নারী – নিকেতন – বন্দনা বিশ্বাস

গল্প সাহিত্য
Spread the love

মােবাইলটা বেজে ওঠে—“আমার মল্লিকাবনে যখন…” সুনীপা অঘােরে ঘুমােচ্ছে! মাঝে মাঝে কানে আওয়াজ আসছে আবার বেজে উঠছে। অনেকক্ষণ বাজার পরে সুনীপা উঠে পড়ে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে—আরে এখন তাে রাত একটা। এত রাত্রে কে ফোন করছে! মােবাইলটা তুলে সুনীপা বলে “হ্যালাে!!”

ওপার থেকে কাপা কাপা গলায় উত্তর আসে—“আজ্ঞে , আমি ফুলমণি বলছি—নারী নিকেতন থেকে।”

সমস্ত ঘুম সুনীপার চোখ থেকে সরে যায়, মেরুদণ্ড সােজা হয়ে যায়—“বল ফুলমণি, কোনাে বিপদ!” | ফুলমণি রীতিমতাে কাঁপতে কাঁপতে বলে—“হ্যা দিদি, আমাদের সুলেখাকে তুলে নিয়ে গিয়েছে কারা যেন।”

সুনীপা বলে—“সুলেখা মানে নতুন বিধবা মেয়েটা?

‘ —হ্যা খুব সুন্দরী যে নতুন মেয়েটা; সেদিন আপনার হাতে ই ধরে এখানে থাকার জন্য আবেদন জানাচ্ছিল। আপনি তাে প্রথমে । রাখতেই চাননি। কারণ ও তাে কারও রেকমেণ্ডেশনে আসেনি, = বা কোনাে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও আসেনি। শেষমেশ আপনি ’ বলেন—পঞ্চয়েত থেকে লিখিয়ে আনতে হবে। ও বলল, কটা ৭ দিন থাকতে দিলেই, ও একদিন গিয়ে লিখে নিয়ে আনবে।

ও সব কথা রাখ। এখন বল কিভাবে কী হল। এতগুলাে 7 সিকিউরিটি গার্ড কি ঘুমাচ্ছিল? তােরা কি করছিলি? কীভাবেই

বা জানতে পারলি ?…রাখ রাখ ফোন। আমি…ও হাে লাইটের সুইচটা কোথায় গেল! অন্ধকারে কোথায় কি রেখেছি..! এই পেয়ে গেছি স্কুটির চাবিটা।

পাশের ঘর থেকে সবিতাকে উঠিয়ে সুনীপা বলেন—“সবিতা

তাড়াতাড়ি মুখে জল দিয়ে ড্রেস করে নে।

-কেন? কেন!! কেন!!! দিদি কি হয়েছে? সুনীপা একটু ঝাঝিয়ে বলেন অত প্রশ্ন না করে যা বলছি তাই কর।

“শিবু… শিবু!” বলে বারান্দার ঐ প্রান্তে ড্রাইভার শিবুকে ডাকেন। এত রাতে স্কুটিতে যাওয়াটা ঠিক হবে না।।

শিবুর ঘুম খুব সজাগ; সে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে জামার বােতাম লাগাতে লাগাতে বলে——“কি হয়েছে ম্যাডাম!!” | সুনীপা উত্তেজিত হয়ে বলেন—“কথা বলার সময় নেই তাড়াতাড়ি গ্যারেজ খুলে গাড়ি বের কর আর রাম সিংকে ডেকে

দে।”

| শিবু কোনাে কথা না বলে চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে গ্যারেজের চাবি আর গাড়ির চাবি নিয়ে দ্রুত বাড়ির বাইরের দিকে যায়। রাম সিংকে বলে শিগগির ওঠো রামুদা। কিছু প্রশ্ন করার আগেই ঠোটে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয় ম্যাডামের নির্দেশ। কোনাে রকমে লুঙি বাঁধতে বাঁধতে, চোখ মুছে গেটের চাবি খােলে রাম সিং। শিবু গ্যারেজ খুলে গাড়ি বের করে। হতভম্বের মতাে দাঁড়িয়ে থাকে দারােয়ান রাম সিং।

ম্যাডাম ও সবিতা উদভ্রান্তের মতাে গাড়িতে ওঠে। ম্যাডাম বলেন—“রামুদা ভালাে করে গেট বন্ধ করে ভিতরে যাও। রাতে যতি ফিরি তােমার ফোনে ফোন করব তখনই গেট খুলবে। অন্য কেউ ডাকলে রাতে বাইরে বেরােবে না।।

—জি ম্যাডাম, বলে রামু গেট বন্ধ করে দেয়। “…শিবু গাড়িটা একটু তাড়াতাড়ি চালা। টেনশান আর নেওয়া যাচ্ছে না। আবার ফোন করে সুনীপা।

ফুলমণি ভয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, “ম্যাডাম, আমাদের গেটের সামনে অনেক লােক জড়াে হয়েছে। তারা নানা গালিগালাজ করছে। গেটে জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে।

সুনীপা আর কোনাে রিস্ক না নিয়ে শিবুকে বলে প্রথমে থানায় চল। আগে একটা ডায়েরি করে আসি।

সুনীপা থানার বড়বাবু সুবিমলক বাবুকে ফোন করে। …হ্যালাে কে বলছেন? —আমি স্যার, নারী-নিকেতন থেকে সুনীপা বলছি। —এত রাতে? কোনও অঘটন?

-হা স্যার। কয়েকদিন আগে আমার ওখানে একটি নতুন মেয়ে এসেছে। তাকে আজ কারা রাতে তুলে নিয়ে গেছে। তার ওপরে প্রচুর লােক জড়াে হয়েছে গেটের সামনে। নানা গালিগালাজ করছে এবং হুমকি দিচ্ছে, নারী-নিকেতন নাকি তুলে দেবে!

বড়ােবাবু অভয় দেন, “ম্যাডাম কিছু চিন্তা করবেন না। আমি আমার ফোর্স নিয়ে এখনি যাচ্ছি আপনার ওখানে। আপনি থানায় চলে আসুন। আপনি আমাদের সঙ্গে ওখানে যাবেন। তা না-হলে আপনার বিপদ হতে পারে।”

শিবু গাড়ি থামায় থানার সামনে। সুনীপা নেমে সােজা থানায় ঢােকে। সমস্ত ঘটনা বলে।

সব শুনে বড়বাবুর ভ্রু কুঁচকে যায়। বলেন, “বলুন সুনীপা ম্যাম, আপনি পুরাে ঘটনাটা খুলে বলুন, ওখানে কি হয়েছে, আর আপনি কি শুনেছেন। | সুনীপা বলতে শুরু করেন—“গত মাসে একটি মেয়ে আসে সুলেখা নামে। আমার আশ্রমের গেটের সামনে বিধ্বস্ত চেহারা, উস্কোখুস্কো; মুখ দেখে মনে হল হয়তাে ভালাে করে খাওয়াও কয়েকদিন হয়নি। সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ আমার আশ্রমের বড়াে গেটে এসে দারােয়ানের হাতে-পায়ে ধরে কান্নাকাটি করছে আমার সঙ্গে একটিবার দেখা করতে চায়। আমি তখনই আশ্রমে এসে ঢুকেছি। চিৎকার শুনে বাইরে এসে দেখি মেয়েটি অঝােরে কঁদছে। আমি তখন দারােয়ানকে বললাম ওকে আমার কাছে নিয়ে আসতে।

সত্যিই, দারােগাবাবু মেয়েটির মুখটা দেখে আমি কিছুটা দুর্বল হয়ে গিয়েছি। যথেষ্ট সুন্দরী, দারিদ্রের ছাপ সারা শরীরে, তবু এক অসম্ভব মায়াজড়ানাে মুখ, তার দুচোখের জল আমাকে কিছু সময়ের জন্য বিহুল করে দিয়েছিল। কি হয়েছে তােমার? আর। এখানেই বা কেন এসেছ? প্রশ্ন করতেই ও ছুটে আমার পা দুটো ধরে অঝােরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “দিদি আমাকে একটু আপনার পায়ে ঠাই দিন, না-হলে ওরা আমাকে শেষ করে দেবে, আমাকে বাঁচতে দেবে না।”

—ওরা কারা? আর তােমাকে কেনই বা বাঁচতে দেবে না ? তােমার নিজের কেউ নেই? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ও তখন যা বলল, তাতে বুঝলাম যে মাস ছয়েক হল ওর স্বামী মারা গেছে। ওর বাবা-মা নেই। অল্প-বয়সের বিধবা তাই, সুন্দরী। শ্বশুরবাড়ি থেকেও নানা অপবাদ দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে। মা-বাবার একটা ছােট বাড়ি ছিল সেখানেই সে কোনােরকমে থাকছিল। ওখানের একটি যুবকের সাথে ওর সম্পর্ক তৈরি হয়। সেই তাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে আসে। তারপর ও বুঝতে পারে যে ছেলেটি ওকে পাচার করার উদ্দেশ্যে এখানে নিয়ে এসেছে। ও সেখান থেকে রাত্রে পালিয়ে এসে ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে পৌঁছেছে। ওর কথা শুনে আমার মনটা বড়াে ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। আজও আমাদের দেশের মেয়েদের অবস্থার কোনাে উন্নতি হয়নি। তারা শুধুই পুরুষের লালসার শিকার। তার মাথার উপরে কোনাে পুরুষ না থাকলে সে যেন সার্বজনীন। তার একলা নিজের মতাে করে বাঁচার অধিকার নেই। কিছুটা ইমােশনাল হয়ে পড়লাম। আগু-পিছু না ভেবেই সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে ওকে থাকতে দিলাম। আর বললাম—“তুমি তােমার বাপের বাড়ি গিয়ে পঞ্চায়েত থেকে লিখে আনবে আর আধার কার্ড, ভােটার কার্ড নিয়ে আসবে। কিন্তু কয়েকটা রাতও কাটতে দিল না, কেমন বিপদে পড়লাম কিছুই বুঝতে পারছি না।

সব শুনে থানার বড়ােবাবু মাথা চুলকে বললেন—“আচ্ছা ম্যাম্ | কিছুদিনের মধ্যে কারও সাথে আপনার কোনাে ঝামেলা হয়েছিল?”

অনেকক্ষণ ভেবে সুনীপা বললেন, “মনে পড়েছে, হ্যা স্থানীয় কিছু ছেলে একজন প্রােমােটারের হয়ে এসেছিল। আমার আশ্রমের

পিছন দিকে বড়াে রাস্তার ধারে যে বিঘাখানেক জমি আছে তার অর্ধেক ওদেরকে দিতে। বিনিময়ে ওরা বাকি জমিতে যেমন বলবাে বিল্ডিং বানিয়ে বাগান করে দেবে।

আপনি কি বললেন? -না না, আমি আমার নিজস্ব এলাকায় কাউকে ঢুকতে দেবাে। । | একদিন কাউন্সিলার সাহেব দলবল নিয়ে আসলেন, আমার নারী-নিকেতন দেখতে। আমাকে বললেন, “ম্যাডাম আপনি যা করছেন সমাজের অবহেলিত, নির্যাতিত মহিলাদের জন্য তার জন্য আমরা গর্বিত। আমাদের যে কাজটা করার দরকার তা তাে আপনি। স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছেন। আপনার যখন যা সাহায্য লাগবে আপনি বলবেন আমি সমস্ত ব্যবস্থা করে দেব। আমার ছেলেরা সত্যিই খুব ভালাে।” আবার আস্তে করে বললেন, “আপনিও একটু হাতটা বাড়ান আমাদের দিকে। বাচ্চাছেলেগুলাে যে আব্দারটা রেখেছে মিটিয়ে দিন। ওরাও করে খাবে, ওরা আপনার ছেলের মতােই। ওদের জন্যে আপনি না ভাবলে কে ভাববে বলুন? একটু ভাববেন ম্যাডাম… আমরা আপনার পাশে আছি। …চলি কেমন!”

বড়বাবু বললেন, “এবার বুঝলাম, মেয়েটা আসলে বঁড়শির টোপ। আপনি তাে না বুঝে গিলে ফেলেছেন। রক্ত তাে আপনার ঝরবেই। যাকগে, চলুন দেখা যাক কতদূর কি করতে পারি। তবে আমার মনে হচ্ছে, জল অনেক দূর পর্যন্ত গড়াবে। আসলে আমরা পুলিশ প্রশাসন এখন হয়ে গেছি শাঁখের করাত। এগােলেও কাটবে, পিছােলেও কাটবে। দুর্নীতি এখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। আমাদের গায়ে চাপান উর্দিটা আসলে কাটার মুকুট।

নারী নিকেতনের সামনে আমাদের কথা শুনতে হবে, শুনতে হবে। নারী-নিকেতনের ভিতরে কি চলছে, সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে। একটা মেয়ে কি করে উধাও হয়ে যায়—জানতে চাই, জানতে চাই। সুনীপা ম্যাডাম জবাব দিন, জবাব চাই।” চারিদিকে সাংবাদিক ক্যামেরা, টিভি চ্যানেলের লােক। সকাল হতেই দলে দলে লােক জমা হচ্ছে।

| পুলিশের গাড়ি এসে থামল নারী নিকেতনের গেটের সামনে। গাড়ি থেকে পুলিশের দল নেমে সাধারণ মানুষকে সরিয়ে দেয়। দারােয়ান গেট খুলে দাঁড়ায়। প্রথমে বড়ােবাবুর গাড়ি পিছনে সুনীপা ম্যাডামের গাড়ি—তারপর মহিলা পুলিশের গাড়ি ঢুকে গেল। ফুলমণি, শরৎ, কাশী, পুষ্প যে যেখানে ছিল উদ্বিগ্ন মুখে দৌড়ে চলে এল। বড়বাবু বললেন—সব কর্মচারী যারা এখানে রাতদিন থাকে সবাই এখানে এসাে। তিনি এক এক করে জেরা শুরু করলেন। তারপর প্রত্যেকের বয়ান আলাদা আলাদা ভাবে নিলেন। কিন্তু মেয়েটির হদিশ পাবার মতাে কোনাে ক্ল তিনি বার করতে পারছেন না। দারােয়ানরা সবাই এক সাথে ঘুমিয়ে পড়ল কি করে। গেটের বাইরে থেকে কোনােভাবে ওষুধ স্প্রে করা তাে সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই এখানকার কেউ সাহায্য করেছে। কে হতে পারে? সুনীপার দিকে তাকিয়ে বড়বাবু জিজ্ঞাসা করেন—“আচ্ছা ম্যাডাম, গত একমাসের মধ্যে নতুন কোনাে কর্মচারী নিয়ােগ

করেছেন?”

| সুনীপা বলেন—“না, না, আমরা বিগত এক বছরের মধ্যে কোনাে নতুন লােক নিয়ােগ করিনি।”

এরপর বড়ােবাবু বলেন—“চলুন আপনার নারী-নিকেতনের চারিদিকটা একবার ঘুরে দেখি। সরেজমিনে দেখলেন কোনাে প্রাচীরের কোথাও ভাঙা আছে কিনা, অথবা কোথাও কোনাে সুড়ঙ্গ তৈরি করে আসামিরা ঢুকেছে কিনা। কিন্তু কোথাও সেরকম কোনাে চিহ্ন নেই। তাহলে? একটা জলজ্যান্ত মেয়ে কীভাবে উধাও হল? বড়ােবাবুর মাথায় চিন্তার জট। তিনিও ভালাে করেই জানেন সুনীপা দেবীকে। এই অঞ্চলের সবাই চেনে এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। তার এমন শত্রু কে থাকতে পারে! অনেকক্ষণ পরে বললেন—“আজ আমরা ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু আপনার এখানকার একটি লােকও যেন এই নিকেতন ছেড়ে কোথাও না যায়। আমাদের প্রয়ােজন পড়লে আমরা এখানে আসতে পারি, অথবা সন্দেহভাজন যে কাউকে থানায় তলব করতে পারি। শত্রুপক্ষ আশপাশেই থাকবে এবং নজরদারি চালাবে। আপনারা সবাই সাবধানে থাকবেন।

সময় নিজের গতিতে চলে। দিন যায়, দেখতে দেখতে প্রায় ছমাস হতে চলল, মেয়েটির কোনাে খবর নেই। রােজই প্রায় নতুন নতুন পােস্টার পড়ছে নারী-নিকেতন’-এর দেওয়ালে। এমনকি সুনীপা দেবীর নামে “নারী পাচারকারী” তকমাও লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সংবাদপত্র, টি. ভি. প্রভৃতি সংবাদ মাধ্যমে নানা দুর্নাম রটছে। কেউ কেউ বলছে—এটা পুরাে গআপ কেস। সুনীপা ম্যাডাম পুলিশকে খুব খাইয়েছে। আসলে সুন্দরী অল্প বয়সি মহিলা তাে, বাইরে কোথাও মােটা টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। যে মানুষটার সততা, সেবাপরায়ণতা নিয়ে কেউ কোনােদিন প্রশ্ন তােলেনি আজ তার মাথাটা হেঁট হয়ে গেছে। সমাজ পরিত্যক্ত পরিবার থেকে মহিলাদের অনাথা, ধর্ষিতা, পতিতা সমস্ত রকম মহিলাদের পাশেই অভয়দাত্রীর ভূমিকায় যে সুনীপা ম্যাডামকে পাওয়া যেত সেই ম্যাডামের সমস্ত সম্মান যেন এই একটি ঘটনায় ধুলােয় মিশে গেছে। মনেপ্রাণে ভেঙে পড়েছে সুনীপা।। | নারী-নিকেতনের অনাথা মহিলারাও যেন ভেঙে পড়েছে। যার ছাতার তলায় তারা নিশ্চিন্তে জীবন ফিরে পেয়েছিল তার এই অবস্থা, এমন হেনস্থা তারা মেনে নিতে পারছে না। এখানকার মহিলারা কেউ ঝুড়ি বানায়, কেউ ব্যাগ তৈরি করে, উলের পােশাক তৈরি ইত্যাদি কোনাে না কোনাে কাজের মাধ্যমে যুক্ত। তাদের স্বনির্ভর হবার সুযােগ তাে ম্যাডামই করে দিয়েছে। একদিকে গােশালা, হাঁস-মুরগি পালন ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে যেমন নারীনিকেতনের খরচ চলত তেমনি তারাও টাকা-পয়সা পেত। ভালােই আয় হত তাদের। এই ছয় মাসে সেই ব্যবসায়ও অনেক ক্ষতি হয়েছে। বাইরের যেসব সাপ্লায়ার্সরা এইসব জিনিস কিনতে তারা অজানা কোনাে কারণে সামান্য অজুহাতে তাদের অর্ডার বাতিল করে দিচ্ছে।

কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল সুনীপা বুঝতেই পারছে না। ব্যাবসা বন্ধ হবার উপক্রম। এদিকে নারী নিকেতনের খরচ চালানাে

তাে এখন অত্যন্ত সমস্যাসঙ্কুল হয়ে গেছে। পুলিশও কোনাে সুরাহা করতে পারছে না। ঘরে-বাইরে সমস্যায় জর্জরিত সুনীপার খাওয়াঘুম চলে গেছে। চোখের তলায় কালি, সুগার-প্রেশার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ভালাে করে কারও সাথে কথাও বলেন না। যেসব গােয়ালারা দুধ নিতে আসে তারা এখনাে বন্ধ করে নি আর বাগানের কাঁচা সজি, মাছ, ডিম, এগুলাে আছে বলে কোনােরকমে আবাসিকদের খাবারটা দেওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আজ দুমাস কর্মচারীদের বেতন দিতে পারেনি। চিন্তায়, হতাশায় ধীরে ধীরে হতােদ্যম হয়ে পড়ে সুনীপা। এই বিশাল কর্মকাণ্ড বােধহয় আর চালাতে পারবে

। কখনাে কোথায় সাহায্যের হাত পাতেনি, এতবড়াে প্রতিষ্ঠানের খরচ নিজেই চালিয়ে এসেছেন, এমন পরিস্থিতিতে কখনােও পড়তে হয়নি।

ফোন করে অনেকেই তাকে সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ একদিন ওয়ার্ড কমিশনারের ফোন—“ম্যাডাম, খুব খারাপ লাগছে। কি করে হল এমন ঘটনা। পুলিশ কিছু করতে পারল? বাইরে নানা গুজব শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু আমি তাে আপনাকে চিনি, ঐসব গুজবে আমি বিশ্বাস করি না। তবে কি জানেন তাে জনতা খেপে উঠলে খুবই মুশকিল। সাহায্য লাগলে বলবেন। আমরা থাকতে আপনার কোনাে অসুবিধা হবে না। আমার পার্টির ছেলেরা। খুবই ভালাে। আপনি আমাদেরকে আপন ভাবেন না।” | তারপর, কমিশনার-মশাই হে-হে-হে করে এক অদ্ভুত হাসি হেসে বললেন, “রাখি ম্যাডাম, চিন্তা করবেন না, আমরা আছি।” এই ফোনটা যেন সুনীপার মনােবলটা একেবারে মুড়িয়ে দেয়। দিন দিন সুনীপা ভেঙে পড়ছেন। আর বােধ হয় হবে না। এখন মনে দুটো চিন্তা—কি করা উচিত! নারী-নিকেতন বন্ধ করার কথা ভাবলে বুকের ভিতরটা টনটন করে ওঠে। ওটা যে সুনীপার সন্তানসম। নিজের হাতে সন্তান হত্যা! কি করে সম্ভব? অপরদিকে একটাই পথ খােলা—ওদের কাছে মাথা বিকিয়ে দেওয়া। কিন্তু সুনীপা কখনােই তা পারবে না। এর চাইতে আত্মহত্যা করা অনেক ভালাে—

চিন্তায়-ভাবনায় নাওয়া-খাওয়া যখন বন্ধ হতে বসেছে, চেহারার। দিকে তাকানাে যায় না। প্রয়ােজন ছাড়া কারও সাথে কথা বলে

এমন সময় সবিতা এসে দাঁড়ায়। বলে, “দিদি এসাে, তােমার চুলটা আঁচড়ে দিই। কতদিন তুমি আয়নার সামনে দাঁড়াওনি। দেখেছাে একবার তােমার চেহারাটা; চোখের তলায় কালি পড়ে গেছে। কি কুক্ষণে যে তুমি ঐ মেয়েটাকে”..বলতে বলতেই গেটে দারােয়ান রাম সিং-এর আওয়াজ। কাকে যেন সে ঢুকতে দিতে বাধা দিচ্ছে। অপরদিকে খুব আস্তে এক মহিলার গলার কান্নাভেজা আওয়াজ। সুনীপা, সবিতাকে বলে “দ্যাখ তাে কি হয়েছে?”

সবিতা তাে হতবাক! এ কাকে দেখছে সে! দিদিকে ডাকার মতাে ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। সবিতা আসতে দেরি করায় সুনীপা এগিয়ে গিয়ে দেখে—সেই সুলেখা! হাতের ইশারায় রাম সিংকে দরজা খুলতে বলে। সুলেখা, “দিদি”. বলতেই সুনীপা মুখে আঙুল। দিয়ে কথা বলতে বারণ করে। ঘরে নিয়ে গিয়ে সবিতাকে বলে, ওকে কিছু খাবার আর জল দে।

সুলেখা দিদির পা-ধরে বসে পড়ে। বলে, “দিদি আমাকে ক্ষমা করাে। আমাকে দিয়ে এইসব করানাে হয়েছে। আমি তােমার মতাে দেবীতুল্য মানুষকে চিনতে ভুল করিনি।… যখন ওরা আমাকে শিখিয়ে পাঠিয়েছিল তখন আমি তােমাকে চিনতাম না। কিন্তু তােমার কাছে থাকতে থাকতে ঐ কদিনেই বুঝেছি তুমিই আমাকে নতুন জীবন দিতে পারাে…কিন্তু ওরা আমাকে…”

সুনীপা সুলেখার মাথায় হাত রেখে বলেন, “কেঁদো না, ভয় নেই। খেয়ে নাও। পাশের ঘরে গিয়ে থানার বড়ােবাবুকে সুনীপা সব জানায়।

বড়ােবাবু বলেন, “ম্যাডাম আপনি সাবধান, ওর কান্নায় ভিজে যাবেন না। ওরা সব পারে। আপনাকে আবার কোনাে বিপদে ফেলতে এসেছে। আমি ঘন্টাখানেকের মধ্যে আপনার বাড়ি যাচ্ছি। পারলে ওকে ঘরে তালা দিয়ে রাখুন।” | ফোনটা রেখে সুনীপা আবার সুলেখার কাছে আসেন। সব শুনে বলেন, “ওদেরকে ঢােকালি কি করে?” | সুলেখা বলে, “ওরা আসার সময় ঘুমের ওষুধ দিয়ে বলেছিল, এটা স্প্রে করে দিলে দারােয়ান ঘুমিয়ে পড়বে, তারপর ওর পকেট থেকে চাবি নিয়ে দরজা খুলে দিতে। আমি তাই করেছিলাম। এরপর ওরা ঢুকে আমাকে নিয়ে যায়।” | কান্নায় ভেঙে পড়ে সুলেখা। দিদি আমাকে ক্ষমা কর। আমি জানি, আজ না হলে কাল, ওরা যখন জানবে আমি তােমাকে সব বলে দিয়েছি, আমাকে ওরা মেরে ফেলবে। এমনিতেই আমি শরীরে মনে শেষ হয়ে গেছি। কিন্তু আমি মরেও শান্তি পাবাে না যদি আপনাকে সত্যটা না জানিয়ে যেতে পারি। আমি যে কোনাে মুহূর্তে খুন হয়ে যাব। আমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না আমি ভালাে করে জানি। ওরা খুব সাংঘাতিক। আপনি থানায় খবর দিন, আমি সব জানিয়ে যেতে চাই।” | সুনীপা বলেন, “এখুনি বড়বাবু এসে যাবেন। তােমার চিন্তা নেই পুলিশ তােমাকে প্রােটেকশন দেবে।”

সুলেখার মুখে একটা ক্ষীণ হাসির রেখা বুঝিয়ে দেয় যে ওর রক্ষাকর্তা ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ না।

একটু পরে বড়বাবু এসে সুলেখার মুখে সব শুনে শিউরে উঠলেন—মানুষের লােভ কোন পর্যায়ে গেলে মানুষ এত হিংস্র হতে পারে! শুধু সুনীপার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই কারণেই হয়তাে সত্যিকারের সমাজসেবীরা তাঁদের জীবদ্দশায় সম্মান পান না।”

তারপর সুলেখার দিকে তাকিয়ে বড়বাবু সুলেখাকে বললেন, “তুমি যেখানে থাকো আমাদের ঠিকানা দাও, পুলিশ-পাহারার ব্যবস্থা করব।”

অনিচ্ছাসত্ত্বেও সুলেখা ঠিকানা দেয়। কিছুদিন সুনীপা একরকম জোর করেই সুলেখাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেয়।

কয়েকদিন কেটে যায়। হঠাৎ একদিন খবরের কাগজে সুনীপা দেখতে পান কয়েকজন দুষ্কৃতীর হাতে খুন হয়েছে সুলেখা নামে এক তরুণী। তার ছিন্নভিন্ন দেহ পড়ে আছে ধানখেতের আড়ালে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *