বিজয়িনী – ডালিয়া ব্যানার্জী

গল্প সাহিত্য
Spread the love

গ্রামের মেয়ে মনিকা, মধ্যবিত্ত পরিবার পারিবারিক বিষয় বলতে কিছু জমিজমা আর একটা মুদিখানা। কোনােমতে সংসার চলে যায়। একদিন মা আর দিদিমার সঙ্গে গঙ্গাস্নানে আসে। একই ঘাটে স্নানে নেমেছিলেন মা বনদেবী ও তার ছেলে মানব। দুজনেরি যােডােষি, সদ্যযৌবনা মনিকাকে দেখে পছন্দ হয়ে যায়। বনদেবী সদ্য বিধবা, তাই দেরি না করে তাড়াতাড়িই ছেলের বিয়ের দিন স্থির করেন। একমাত্র ছেলে নিকটবর্তী কাটোয়া শহরে স্টেশনারি দোকান, গ্রামে জমিজমা, নিজস্ব বাড়ি। মনিকার বাবা তাে এক কথাতেই রাজি। অতএব মাস তিনেকের মধ্যেই চারহাত এক হয়ে গেল। নতুন সংসারে এসে মনিকার সুখেই দিন কাটছিল। অল্প বয়সে বিয়ে তাই অল্পবয়সে মাও হয়ে গেল। পরপর তিন মেয়ে। শাশুড়ি মা ভেঙে পড়লেন। বংশ-রক্ষা হল না। স্বামীও মাঝে মধ্যে বলে দুধের স্বাদ কি আর ঘােলে মেটে। মনিকাও অনেক আশা নিয়ে তৃতীয় সন্তান নিয়ে ছিল। কিন্তু সে আশা অচিরেই হতাশায় পরিণত হল। কিছুদিনের মধ্যে শাশুড়িমা অসুস্থ হয়ে দেহ রাখলেন। মানবও কিছুদিনের মধ্যে গ্রামের বাড়ি সম্পত্তি বিক্রি করে শহরে দোকানের কাছে বাড়ি কিনে পাকাপাকি ভাবে সংসার পাতল। মনিকা মনের সমস্ত সংকীর্ণতা হতাশা, সব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে শহরে এসে মেয়েদের খুব ভালােভাবে মানুষ করার চেষ্টা করতে লাগল। মানব কোনাে দিকেই কার্পণ্য করে না। মনিকাকে ভরসা করে। সংসারের সব দায়িত্ব মনিকার উপর ছেড়ে দিয়ে, নিজে ব্যাবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

| ধীরে ধীরে মেয়েরা বড় হয়ে উঠল। বড় মেয়ে মােহিনী, মেজমেয়ে রাগিনী আর ছােটমেয়ে বিনােদিনী। নাচ, গান, লেখাপড়া সবই শেখে। মােহিনী ভালাে নাচ /1IA. করে, বিভিন্ন ফাংশানে নাচের জন্য ডাকও পড়ে। পড়াশােনাতে বিশেষ মন নেই। কোনােরকমে হায়ার সেকেন্ডারি পাস করে কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। ও সাজগােজ, পােশাক-পরিচ্ছদ, বন্ধু-বান্ধব নিয়েই সর্বদা ব্যস্ত। মনিকার সাথে প্রায়ই মনােমালিন্য চলতে থাকে, মেয়ের শরীর দেখানাে খােলা পােশাক, আর অত ছেলে বন্ধুদের সাথে মেলামেশা, মনিকার মােটেও পছন্দ নয়। তাই অশান্তি লেগেই থাকে। মানব তার ব্যাবসা নিয়েই ব্যস্ত, সংসারের দিকে তাকাবার তার সময় নেই। তাই মনিকাকেই সব ঝড় সামলাতে হয়। মনিকা চিন্তা করে মােহিনীর মতাে অবাধ্য মেয়েকে আর বেশিদিন রাখা যাবে না। তাহলে কিছু একটা অঘটন ঘটাবেই, ও মেয়েকে বিশ্বাস নেই। তাছাড়া আরও দুটো মেয়ে বড়াে হচ্ছে। তাদের কথাও ভাবতে হবে। মনিকা মানবের সাথে কথা বলে ছেলে দেখতে শুরু করে, জুটেও গেল, ভদ্রলােকের হার্ডওয়ারের বড় ব্যাবসা। পঁচিশ বছরের ছেলে বাবার ব্যবসায় দেখাশােনা করে, একটিই ছেলে। স্ত্রী মারা গেছেন তাই তাড়াতাড়ি ছেলের বিয়ে দিতে চান। মহিনীকে ওদের পছন্দও হয়ে যায়, দাবিদাওয়া কিছু নেই। দু-মাসের মধ্যেই বিয়ের দিন ঠিক হয়ে যায়। মেজেমেয়ে রাগিনী বারাে ক্লাসে পড়ে, খুব শান্ত পড়াশােনা আর সেলাই ফোড়াই নিয়ে থাকে। মাকে সংসারের কাজে সাহায্য করে। তার উপরেই মনিকার ভরসা। বাইরে কোথাও গেলে রাগিনীই সংসারের সব কাজ সামলায়, সবার খেয়াল রাখে। ছােটোমেয়ে মাধ্যমিক দিয়েছে, অত্যন্ত জেদি, যেটা ও ঝোঁক ধরবে, সেটা ওর চাইই চাই। ওকে নিয়েও মনিকার অশান্তি কম নয়। অনেক চেষ্টা করে ওকে আয়ত্বে আনবার। কিন্তু ও ওর মতেই চলে। মনিকা। দুঃখ করে মানব বলে দুঃখ করােনা, এখন ও ছােটো, বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

দেখতে দেখতে মােহিনীর বিয়ের দিন এগিয়ে এল। মনিকা মানব দুজনেই খুব ব্যস্ত। মােহিনী নিজে পছন্দ করে। গয়না, বেনারসী, কসমেটিকস্ সমস্ত কিনেছে। বাড়িতে প্রথম মেয়ের বিয়ে তাই মনিকাও কার্পণ্য করেনি।

সুন্দর করে সাজানাে চলছে প্যান্ডেল, খাওয়া-দাওয়ার ভালাে আয়ােজন। আত্মীয়-স্বজন অনেকেই এসে পড়েছে। বিয়ের আগের দিন বিকেলবেলা, বাড়িশুদ্ধ সবাই শেষ-মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। মােহিনীর ইচ্ছে হল বেনারসী-গয়না সব পরে ও একবার দেখে নেবে কোথাও কিছু অসুবিধে হচ্ছে নাকি! মনিকাও মেয়ের শখ মেটানাের জন্য সব বের করে দিল। মােহিনী দরজা বন্ধ করে সব পরে নিজের মনে মতাে করে সাজল। বিনােদিনী দিদিকে সাহায্য করতে লাগল, সন্ধে হয়ে এল, মােহিনী বিনােদিনীকে জিজ্ঞাসা করল, আমাকে কেমন লাগছে?

দারুণ রে দিদি! দারুণ লাগছে তােকে। কালতাে পার্লার থেকে পাপিয়াদি তােকে সাজাতে আসবে। তখন আরও সুন্দর লাগবে।

মােহিনী জিজ্ঞাসা করে— ‘মা কোথায় রে? | মা ভােরবেলার দধীমঙ্গলের ব্যবস্থা করছে, আর মেজদি ছাতে, ছাতনাতলার আলপনা দিচ্ছে। যা, আমার খিদে পেয়েছে, বিকেলের টিফিনে যা হয়েছে। আমার জন্য নিয়ে আয়। আর চা আনতে ভুলবি না। বিনােদিনী আধ ঘণ্টার মধ্যে চা টিফিন নিয়ে ফিরে এসে দেখে, মােহিনী ঘরে নেই, ভাবল হয়তাে বাথরুমে গেছে। উঠোনে বেরিয়ে বাথরুমে দেখল কেউ নেই। মিনুমাসি একপাশে বাসন ধুচ্ছিলাে। বিনােদিনী জিজ্ঞাসা করে ‘দিদিকে দেখেছ? বলল ‘দিদি কিনা জানিনা! বাগানের দরজা দিয়ে একজনকে বেরিয়ে যেতে দেখেছি, পিছন থেকে দেখেছি কে বুঝতে পারিনি। বিনােদিনী খানিকক্ষণ খোঁজার পর ঘরে আসে। দেখে ঘরে খাটের উপর একটা ছােট্ট চিরকুট পরে। লেখা আমি | তােমাদের পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করতে পারব না। বিনােদিনী সােজা মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে চুপিচুপি ডেকে এনে, ঘরের দরজা বন্ধ করে চিঠি দেখাল। মনিকা তাে মাথায় হাত দিয়ে ওখানেই বসে পড়ল। বলল “তাের বাবাকে ডাক। মানব উত্তেজিত হয়ে ঘরে ঢুকল এখন আবার ডাকলে কেন? বরাশন নিয়ে এসেছে কোথায় পাতা হবে দেখিয়ে দিতে হবে। এখন আমাকে উপরেই থাকতে হবে। মনিকা একেবারে বােবা, দুচোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা, মানব চমকে ওঠে কি হয়েছে?’ ‘সর্বনাশ হয়েছে, মােহিনী পালিয়ে গেছে।

নিমেষে মানবের মাথা ঘুরে গেল। চোখে অন্ধকার নেমে এল, বুকের ভিতরটা কেমন যেন চিন চিন করছে। এযে বিনা মেঘে বজ্রপাত। এখন আমি কি করব! কি করে অশােকবাবুকে একথা জানাবে, ভাবতে ভাবতে ওখানেই পড়ে গেল। মনিকা চিৎকার করে ওঠে “কি হল তােমার! ছােটো মেয়েকে বলে ‘জল আন, কাকাকে ডাক। নিমেষে গােটা বাড়িতে খবর ছড়িয়ে পড়ল। মনিকা হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে। এই যদি তাের মনে ছিল তুই আগে বললি না কেন? আমাদের এইভাবে মুখ হাসালি কেন? বাবা-মার মান-সম্মানের কথাটা একবারও ভাবলি না। ক্রমে

আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সকলের মুখে মুখে আলােচনা ছড়িয়ে পড়ল। খুড়তুতাে দেবর কানন দাদার অবস্থা দেখে দাদাকে নিয়ে নার্সিংহােমে ছুটল। এদিকে ছেলের বাড়িতে খবর যেতেই, সেখানেও একই অবস্থা। একমাত্র ছেলের বিয়ে, বিশাল আয়ােজন, প্রায় শেষের দিকে, আত্মীয়-স্বজন সবাই চলে এসেছে। এ অবস্থায় বিয়ে বন্ধ হয়ে গেলে, অশােকবাবু সমাজে আর মুখ দেখাতে পারবেন না। সবদিক চিন্তা করে, আর মানবের অবস্থা দেখে। পাত্রের বাবাই প্রস্তাব দিলেন। ছেলে কাল যথাসময়েই বিবাহের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। আপনাকে মেজোমেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়ে হবে। তবে শর্ত আছে, আপনার বড় মেয়েকে | কোনােদিন মানতে পারবেন না। যদি কোনােদিন আপনার মেয়ে বাড়ি আসে, সেদিন থেকে, আমার বৌমার বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। কিছুটা হলেও পরিবারে খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল। শােক কাটিয়ে আবার সবাই বিয়ের আয়ােজন শুরু করল। মনিকা নিজের বােনকে দিয়ে আবার বেনারসী আনল। নিজের গায়ের গয়না দিয়ে মেয়েকে সাজিয়ে দিল, বলল পরে পরে সব গড়িয়ে দেব।

যথাসময়ে বরযাত্রী ও বরসমেত বরকর্তা এসে হাজির হল। পাত্র সন্দীপের মায়ের সমস্ত গয়না দিয়ে রাগিনীকে সাজিয়ে দিল। কোনাে অনুষ্ঠানের কোনাে ত্রুটি থাকল না। মহাসমারােহে রাগিনীকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে গেল। বিশাল আয়ােজন করে বৌভাত হল। সকলে ধন্য ধন্য করতে লাগল। রাগিনীর কি ভালাে কপাল, যেমন পাত্র, তেমনই শ্বশুরবাড়ি। মােহিনী যে কি ভুল করল; পরে বুঝবে, কেঁদে পার পাবে না। মানব ও মনিকাও বেয়াই মশাইকে জানিয়ে দিল। মােহিনীর জন্য এবাড়ির দরজা চিরদিনের মতাে বন্ধ।

রাগিনী শ্বশুরবাড়ি গিয়ে অবাক। বিশাল দালান, প্রত্যেকটা ঘর সুন্দর আসবাব দিয়ে সাজান। কত দাসদাসি। রাগিনী কিছুদিনের মধ্যেই সংসারের হাল ধরে ফেলল। সেবাযত্ন করে শ্বশুরের মনজয় করে নিল। সংসারের আরও যেন উত্তর উত্তর শ্রীবৃদ্ধি হতে থাকল।

এদিকে মােহিনী-সুকুমার বলে একটি ছেলের সঙ্গে রেজিস্ট্রি বিয়ে করে সুকুমারদের বাড়িতে গিয়ে উঠল। সুকুমাররা ওদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে থাকে। বাড়ির অবস্থা তেমন ভালাে নয়। ও সুকুমারের সাজগােজ, বাইক নিয়ে ঘােরা দেখে অনেক কিছু কল্পনা করেছিল। কিন্তু বাস্তবে তার সাথে কোনাে মিল হল না। ও বন্ধুদের বাইক ধার করে মােহিনীকে নিয়ে ঘুরত। ও কোলকাতায় একটা কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ করে, সামান্য মাইনে পায়। সুকুমারের পরিবার ভেবেছিল, মােহিনীর বাবা-মা মেনে নেবে, সুকুমারকে। একটা ব্যাবসাট্যাবসা করে দেবে। সে আশাও পূরণ হল না। মােহিনীর বাবা-মা সম্পর্কই রাখল না। তাই কিছুদিন পর থেকে | মােহিনীর উপরে নানারকম ভাবে চাপ সৃষ্টি করতে থাকল। কিছুদিনের মধ্যেই মােহিনীর সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তার উপর সংসারের চাপ, মনের ভিতর থেকে থেকে বিদ্রোহ করে উঠতে লাগল। সুকুমারের সাথে প্রায় অশান্তি লেগেই থাকে। তার উপর প্রতিবেশীদের কাছে শুনতে হয় রাগিনীর সুখের কথা। | প্রতিনিয়ত রাগিনীর এই সুখ-কাহিনী। মােহিনীর অন্তরের জ্বালা

দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল। এই সুখ, বিশাল সাজানাে বাড়ি, হিরের গয়না। সবই তাে আমার হবার কথা ছিল। বাবা, মা, রাগিনী সবার উপরে ওর রাগ হয়, ইচ্ছে করে সবাইকে শেষ করে দিই। আমি এখানে। এত কষ্ট পাচ্ছি, আর ওরা সবাই দিব্যি সুখে ভােগে আছে। রাগে। অন্ধ মােহিনীর চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে।

বছর দুয়েকের মধ্যেই রাগিনীর কোলে একটা ফুটফুটে খােকা এল। শ্বশুরবাড়ি বাপের বাড়ি সবাই খুব খুশি। রাগিনীর শ্বশুর ধুমধাম করে নাতির অন্নপ্রাশন দিলেন। তারপর হঠাৎ একদিন বুকে ব্যথা নার্সিংহােম, ডাক্তার ছােটাছুটি সবই হল কিন্তু মানুষটাকে বাঁচানাে গেল না। রাগিনীর মনে হল মাথার উপর থেকে যেন ছাতাটাই চলে গেল। সন্দীপ আর রাগিনীর সংসার, রাগিনী কোলে বাচ্ছা নিয়ে সবদিকটা আগের মতাে লক্ষ রাখতে পারে না। বাবা গত হওয়ার পর সন্দীপও ব্যাবসা নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তাছাড়া বড় বাড়ি খুব ফাকা ফাঁকা লাগে। তাই এবার বাপেরবাড়ি থেকে আসার সময় বিনােদিনীকে নিয়ে এল, বিনােদিনী তাে খুব খুশি। দিদির সুখ আর বৈভব দেখে ওর মাথা ঘুরে গেল। ও মনে মনে ঠিক করল এখানেই থেকে যাবে, আর কোনােমতেই বাড়ি ফিরে যাবে না। তারজন্য যা করতে হয় ও করবে। সন্দীপের। সেবাযত্নে নিজেকে উজার করে দিল। রাগিনী বাচ্ছা নিয়ে ব্যস্ত, সে সুযােগ বিনােদিনী পূর্ণমাত্রায় সদ্ব্যবহার করতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সন্দীপ সব ব্যাপারে বিনােদিনীর উপর নির্ভর করতে। শুরু করল। বিনােদিনী ওর সময়ে খাবার, জামা-জুতাে, রুমাল ঘড়ি সবই ঠিক সময়ে হাতের কাছে জোগান দেয়। বিনােদিনীর পুরুষ মানুষকে আকর্ষণ করার একটা আলাদা ক্ষমতাও আছে। যেটা রাগিনীর নেই। রাগিনী শান্ত সাদামাটা মেয়ে, অত ছলাকলা জানে না। তাই বুঝতেও পারল না, ওর অজান্তে ওর সবকিছু। হাত পরিবর্তন হতে থাকল।

এদিকে মানবের খুব শরীর খারাপ মনিকা বিনােদিনীকে ডেকে পাঠাল। প্রায় চারমাস হয়ে গেল এবার তুমি এসাে, আর ওখানে থাকতে হবে না। বিনােদিনী রেগে ওঠে ও যাবে না। সন্দীপও ওকে পাঠাতে চায় না। মনিকা দুঃখ পায়। রাগিনীর বাড়িতে বহু দিনের কাজের মাসি আভাদি, বাড়ির অভিভাবকের মতাে। রাগিনীকে খুব ভালােবাসে। এই মাসিই রাগিনীর চোখ খুলে দেয়। রাগিনী একদিন গােপনে লক্ষ করে প্রেমের উদ্দাম উন্মাদনায়। দুজনের চুম্বন দৃশ্য। রাগিনী বােনকে তিরস্কার করে, চলে যেতে বলে। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সন্দীপ তখন বিনােদিনীর প্রেমে পাগল। ও অনুভব করে ওর জীবনে কোথাও যেন একটা অভাব ছিল। সেই অভাব পূরণ করেছে বিনােদিনী। তাই বিনােদিনীকে ছাড়া ও বাঁচবে না। বিনােদিনী বুঝে গেছে সন্দীপ এখন ওর হাতের মুঠোয়। অতএব কে পাত্তা দেয় রাগিনীর কথায়। পরিষ্কার বলে দেয়— এখানে আমি থাকব, তুই চলে যা। রাগিনী ছেলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসে। সন্দীপ একবারও বাধা দিল না। সে সন্দীপ একদিন ছেলে হওয়ার সংবাদ পেয়ে সবাইকে ডেকে ডেকে মিষ্টি খাইয়েছিল। সে ছেলের দিকে একবার তাকিয়েও দেখল না। সব শুনে মনিকা বিনােদিনীকে বকাবকি করে, বাড়ি নিয়ে আসতে চায়। বিনােদিনীর তখন ক্ষিপ্ত

বাঘিনীর মতাে অবস্থা। ও আসবেও না রাগিনীকে ও বাড়িতে

ঢুকতেও দেবে না। মনিকা কি করবে ভেবে পায় না। একবার | ভাবে থানায় যাবে। একবার ভাবে মামলা করবে। কিন্তু কার বিরুদ্ধে করবে, নিজেরই মেয়ে জামাই। কিছুদিন থেকে মানবের শরীর বিশেষ ভালাে যাচ্ছিল না। দোকানেও বেশিক্ষণ বসতে পারত

। মনিকা গিয়ে দোকানে বসত। তার উপরে এই সংবাদ পেয়ে আরও বিহ্বল হয়ে পড়ল। মনিকা মানবকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। নার্সিংহােম বাড়ি ছােটাছুটি, রাগিনী সংসার ঝামেলায়। কিন্তু একমাসও গেল না, মানব দেহ রাখল। অনেক চেষ্টা করেও মানবকে বাঁচানাে গেল না। এদিকে বাবার অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে মােহিনী এসে হাজির, ও একটা ছুতাে খুঁজছিল বাপের বাড়িতে ঢােকার। এসময় ওকে আর কেউ কিছু বলতে পারবে না। একবার এসে ও আর শ্বশুরবাড়ি যেতেই চায় না। ওর স্বামীর সঙ্গে অশান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কেবলমাত্র কোথাও যাবার জায়গা ছিল না বলে ও এতদিন ছিল। এখন বাপের বাড়ি আসার সুযােগ পেয়ে ও আর যাবে না বলে স্থির করে নিয়েছে। মনিকা ওকে শ্বশুরবাড়ি যেতে বলে, কিন্তু ও কথা শুনবে না। ওর বক্তব্য দোকান বিক্রি করে আমাকে টাকা দাও আমি পার্লার খুলব। মনিকা বলে তােমাকে সব দিলে আমরা খাব কি? তােমাকে তাে অনেক গয়না দিয়েছিলাম সেসব কোথায় গেল! এখন আর কিছু তােমাকে দিতে পারব না। মা মেয়ের অশান্তি চলতেই থাকে। মনিকার রাত্রে শুয়ে ঘুম আসে

। অন্য কেউ নয় নিজের পেটের সন্তান তারাই আজ আমার শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি কি করে এ অশান্তি থেকে মুক্তি পাব আমি জানিনা। সন্দীপকে ডেকে একটা ফয়সালা করতে চাইল মনিকা। রাগিনী বলল, ছেড়ে দাও মা। জোর করে কারও মন পাওয়া যায় না। আর নিজের বােনের সাথে আমি স্বামীকে ভাগ করে নিতে পারব না। অতএব কিছু টাকা পয়সার বিনিময়ে ডিভাের্স হয়ে গেল। মনিকার খুব কষ্ট হয় রাগিনীর জন্য, ভাবে এত ভালাে মেয়েটা আমার, সব পেয়েও সব হারাল। ওর একটা ব্যবস্থা করতে পারলে মরেও শান্তি পাব না।

মনিকা প্রায়ই কালী মন্দিরে পুজো দিতে যায়। মাঝে মাঝে রাগিনীকেও নিয়ে যায়। যদি সংসারে একটু শান্তি আসে। ওখানেই এক মহিলার সাথে আলাপ হয়, ওনার রাগিনীকে খুব পছন্দ, উনি বললেন এই রকম শান্ত নম্র মেয়েই আমি খুঁজছি। ওনার একমাত্র সন্তান বাবা মারা যাওয়ার পর বাবার চাকরিটা পেয়েছে। সরকারি চাকরি, মহিলা পেনশন পান বাড়িঘর আছে। মনিকা ভাবল এ সুযােগ হাতছাড়া করা যাবে না। বিয়ের পর মা ও স্ত্রী দুজনকেই বর্ধমান নিয়ে চলে যাবে। বাচ্ছাটা এখন কিছুটা বড় হয়েছে। মনিকা বাচ্ছাকে সন্দীপের কাছে দিয়ে এল, মেয়েকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিল। রাগিনী বলেছিল মা এভাবে সবকিছু না জানিয়ে বিয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না। মনিকা বলল, “আগে বিয়েটা হয়ে যা তারপর ধীরে ধীরে জামাইকে সব জানাব। এ বিয়ে আমি কিছুতেই ভাঙতে দেব না।’ রাগিনী বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। শ্বাশুড়ি বউ পেয়ে খুব খুশি, সংসারের হাল ঠিকভাবে ধরে নিয়েছে, সব দিকে তার খেয়াল। কারও এতটুকু ত্রুটিও হতে দেয় না। জামাই প্রলয় রাগিনীকে চোখে হারায়, বাপের বাড়ি পর্যন্ত পাঠাতে চায়

রাগিনীর সুখ দেখে মনিকা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। এদিকে মােহিনীর স্বামীর সাথে পাকাপাকি ভাবে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। মনিকার জীবনে এ আর এক নতুন যন্ত্রণা শুরু হল। নিজেই কোনােরকমে দোকানটা চালায়, আগের মতাে আর বিক্রিবাট্টা হয়

। তাতে কোনােমতে চলে যায়। মােহিনী ঘাড়ের উপর এসে না জুটলে মনিকার একার জন্য কোনাে চিন্তা ছিল না।

এদিকে মােহিনী রাগিনীর সুখ দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠল। ঘন ঘন রাগিনীর বাড়ি যেতে শুরু করল। মনিকা সিঁদুরে মেঘ দেখতে পেল। মােহিনীকে বকাবকি করল, যেতে নিষেধ করল, রাগিনীও আসতে বারণ করল। তাতে ওর জেদ আরও বেড়ে গেল। মােহিনী তখন গােপনে প্রলয়ের অফিসে গিয়ে দেখা করতে লাগল। অফিস ছুটির পর প্রলয়ের সাথে সিনেমা যায়, মলে বাজার করতে যায়। রেস্টুরেন্টে যায়। ওর প্রেমের ফাঁদে প্রলয়কে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে। রাগিনী দেখে প্রলয়ের প্রায়ই অফিস থেকে আসতে দেরি হয়। আবার এক একদিন অফিসের কাজে বাইরে যাচ্ছি বলে, দুই একদিন বাড়ির বাইরেও থাকে। ব্যবহারেরও অনেক পরিবর্তন লক্ষ করে। রাগিনীর সন্দেহ হয়। মােহিনীকে ওর বিশ্বাস নেই। ও নিজের স্বার্থের জন্য সব করতে পারে। একদিন রাগিনী না বলে অফিস ছুটির সময় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। ঠিক ও যা সন্দেহ করেছিল তাই। ছুটির পরে মােহিনী আর প্রলয়কে একটা ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে। বাড়ি ফিরলে রাগিনীর সাথে অশান্তি শুরু হল। রাগিনী কথা তুলতেই প্রলয় বাচঁ করে ওঠে। তুমি আমায় সব লুকিয়েছ, তােমার বিয়ে দিল, একটা ছেলেও আছে। মােহিনী আমাকে সব বলেছে। আমি পরিষ্কার তােমাকে জানিয়ে দিলাম, আমি মােহিনীকে ভালােবাসি; মােহিনীকে নিয়েই সংসার করতে চাই। কঁাদতে কাদতে মায়ের কাছে এসে হাজির হয়। প্রলয়ও পিছু পিছু হাজির। মনিকা প্রলয়কে বােঝাবার চেষ্টা করে। ‘ও তােমার বিবাহিত স্ত্রী ওকে তুমি এভাবে ছাড়তে পার না। কে কার কথা শােনে। মােহিনীর উদ্দাম প্রেমের সুরায় ও তখন মাতাল। ওর আর দিবিদিক জ্ঞান নেই। আমার মােহিনীকে চাই ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না। রাগিনী বলে, ‘ছেড়ে দাও মা, জোর করে কাউকে নিজের কাছে আটকে রাখা যায় না। আবার সেই একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি, রাগিনীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি, মােহিনীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হল প্রলয়।

| মনিকা খুব কষ্ট পায়। মেয়েটাকে আমার সব পেয়েও বার বার হারাতে হয়। ওর সঙ্গে কেন এমন হয়। আমি চলে গেলে ওর কি হবে, চিন্তায় ভাবনায় পাগল হয়ে যায়। রাগিনীও ভাবে আমি কেন বার বার ব্যর্থ হই। পুরুষ মানুষ প্রেমের নেশায় মাতাল হতে ভালােবাসে, সেটা হয়তাে আমি পারি না। ধীর শান্ত স্বভাবের মেয়ে আমি, শরীরে মনে আগুন জ্বালাতে পারি না। তাই আমাকে ব্যর্থ হতে হয়। রাগিনী বুঝতে পারে মনিকা ওর চিন্তায় দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ও সব হতাশা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মনকে শক্ত করে, কিছু একটা করতে হবে, নিজেকেও বাঁচতে হবে মাকেও বাঁচাতে হবে। আমি আর কিছু না পারি, রান্না তাে করতে পারি, এটাকে ভর করেই আমাকে দাঁড়াবার চেষ্টা করতে হবে। বাড়িতেই সকালে পরােটা ঘুঘনি, রাত্রে রুটি তরকারির দোকান চালু করল।

মনিকাও মেয়েকে সাহায্য করে। একটু একটু করে চাহিদা বাড়তে লাগল। দোকান যখন মােটামুটি চালু হয়ে গেল, ও ওর ছেলেকে নিয়ে চলে এল। আমার ছেলে আমিই মানুষ করব। বিনােদিনীও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। রাগিনীর মনের জোর দেখে, মনিকাও অনেকটা হতাশা কাটিয়ে ওঠে। রাগিনী রাস্তার মােড়ে একটা হােটেল খােলে নাম ‘সুস্বাদু রান্নার ঠাকুর রাখে, কর্মচারী রাখে নিজে শুধু তদারকি করে। সুস্বাদু হােটেলের নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পরে। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্ররা দল বেঁধে খেতে আসে। ছাত্রদের জন্য মিলপিছু ছাড়ও থাকে। রাগিনীর ছেলেও এখন অনেকটা বড় হয়েছে। ছেলেকে খুব সুন্দর করে মানুষ করে।

| তবুও মনিকার মনে কাটার মতাে একটা চিন্তা থেকেই যায়। রাগিনী নিঃসঙ্গ জীবন কাটাবে। পাড়াতেই ড্রাইওয়াশের দোকান, অবস্থা ভালােই। কিছুদিন হল স্ত্রী মারা গেছেন। কোনাে সন্তান নেই। রাগিনীর ব্যাপারে সব জেনেই বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। মনিকার খুব ইচ্ছে ছিল রাগিনীর আবার বিয়ে দেয়। তাহলে হয়তাে মনিকা নিশ্চিন্তে মরতে পারবে। কিন্তু রাগিনী আর রাজি হল না। মাকে বােঝায় সবার কপালে সবকিছু থাকে না মা। আর আমাকে অনুরােধ করাে না। আমার ছেলে আর একটু বড় হয়ে গেলে আর আমার চিন্তা নেই। আমরা ভালােই থাকব।।

ইতিমধ্যে সময় গড়িয়ে গেছে নিজের ছন্দে, রাগিনী এখন সফল ব্যবসায়ী। ছেলেও খুব ভালাে পড়াশােনায়, খুব ভালাে রেজাল্ট করেছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছবি ছাপা হয়েছে। আমেরিকার নামী ইউনিভার্সিটি থেকে ডেকে পাঠিয়েছে শিক্ষকতা করার জন্য। খুব শীঘ্র চলে যাবে। মনিকার বয়স হয়েছে, রাগিনী মনিকাকে খুব যত্নে রাখে। মনিকা রাগিনীকে যত দেখে তত অবাক হয়ে যায়। সেই শান্ত মেয়েটা জোরে একটা কথা বলতে পারত। এখন তার আমূল পরিবর্তন। নিজের মেয়েকে নিজেই যেন চিনতে পারে না। জীবনে আঘাত, অপমান ব্যর্থতা কাউকে শেষ করে দেয়, আবার কাউকে জ্বলে উঠতে সাহায্য করে। এদিকে মােহিনী আর বিনােদিনীরও একটা করে ছেলে। তারাও বড় হয়েছে। মােহিনীর ছেলে ভালাে করে লেখাপড়াও শেখেনি, কিছুই করে না। ছেলের চাহিদা মেটাতে মেটাতে বাবা মা প্রায় সর্বস্বান্ত। সংসারে সর্বক্ষণ অশান্তি লেগেই আছে। বিনােদিনীর ছেলে আরও সাংঘাতিক নিজের মতে বিয়ে করে, দুজনে মিলে বাবাকে মাকে সমস্ত সম্পত্তি লিখে দিতে বলে। না দেওয়াতে মেরে দুজনকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দেয়। পাড়ার লােক এসে তালা ভেঙে ওদের উদ্ধার করে। ছেলে-বৌএর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে প্রায়ই ওদের পুলিশ ডাকতে হয়। প্রেমের নেশা ওদের বহুদিন আগেই কেটে গেছে। এখন শুধু অপরাধবােধ ওদের কুরে কুরে খায়। রাগিনীর ছেলে আমেরিকা থেকে ফিরেছে মাকে নিয়ে যাবে। রাগিনী ম্যানেজারের উপর হােটেলের দায়িত্ব আর মাকে দেখার দায়িত্ব দিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয়। মােহিনী আর বিনােদিনী দুই বােনে এয়ারপাের্টে দেখা করতে আসে। রাগিনীর দিকে তাকিয়ে ভাবে। তুই খুব সুখী রাগিনী। তুই এখন আমাদের ধরা-ছোঁয়ার অনেক উপরে। তুই জিতে গেছিস রাগিনী, আমরা হেরে গেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *