বসন পরো মা – সুনন্দা সিংহ

গল্প সাহিত্য
Spread the love

ত্রিয়া তাড়াহুড়াে করছিল। ডাল, ভাত ও ডিমের আলু দিয়ে। কষাকষা তরকারি নামিয়ে ফেলেছে। স্যালাট কেটে ফ্রিজে রেখেছে। ভাত খাওয়ার সময় পাঁপড়টা ভেজে নেবে শুধু। ত্রিয়ার ft. বর পুলক লাঞ্চ টাইমে বাড়ি আসে একেবারে ছেলেকে স্কুল থেকে ফু নিয়ে। ওদের আসতে সাড়ে বারােটা থেকে পৌনে একটা হয়। আর ক্রিয়ার সেলাই ক্লাস এগারােটা থেকে বারােটা, ও বারােটা কুড়ির মধ্যেই বাড়ি ফেরে।

ত্রিয়া দরজা-জানলা বন্ধ করে বেরােবে, এমন সময় বাইরে থেকে কেউ ভিক্ষে চাইছে, শুনতে পেল, মেয়ে-কণ্ঠ। ত্রিয়া কখনাে। ভিখারিকে ফেরায় না। তাই তাড়াতাড়ি চাল ও ৫টা টাকা নিয়ে বেরােল। কিন্তু বেরিয়ে ভিখারিনীকে দেখে ও তাে অবাক! স্বাস্থ্যবতী ফর্সা মহিলা, বুকের কাছে ধরা একটা ছােট্ট বাচ্চা, উস্কোখুস্কো কটা চুল, অযত্নে বাঁধা। একটা ব্লাউজ গায়ে, হাতার কাছে ছেড়া আর পরনে মাত্র এক টুকরাে ন্যাতা! একেবারে । আক্ষরিক অর্থেই তাই। মাংসল কোমরে বাঁধা ময়লা সাদা ত্যানাটা হাঁটুর ওপর অবধি! ত্রিয়া ঘেঁড়া-ফাটা কাপড় চোপড় পরা অনেক গরিব দেখেছে, কিন্তু এতটা খােলা এই প্রথম দেখল! পুরুষ্ঠ জঙঘা ও নিতম্বের দিকে মেয়ে হয়েও ওরই চোখ চলে যাচ্ছে! ত্রিয়া থতমতভাবে ভিক্ষেটা দিতে গিয়ে বুঝল— ভিখারিনী অন্ধও। ত্রিয়া জিজ্ঞেস করল, “অন্ধি হাে ক্যা?”

ভিখারিনী বলল, “থোেড়া থােড়া দিখতা হ্যায়। আপ দিখ রহে হাে, পর বঁধলা, আঁখ-নাক সমঝমে নেহি আ রহা!” | ক্রিয়ার মনে হল অন্ধত্বটা জন্মগত নয়, তাই জিজ্ঞেস করল, “ক্যায়সে অন্ধী হাে গই?”

—আদমি নে মারা থা মেমসাব! সর ঠোক দিয়া থা দিওয়ার পে, তভি সে নজর খারাপ হাে গয়া!

ত্রিয়া পাষণ্ড লােকটার প্রতি ঘৃণায় কপাল কুঁচকে বলে, “বাে কঁহা হ্যায়! তুম অন্ধী হােকে ভিস্থ মাংগ রহি হাে!”

—হম বনজারে, পরে লােগ হ্যায় মেমসাব, ছছানােকো কাম করনা পরতা! হম দুসরা কাম নেই কর সকতে, তাে ভিস্থ মাংগনে নিকলে!

প্রিয়া আর কী বলবে, ভিক্ষেটা দিয়ে ঘরে এসে সােফায় বসে পড়ে। ব্যাপারটা মাথায় পা দিচ্ছে। হঠাৎ ওর মনে হয়, ওদের ওখানে G.C.F Factory-র ২৫৪টি বাংলাে টাইপ কোয়ার্টার। অনেক কোয়ার্টারেই ব্যাচেলার ছেলেরা ২/৩ জন করে থাকে—

অনেক সিঙ্গল মানুষও আছে, যাদের পরিবার দেশের বাড়িতেই থাকে বেশির ভাগ সময়। এই ভরদুপুরে ওইরকম আধান্যাংটা মহিলাকে সুযােগ পেলে কেউ ছাড়বে! যা দিনকাল চলছে এখন! হয়ত ভিক্ষে দেওয়ার বাহানায় ভিতরে টেনে নেবে।

ত্রিয়া তাড়াতাড়ি বাইরে গেল। মহিলাটি তখন পাশের কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ভিক্ষের গুজারিশ করছিল। ত্রিয়া তাকে ডাকল এবং তার হাত ধরে ঘরের ভিতরে নিয়ে এল। তারপর ওকে বুঝিয়ে বলল যে কি বিপদ হতে পারে তার। এখানের বাংলাে টাইপ কোয়ার্টারগুলাে সব গাছপালায় ভর্তি। অতএব বিপদ কোথায় ওঁত পেতে থাকবে বােঝাই যাবে না। ত্রিয়া তাই তাকে বলল যে সে শাড়ি কাপড় দিচ্ছে, ও পরে নিক, আর যেন সাবধানে থাকে! ত্রিয়া আলমারি থেকে কালাের ওপরে লাল-নীল ফুলের | সিনথেটিক একটা ছাপা শাড়ি বের করল, যেটা হিন্দুস্থানি মার্কা

বলে ও পরত না। আর একটা পুরনাে সায়াও বের করল। ত্রিয়ার ব্লাউজ ওর হবে না। অতএব শাড়ি-সায়াটা এনে ওকে পরতে বলল।

মেয়েটি কোলের ঘুমন্ত বাচ্চাটাকে মাটিতে শুইয়ে দিলে ত্রিয়া তাড়াতাড়ি একটা চাদর বিছিয়ে বাচ্চাকে তার ওপরে শােয়াতে বলল, নইলে পুরনাে মেঝে যা ঠান্ডা! বনজারা বৌটি একটু হাতড়ে হাতড়ে সায়া-শাড়ি পরে নিল। সামনে আঁচল করে শাড়িটা পরেছে। এইটুকুতেই কি সুন্দর লাগছে ওকে! অতঃপর ভিখারিনী ত্রিয়াকে অনেক দুয়া দিয়ে বাচ্চা নিয়ে বেরিয়ে গেল। ত্রিয়াকে ভীষণ এক তৃপ্তি আর ভালােলাগা আচ্ছন্ন করল যেন! কিন্তু সে তাড়াতাড়ি ঘড়িতে দেখল—১১.২০ বেজে গেছে। অতএব ত্রিয়া সেলাই-এর ব্যাগটা নিয়ে দরজায় তালা দিয়ে দ্রুত হাঁটতে লাগল গন্তব্যের দিকে।

ত্রিয়ারা ১৬ জন বাঙালি মহিলা ও ২ জন মারাঠি মেয়ে— মােট ১৮ জন সেলাই শিখছে, এই মাস তিনেক হল। টিচার কুসুম মালহােত্রাদি বলেছেন যে আর তিনমাস পরেই ওদের ডিপ্লোমার পরীক্ষা দেওয়াবেন। কারণ সবাই প্রায় আগে থেকে সেলাই জানত এবং সবাই খুব দ্রুত প্রােগ্রেস করছে। ত্রিয়াত মেশিনে এম্ব্রয়ডারি পর্যন্ত শুরু করে দিয়েছে। মালহােত্রাদি ত্রিয়াকে একটু বেশিই ভালােবাসেন। কারণ মালহােত্রাদির কথায় ত্রিয়ারা গায়ত্রী পরিবারের’ মেমরার হয়েছে এবং ওনার সঙ্গে কয়েকটা গায়ত্রী হবন’ এ যােগও দিয়েছে তারা। ত্রিয়াকে দেরি করে আসতে দেখে সেলাই টিচার মালহােত্রাদি কারণ জিজ্ঞেস করলেন। ত্রিয়া তাে মুখিয়েই ছিল, সব বলল সবিস্তারে। সবাই Appreciate করল, বাহবা দিল ক্রিয়াকে। মালহােত্রাদি স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন। মাথায়। আজ আর ত্রিয়ার তেমন সেলাই টেলাই হল না। শুধু বাড়ির মেশিনে বড় বড় সূচের সাহায্যে যে embroidery টা করেছিল সেটা দেখাল এবং নাম পেল। ততক্ষণে ১২টা বেজে গেছে, সবাই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ল। কারণ G.C.F Factory থেকে স্বামীরা সব ১২.১৫-র মধ্যেই নিজের নিজের বাড়িতে চলে আসবে আর Lunch সেরে ১.৩০-এর মধ্যে চলেও যাবে কর্মস্থলে। এখানে এটাই নিয়ম। শুধু ক্রিয়ার বর ছেলেকে নিয়ে আসে বলে আধঘণ্টা মতাে দেরি হয়। ত্রিয়া-ও ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

ওদের বাংলাে কোয়ার্টারগুলাে রাস্তার দুপাশে ৮ করে ১৬টা দুই লাইনে—এভাবে পর পর ৯টা লাইনে ১৮ সারিতে ১৪৪টা কোয়ার্টার। এ ছাড়া লম্বা করে একদিকে দশটা কোয়ার্টার। মালহােত্রাদির কোয়ার্টার হতে ত্রিয়াদের কোয়ার্টার চারটে লাইনের পরে। পাশের রাস্তা দিয়ে ত্রিয়া সবে দুটো লাইন পেরিয়েছে, হঠাৎ তৃতীয় লাইনে ওই ভিখারি মহিলার গলার আওয়াজ পেয়ে ডানদিকে ফিরে চাইল। দেখল মােটামুটি ওদিক থেকে চতুর্থ বা পঞ্চম বাংলাের সামনে দাঁড়িয়ে সে। কিন্তু অতি অবাক হয়ে দেখল ত্রিয়া, মহিলা মােটেই শাড়ি পরে নেই! আগের মতােই ত্যানা পরে ভিক্ষে করছে! ওর মুখ থেকে অনায়াস একটা চিৎকার বেরিয়ে এল—“এ্যা ই ই ই!”

ভিখারিনী চকিতে ত্রিয়ার দিকে ফিরে চাইল এবং হনহন করে ওদিকেই চলে গেল। ত্রিয়া বুঝল যে সে এতদূর থেকে ত্রিয়াকে দেখে যখন চিনতে পেরেছে, সে কখনই অন্ধ নয়! মানে পুরাে ব্লাফ দিয়েছে ক্রিয়াকে। আর শুধু ত্রিয়াকেই কেন, সবাইকেই বােঝাচ্ছে অসহায়তা! ক্রিয়া ক্ষিপ্ত মেজাজে বাড়ি ফিরল। আগে

ভেবেছিল, পুলক এলেই সে আজকের ঘটনাটা বলবে—মনে মনে বেশ গর্বও হচ্ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে নিজেকে একটা বােকা-গবেটহাঁদা ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছে না। শুনেছিল এই বনজারা মহিলারা নাকি সাংঘাতিক হয়, চুরি-ছলনা সব ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত! আজ প্রমাণ পেয়েও গেল। অতএব পুলককে কিছু না বলে সব চেপে যাবে ঠিক করল। কারণ জানে, পুলক সব শুনে একটা অট্টহাসি দেবে! নিজের Criticise কেউ জেনেশুনে করায় নাকি পাগল! থমথমে মুখে ক্রিয়া পাঁপড় ভাজতে শুরু করল।

পুলক Lunch সেরে অফিস চলে গেছে। ত্রিয়া সাত বছরের সােনাইকে স্নান করিয়ে খাইয়ে দিয়ে নিজেও খেয়ে নিয়েছে। তারপর ছেলেকে নিয়ে বিছানায় গিয়ে তাকে গল্প বলে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মাথায় আবার পুরনাে খেয়ালটা এসে ঝাপিয়ে পড়েছে। ত্রিয়া পাশ ফিরে মেয়েটির বিষয়ে ভাবতে শুরু করল। মনকে সে বুঝিয়েছে যে সে তাে সত্মনে কারও উপকারই করতে চেয়েছে! এখন সে যদি সেভাবে সেটা গ্রহণ না করে তাে এতে তার কী দোষ! যার যেমন কর্ম, সে তার তেমনি ফল পাবে! ওর কপালে দুর্ভোগ থাকলে আটকাবে কে?—ও নিজেও হয়ত তাই চায়! নইলে শরীর প্রদর্শন করছে কেন? শাড়ি দিলেও যখন পরেনি, তার মানেই ওর মতলব মােটেই ভালাে নয়! মরুকগে! ত্রিয়া ঘুমােনাের চেষ্টা করে। কিন্তু অস্বস্তিটা মন থেকে যাচ্ছে না! দুবার অহেতুক এপাশ ওপাশ করে। হঠাৎ একটা কথা মনে হয় ত্রিয়ার। ভাবে, যাযাবর জাতিটা, বিশেষ করে তাদের মেয়েরা কিন্তু খুব Dangerous হয় শুনেছে সে। এরা চুরিবাটপাড়ি-ছলনায় নাকি খুব পটু হয়! টাকার জন্য করতে পারে

হেন কাজ নেই। তাহলে এই ভিখারিনী মেয়েটিও Innocently নয়, হয়ত ভাবনা চিন্তা করেই ওরকম আধন্যাংটা হয়ে ঘুরছে, যাতে সুযােগ পেলে পুরুষ মানুষের ক্ষুধা মিটিয়ে বেশ কিছু | রােজগার করে নিতে পারে! নিজেকে রক্ষা করার অস্ত্র হয়ত ঠিক লুকিয়ে রেখেছে কোথাও! দরকার পড়লেই বের করে নেবে চকচকে ধারালাে ছুরি! ত্রিয়ার মনে হঠাৎ করে ওই মেয়েটির প্রতি একটা ভাবাবেগ এসে পড়ে। মনে হয়,ওই যাযাবর মেয়েটা নিশ্চয় যথেষ্ট মজবুত এবং নিজের প্রতি Confident! সে তার ইচ্ছেমতাে চাইলে কাউকে শরীর দিতে পারে, অন্যথায় বাড়াবাড়ি করলে নিজেকে সে রক্ষা করতেও পারবে। কিন্তু ত্রিয়ার মতাে মেয়েরা? ক্ষমতা হবে এতটা স্বনির্ভর ভাবে চলার? সাহসই হবে না! ক্রিয়ার এখন নিজেকে কেমন যেন দুর্বল-অসহায় মনে হল আর ওকে এক বীরাঙ্গনা! যে মেয়ে ভয়কে জয় করতে পারে সে তাে | বীরাঙ্গনাই! ত্রিয়া ওকে শাড়ি দিয়েছে বলে এখন আর মন খারাপ

লাগছে না। বরং ভাবল, মেয়েটা তার কষ্টের উপার্জন নিয়ে একসময় ঘরে যাবে, স্নান করে হয়ত তার দেওয়া শাড়িটা খুশিমনে পরে উনােনে রান্না বসাবে। দিনশেষে সবাই মিলে ঝাল ঝাল মাংসের ঝােল আর গরম গরম ভাত খাবে। শাড়িটা দেখে কেউ | কিছু জিজ্ঞেস করলে সে নিশ্চয়ই এক দয়ালু মেমসাহেবের কথা | বলবে। বেশ উৎফুল্ল হয়ে গেল ওর মনটা। কখন যেন ত্রিয়ার দুচোখে এক পরম শান্তিতে ঘুম নেমে এল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *