প্রতিবাদী তসলিমা – অপূর্ব দাস

প্রবন্ধ / নিবন্ধ সাহিত্য
Spread the love

তসলিমা নাসরিন আজ আর শুধু একজন প্রতিবাদী লেখিকার নাম নয়, একজন নারীবাদী মহিলাও নয়, এই সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দর্পণ তিনি। ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যায় | নিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানাের প্রতিচ্ছবি তিনি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় একজন নারী কীভাবে প্রতিক্ষেত্রে লাঞ্ছিতা ও অত্যাচারিতা হল সেটা তাঁর লেখনীর মাধ্যমে বারবার ফুটে উঠেছে। তার কথায় নারীর শুদ্ধ হওয়ার প্রথম শর্ত নষ্ট হওয়া।” একজন। ছােটবেলা থেকেই নিয়ম ও অনুশাসনের শিকলে বাঁধা পড়ে যায়। তাই তিনি নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য’ গ্রন্থে স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন নারী কেন ফুটপাতে হাঁটবে, গাছের ছায়ায় দাঁড়াবে, সিঁড়িতে একা বসবে, ঘাসের ওপর শােবে?’

এই সামাজিক নিয়মে সত্যিই একজন নারী তার অনুভূতি, চেতনাকে সামনে রেখে নিজের মতাে পথ চলতে পারে

। চলতে গেলে অনেক বাধা আসে। একজন মেয়ে জন্মাবার পর থেকে যত বড় হতে থাকে ততই তাকে নিয়মের জাঁতাকলে পিষ্ট করা হয়। উল্টোদিকে একজন ছেলে জন্মাবার পর থেকে যত বড় হতে থাকে ততই তার স্বাধীনতা বাড়তে থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ক্ষেত্রে নিয়মকানুন অনেক শিথিল। পুরুষরা যেন উত্তমর্ণ, আর নারীরা অধমর্ণ! এ কেমন সমাজব্যবস্থা? এ কেমন? অথচ প্রকৃতি এবং সৃষ্টির জন্য পুরুষের নারীকে প্রয়ােজন। তসলিমার ভাষায়, ‘ভােগের জন্য, বংশরক্ষা করার জন্য। বিরুদ্ধবাদীরা অবশ্য বলবেন নারীদেরও পুরুষদের দরকার ভােগের। জন্য, বংশরক্ষার জন্য। কারণ স্ত্রী-পুরুষ মিলিত হওয়ার ফলেই শিশুর জন্ম হয়, বংশরক্ষা হয়। তাছাড়া নারী-পুরুষের সঙ্গমে উভয়পক্ষই শারীরিক তৃপ্তি পান। সেক্ষেত্রে দুজনেই দুজনকে ভােগ করেন। সহবাসে উভয়েরই ভূমিকা থাকে। তবে এটাও ঠিক অনেক ক্ষেত্রেই নারীকে ভােগ করা হয় ইচ্ছার বিরুদ্ধে। কখনও স্রেফ গায়ের জোরে। বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় সংসারের কর্তা তার যাবতীয় কর্তৃত্ব ফলাচ্ছেন গিন্নির ওপর। তসলিমার কথায় শক্তি খাটাবার, গলার জোর—গায়ের জোর দেখাবার জায়গা কোথায় পুরুষের। | তবে এই কথাটি সবক্ষেত্রে প্রয়ােগ করলে তা অতিসরলীকরণ হয়ে যায়। সব পুরুষই নারীকে তার ব্যক্তিগত পণ্য হিসাবে ভাবেন

তাকে চর্ব, চোষ্য, লেহ্য, পেয় করেন না। প্রাকৃতিক কারণে নারীর কিছু অসুবিধা রয়েছে। তবে তার মানে এই নয় যে নারী দুর্বল, নারী সহায়সম্বলহীন উদ্বাস্তু। তসলিমার লেখায়, বিশেষ করে ‘নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য গ্রন্থে নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের জন্য ধারালাে প্রতিবাদ এসেছে। নারীকে তিনি পােষাপাখির সঙ্গে তুলনা করেছেন। খাঁচার পাখিকে যেমন স্নান করানাে হয়, খাবার দেওয়া হয়, কিছু বাঁধাবুলিও শেখানাে হয়, তেমনি নারীকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার শেখানাে বুলি আওড়ে যেতে হয়। এর এদিক-ওদিক হলেই সেই নারীর ওপর ‘ভ্রষ্টা, ‘কুলটা’ বা ‘অসতী’-র তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়।

তসলিমা মনে করেন নারী-শরীর দুর্বল নয়। যারা এটা ভাবেন, তারাই ভ্রান্ত ধারণা পােষণ করছেন। এক্ষেত্রে নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য’ বইতে একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন তিনি। তার কথায় ‘এখনও দুটো ছেলে ও মেয়ে শিশুকে ছেড়ে দিলে যে শিশুটির আগে মৃত্যু হবে সে ছেলে শিশু। যদি মেয়ে শিশুর ফুসফুস বা হৃৎপিণ্ড ছেলে শিশুর চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী হয়, তবে কি করে একবাক্যে রায় দেওয়া হয় যে, মেয়ে মাত্রই দুর্বল, কোমল, ভীতু ও লজ্জাবতী?

আসলে তসলিমার লেখনীর মতই যুক্তিগুলি ধারালাে এবং স্পষ্ট। তিনি লেখনীকে ব্যবহার করেছেন অন্যায়, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসাবে। ধারালাে ভাষা ও জোরালাে মতামতের জন্যই এই লেখিকা দ্রুত সাধারণ মানুষের মনকে স্পর্শ করতে পেরেছেন, তাদের অনুভূতিকে আন্দোলিত করতে পেরেছেন।

তিনি বারেবারে তাঁর লেখা নানা নিবন্ধে বলেছেন নারীদের দমিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি মনে করেন না ভয় এবং লজ্জাই নারীর ভূষণ। এই দুটি বিষয়কে তিনি নারীত্বের প্রধান গুণ বলেও মানতে চাননি। তিনি বােঝাতে চেয়েছেন এই সমাজ নিজেদের স্বার্থেই নারীর চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট হয়। তাই বাধ্য হয়েই প্রতিবাদের রাস্তায় হাঁটতে কুণ্ঠাবােধ করেন নারীরা। কারণ ‘ভদ্রতার বাইরে গেলেই মেয়েদের পতিতা বলে দেওয়া হয়।

তসলিমার লেখায় তথাকথিত সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষদের এবং সংস্কৃতি জগতের কেষ্টবিষ্টুদের স্বরূপ উদঘাটিত হয়েছে। বাংলাদেশের ভাষাশহিদ দিবস একুশে ফেব্রুয়ারির কোনও এক বছর) বিকেলে কীভাবে এক যুবতী ধর্ষিতা হয়েছেন তার উল্লেখ রয়েছে। তার প্রশ্ন, ভাষা আন্দোলনের প্রতি এই যদি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের নমুনা হয়, তাহলে এই দিনটি নিয়ে এত মাতামাতির কী কারণ থাকতে পারে? তাঁর কথায় এই যদি হয় ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, তবে যারা এই বিকৃত যৌনআনন্দ শেষে ভালােমতাে মিশে যায় বইমেলায়, বই দেখে, কেনে, তাদের মুখে কি একুশে ফেব্রুয়ারির গান শােভা পায়? এই ভণ্ডদের তিনি ধিক্কার জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্টই জানিয়েছেন একুশের মেলায় ভিড়ের সুযােগে যৌন হেনস্তার শিকার হন অনেক

মহিলাই। ভিড়ের ভয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন। আসলে তসলিমা বলতে চেয়েছেন যতই বাঙালিরা রুচিশীলতা এবং সংস্কৃতির বড়াই করুক, যতই নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলা হােক, আসলে অনেককে সুযােগ পেলেই নিজেদের কামনা চরিতার্থ করতে চায়। অথচ এই মেলা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ আজও প্রবল। তাসত্ত্বেও এখানে নারীরা নিরাপদ নয়। তাদের নিরাপত্তার জন্য বাংলা আকাদেমি কর্তৃপক্ষ ছাত্রী বিগ্রেড গঠন করেছেন। এ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

এ থেকেই বােঝা যায় বাংলাদেশে আজও নারীদের অবস্থা ঠিক কোন জায়গায় রয়েছে। আবার ছাত্রী-ব্রিগেড নিয়ে মেলায়

পুরুষ প্রবেশার্থীদের কৌতূহলের অন্ত নেই। বই কেনা বা বই | দেখার চেয়ে ছাত্রী-ব্রিগেডের প্রসঙ্গ নিয়ে আলােচনাই তাদের কাছে মুখরােচক। লেখিকার কথায় “এখন নিরাপত্তার কারণেই নাকি সন্ধে ছটার সময় ছাত্রী-ব্রিগেডের চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান সমাজে নারীদের প্রকৃত অবস্থার কথা বারবার নানা প্রসঙ্গ, নানা উদাহরণের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে। তবে এসবের মাঝেই লেখিকার ইতিবাচক মনের পরিচয় পাওয়া যায় যখন তিনি ছাত্রী-ব্রিগেড এবং মেলা পরিচালন কমিটিকে অভিনন্দন জানান। নারীর স্বার্থে নারীরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসায় আশার আলাে দেখতে পেয়েছেন। তসলিমা। মেলা একটি প্রতীক মাত্র।

আসলে জীবনের নানা ক্ষেত্রে মহিলাদের ওপর অত্যাচার, অবিচার, শােষণ, নিষ্পেষণ চলছে। সরকার বা রাষ্ট্র এক্ষেত্রে ফলপ্রসূ কিছু করছে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সরকার ইতিবাচক কিছু করতে গেলে নানাদিক থেকে বাধা আসে। এজন্যই লেখিকা জানিয়েছেন নারী জন্মাবার পরই পুরুষকৃত নানা নিয়ম ও নীতির জালে আটকে যায়। তাই নারীর দেহ ও মন রক্তাক্ত হয়। নারী যে পথে হাঁটে সে পথ কাঁটা বিছানাে। বর্তমান সমাজে নারীর জন্য নিরাপত্তার দরকার হয়। যেমন তা দরকার হয় দুর্বল মানুষ, প্রতিবন্ধী ও শিশুদের জন্য।

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী এবং তথাকথিত শিক্ষিত সমাজকে সমালােচনার হুল ফুটিয়েছেন লেখিকা। আসলে লেখিকা বুদ্ধিজীবী শ্রেণির দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে সােচ্চার হয়েছেন। তাদের মুখােশ খুলে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে লেখিকা নিজের কলমকেই শাণিত তরবারির মতাে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কথায়, বুদ্ধিজীবী এখনও হইনি, তাই বুদ্ধিও খােলেনি আমার, তা না-হলে নিজের স্বার্থের জন্য যে মাঝেমধ্যে নিজের জন্য ফাদও পাতা যায় তা আমি কিছুটা হলেও জানতাম। | বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের কাছে ফেব্রুয়ারির মাস উৎসবের মাস। সারা বছর যাঁরা লেখালেখির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখেন, সারা বছর যাঁরা সৃষ্টির সাধনায় মেতে থাকেন, তাদের আনন্দ করার মরশুম। এজন্যই তারা সেই সময় কলমকে বিশ্রাম দেন। এজন্যই বুদ্ধিজীবীরা মেলায় যান।

তসলিমা নিজেও অকপটে জানিয়েছেন এই সময় তিনি আনন্দের জোয়ারে গা ভাসাতে চান। এজন্যই বইমেলায় আসেন, যেটা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের মিলনমেলা। এই বইমেলা বার্ষিক উৎসবের রূপ নিয়েছে। অথচ বইমেলাতেই লেখিকার বই নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। তসলিমার লেখা নিয়ে আপত্তির অজুহাতে কয়েকটি চরম অসভ্যতা হয়। স্টল থেকে জোর করে তার বই তুলে নিয়ে গিয়ে ছিড়ে ফেলা হয়। শুধু তাই নয়, ওই দুর্বিনীত বীরপুঙ্গবের দল লেখিকাকে হুমকি দেয়, বাংলা আকাদেমির মেলায় এলে তাকে অপমান করা হবে। এমনকি শারীরিক নিগ্রহ করা হবে। | তার দুটি কবিতা নিয়ে এদের আপত্তি। এর মধ্যে একটি কবিতা ‘দৌড়, দৌড়। এই কবিতায় তসলিমা লিখেছেন—“তােমার পিছনে একপাল কুকুর লেগেছে। জেনে রেখাে, কুকুরের শরীরে র্যাবিস। তােমার পিছনে একপাল পুরুষ লেগেছে। জেনে রেখাে, সিফিলিস। এই কবিতায় তিনি হিংস্র কুকুরের পালের সঙ্গে নারীমাংসলােলুপ পুরুষের তুলনা করেছেন। আর এতেই চটে গেছেন এক শ্রেণির ভেকধারী মানুষ। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ওই বইমেলায়। অভিযােগ, ‘পুরুষেরা শরীরে সিফিলিস’ বলে লেখিকা সমগ্র পুরুষ সমাজকে দোষ দিচ্ছেন। এজন্য তাঁকে কৈফিয়ত দিতে হয় কিছু অর্বাচীন ভণ্ড, গোঁড়া, সনাতন সংস্কারে ডুবে থাকা সশস্ত্র যুবকের কাছে।

তসলিমার আক্ষেপ এই নােংরা সমাজের দলিত, নিপীড়িত, শােষিত নারীর পক্ষে যে কোনও শব্দকে অশ্লীলতা বলে গণ্য করা হয়। একজন কবি, লেখিকা, ঔপন্যাসিক বা প্রবন্ধকারের লেখা কোনও শব্দ নিয়ে যে কোনও ব্যক্তি, গােষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের আপত্তি থাকতেই পারে। কিন্তু তাদের আচরণ আগ্রাসী এবং মারমুখী হবে কেন? তিনি সংশ্লিষ্ট শব্দ, বাক্য বা বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারেন। তবে প্রতিবাদের ভাষা অবশ্যই হবে শালীন এবং সংযত।

একজন কবি তাঁর কবিতায় কোন শব্দটি ব্যবহার করবেন সেটা একান্তই তার নিজস্ব চিন্তাভাবনার বিষয়। কিন্তু প্রচলিত ধ্যানধারণার বিপরীতে গেলেই অর্থাৎ স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটলেই তাকে একঘরে করার চেষ্টা করা হয়। তাঁকে সবদিক থেকে আঘাত করার চেষ্টা করা হয়। একবিংশ শতাব্দীর গােড়ায় এসেও মানুষের মনের সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামি কাটেনি। মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কারের কাছে মাথা না নােয়ালেই একজনের গায়ে বিদ্রোহীর তকমা এঁটে দেওয়া হয়। তসলিমার লেখা থেকে স্পষ্টই বােঝা যায় তিনি নারীর ওপর ধর্মের, সমাজের, রাষ্ট্রের

নির্যাতনের ঘােরবিরােধী। তসলিমা স্পষ্টই জানিয়েছেন তিনি আপস করতে চান না কোনও ক্ষমতাবান সন্ত্রাসীর সঙ্গে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি জয় বাংলাকে অন্তরে ধারণ করি। এই জয় বাংলাকে জীবনের রক্তে মাংসে যারা লালন করতে

জানে তাদের, সেই দুর্ভাগাদের মৃত্যু হােক।

প্রতিবাদী তসলিমা বারবার সমাজের নানা অন্যায়, অবিচার, | গোঁড়ামি এবং ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। তাই তাঁকে নিয়ে, তার সৃষ্টিকে নিয়ে বারবার বিতর্ক হয়েছে। এজন্য জীবনে তাকে কম দুর্ভোগ পােহাতে হয়নি। মৌলবাদী এবং ধর্মান্ধদের ক্রমাগত হুমকি ও আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে দেশ ছাড়তে হয়। তার ফাঁসি চেয়ে মিছিল বের করে মৌলবাদীরা। তাঁকে হত্যা করলে কয়েক লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়ার কথাও ঘােষণা করে একাধিক মৌলবাদী সংগঠন। এমন ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের কলকাতা শহর থেকেও তাঁকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে তাড়ানাে হয়। আর সমস্ত তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা যারা হিন্দু-মৌলবাদের বিরুদ্ধে ক্ষণে ক্ষণে প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন, এক্ষেত্রে মুসলিম-মৌলবাদের বিরুদ্ধে মুখে কুলুপ এঁটে নীরব লজ্জাকর ভূমিকা পালন করেন। | তসলিমার ভাষায় বিরুদ্ধ একটি সমাজের ভদ্রলােকেরা তাকে নিরন্তর চাবুক মারছে। এজন্য তিনি দুঃখ পেয়েছেন। এখনও পাচ্ছেন। তবে দীর্ঘদিন একই অবস্থা চলতে থাকায় তিনি আগের মতাে ব্যথিত হন না। আগে ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্মিত হতেন। এখন আর বিস্মিত হন না। সব কিছু দেখেশুনে তিনি স্থবির হয়ে গেছেন। ফেব্রুয়ারির বইমেলায় বাংলা আকাদেমির মাঠে একবার একদল উগ্র যুবক লেখিকার বিরুদ্ধে একটি মিছিল বের করে। | ব্যানারে লেখা ছিল কয়েকটি অশ্লীল বাক্য। লেখিকা অন্য বন্ধুদের মুখে এই ঘটনার খবর পান। এরপর তার কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী মেলা পরিচালন কমিটিকে ঘটনার কথা জানান। পরে তসলিমার

শুভানুধ্যায়ীরা তসলিমাকে আকাদেমির মহাপরিচালকের ঘরে নিয়ে চলে যান। পরে অবশ্য কয়েকজন যুবক ওই ব্যানারটি কেড়ে নেন। মহাপরিচালকও মঞ্চের মাইক ব্যবহার করে এজাতীয় অশােভন আচরণের তীব্র সমালােচনা করেন। কিন্তু তারপরেই এই মানুষটির আচরণ লেখিকাকে হতবাক করে দেয়। মহাপরিচালক লেখিকাকে প্রশ্ন করেন কেন তার বিরুদ্ধে মিছিল বের করা হচ্ছে? এই প্রশ্নে হতবাক তসলিমা তাঁকে জানান সম্ভবত লেখালেখির জন্যই এই মিছিল। লেখিকার এই উত্তর অবশ্য মহাপরিচালককে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাঁর মতে অনেকেই তাে লেখালেখি করেন। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের বিক্ষোভ বা মিছিল হয় না কেন? এই ভদ্রলােকের কথা শুনে লেখিকার মনে হয়নি তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। এই ঘটনাটি থেকে একটি কথা স্পষ্ট হয়ে যায়, উঁচু আসনে বসে থাকা মানুষগুলি কখনই স্রোতের বিরুদ্ধে হাঁটতে চান না। কখনই সৃজনশীলতার প্রশ্নে প্রতিষ্ঠান-বিরােধিতাকে প্রশ্রয় দেন না। তারা মুখে বড় বড় কথা বলেন। মঞ্চে উঠে প্রগতিশীলতার পক্ষে গলা ফাটান। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে অথবা ব্যাবহারিক জীবনে রক্ষণশীলতার বেড়া ডিঙোতে পারেন না।

তসলিমার লেখায় বারবার উঠে এসেছে মুসলিম সমাজের রক্ষণশীলতা এবং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারার কথা। গ্রামাঞ্চলে গরিব মানুষের ঘরে দশ-বারােটি সন্তান। অজুহাত হিসাবে তাকে আল্লার দান’ বলা হয়। জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং পরিবার পরিকল্পনাকে এখনও স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি অনেকে। সচেতনতার অভাব এবং অশিক্ষাও এক্ষেত্রে দায়ী। শহরাঞ্চলেও নিম্নবিত্ত মানুষদের মধ্যে জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রয়ােজনীয়তা সম্পর্কে

স্পষ্ট ধারণা গড়ে ওঠেনি। তসলিমার জন্ম শহরে। সেখানেই তিনি বড় হয়েছেন। গ্রামের কথা শুনেছেন শুধু বাবার মুখে। লেখিকা গ্রাম দেখেছেন ট্রেনের জানালা দিয়ে। তাই শীত, গ্রীষ্ম বা বর্ষায় তিনি ট্রেনে জানালার ধারের সিটই পছন্দ করতেন। কারণ জানালা দিয়ে দেখা যায় শনে-ছাওয়া ঘর, কোথাও মাটির উঠোনে খড়ের গাঁদা, গাছের ছায়ায় বসে গােরুর জাবর-কাটা। একটি গ্রামে একদিনের জন্য অতিথি হয়ে গিয়ে দেখেছেন সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাহীন দারিদ্র। বিকেল সাড়ে তিনটের সময় লেখিকার ভাগ্যে জোটে ভাত ও সজনে ডাল। দরিদ্র এই পরিবারের গিন্নির কাছে লেখিকা জানতে পারেন তার ১১টি সন্তানের কথা। ওই গ্রামে পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের কর্মীরা আসেন। কিন্তু বাড়ির কর্তা নিজের বাড়িতে ওই কর্মীদের ঢুকতে দেয় না। সমাজসচেতন তসলিমা এসবের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন মুসলিম সমাজের নির্বোধ রক্ষণশীলতা এবং কুসংস্কার।।

তসলিমা ছেলে-মেয়ের বৈষম্যকেও মেনে নিতে পারেননি। তার প্রতিবাদী মন এবং ধারালাে লেখনী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে জন্মাবার পর থেকে এই বৈষম্য চলে। | তিনি এক জায়গায় বলেছেন, কোন খেলা ছেলেদের এবং কোন

খেলা মেয়েদের তা ভাগ করেছে কে—আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। মাঝেমধ্যে আমার মস্তিষ্ককে একটি রবারের গােলকার পিণ্ড মনে হয়, ইচ্ছে করলেই এটিকে গলিয়ে চ্যাপ্টা করা যাবে অথবা চৌকো। মাঝেমধ্যে ভিতরটা বড় ফাপা লাগে। আমি তখন বুঝতে পারিনা মানুষের জন্য দুরকম নিয়ম কারা বানায়। ছেলেরা ফুটবল খেলবে, ক্রিকেট খেলবে, ছেলেরা লন টেনিস খেলবে, স্কোয়াস খেলবে, বিলিয়ার্ড খেলবে। আর মেয়েরা | খেলবে উঠোনের মাটিতে দাগ কেটে এক্কা-দোক্কা, আর পাথর বা ইটের টুকরাে তুলে যােলাে গুটি। এই বৈষম্য লেখিকার মনে আলােড়ন তুলেছে। অবশ্য স্ত্রী-পুরুষের এই বৈষম্য শুধু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতেই নেই উন্নত ও ধনী দেশগুলিতেও রয়েছে। লেখিকা জানিয়েছেন কানাডার মতাে উন্নত দেশেও নারী-পুরুষের মধ্যে অধিকারের ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে। কানাডার আইন অনুসারে পুরুষেরাই শুধু শরীরের ঊর্ধ্বাংশ অনাবৃত রেখে চলাফেরা করতে পারেন। নারীদের এই অধিকার নেই। কানাডায় মহিলারা এনিয়ে বিক্ষোভ দেখান। শরীরের ঊর্ধ্বাংশ অনাবৃত রেখে মিছিলে তার হাঁটেন। তসলিমা কানাডার এই প্রতিবাদী নারীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। | এ থেকেই বােঝা যায় তসলিমার ভিতরের প্রতিবাদী সত্তাটিকে। এই প্রতিবাদের রাস্তায় হাঁটার জন্যই তাকে বাংলাদেশে ধর্মান্ধ ও মৌলবাদীদের কোপে পড়তে হয়েছে। রক্ষণশীলদের চক্ষুশূল হয়েছেন। নিজের প্রিয়জনদের থেকে দিনের পর দিন দূরে থাকতে হয়েছে। তাসত্ত্বেও তিনি মৌলবাদীদের সঙ্গে আপস করেননি। বহুদিন ইউরােপে কাটাতে হয় তাকে। সেখানেও মৌলবাদীরা একনাগাড়ে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়, ভয় দেখায়। ভারতেও | লেখিকা হায়দ্রাবাদে আক্রান্ত হন। কলকাতাতেও ১৩ বছর আগে

লেখিকাকে বিতাড়ণের দাবিতে সারাশহর জুড়ে যে মুসলিম| মৌলবাদী তাণ্ডব হয় তার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন মহানগরীর বহু মানুষ। | ভারতের তৎকালীন কংগ্রেসি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে তখন নানা দায়িত্বশীল ব্যক্তি জানান, এদেশে থাকতে হলে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। ভারতীয় সংস্কৃতি এবং সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। তখন লেখিকা তার ঘনিষ্ঠ মহলে স্পষ্টই জানান, ভারতে থাকলে তার পছন্দের জায়গা হল কলকাতা। এখানে তার অনেক পরিচিত ও বন্ধুবান্ধব রয়েছে এবং তার জন্মভূমি বাংলাদেশের সঙ্গে এখানকার সংস্কৃতির মিল রয়েছে। এই শহরের সংস্কৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু এ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ভােটব্যাঙ্কসর্বস্ব রাজনীতির ঘােলাজলের শিকার হয়ে তসলিমা আজ পর্যন্ত কলকাতায় থাকতে পারেননি। তবে এই রাজ্যের বুদ্ধিজীবী ও প্রগতিশীল মানুষেরা যাঁরা তাঁকে কলকাতা থেকে বিতাড়ণের সময় নির্লজ্জ নীরব ভূমিকা পালন করেন, তাঁরা চান তসলিমার প্রতিবাদী কলম যেন সচল থাকে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *