদিন সূর্যগ্রহণ। বৈকাল ৫.২৯ মিঃ স্পর্শ এবং ৫.৫৮ মিঃ মােক্ষ। নিয়মানুসারে সেই সময়টুকুর মধ্যে প্রায় সকলেই ধর্মালােচনা, হরি-সংকীৰ্ত্তন ও গঙ্গাস্নানের মাধ্যমে পুণ্যার্জনে ব্রতী হন। গ্রামে গঞ্জেও অনুরূপভাবে হরিসংকীৰ্ত্তনের দল নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় এবং মােক্ষ প্রাপ্তি হলে পুকুরে বা নদীতে পুণ্যস্থান করে মনকে। পবিত্র করে। | লছমনপুর এক সাবেকী গ্রাম। Ma বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। WD) শস্য-শ্যামলা বসুন্ধরার মাঝে প্রকৃতির অপরূপ সাজে সুসজ্জিত গ্রামটির চারিদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত, মাঠ-ঘাট ও প্রান্তর দিয়ে ঘেরা। থৈ-থৈ করা কালাে জলে ভরা দীঘিগুলােতে পদ্ম-শালুকের আহামরি মননামুগ্ধকর শােভা দেখতেদেখতে মনটা কেমন যেন হয়ে যায়।

ফুল শতদল করে ঝলমল অপর দীঘির জলে সাদা হাঁসগুলি করে জলকেলি পানকৌড়ি ডুবি তােলে কত মধুকর করে মাধুকরী গুণ গুণ গুঞ্জনে—

সঞ্চারিয়া মধু ঢেলে দেয় শুধু পরহিতে কেন তারে? | বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা ছােট্ট নদী কুলু কুলু রবে আর পূর্ব দিগন্তে সীমান্ত প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে বিশাল এক পাহাড়। ভারতের স্বাধীনতার প্রাপ্তিকালে স্থানীয় মানুষ সমবেত হয়ে যার নাম রেখেছিল ‘গান্ধীপাহাড়’। ঐ গান্ধীপাহাড়ের পাদদেশে একটা পুকুর আছে। চোখে দেখে হয়ত সেটাকে সাধারণ মনে হলেও বাস্তবে সেটার প্রতিকৃতি অসাধারণ। বিশাল ও ভয়ঙ্কর রূপ তার। শােনা যায়—এককালে এখানে কয়লা তােলার খাদান ছিল। পাথরের চাল কেটে তৈরি লম্বা সুড়ঙ্গ চলে গেছে নীচু দিকে বহুদূর পর্যন্ত। যার ভেতর থেকে কয়লা তােলার কাজ চলত। পুকুরটার উত্তর-পূর্ব কোণে একটা হরিতকী গাছকে অবলম্বন করে আছেন এক ‘গোঁসাই বাবা’। সেই গোঁসাই বাবার অসন্তুষ্টির রােষানলের জন্য সেই কোল কোম্পানি কয়লা তােলার কাজ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। তখন জমিদারী আমল। সেই সুযােগে স্থানীয় জমিদার বাবুরা তাদের ভােগ দখলের জন্য চারিদিকে মাটি কাটিয়ে পাড় টেনে পুকুরের ‘আকার’ দিলেন—যার নাম হল বড়পুকুর।

বর্তমানে পুকুরটার পাড়গুলাে নানারকমের গাছ-গাছড়ায় ভর্তি।

ভেরেণ্ডা, আকন্দা ছাড়াও কাশী ঘাসের ঝােপের ভেতর নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে কাঠবেড়ালি আর ধূৰ্ত্ত ঘেঁক-শেয়ালীর দল, আর তেঁতুল গাছের উপর বাসা বেঁধেছে রাজ্যের বক, চিল আর শকুনরা। কালাে জলে থৈ থৈ করা পুকুরটার পাড়ের ধারে ধারে বড় বড় পাথরের চাঙ্গড়গুলাে যেন দাঁত বের করে হাসছে। যেন চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। তবুও গ্রামের সমস্ত কাজে ব্যবহৃত এই পুকুরটায় শুভ ও অশুভ কাজের শুরু ও শেষ এখানেই। শােনা যায় রাত্রি বেলায় নাকি কিছু অলৌকিক দৃশ্যও দেখা যায়। স্বয়ং গোঁসাই বাবা ব্রহ্মচারী নাকি খড়ম পায়ে চিমটি হাতে ঘুরে বেড়ান।

তখন প্রায় সন্ধ্যা ৬টা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে পৃথিবীর বুকে। গ্রহণও মােক্ষ পেয়ে গেছে। কিন্তু তখনও মৃদঙ্গ-খােল, করতাল ও নানাবিধ বাদ্যের তালে চলেছে হরি-সংকীর্তনের জোয়ার। নৃত্য, উদ্দাম নৃত্য। ঘুরে বেড়াচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। চলছে আনন্দোচ্ছ্বাসের হরিলুট। | কিন্তু! বকয়ের মনে শুধুই অস্বস্তি। আনন্দ নেই। নেই স্ফুর্তি, উৎশৃঙ্খলতা, আনন্দোচ্ছ্বাস। মাথায় ঘুরঘুর করছে শুধুমাত্র একটাই চিন্তা। তার মামার কড়া নির্দেশ সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে—অনেক কাজ পড়ে আছে। সেগুলাে করতে হবে। নইলে তার ভাগ্যে জুটবে অশেষ লাঞ্ছনা, দুর্ভোগ, এমনকি উত্তম-মধ্যমও দরিদ্র পিতামাতার সন্তান বকয়’। থাকে মামার বাড়িতে। হয়ত তাই ভয়ে, ভাবনায় উদভ্রান্তের মতাে দৌড়াল ঐ বড় পুকুরটার দিকে।

তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। কেঁচের মেচের করে সান্ধ্য পেঁচাগুলাে ডেকে উঠল। জানিয়ে দিল প্রহরবার্তা। নিস্তব্ধ-নিরিবিলি চারিদিক। যেন নীরবতা বিরাজ করছে। ঘুটঘুটে গাঢ় অন্ধকারের বিভীষিকায় শুধুমাত্র ঝি ঝি পােকার ডাক আর জোনাকির মিটিশ

মিটি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না ঐ পুকুরটায়। তবুও অতি সন্তর্পণে পা-টিপে টিপে এগিয়ে যেতে লাগল ‘বকয়’ স্নানের জন্য। ঐ বড় পাথরটা থেকে একটা ঝাঁপ দিয়ে পুণ্যস্থান সেরে বাড়ি ফিরে যাবে বকয়। কিন্তু মানুষ চায় এক, আর হয় অন্যকিছু। সবকিছুই সেই অদৃশ্যশক্তি ভাগ্য নিয়ন্ত্রণকারীর হাতে। তিনি যেটা চাইবেন সেটাই হবে, হয়ত তাই—হায় রে! দুর্ভাগ্য পাথর চালটার কাছ পর্যন্ত যেতে না যেতেই হঠাৎ পাটা পিছলে গেল বকয়ের। পড়ে গেল সুড়ঙ্গের মুখে। ব্যাস! আর যায় কোথায়…। শুরু হয়ে গেল লড়াই। জীবন মরণ খেলার লড়াই। মৃত্যু তখন যেন মহানন্দে ছুটে আসে লােলুপ দৃষ্টি নিয়ে… বাঁচাও…বাঁচাও…। আমাকে বাঁচাও বলে চীকার করতে লাগল বকয়। সাঁতার কেটে তীরের দিকে আসবার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল। সাথে চীকার ‘কে আছ আমাকে বাঁচাও!…’ কিন্তু এই ভরসন্ধ্যায় কে আসবে তাকে বাঁচাতে? কেউ এলাে না। হাবুডুবু খেতে লাগল বকয়…। তবুও কেউ এলাে না তাকে বাঁচাতে…। তারপর একটা সময় নিস্তেজ হয়ে পড়ল তার দেহটা। হাত-পা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলাে সব একে একে…।

কথায় আছে—বিধির বিধান আর নিয়তির কলম কখনও খণ্ডন হয় না। যেটা হবার হবেই। লােহার বাসর ঘরে থেকেও বেহুলার স্বামী লক্ষীন্দর, মা মনসার কোপানলে পড়েছিল। রেহাই পায়নি। শত পুত্রের জননী হবে’—বর দিয়ে স্বয়ং যমরাজকেও ফেরত দিতে হয়েছিল সতী সাবিত্রীর স্বামী সত্যবানের প্রাণ।

তখন রাত প্রায় ৮টা। গ্রামে সংকীৰ্ত্তন শেষ হয়ে গেছে। এবার স্নান যাত্রার পালা। গ্রামের মানুষজন সদলবলে ঐ পুকুরটায় পৌছাতেই দেখল অর্পচৈতন্য অবস্থায় একজন মানুষ পুকুরঘাটে

পড়ে আছে আর বিড় বিড় করে অস্পষ্ট স্বরে আধাে আধাে ভাবে কথা বলে চলেছে…।

ঢেউ আসছে….ঐ যে আরও ঢেউ আসছে…প্রবল বেগে ঢেউ আসছে আবার বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এ যেন উত্তাল সমুদ্র লহরী ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে কোথায় যেন…। ঐ তাে কে যেন আমার দেহটাকে তুলে রেখে দিল সৈকতে সযত্নে। ঐ তাে কে যেন বলছে…

—‘বকয়’—ওঠ বাড়ি ফিরে যা… —হা…হা..যাব। এক্ষুনি বাড়ি ফিরে যাব আমি… গ্রামের মানুষজন চিনতে পারলাে—এ তাে তাদেরই গ্রামের ছেলে—বকয়’। হয়তাে সে একাই এসেছিল পুকুরটায়, হয়ত তাই ঘটে গেছে কিছু অলৌকিক ঘটনা। মুখে হাতে জল ছিটিয়ে তারা ডাকতে লাগল…বকয়’ এই বকয় ওঠ, তাের কি হয়েছে? এখনে পড়ে আছিস কেন? | চমকে উঠে বকয়। যেন ফিরে পায় সম্বিৎ…। হারানাে স্মৃতি…। আধাে আধাে ঝিলমিল চোখে তাকিয়ে দেখে একটা বৃদ্ধা মেষ, দাঁড়িয়ে আছে তার কাছে। স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে বয়ের দিকে। যেন বলতে চায়—বকয়। ভয় নেই—আমি আছি…এবার বাড়ি ফিরে যা…. | চোখ কচলে আবার ভালভাবে দেখবার চেষ্টা করল—“বকয়’ কিন্তু ? না, আর দেখতে পেল না সেই বৃদ্ধা মেষটাকে। আতঙ্কে শিউরে উঠল বকয়। বুকের হৃৎপিণ্ডটা ধড়াস্ ধড়াস্ করতে লাগল। মুখে কথা নেই…। সম্পূর্ণভাবে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে এবার বকয়

আবার জিজ্ঞাসা করল নিজের মনকে—কেন এমনটা হলাে তার? | উত্তরও পেল নিজের মন থেকে—তবে কি এটা—‘বড় পুকুর’?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *