নামলী – এ জিরাে পয়েন্ট – অর্বাচীন

ভ্রমণ
Spread the love

কোথায়।

গম্ভীর গলায় প্রশ্নটি কানে বাজতেই হঠাৎ ভিতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। এক পলক তাকিয়ে নিয়ে নিজেকে মাইল ফলকের ওপর সামনে ঠিক করে বসতে বসতে আবার, মানে বাড়ি কোথায় ? উত্তর এল

মাজিত্তার।

তার মানে পড়াশুনা করছাে বুঝি—! হুট করে মাজিতার মুখে চলে এল বৈকি, যেহেতু চলার পথে ফেলে আসা জায়গাতে একটি ইউনিভারসিটি আছে। কথা শুনে মনে হল লােকটার খোজ খবর আছে। তাহলে বুঝে শুনে, তারপর কথার উত্তর দিতে হবে আরকি।

একে দাও

নমিত দৃষ্টি কোণের বাঁকা চাউনির পলক দিয়ে বুঝলাম হাত বাড়িয়ে এক কাপ চা হাতে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। “না মানে আমি তাে চা খাই না, আরে ভাই খাও। আমি বলছি খাও— ক্লান্তি কেটে যাবে। হাত বাড়াতে মেয়েটির মিষ্টি হাসির ঝলক অনুভব করার পূর্বেই হাতে চা রেখে চলে গেল।

| অনেকদিনের শখ ছিল পাহাড়ের সৌন্দর্য ভূষিত কোনও প্রভৃতি কন্যার হাতের চা খাওয়ার। একরাত পরে ও বেলা বেশ গড়িয়েছে, এখনও হেঁটেই চলেছি— চড়াই আর চড়াই রাস্তা। হাঁফাতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। যেহেতু বেকারত্বের যন্ত্রণা মনের বেদনাতুর মলিনতাকে ছাপিয়ে গেছে সেহেতু ক্লান্ত হওয়ার কোনও জায়গা নেই। চলতে আমাকে হবেই। বাড়তি পকেট! তাই শূন্য কড়ি আমার সাহসিকতার উৎস। কিন্তু কাঁহাত! হাতে চায়ের গরম লাগতেই পেয়ালায় আলতু করে প্রথম সুড়ক দিতেই বিষম খাওয়া, খিদেপেটে চায়ের সুড়ক একটু বেশি হওয়ায় ছেলেটি বিষম খেল বটে। একটু খেয়ে নিয়ে বলল, আহ— কিন্তু পেটের খিদেটা আরও বেড়ে গেল বলে মনে হয়। দ্বিতীয়বার সু-উড়কু দিতেই আবার বিষম খাওয়ার উপক্রম— কারণ পুনরায় প্রশ্নবাণ।

তাে এখানে কেন ? কোথায় যাবে বলে ভাবছাে—

ভাবতেও যে মনে ভয় হচ্ছে— সামনে যা দুর্গম রাস্তা! উত্তরের অপেক্ষা না করেই ভদ্রলােক ডানহাতের দুআঙুলে চেপে রাখা সিগারেট-এ লাস্ট পা সেরে বাকি দুজনকে বসাে বলে পিছন

হয়ে ওপারে ড্রাভিং সিটে বসলেন। ছেলেটি অজান্তে লােকটিকে ওয়া করে চলেছে। আর ভাবছে এই অজানা পাহাড়ি এলাকায় সবাই অচেনা, কারও মুখে আমায় লক্ষ করে দুটি প্রশ্ন! তার মাঝে আবার এক কাপ চা। — কেমন যেন ক্ষণিকের একান্তিকতায় ভালােলাগার এক তীক্ষন রেখাপাত ঘটল। ভাবতে ভাবতে ভদ্রলােক গাড়িটি কড়া স্টার্ট দিলেন। সময় সময় অ্যাডভেনচারাল মুডে চালক এরকম করে থাকেন। ছেলেটি অন্য দৃষ্টে নিজের মনের গভীরতায় প্রবেশ করার আগেই শুনতে পেল ব্রুম্‌! ব্রুম- ভুম!

| এসেলেটরের আওয়াজ। ফিরে তাকাতেই বামহাত গিয়ার হ্যান্ডেল থেকে সরিয়ে বামদিকে ঝুঁকে ফ্রন্ট সিট-র গেটটি খুলে দিলেন।

| চোখের ইশারায় বললেন বসে পড়াে নিমেষের অপেক্ষা না করে লেট-ফ্রন্ট সিট-এ বসে পড়লাম।

প্রথম প্রশ্নের মুখােমুখি হতেই আভাস পায়— মিনিট কয়েক আগে গাড়িটি ওর গা ঘেঁষে যখন পাশ করে ভদ্রলােকটি মুহূর্তকাল তাক করেছিলেন। কিন্তু আমল দেয়নি। তাছাড়া এরকম তাে হাজারাে গাড়ি ওকে বাইপাশ করেছে, করছে অথবা করেই চলেছে এবং এটাই তাে গতানুগতিক। বেগতিক এক যুবা পথিক পাহাড়ের রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছে— সে তার নিজের প্রয়ােজনেই হবে নিশ্চয়ই। কে অত আর নিখুঁত খোঁজ রাখে।

কিন্তু বেগতিক ছেলেটি চলেছে কর্মহীন এক আশ্রমের দিকে কাজের সন্ধানে। যাওয়ার পথে নখের আঁচড়ে পাথর কেটে পাহাড়ের শৃঙ্গে ওঠার বৃথা চেষ্টায় আগুয়ান। কে জানে কোথায় গিয়ে থামবে। এ ও ভাবছে না আর কোথায় কতদূর যেতে হবে।

পাহাড়ে কাজের সংস্থান কম। —নেই বললেই চলে সব্বাই জানে। ছেলেটিও জানে কত প্রান্তিক এগােবে জনবসতি কমতে থাকবে। একসময় হয়তাে ভদ্রলােকটি ওকে শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে। দিয়ে নিজের অবকাশে মুক্ত হবেন। সামনের রাস্তা বরফে ঢাকা থাকবে। রাস্তায় বরফ চাপা পড়েছে ভেবে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করবে এত বরফ! তাহলে রাস্তা কখন খুলবে? এখানে রাস্তা খােলার নয়রে পাগল। খুশির বরফে ঢাকা পাহাড়ে ধাক্কা লেগে রাস্তা এখানে এমনি করে থমকে যায়! আর কোথা কোথা টাকার বান্ডিল খরচ করে এখানে স্ফুর্তি করে বিলাস পিপাসুর দল। তাহলে আমার কী হবে?

কী আর হবে। শত কণ্ঠে নিনাদিত কর্মসংস্থানের হাহাকার শহরভেদী মিছিল গগনভেদী গর্জনে স্লোগান তােলে বার বার, কৃষক-খেত-মজদুরের পদযাত্রায় মাথার ঘাম যখন রাজপথে রক্ত ঝরায়, কর্মচ্যুত শ্রমিকের কান্নায় প্লাবিত অশ্রুধারা যখন কারখানার বন্ধ কপাট খুলতে অক্ষম—জয় শ্রীনাম-এর পৌরাণিক ধ্বনি তখন মুখ ফিরায়ে মালা জপতে থাকে। আর ধর্মের দানা গুণতে গুণতে। প্রহর শাপে কখন চোষট্টি, যােলাে কলায় পূর্ণ হবে। আর আকাল মহামারির মােড়কে যখন কারুর অকাল মৃত্যু ঠকানাে মুশকিল হবে, সাদা কাপড়ে-দান করে বলবে, হায়রে বিধির লিখন! হে রাম!

তাহলে কী আমি ভয় পেলাম! না না—দুর্গম পাহাড় অতিক্রম। করার পণ করেছি। যদি জীবন খুঁজে পাই। মনে মনে বলল, আমি নিনাদ।

| তাহলে নিনাদ—The young chap! আপাতত আজকের মতাে যাত্রা এখানে থামাতে হবে। সাবধানে স্মথ ব্রেক করে গাড়ি থামাল সাইড করে। ভদ্রলােকের মুখে ওর নিজের নাম শুনে রীতিমতাে উৎসাহিত কিন্তু হতভম্ব। মনে মনে বলছে, তিন ঘণ্টা ধরে আমি ওনার গাড়ি চালিয়ে আসছি কিন্তু একবারও উনি আমার নাম জিজ্ঞেস করেননি, অবাক ব্যাপার, নিনাদ নামটি কীভাবে জানলেন! অবশ্য পথে একবার উনি ক্লান্তি অনুভব করায় হঠাৎ আমায় বলে ওঠেন ড্রাইভ জানাে? বললাম বছর দুয়েক স্টিয়ারিং ধরিনি।

তাতে কী হয়েছে?

গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভিং সিট ছেড়ে দিয়ে বললেন, চলে। এসােব্যস!

বিকাল ঢলতে শুরু করেছে তাই ইয়াম্ থাং পৌছেই গাড়ি। থামাতে বললেন। লক্ করে চলে এসাে Shop No. 39– গাড়ি পার্ক করে গাড়ির কাচ নামিয়ে সবকিছু চেক-আপ করে Shop No 39 খুঁজে চলে এলাম। দোকান বলতে রাস্তার পাশে চিলেকোঠায় কিছু আঞ্চলিক প্রােডাক্ট আইটেম ঝােলানাে; আর মাচা পেতে কিছু জিনিস ডিসপ্লে করা আছে কী। যেহেতু কনকনে ঠাণ্ডার দেশ সিকিম, উপরন্তু নর্থ-জোন তাই শীতের পরিধেয় বস্ত্রের এলােমেলাে টাঙানাে বেশ কিছু সরঞ্জাম – তাদের পাশ কাটিয়ে দুই-তিন ধাপ। মাটি-কাটা সিঁড়ি নেমে ভদ্রলােকের কথার আওয়াজ অনুসরণ করে ভিতরে ঢুকে পড়লাম। ঘুপচি মতাে এক কামরাচিতাে ঘর। তার এক কোণে রান্নার ব্যবস্থা, অন্য দুদিকের দেওয়াল চেপে বেঞ্চ পাতা— আর একদিকে বরফ-সফর করতে আসা যাত্রীদের জন্য গাম্বুট, হাতগ্ল্যাভস, জ্যাকেট, টুপি ইত্যাদি ভাড়া দেওয়ার জন্য রাখা তাক। ঘরটির ঠিক মাঝখানে রাখা পাত্রে পাহাড়ি কাঠজুলা আগুন যাতে

ওখানে যারাই যাবে প্রথমে হাত-পা সেঁকতে পারে; উপরন্তু ঘরটিও ওয়ার্ম থাকে। বেশ মজার পরিবেশ।

| হাতে কিছু হাল্কা খাবার এল—ওটা হাতে নিয়ে খেতে খেতে নিনাদ একটু বাইরে চলে এসেছে। অচেনা জায়গা, নতুন পরিবেশসুন্দর এক বাতাবরণ যেন ওকে বাইরে নিয়ে এল। রাস্তার কান্দায় গা ঘেঁষে চালা কার দোকানগুলাে, সারি সারি তবুও কেমন যেন ছন্নছাড়া বলে মনে হয়। একটু এগিয়ে এগিয়ে যায় পাইন গাছের বাগান তবে উঁচু উঁচু গাছের ছায়ায় নিচটা বেশ পরিষ্কার। সামনে একটু একটু করে নিচু সামান্যতর ঢালু—কিছুদূর যেতেই গাছপালা পাতলা হতে লাগল। ওর কানে বিশেষ আওয়াজ গুঞ্জতে লাগল জল গড়িয়ে যাওয়া, কেমন যেন ক ক তার মধ্যে আবার জল পড়ার শব্দ সাথে যে-ঝড়বৃষ্টি নিয়ে আসে নিনাদ শব্দগতিক আচরণে নিজের মনের সন্দেহকে দূর করতে তাে পারছেই না বরং জানার জন্য দৃশ্যমান আকর্ষণ ওকে আরও এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান করছে। গাছপালা পেরিয়েই সামনে বিরাট পাহাড়। ডানদিক ছেড়ে বামদিকে তাকিয়ে তার কোথায় শুরু বা কোনদিকে শেষ বােঝা ভারি। এতক্ষণ গাড়ি চালিয়ে এসেছে ঠিকই কিন্তু পাহাড়ের আঁকা-বাঁকা রাস্তার দুধার মাপতে মাপতে তার সামান্যতম রূপ সৌন্দর্য দেখার যুযােগ ছিল না। সামনে ফঁাকা, অল্প কিছু দুরত্বেই পাহাড়ের গােড়াকত আর দূর হবে! লাফ মেরে বেশ একটু নিচুতে নামতেই আর গাছপালা নেই। দ্রুত চলতে শুরু করল। কিছুদূর যাওয়ার পর গােল গােল পাথরের ঢেলা কী করে এক বিভিন্ন ধরনের মসৃণ সাইজের গােলাকৃতি পাথরের টুকরাে এখানে ওখানে সাজিয়ে রাখা, বুঝতে

চেয়ে বরং এ পা-ওপা করে ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে চলতে লাগল। এতক্ষণে পাহাড় চুঁইয়ে ঝরনার আকারে পড়া জলের আওয়াজ আরও কাছে টানতে শুরু করেছে। কেননা গােধূলিবেলায় সূর্যের আলাে নিচুতে যত মলিন হতে শুরু করেছে, পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনার রজত-শুভ্র ধারা তত উজ্জ্বল হয়ে ওকে মােহিত করছে। তাছাড়া পাহাড়ের গায়ে একাধারে এত ঝরনা-ধারা ওকে পাগল করে তুলেছে। স্বল্প দূর যাওয়ার পর ও থম্‌কে পড়ে।

খরস্রোতা বরষাতি ওকে দাঁড়াতে বাধ্য করে— সমতলে নদীর মৃদু জলপ্রবাহ মন মুগ্ধ করে, আর এ জলস্রোত কেমন যেন মন ছলাৎ করে কেঁপে ওঠে! না জানি কত গভীর—এত স্রোত জীবনে দেখিনি। যদিও বরযাতি নদীর ধারা বেশি চাওয়া-বিস্তর নয়। মনে হচ্ছে সামনেই পাহাড়। এক পা সাবধানে বাড়ায়—এতই ঠান্ডা যে জল থেকে পা আর নিজেকে তুলতে হয়নি বরং প্রতিবর্ত-ক্রিয়া এসে নিমেষে পা ওপরে তুলে দিয়েছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার উপক্রম। নিনাদ পিছন ফিরে তাকিয়ে বুঝতে পারে যে সে পাহাড়ের অবস্থান যতদূরে ভেবেছিল তার থেকে ঢের বেশি পথ অতিক্রম করে ফেলেছে। টান্ টা পায়ে ফিরে আসে।

| আলাপন চলছে, ভদ্রলােক নিনাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, নিনাদ তুমিও চলাে—আজ এদের অতিথি হয়েই থাকব। যাকে বলে হােম-স্টে। না বাবু আমি বরং গাড়িতেই থেকে যাই। গাড়ি যেহেতু চালালাম সেহেতু গাড়িতেই রাত কাটাতে ভালাে লাগবে। ওনারা ভদ্র মহিলার সঙ্গে চলে গেলেন। আমি কিছুক্ষণ ওখানেই বসে আছি— একটি লােকও ছিলেন ওঘরে। হয়তাে মালকিন-র নিকটস্থ সম্পর্কের কেউ হবে। পাহাড়ি অধিবাসী বিশেষ করে গায়ে

খেটে খাওয়া লােকেদের বয়স বােঝা দায়, তাই সম্পর্কের বিচারে অভিধান খুঁজতে চাইনি। তাছাড়া ক্ষণিকের অতিথি তারপর আসার উপস্থিতি ওখানে খানিকটা ফটেচালার বারান্দার মতাে। মাঝে মধ্যে | ছােটখাটো কথাবার্তা চলছিল আমাদের মাঝে। কথার ফাঁকে পেছনের দরজার পাল্লার সামান্য ফাঁক দিয়ে এপার-ওপার করার বারবারতায় বুঝতে পারলাম কারও ঘােরাফেরা চলছে। ওদের নিজেদের ভাষায় কি একটা বলার কিছুক্ষণ পর একটি মেয়ে ঘরের কোণে এসে টুন্টাক ঠুষ্ঠান-ওখানে আবছাওয়া থাকায় ওকে স্পষ্ট চেহারায় বােঝাও যাচ্ছিল না। আপাতবস্থায় একটু হলেও পরিপাটি করে বড়াে মাপের পেয়ালা বাড়িয়ে ধরে বললে, এই নিন শশা! অবাক না হয়ে বরং ওর মুখের হাসির মর্যাদা রাখতে ধন্যবাদ বলে চায়ের কাপটি হাতে ধরলাম। ও দুরন্ত পায়ে দরজা পার হয়ে | গেল। বড়াে মাপের কাপে দার্জিলিং ফ্লেবারের লাল চা অনেকক্ষণ ধরে সিপি দিচ্ছিলাম কিন্তু ওর আর দেখা পেলুম না। ঘণ্টা দুই পরে মালকিন ফিরে এলেন। ঘরে ঢুকেই বললে, এখানেই থাকতে হবে। কিন্তু বাংলা পুরাে পরিষ্কার না হলেও শুনে বুঝতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। না মাসি—! তবে ওদের স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহার আমার বেশ লাগছে। রাত সাড়ে সাত-আট হতেই বাইরে আউটলে করা পণ্যাদি গােটানাে শুরু—আমিও সাহায্যের হাত বাটতে ওরাও ভীষণ খুশি। ওখানকার অতিপ্রিয় শুষ্মি শাখ আর ভুট্টার রুটি—খাওয়াদাওয়া সব সেরে এবার বিশ্রামের পালা।

বুখারীর দুদিকে দুটো মােটা শতরঞ্চি পাতালেন। বেশ! একটিতে ঝটিকার মতাে এসে মেয়েটি চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল—কেমন যেন সন্দেহ হওয়ায় নিনাদ মনে মনে বলল, বরং গাড়িতেই যাওয়া ঠিক হবে। সে মতাে বাইরে যাওয়ার পথে মাসি। আর হলেন, হাত ধরে ওনার নিজের হাত বুকে রেখে বললে— আমার অমঙ্গল হবে। টুমি এনেই ঠবে।

বাকি জায়গাতে বিছানা করে একটি বালিশ রেখে বললে, তুমি এখনে শুবে কিমন!

সে কেমনে হয়— মনে মনে ভাবছি ফাসানাের ফন্দি আঁটছে না তাে! | মেয়েটা ওদিকে আর আমি এদিকে, মাঝখানটায় ধীরে ধীরে জ্বলতে থাকা বুখারী। পরে লােকজন ডাকাডাকি করে কোনও চক্করের সিন্ ক্রিয়েট করবে না তাে! ধীরে ধীরে ক্লান্ত শরীরে অক্লান্ত সন্দিহান দানা বাঁধছে—কী করি! এরই মধ্যে দেখতে পেলুম আর একটি বালিশ পাশে রাখলেন। মনে মনে ভাবলাম ঠিক আছে, আর একটি বালিশ যখন এসেছে ওটি ওই লােকটির বােধহয় হবে। তাহলে ভরসা রাখা যায়। আর একটু ছােট-মতাে কাজ বাকি—তুমি ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়াে। তােমার আবার গাড়ি চালানাে আছে আছে কাল সকাল থেকে। দোমনা করতে করতে অতি ক্লান্ত শরীর-পাহাড়ি গাঁয়ের কোনও এক অজানা ঘুমটি ঘরে মেঝেতেই সপাটে নিজেকে বিছিয়ে দিলাম। এক রাত একদিন পার, আবার রাতে শবাসন— কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেও পারিনি। কখন ঘরের বাতি বুজেছে তাও জানিনা। রাত্রি প্রহর। ঠান্ডার কনকনানিতে শীত ঘুমের আবশে নিনাদ অবচেতন। এমন শীতে পাশাপাশি শুয়ে থাকা প্রাণীর মধ্যে গ্যাপ যত কম থাকবে তত ভালাে ওম্ তৈরি হয়।

ফরমুলা হয়তাে ঠিক ছিল—

এক চাদরের বডি-পার্টস্ ফুড়ে যখন অন্য চাদরের আদর যাতায়, ঘুমের আদলে মন যা-ই হােক—শরীর তখন এমােড়ওমােড় করবেই। নিনাদের সিক্সথ-সেন্স বলল—না! এটা টো কেমন হয়, একটানে চাদর ফেলে দিয়ে সােজা গাড়ির মধ্যে গিয়ে ডাের-লক্ করে বসে পড়ল! তাহলে ওই লােকটি আসেনি!

বয়সে উনি আমার বড়াে কিন্তু আমি তাে সদা জাগ্রত!

ভয়-লজ্জা মিশ্রিত চিন্তা ভাবনার মাঝে ও আবার ঘুমিয়ে পড়ল। রাত বেশি আর বাকি ছিল না। ঘুম অবস্থাতেই কানের পর্দায় কেমন যেন গাড়ির আশপাশে কারুর উপস্থিতির আভাস-না না না, অন্য ধাতুর ঝিনিন যুক্ত পায়ের ক্ষীণ আওয়াজও পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বাইরে তখনও পরিষ্কার হয়নি। প্রভাতির আগমনি আভাস মাত্র। ভাবছে বাইরের থেকে তাে আর ওকে অনায়াসে দেখতে পারবে না। এই ভেবে নিশ্চিন্তায় পাশ ঘুরে শুতেই ঝাপসা কুয়াশায় গাড়ির উইন্ডাে-গ্লাসে ঘষা কাচের জানালায় আঙুল চিত্রাঙ্কনে কারুবাকী গ্রাফিক্স ভেসে উঠল, যেন একটি ভগ্ন হৃদয়, প্রস্ফুটিত হলাে। চোখ পড়তেই আকৃষ্ট হল—একবার বেমালুম মাথা উঁচু করে দেখতেই ও স্টাচু—!

একটি অতীব সুন্দরী মেয়ের অবয়ব গাড়ির কাচের বাইরে, বিভিন্ন রকম কায়দায়—সাইড-ভিউ। অপজিট সাইড-ভিউ, ব্যাক এমনকী ফ্রন্ট-ভিউজ! প্রতিটি মুভমেন্ট যেন এক একটি কলাকৃতির মুদ্রা—! Sixteen mm দূরত্বে, glass-র ওপারে Sweet Sixteen! এমন দৃশ্য! এমন এক অন্য প্রভাতবেলায়– ও কী তাহলে নিজেকে ইম্পােস্ করছে না কী আমায় সত্যিকারে রিপ্রেজেন্ট করছে! সে যাহাই হউক নিনাদ রীতিমতাে মােহিত— মােহিত শুধু নয়। অনুভূতির উৎসন্ধানে ও বিমগ্ন। হঠাৎ কী মনে হল নিজেকে আস্তে আস্তে করে গাড়ির সিটের উপর তুলে ধরে এবং ধীরে ধীরে Window glass টি খুলতে যায় হল উল্টোটা, ঝাপ্ করে কঁাচটি খুলে গেল আর আচমকা চমক দেওয়ার মতাে ঘটনা ঘটে যায়। অকস্মাৎ মেয়েটির মূদ্রিত মুখশ্রী এসে এক্কেবারে নিনাদের মুখের ওপর—জিভ বের করে ভিংচি কেটে মুহূর্তে স্ট্যাচু। ও বুঝতেই পারেনি যে বন্ধ গাড়ি ভিতরে কেউ থাকতে পারে।

প্রতি প্রভাতকাল নিত্যকলা কৃষ্টির অন্তঃস্তল। আসল কথা প্রতিকৃতির অবয়ব ভাবাবেগ প্রকাশ, আর নিজেকে গাড়ির কাচে দেখে নেওয়া ওর প্রতিদিনকার রােজনামচা। এভাবেই ও | ছােটবেলা থেকে বড়াে হয়ে ওঠা পর্যন্ত নিজ-আকারের ইমেজকে আপন দৃষ্টিকোণে ধরে রাখে প্রতি সকালে। তারপর সারাদিন নেচে খেলে পাহাড়িয়া আবেশে ডানামেলে ধরে আর তিস্তার ঠান্ডা জলে পা ভিজিয়ে হয়তাে নিজেকে শীতল রাখে।

কিন্তু আজ ভােরাই ওকে অন্য সকাল উপহার দিয়েছে। ওর মনে খটকা দিয়েছে। ওদিকে নিনাদ ভাবছে সেতাে আমি ভাগ্যবান, যে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে সামিয়ানা করে প্রেক্ষাপট ওর রূপের মূদ্রা আমায় দৃষ্টিদিব্য উদ্ভাবিত করেছে। আর মনে মনে বলছে, আজ বুঝিলাম – নারীর সৌন্দর্য প্রকৃতির সৌন্দর্যকেও কখনাে কখনাে হার মানায়। আজ আমার ভিতরে ভিন্নতার সন্ধান পেলাম। সে একপাহাড় অনুভূতি তাকে যেন পর্বত শৃঙ্গে পৌঁছে দেয়। —অজান্তে! শূন্য গগনে মেঘের নিনাদ বাজিছে যােগ প্রাণে,

আর নামলী

আজ ধরা পড়ে গিয়েছে তাই দৌড় আর দৌড়! ছুটে পালাতে গিয়ে পড়ল ধপাস্।

কী করা—গাড়ির দরজা খুলে দ্রুত গিয়ে হাত ধরে তুলতেই উল্টে নিনাদের বুকে ধাক্কা মেরে আবার দে ছুট।

ছুট ছুট আর ছুট। | ইয়াঙ্কং ভ্যালির অপরূপ স্থিরতাকে আজ প্রাণােচ্ছ্বাস সতেজ করে তুলেছে তার অবারিত দৌড়াদৌড়ি। মনে হচ্ছে অদৃশ্য ডাের-বন্ধনের জালে নিজেকে আরও আবিষ্ট করতে চাইছে— রাস্তার খাদ পেরিয়ে পাহাড়ের অববাহিকায় একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা এলােমেলাে গাছগুলাের ছায়াতলে নামলী একাই একশাে। যেন প্রকৃতির প্রতিকৃতি। ঠমকিয়া চলন ওকে আরও দূরে নিয়ে যাচ্ছে। একা নিনাদ আর কী করে!

আশপাশ তখনও ঘুমের নিঃশ্বাস ফেলছে। এই ফাঁকে নিনাদ ভয় পাচ্ছে নামলী যদি পাহাড়িয়া কোনও দৈবাৎ ফাদে নিৰ্মীলিত হয়ে যায়, তাহলে কী হবে! নামলী লাফিয়ে লাফিয়ে ক্রমে নিচে নেমে যাচ্ছে; নিনাদ এখানকার পরিবেশে অনভিজ্ঞ, তাই সন্তর্পনে ধীরগতিতে একে পিছু করে চলে। ইয়াং ভ্যালির দুদিকেই পাহাড় আকাশ ছোঁয়া-একদিকের গায়ে ওরা আর সামনে তিস্তা নদীর অববাহিকা তাই বালুকাময় চর হওয়ার কথা। এখানে ব্যতিক্রম | সে জায়গায় গােল গােল ছােট বড়াে পাথরের সমাহার। যার শেষ বিস্তার সামনের গগনচুম্বি সীমাহীন পাহাড় মাঝে বরষাতি তিস্তা। এই এলাকার প্রতিটি গােলাকার মসৃণ পাথর নামলীর চেনা। যখন থেকে নামলীর পা মাটিতে পড়েছে কোনও সকাল খুঁজে পাওয়া ভার যে ওর পা না ভিজিয়ে তিস্তার জল জিরােপয়েন্ট থেকে স্রোতধারায় প্রবাহিত হয়েছে।

আর আজ তাে এক আলাদা মােচড় লেগেছে ওর মনে— যেহেতু ওকে আজ কেউ নতুন ভাবে পিছে বিশেষ উৎসাহ প্রদান করছে। তাই মাঝে মাঝে একটু থেমে যায় আর ওড়না উড়িয়ে পিছনে তাকায়, নিনাদ আসছে কী না! উঁচু পাহাড়ের আবগাহ থেকে ছলকিয়া আসা রশ্মি রাশি ঝর্না পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে, তাকে শীতল করার অছিলায় দ্রুত প্রবাহিত হয়। মাঝে পাহাড় ধসে পড়া খণ্ড খণ্ড পাথরগুলি যখন বাধার সৃষ্টি করে— স্রোতস্বিনী | তিস্তার জল আনন্দে আরও আস্ফালিত হয় এবং পরস্পরের কথা বলার এক অনাবিষ্কৃত ভাষা যেন ছলাৎছলাৎ! পাহাড় পাড়ে নিনাদ কলতা নামলীর মনের আগ্রাসন। তাতে আরও উৎফুল্লিত যতক্ষণ না তার বিবস্ত্র পা ঐ স্রোতের শীতল জলের স্পর্শ পায়।।

কিন্তু আজও মানে নামলী, হঠাৎ করে জলের কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়িয়েছে! জলের দিকে তাকিয়ে বরং কানখাড়া করে পিছনে কদম্ কদম্ পদধ্বনীর অপেক্ষা করছে আর মনে মনে বলছে তিস্তা তােমার জলে আজ পবিত্র-স্নান করে গাত্রদাহ শীতল করে তুলব। মন বলছে চিৎকার করে ওপারের পাহাড়কেও বলি। আজ আমি একা নই।

নামলী নিনাদকে একরাত আগের থেকে চেনে বৈকি, নাম জানে না। মজার ব্যাপার নিনাদ কিন্তু নামলীকে এখনও চেনে না। অথচ একজন ওকে চেনে না বলে পিছু নিয়েছে অন্যজন তাকে চেনে বলেই তিস্তার পাড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। নামলী দাঁড়িয়ে, আর নিনাদ ওর অপেক্ষারত ভাবাবেগের মর্যাদায় সাড়া জাগাতে

গতি বাড়িয়েছে। কাছাকাছি আসতেই খপাত করে একে অপরের হাত ধরে তিস্তার বয়ে চলা ঠান্ডা জলে নেমে পড়ল। স্বল্প জলের প্রবাহ এড়িয়ে এপাথর থেকে ওপাথর লাফিয়ে অতিক্রম করতে করতে পা পিছলে যায়! আলতু করে ধরে রাখা হাত আর কতক্ষণ স্রোতের প্রতিকূল হাবুডুবু না খাওয়ার চেষ্টায় নামলী | গােল গােল পাথরগুলি আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে। কিন্তু কতক্ষণ

আর- নিমেষে অনেকটা ভেসে যাওয়া দেখে নিনাদ কয়েক লাফের | চেষ্টায় পাড়ে ওঠে আর ওকে লক্ষ করে পাড় ধরে অতি দ্রুত দৌড়ে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে জলে ঝাঁপ দেয়। স্রোত বেশি হলেও গভীরতা অতল নয়। নিনাদ নিজেকে ভারসাম্যে দাঁড় করাতেই মুহুর্তের অপেক্ষায় নামলী দুহাতের বেষ্টনীতে চলে আসে। নামলীর অভিজ্ঞতা থাকলেও স্রোতের মােকাবিলা করা বেশ শক্ত ছিল। পরস্পরের সহযােগিতা সত্ত্বেও এক-দুই পাণ্টি খেতে খেতে তিস্তার জল অচিরে গলধঃকরণ হল। উপায় ছিল না। পরিস্থিতি মােকাবিলা করার বিশেষ বাইরে যাওয়ার আগেই একটি বড়াে পাথর ওদের আড় করে ক্ষণিক থামাতেই নিজেদের বাহুবেষ্টনে পরস্পর ব্যালান্স পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। একে অপরকে ধরে ওরা পাড়ে ওঠে। নামলী ও নিনাদ দুজনেই বিধ্বস্ত। নামলী তখনও নিনাদকে ধরে দাঁড়িয়ে ও বুঝি তিস্তার জল বেশি খেয়ে ফেলেছে। বুঝতে পেরে নিনাদ নামলীকে তিস্তার পাড়ে শুয়ে দেয় আর আলতু করে পেটের ওপর দুহাত পাতা পাতা করে রেখে আস্তে ক্রমে জোর চাপ দিতেই | পেটের অতিরিক্ত জল মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায় আর নামলী চোখ খােলে। নিনাদের দিকে তাকায়—হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিয়ে বলে, “অনেক জল ছিল, তাই না?

হা! তােমার পেটে হাত রাখতেই দেখি ডাম্ ডা— আরে ধ্যাৎ, ঝটপট উঠেই নিজেকে সামলে নিল, আর চোখের ঝলকে এক পলক বাড়ি মেরে একগাল হেসে বলল- আমি তাে তিস্তার কথা বলছি!

এত সব ঘটে যাওয়ার অন্তরালে ভানুর উদয়ন ওদের খেয়ালেই আসেনি। একদিকে নামলীর মা খুঁজতে বেরিয়েছে— অন্যদিকে নিনাদের পকেটে গাড়ির চাবি। ইয়াঙ্কং-ভ্যালিতে নামলীর সঙ্গ পেয়ে দুজনেই জীবনের সুন্দরতম প্রভাতফেরি উদ্যাপন করল। একদিকে দোকান খুলতে দেরি অন্যদিকে ভদ্রলােকদের বাকি যাত্রা থমকে। নামলী ও নিনাদকে একসঙ্গে ফিরতে দেখে ভদ্রলােক হাসিমুখেই বললেন, বরং নিনাদ; আমাদের এই যাত্রায় নামলীকেও শামিল করলে কেমন হয়। নামলী তাে ভীষণ খুশি।

নিনাদ সমতলের শিক্ষিত যুবক। নিজের পায়ে দাঁড়ানাের আগে কোনও কম্প্রেমাইস্ নয়। ভেজা পকেট থেকে আস্তে আস্তে চাবিটা বের করে ভদ্রলােকের হতে রাখল এবং মাথা নিচু করে বলে, আপনারা বরং দীর্ঘ ছাব্বিশ মাইল দূরে আছেন জিরােপয়েন্ট থেকে। চোখ মুখ লাল করে এতক্ষণে নিনাদ অনেকটা গম্ভীর অথচ মুখে হাসি রেখে বলে আমাকে বােধহয় এখানেই থামতে হবে।

ইতিমধ্যে নামলী সামনে দাঁড়িয়ে ভদ্রলােকের পায়ে হাত রেখে নমনীয় প্রমাণ সেরে নিনাদের পাশে এসে দাঁড়ায় এবং নিনাদ নামলীর দিকে তাকিয়ে It’s my Zero-Point | আমাদের এখানেই শুরু বলে শূন্যের আগেই একটি দশমিক

লাগিয়ে দিল।

ভদ্রলােক সব শুনলেন এবং ওয়ালেট থেকে একটি ছােট্ট কার্ড বের করে নামলীর মায়ের হাতে দিয়ে ওদের শুভ হউক বলে গাড়ি ছাড়লেন।

ইয়াঙ্কং ভ্যালির প্রকৃতিশােভায় মনােলােভা। হওয়ার সুযােগ উপভােগ করতে নিনাদের সময় লেগেছে অনেকদিন। একে তাে শিক্ষিত যুবক অথচ কাজের সুযােগ করে উঠতে না পারার যন্ত্রণা; তার ওপর আবার নামলী। মাথার বােঝা আরও যে কত ভারী হল সে একমাত্র নিনাদই জানে। গাড়ি চালিয়ে বেশ পরিশ্রম মালিকের পয়সা, পেট্রোল-খরচা বাদ দিয়ে যা সঞ্চয় হয় তা অতি নগণ্য। তার ফাকেও নামলীকে সঙ্গে করে উপত্যকার বৈচিত্র্য রােমন্থনে এক অন্য মাত্রা খুঁজে পায়। কিন্তু উপার্জনের অনুসন্ধানে অনেক খুঁটিনাটি সৌন্দর্য ওর চোখে পড়ে না। চোখে পড়লেও মনে ধরে না। একবার নামলীকে নিয়ে কোলকাতায় আসছে – আসার পথে নামলী বলে, আচ্ছা নিনাদ আমাদের পাহাড়ের পরিবেশ তােমার কেমন লাগে? ভালাে। আর তিস্তা ? -নামলীর দিকে তাকিয়ে সেতাে অপরূপ সুন্দর।

নামলী নিনাদের কাছাকাছি হয় বলে তুমি আমার কথা বলছাে তাে? না না, দ্যাখাে রাস্তার পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা তিস্তার জল ঘন নীল একেবারে ক্রিস্ট একই গতিধারায় বয়ে চলেছে ছল-ছল কলতানে। পাহাড়ের গা বেয়ে আঁকা-বাঁকা রাস্তা ধরে এত রাস্তা পেরিয়ে এলাম কিন্তু তিস্তা কখনও ডাইনে কখনাে বামে ঠিক আসার পাশে আছে। আর আমি!

একবার মানে প্রথমবার যখন নিনাদ নিজের খরচায় নামলীকে নিয়ে সমতলে নামছে। নামলী ভীষণ খুশি, কিন্তু চুপচাপ বসে। মাঝে মধ্যে দুজনের মধ্যে রােমাঞ্চক কথাবার্তা চলছে। উপত্যকার সৌন্দর্যরাগী দুজনকে আকৃষ্ট করছে। যে যার ভিন্নতার স্বাদে উপভােগ করছে। নামলী প্রথমবার পাহাড় অবতরণ করছে তার প্রিয়জনের সাথে। ইয়াং থেকে সে নিচে বলতে একমাত্র মাজিতার-মানে যেখানে ম্যানেজমেন্ট পড়েছে তার নিচে নামেনি। এবার কোলকাতার অভিমুখে-অবশ্যই এক নতুন অজানা ঠিকানায়। মেয়েরা যার খোঁজে চলতে লেখা থেকে যৌবনের কঠিন তারুণ্যের ও বাবা মায়ের কুটিরে ঘরে জানালা ধরে পর্দার আড়ালে অপেক্ষা করে থাকে। ভােররাতে যেমন পাখি অপেক্ষায় কিচিরমিচির করে সকাল হবে।

শাঁজখােলা-চিসােপানি, মেলা হয়ে গেলিতার বেশ কয়েক কিলােমিটার ধরে রাস্তার ডাম-বাম করে ঠিক পাশাপাশি অতিবাহিত। এতটা দূরত্বে এত সময় তিস্তাকে খুব কাছাকাছি পাওয়া যায়। কমবেশি প্রায় পনেরাে হাজার উচ্চতায় জিরাে পয়েন্ট যার উৎস সেই তিস্তা তার অর্ধেক উচ্চতাসম্পন্ন জায়গা মেলাতে এসে অনেকটাই ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে বৈকি। তবে তিস্তার এই স্থিরতা বা তুলনামূলক মন্থর গতিধারা দুকূল ভরা থৈ থৈ জলধারা যেন অনেক পরিণত। নামলীর গতিবিধি নিনাদের সংস্পর্শে যত সমতলের দিকে এগােচ্ছে ততটা শিথিল এবং স্বাভাবিক হওয়ারই মতাে। এবার নামলী নিনাদের উদাসীনতা ভাঙতে বলে ওঠে—কী দেখছাে অত উদাস মনে? দেখছি এত উঁচুগাছ-পালাযুক্ত পাহাড় আরও উঁচু উঁচু পর্বতমালার বুক চিরে একা তিস্তা বয়ে চলেছে সজোরে।

এবার নিনাদ কোথায় চললে ?

এত উঁচু উঁচু পাহাড়-পর্বত মাথা উন্নীত করে মেঘের সঙ্গে | খেলা করে। তার প্রেমের আবেশে আবেগ ঘন সাদা চাদরে মুড়ে রাখে, আদর জানায়, বিগলিত হয়ে ঝরনা ঝরায় তিস্তার অববাহিকায়। বলে তিস্তা তুমি আমার মেঘার উৎস সন্ধান করাে এমন উৎসের অনুসন্ধানে তিস্তার এই ছলাৎছলাৎ চলা। ততক্ষণ চলতে থাকল যতক্ষণ না সমুদ্রমােহনার বালুচরের স্পর্শ পাই। আর আমিও আশায় আছি এক নতুন দীপের সন্ধানে।

তিস্তার অববাহিকায় প্রান্তরে বিভিন্ন ধরনের ফুল ফোটে তুমি দেখেছ। হ্যা, দেখেছি। সাথে খুব সুন্দর Number of variety’s Plants-ও আছে। কোলকাতায় সান্দার আলিশন বাড়ির চমকে দেওয়া ব্যালকনিতে যদি এই ফুল অথবা নানান ধরনের Plants সাজিয়ে রাখা যায় তাহলে কী সুন্দর লাগবে বলাে। আমি চাই ভবিষ্যতে এমনই একটা ঘর হবে কোলকাতায় আর ব্যালকনিতে থাকবে আমার ইয়াথাং সৌন্দর্য। নিনাদ বলল

পাহাড় থাকবে মনে। | আর ফুল শুধু নয় পাহাড়িয়া বনে।।। Plantation in cell culture is deviationবিশ্ববিদ্যালয়ে বায়ােটেকনােলজি নিয়ে Master’s পড়ার সুবাদে বায়াে-ডায়ভার্সিটি চিন্তা ভাবনায় এক্সাক্সন করার মৌলিক চিন্তা ভাবনা নিয়ে বেকারত্বের এক মস্ত বােঝা শূন্য পকেটে করে একা নিনাদ হেঁটে পাড়ি দিয়েছিল নর্থ-সিকিমের অচেনা রাস্তায়! কোলকাতায় নামলীর কল্পনার বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আবহাওয়ার তারতম্যতায় নতুন প্রযুক্তিকে প্রয়ােগ করে শুরু হল প্রকৃতির বিস্তার। এগিয়ে চলল নিনাদ ও নামলীর জীবন-বৃত্তান্ত অগ্রগতির পথে।।

| প্রযুক্তি প্রয়ােগের এক চিলতে বারান্দায় শুরু করেছিল নিনাদ। আর আজ সান্দার তার বাড়ির ব্যালকনিতে পাশে Manager-cum-Cordinator alacilat faci wifyca Gallo বাড়িতে। গ্লোবাল-ওয়ার্মিং-এর বিপদ এড়াতে প্রকৃতিপ্রেমিক চিন্তাভাবনায় বানানাে Project এবং সেই Project-র BluePrint যখন কোলকাতায় পরিবেশ সংরক্ষণ হেড-অফিসে অনুমােদন পাওয়ার অপেক্ষায় Dr (Professor) তপাঞ্চন ভূঁইমালীর টেবিলে— নামলী’ Biodiversity and Tourism Centre-র নামে সামনে এল এবং অফিসের দরজা খুলে নিনাদ ও নামলীর প্রবেশ ঘটল-এক দস্তাখতে অনুমােদন করে দুজনকে জড়িয়ে ধরে ভদ্রলােক বললেন জানতাম তােমরা পারবে।

ইয়াঙ্কং থেকে ছাব্বিশ কিলােমিটার দূরে আরও উচ্চতায় oraigo 93 Zone i syarator Restricted and Military Zone | আর সেখানে গড়ে ওঠা ‘Naamli Biodiversity and Tourism Centre৷ তার উদ্ভোধন হওয়ার পর একেবারে ট-অব-দ ফ্লোরের গ্লাস-হাউসে নামলীকে বুকে চেপে ধরে। কিছুক্ষণ পর foralth 161, —See the beauty of the snowfall; and the ice is growing

অন্যধারে নামলী বলে ওঠে— The ice is melting, lick| ing! So the River Tista is flowing ! যার উৎস এই জিরােপয়েন্ট। নিনাদ বলল— নামলী’ A Point before the Zero .

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *