ধুলবালি যত- সৌম্য ঘােষ

গল্প সাহিত্য
Spread the love

‘একদম ওপরের গর্তটাকে ভালাে করে লক্ষ করুন ম্যাডাম। দেখুন, এটাকে বলে সাকশন এন্ড। জাস্ট হােসপাইপটাকে এখানে কানেক্ট করে দিন। ক্লকওয়াইজ একবার ঘােরালেই ফিট করে যাবে। ব্যস এবার শুধু সুইচ অন করার অপেক্ষা। ঘরে মউ-মউ করছে সাবাস এর মােহময় পুরুষগন্ধি পারফিউমের সুগন্ধ। হালকা আকাশি শার্ট আর ঘন কালাে ট্রাউজার্সের সুতাের প্রতিটি বুনােটে যেন পিছলে পড়ছে সপ্রতিভ। ঝলমলিয়ে উঠছে জানালা ছিটকে পড়া রােদ ওর নিখুঁত শেভ করা গালের হাল্কা সবুজ মসৃণতায়। যেমন ভরাট গলা, তেমনি চোস্ত উচ্চারণ। একেবারে পারফেক্ট সেলস পার্সন। নিজের দুদিনের বাসি দাড়িতে একবার হাত বুলিয়ে হিরন একবার চোখের কোণ দিয়ে রুমাকে দেখে নেয় এক ঝলক। একটা বিহুল ঔৎসুক্য মাখামাখি হয়ে আছে রুমার চোখে মুখে। যন্ত্র আর যন্ত্রী – দুই-ই তাকে পেড়ে ফেলেছে। পুরােপুরি – ‘সব ধুলাে

ময়লা বের করে নেবে? স-ও-ও-র? সম্মােহিতের মতাে শুড়ওয়ালা যন্ত্রটার দিকে তাকিয়ে আছে রুমা। খাঁজকাটা পাইপটা খটাস করে সকেটে আটকে প্রবল আত্মবিশ্বাসী হাসে আকাশ নীল শার্ট – ‘ম্যাডাম একেবারে লেটেস্ট এই টেকননালজির নাম ডিপ পাের ক্লিনিং। এই ডেভেলপমেন্টটা আপনি মার্কেটের অন্য কোনও কোম্পানির প্রডাক্টে পাবেন না। এর মধ্যে একটা ডাইনামিক সেন্ট্রিফিউগাল মােশন জেনারেট হচ্ছে। ইট ক্যান রিমুভ দ্য টাফেস্ট ডার্ট ফ্রম দা রিমােটেস্ট কর্নারস। মানেটা কি দাঁড়াচ্ছে বুঝলেন? যে ধুলাে ময়লা আপনি চোখে দেখতে পাচ্ছেন না, এমনকি জানেনই না, তাকেও আমাদের যন্ত্র লুকানাে আস্তানা থেকে টেনে বের করে আনবে। কোনও পথ নেই পালাবার লুকিয়ে থাকবার। এবার, প্রথমবার হিরন মুখ খুলল এবং নিজেই টের পেল তার গলারস্বর, কথাগুলাে ঘরের পরিস্থিতির পরিবেশের পক্ষে ভীষণরকম নীরস, তেতাে শােনাচ্ছে – শুনুন ভাই, আপনার কথাগুলাে শুনতে সবই ভালাে।

কিন্তু ঘর পরিষ্কার রাখতে আমাদের মা ঠাকুমাদের কোনওদিন ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের কিন্তু দরকার হয়নি। শুধুমাত্র আঁটার ব্যবহারেই ঘরদোর ঝকঝকে তকতকে রাখতে পারতেন, জানতেন তারা। | নামী বহু জাতিদের যুবা প্রতিনিধি হিরনের আক্রমণে সামান্যও বিচলিত হয় না। শুধু হাসে – ‘স্যার, আপনি একদম ঠিক বলছেন। মা – ঠাকুমাদের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না। শুধু দুটো পয়েন্ট এ ব্যাপারে আমাদের মাথায় রাখতে হবে। একটু ভেবে দেখবেন স্যার, সেযুগের থেকে কিন্তু এখন পলিউশন লেভেলটা অনেক হাই হয়ে গেছে। তাই না? হার্মফুল জাস্ট কয়েকশাে গুণ বেড়ে গেছে। ফলে অ্যাডভান্স টেকনােলজির হেল্প আপনাকে নিতেই হবে। আর নম্বর টু … এবার ম্যাডাম বলুন … মারকাটারি স্মার্ট একটা হাসি রক্ষার দিকে গড়িয়ে দিয়ে যুবকটি বলে – আপনি যখন বিছানা আঁটা দিয়ে ঝাড়েন কি পরিমাণ

ধুলাে হাওয়ায় ওড়ে একবার ভেবে দেখুন। আর সেটা তাে সিম্পলি আনহাইজেনিক। কারণ ওই ধুলােতে মিশে থাকে হার্মফুল পলিউটেড ডাক্ট। আর সবচেয়ে বড় কথা ঝাঁটা দিয়ে আপনি যেটুকু সাফ করতে পারেন সেটা একেবারেই সারফেস ডাস্ট। ডিপ এরিয়া থেকে ধুলাে বের করে আনতে পারছেন না। ফলে সাফসুতরাে করেও আপনি রেজাল্ট পাচ্ছেন জিরাে। আর দিনের পর দিন সেগুলাে থেকে যাচ্ছে, বেড়েই চলেছে। আপনি রােজ পরিষ্কার করছেন কিন্তু হার্মফুল পার্টিকলস এর ম্যাক্সিমামটা থেকে যাচ্ছে কিন্তু ঝাটার আওতার বাইরে। দ্যাট ইজ ডেনজারাস ম্যাডাম। একটু থেমে, রুমার উদগ্রীব, কৌতূহল টানটান চোখে চোখ রেখে যুবকটি বলে – ‘আপনি জানেন বিছানার ধুলােয় কি থাকে?’ অধীর আগ্রহ মেশা উত্তেজনায় রুমা যুবকের দিকে ঝুঁকে যায় -“কী?’ – ‘ডাস্ট মাইট। ছােট্ট ছােট্ট মাইক্রোস্কোপিক পােকা। খালি চোখে যাদের দেখা যায় না। বালিশ, বিছানা, কার্পেটের মধ্যে লাখে লাখে এরা লুকিয়ে থাকে। যখন আপনি শ্বাস নেন আপনার ফুসফুসে চলে যায়। ফলে, হয় ফুসফুসের জটিল অসুখ।

কোথায় বিরতি দিয়ে হবু ক্লায়েন্টের আগ্রহ, উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে নিয়ে যেতে হবে যুবকটি পেশাদারি শিক্ষায় নিখুঁত জানে, আয়ত্ব করেছে। হিরন প্রখর চোখে সেলস পার্সনটির প্রতিটি বডি ল্যাঙ্গুয়েজ মাপতে মাপতে মনে মনে ভাবে। যুবক এবার রুমার চোখে চোখ রাখে। মুখের হাসি মুছে ফেলেছে। মুখচোখ এমন সিরিয়াস – ‘টেল মি ওয়ান থিং, আপনার কোনওদিন কখনও ব্রিদিং ট্রাবেল হয়েছে, হয়?’ – ‘হা, হা, সর্দিকাশি হলেই তাে আমার ‘ প্রায় আর্তচিৎকারের মতাে শােনায় রুমার গলাটা। তাহলে তাে বলব আমাদের প্রডাক্টটা মাস্ট ফর ইউ। প্রায় জজ সাহেবের রায় দেবার ভঙ্গিতে কঁধ ঝাঝিয়ে ‘শ্রাগ’ করে কথাগুলাে বলে আকাশি শার্ট। রুমাকে ছেড়ে এবার সে হিরনের দিকে ফেরে – ‘একমাত্র এই ডিপ পাের ক্লিনিং সিস্টেমই ওনার প্রবলেমটা কথাতে পারবে স্যার। সমস্ত না দেখা ধুলাে ময়লাকেও টেনে শুষে নেবে। দেখবেন টোটালি ডাস্ট ফ্রি আপনার বিছানাপত্র, ফার্নিচার, এভরি থিং ।

প্রত্যেকটার জন্যে আলাদা আলাদা ব্যবস্থা। আসবাবের দুরূহ খাঁজখোঁজ থেকে, সিলিংয়ের দুর্গম প্রান্ত থেকে, গ্রিলের প্রত্যন্ত প্রান্ত – সর্বত্রগামী, গােপনগভীর ঝুলকালি ময়লা নিপুণ কৌশল, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি – হােম সেশ ডিপ কোর ক্লিনিং সিস্টেম। রুদ্ধশ্বাসে দেখতে থাকে রুমা। ওর একঘেঁয়ে রুটিন বাঁধা ছকের মধ্যবিত্ত জীবনে এ যেন এক অন্য স্বাদের ছোঁয়া। অন্য সুখের পালক যেন সারা শরীরে বুলিয়ে দিচ্ছে রােমাঞ্চের এমন এক স্পর্শ। যা খুব কমই আসে ওদের মধ্যবিত্ত, আটপৌরে জীবন যাপনে। যন্ত্রের সাথে সাথে বারবারই ওর চোখ চলে যাচ্ছে নামী বহুজাতিক সংস্থার তুখোের বলিয়ে সেলস পার্সনটির দিকে। বারবার সরাসরি এবং আড়চোখে যুবকটির দিকে না তাকিয়ে পারছিল না রুমা। কি হ্যান্ডশাম। ফাটাফাটি স্মার্ট। রুমা যন্ত্রীকে ছেড়ে আবার মগ্ন হয় যন্ত্রে। সুইচেরই কত রকমের পাওয়ার ভেরিয়েশন।

অটোকর্ড ওয়াইন্ডার। ভিশু্যয়াল ইন্ডিকেটর। হোঁচট খেতে খেতে হলেও প্রবল আগ্রহে রুমা শিখে নিচ্ছে সব কিছু। “এই যে পেপারব্যাগ, এরই মধ্যে সমস্ত মশলা এসে জমা হবে। প্রত্যেকবার মেশিন চালানাের পর ইচ্ছে হলে আপনি ডাস্ট ব্যাগ চেক করে দেখতে পারেন … ওয়েল, লেট মি ডেমনস্ট্রেট। ম্যাডাম একটা সফট টয় হবে। রুমা প্রায় দৌড়ে শােকেস থেকে দুটো পুতুল নিয়ে আসে। বছর চারেক আগে কেনা। মাত্র কয়েক বছরের বিবাহিত জীবনে, ওদের দুজনের মনটা – মানসিকতা তখন অন্যরকম ছিল। অনেক বেশি রােমান্টিক ছিল। একটা মেলা থেকে কেনা পুতুল দুটো। একটা পুতুলের তুলাে ঠাসা বেঢপ পেটে যান্ত্রিক শুড়টা চেপে ধরে মেশিনটার পাওয়ার অন করতেই একটা অদ্ভুত তীক্ষ্ম, কর্কশ শোঁ শোঁ আওয়াজ শুরু হল। যুবকটি যন্ত্রশােষক শুড়টির মাথাটিকে পুতুলটার সারা শরীরে চেপে ধরতে লাগল। মিনিট খানেকের একটু বেশি সময়, তারপরই ডাস্ট ব্যাগে কালচে বেশ খানিকটা গুঁড়াে। আকাশি শার্ট যন্ত্র বন্ধ করে রুমা হিরনের দিকে বিজয়ীর ভঙ্গিতে তাকিয়ে হাসে। ডাস্ট ব্যাগটার ভিতরের গুড়াে গুঁড়াে কালচে মশলা ধুলােগুলাের দিকে তাকিয়ে রুমার গলা থেকে চাপা বিস্ময় ছিটকে বের হয় – বা-ব্বা, এই অ্যা – ত – ত- ও? বাইরে থেকে তাে বােঝাই যায় না। ওর দুটো চোখ মুগ্ধতায় চিকচিক করে। আকাশনীল শার্ট একটা গাইড বুকলেট ধরিয়ে দেয় রুমার হাতে। খুব সহজ ভাষায় যন্ত্র কিভাবে ব্যবহার করতে হবে সেসব এবং যন্ত্র সম্পর্কিত যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য, পুরাে ব্যাপারটা, সবকিছু বােঝানাে আছে। – ‘পেপার ব্যাগটা ধুলাে ময়লাতে পুরাে ভর্তি হয়ে গেলে ওটাকে খালি করে ফেলতে হবে। মেইনটেন্যান্স বলতে জাস্ট এইটুকু। – ‘ঢাকনা তাে পুরাে বন্ধ থাকবে। ভর্তি হয়ে গেলে বুঝব কিভাবে? এবার কৌতূহলটা হিরন নিজেই প্রকাশ করে ফেলে। – ‘ভেরি সিম্পল। ক্যাপাসিটি ফুল হয়ে যাবার সিগনাল আছে। এই যে মেশিনের ডানদিকের ওপরে লালা ইন্ডিকেটর এটা অটোমেটিক্যালি জ্বলে ওঠে, বিপবিপ’ সাউন্ড দেবে সঙ্গে অ্যালার্ম হিসেবে। তবে এখন আপনি নিশ্চিন্তে তিন মাস ব্যবহার করতে পারেন। সাধারণ গৃহস্থ বাড়িতে পেপার ব্যাগ তিন চার মাসের আগে ভর্তি হয় না সাধারণত। চটি গাইড বুকটার ওপর প্রবল আগ্রহে প্রায় হ্যাংলার মতাে হামলে পড়া রুমাকে আড়চোখে একবার দেখে হিরন। ঘরে স্বামীর অস্তিত্বটাই যেন ভুলে গেছে। এক চুম্বক টানে মােহগ্রস্ত। সেই টানটা কিসের প্রতি, কেন, হিরনের কেমন জানি একটা উদ্ভট সন্দেহ হয়। আকাশনীল শার্ট ততক্ষণে সােফায় বসে পড়েছে। কাগজপত্র, ক্যাশ মেমাে বের করতে করতে আত্মবিশ্বাসী গলায় প্রশ্ন করে – ‘চেক দেবেন তাে স্যার?

দুই

সন্ধে নাগাদ নতুন গ্যাজেটের অপারেশন শুরু করল রুমা। কয়েক মিনিটেই রীতিমতাে মুগ্ধ সে। কপালে, গালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, কিন্তু শরীরী ভাষায় খুশির লহরা। লম্বা হােসের মাথায় আর একটা শক্ত পাইপ ফিট করেছে। তারও মাথায় লাগিয়েছে একটা বাঁকানাে বুরুশ। মেঝেতে দাঁড়িয়েই দিব্যি পাইপটাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে যেখানে সেখানে। আলমারির মাথা, শােকেসের সবচেয়ে ওপরের তাকের পিছন, ডিভানের নিচের চিলতে মেঝেয়, কোনওকিছুই আর অগম্য থাকছে না। বহুকালের কায়েমি ধুলােময়লা ঝুল গভীর থেকে উঠে আসছে শোঁ শোঁ শব্দে। ডিপ কোর ক্লিনিং। জিনিসটা কিন্তু সত্যিই কাজের। ছেলেটা বাজে কথা বলেনি। ঝটাঝাড় দিয়ে কস্মিনকালেও এত ভিতর, এসব জায়গা থেকে ধুলাে ঝুল ময়লা বের করা যেত বলাে? ভেন্টিলেটারের মুখ থেকে মাকড়সার জাল টেনে নিতে নিতে রুমা বলে। হিরন সােফায় শুয়ে একটা পত্রিকা নাড়াচাড়া করতে করতে রুমার কাণ্ডকারখানা দেখছিল। কোনও উত্তর দিল না। শোঁ শোঁ গর্জনটা ভারি অস্বস্তিকর লাগছে ওর, কেন কে জানে। যতবার কানে যাচ্ছে অদ্ভুত একটা বিরক্তি গুলিয়ে উঠছে মনের ভিতর। কি যেন একটা অস্থিরতা। কষ্ট করে জমানাে অনেকগুলাে টাকা বেমক্কা খসে গেল, সেই জন্যেই কি? রুমা যেন যন্ত্রটা নিয়ে বড় বেশি আদেখলপনা করছে। সেটা দেখতে দেখতে কী বারবার অবচেতনে ভেসে উঠে আকাশনীল শার্ট, ঘন কালাে প্যান্ট ? অস্বস্তি, বিরক্তিও? কতদিন রুমার এই উৎসাহ থাকে হিরন দেখবে। সে শুনেছে এই ভ্যাকুয়াম ক্লিনার যন্ত্রটা একটা – ওয়ান উইক ওয়ান্ডার গ্যাজেট মােটের ওপর। যারাই কিনেছে সে সব বাড়িতে বেশিরভাগেই অব্যবহারে পড়ে পড়ে থেকে মােটর বসে গেছে। প্রাথমিক উৎসাহ কেটে ঘর সাফসুতরাে করার যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহারের উৎসাহ কেটে যেতে খুব অল্প সময়ই লেগেছে। শেষ পর্যন্ত বাতিল লােহালক্কড়ের দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এটার পরিণামও নিশ্চিতভাবেই তাই হবে জানে হিরন। এতগুলাে টাকা হঠাৎ করে খরচ করে ফেলা ওই মহার্ঘ গ্যাজেটটার (রুমার বিশ্বাসে) শেষে কিলাে দরে বিক্রি হবার চিন্তাটা মাথায় আসতেই মনের ভিতরটা চিড়চিড়িয়ে উঠছিল। তখনি রুমা ওর কাধটা খামচে ধরল। তেতাে মুখ ঘােরাল হিরন – এই শােনাে একটু হাত লাগাও না..’ কপালের ঘাম মােছে রুমা – এই ভারী মেশিনটা কঁহাতক একা একা টানব? পিঠ টন টন করছে। হিরন খিচিয়ে উঠল (কেন সে এরকম তেতােভাবে রিঅ্যাক্ট করল সেটা সে নিজেই বুঝে উঠতে পারল না) – “সেটা জিনিসটা কেনার আগে ভাবা উচিত ছিল নাকি? কিছু দেখলেই নেচে ওঠা, আগে পিছনে ভেবে দেখার দরকার নেই। আচমকা আঘাতে শক্ত হয়ে ওঠে রুমাও, ধারালাে গলায় বলে ওঠে – ‘জিনিসটা আমার সাজের জন্য কিনিনি। সংসারের কাজে লাগবে, সেই প্রয়ােজনের কথা ভেবেই কেনা। সেটা মনে রেখাে। | হিরন উঠে বসে, সচরাচর সে বিলােদা বেল্ট যায় না। কিন্তু আজ এখন হঠাই (এবারও, কেন যে, সে নিজেই বুঝে উঠতে পারে না), হিংস্র হয়ে ওঠে তার চোখ মুখ – ‘সংসার? … হা হা … প্লিজ, সংসারের কথা আর বলাে না। তােমার মুখে শব্দটা মানায় না। আস্ত একটা সংসারকে আচ্ছা ছাড়া আর কি পারফরম্যান্স দেখিয়েছে এ পর্যন্ত ? বিয়ের তিন বছর পার হতে

হতেই বাড়ি থেকে বের করে এনে …’ আমি? আমি ভেঙেছি তােমাদের সংসার? আমি ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছি তােমাকে? রুমা তীব্রতায় ফেটে পড়ে। খর চোখে তাকায় – ‘তােমার বাবা-মা দিনের পর দিন কি বিভেদ করেছে আমার সঙ্গে … একটা সাইলেন্স … কাপুরুষ, সব দেখে বুঝেও খালি বলতে অ্যাডজাস্ট করাে, অ্যাডজাস্ট করাে। বাবা মাকে কন্ট্রোল করােনি কেন? আজ বলছ আমি ভেঙেছি…।’ স্পাইনলেস .. স্পাইনলেস? এতদূর স্পর্ধা ? আমি শালা হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে মুখে জোটাচ্ছি, সব শখ-আহ্লাদ মিটিয়ে চলেছি … স্বার্থপর, অকৃতজ্ঞ মেয়েছেলে …’ কথাগুলাে রুমার মাথাতেও দপ করে একটা ফুলকি জ্বালিয়ে তুলল, ওলট পালট ঘটিয়ে দিল। বিদ্রুপ মিশিয়ে বিষাক্ত ছােবল মারে যেন – ‘হাড়ভাঙা খাটুনি? থাক ওসব গপ্পো আর শােনাতে এসােনা হে ধর্ম পুত্ত্বর। তােমাদের ডিপার্টমেন্টের কীর্তিকলাপ কে না জানে? খেটে রােজগার সেখানে কজন করে বলােতাে? সপ্তায় সপ্তায় আলমারিতে নােটের বান্ডিল কিভাবে ঢােকে আমি বুঝি না? মুখ খুলিও না এবং দিন প্রকাশ করিনি, কিছু বলিনি তাই। আর আমি যদি মুখ খুলি তুমি সেই মুখটা দেখাতে পারবে? তােমার ক্যারেক্টার সেই কবেই জানা হয়ে গেছে। আধবুড়াে প্রফেসর তার সঙ্গে … ভুলে গেছি নাকি সব? খুব নাকে কেঁদে ধােয়া তুলসি পাতা সেজেছিলে তখন। ভেবে না ভেবেই ইমপ্রেসড হয়ে বসে আছি। আমি খুব ভালাে জানি, জানতাম তােমারও প্রশ্রয় ছিল ব্যাপারটাতে।

হােসপাইপটাকে সশব্দে মেঝের ওপর আছড়ে ফেলে রুমা। এখনও চলন্ত যন্ত্রটা শোঁ-শোঁ শব্দটা করেই চলে। পা দিয়ে ঠেলে সেটাকে সরিয়ে রণংদেহি ভঙ্গিতে চিল্কার করে ওঠে রুমা – আর তােমার নিজের কেচ্ছাগুলাে? সেগুলােও একটু শােনাবে না? মন্দারমণি … সেখানকার স্ক্যান্ডালটা … কেসটা ঠিক কি ছিল গুরুদেব? বলবে না?’ – ‘বিচ…’ সােফায় একটা ঘুষি মেরে চেঁচিয়ে ওঠে হিরন – তােমার মতাে একটা থার্ড গ্রেড মেয়েছেলেকে বিয়ে করাটাই আমার বিরাট ব্লান্ডার। সবাই তখনি বলেছিল, ওই ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে মেয়ে… সে আর কত ভালাে হবে?’ – ‘এই … এই… কি… কি ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা বলছ তুমি হা ?” রুমাও রুখে দাঁড়ায়। মুখে সিনেমার ভিলেন মার্কা একটা ক্রুর হাসি এনে হিরন বলে – তােমার তিনটি রত্ন ভাই। একটিও ভদ্র সমাজের উফযুক্ত বলা যায়? পাক্কা লােফার চিটিংবাজ, দুনম্বরি মাল একেকটা। বাধ্য হয়ে হেসে হেসে কথা বলি বলে ভেবােনা তেনাদের হিস্ট্রি কিছুই জানি না আমি। ফিরতি মার দিতে রুমাও হিসহিস করে ওঠে – আর তােমার বিদ্যেধরী বােন? পালিয়ে গিয়ে কতগুলাে রাত কাটিয়ে এলাে ইলেকট্রিক মিস্ত্রির সঙ্গে। এখন বড়লােক বর পাকড়ে সতী লক্ষ্মী সাজে, বাপরে বাপ, ঢং দেখে গা গুলিয়ে ওঠে। বমি চলে আসে ঘেন্নায়। তেতাে মুখটা বিকৃত হয়ে ওঠে হিরনের। এখনও সবচেয়ে বিষ মাখানাে জ্বালা ধরানাে একটা তির ওর তুলে লুকনাে রয়েছে। ভ্যাকুয়াম ক্লিনারটা থেকে শোঁ শোঁ গর্জনটা এখনও বেরিয়েই চলেছে। যাবতীয় ধুলােবালি

যত টেনে নিয়েই চলেছে। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে ঐ উৎকট শব্দটা … হিরন বিষ মাখা তিরটা ছুড়েই দিল – যাই করুক না করুক, হাজব্যান্ডটা দু দুটো বাচ্চা প্রেজেন্ট করেছে আমার বােন। ব্যারেল ল্যান্ড নয় অন্তত।’ .. কে ব্যারেন আর কে নয় সে তাে ফার্টিলিটি টেস্ট করালেই ধরা পড়ে গিয়ে আসল সত্যিটা জানা যায়। ‘ রুমা মরণ কামড় দেয় – ‘যারা নপুংসক তারাই টেস্ট করাতে ভয় পায় আর বৌকে দোষ দেয়। এরপর অনিবার্যভাবেই পুরুষের হাত ওঠবারই কথা। উঠলও। কিন্তু আছড়ে পড়ার আগেই থেমে যেতে হল মাঝপথে। ভ্যাকুয়াম ক্লিনারে বিপ বিপ শব্দ। ইন্ডিকেটর লাল আলাে সহ বেজে চলেছে। মাত্র কয়েক মিনিটেই ভর্তি হয়ে গেল ডাস্ট ব্যাগ? সেলসের যুবকটি তবে বলেছিল ..

তপ্ত অঙ্গারের মতাে আভা ছড়িয়ে ইন্ডিকেটরটা জ্বলে উঠেছে, জ্বলছে, জ্বলছেই। কোনও মেকানিক্যাল ডিফেক্ট হল নাকি? | বজ্রাহতের মতাে দুটো মূর্তি দাঁড়িয়ে। দুজোড়া নিষ্পলক চোখে বােবা বিস্ময়। ওরা দুজনেই এমন কিছু একটা বােঝার চেষ্টা করছিল সেটা দুজনের কেউই বিশ্বাস করতে চাইছে না, পারছে না বিশ্বাস করতে, মেনে নিতে। দুজনের মনের চিন্তা প্রবাহ হঠাৎ করেই একদিকে বইতে শুরু করেছে। একটা তিরতিরে কাঁপুনিও কি শুরু হয়েছে বুকের ভিতর? হয়তাে। ব্যাখ্যার অতীত এক বিপন্নতা কঁপিয়ে দিয়ে যেতে থাকে একসাথে দুজনকেই।

প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত জেগে বসে থাকে ওরা। মুখােমুখি। মধ্যখানে

নীলধাতব যন্ত্রটা। ওটাকে দ্বিতীয়বার আর ছোঁয়নি রুমা। বরং ভয় বিস্ময় – হতচকিত এক চোখে বারবার তাকাচ্ছে আশ্চর্য যন্ত্রটার দিকে। যেন ওটা জড়গ্রস্ত। দুজনে কথা বলেনি একটাও। শুধু বার কয়েক দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হয়েছে। তারপর একসময় সােফাতেই উপুর হয়ে শুয়ে পড়ে হিরন। রুমাও একসময় গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। কে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে অন্যজন টের পায় না।

তিন

এখন সকাল, সােফার ওপর আস্তে আস্তে উঠে বসল হিরন। ছপছপ করে শব্দ শুনতে পায়। রুমা বিছানা ঝাড়ছে। সাধের ডিপ পাের ক্লিনিংয়ের বদলে ওর হাতে উঠে এসেছে চিরাচরিত ঝাঁটা। হিরন তাকিয়ে দেখে। জানালা গলে একফালি চৌকো রােদ বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে, রােদুরের সেই আলােক চতুর্ভুজের মধ্যে ঢেউয়ের মতাে নাচানাচি করছে, ভেসে বেড়াচ্ছে, অজস্র ধূলিকণা। হিরন এখন জানে, ওগুলাে সারফেস ডাস্ট। সব জায়গাতেই এটুকু ধূলিমালিন্য থাকে-থাকবেই। সংসারেও। একটু আধটু। অল্পস্বল্প উড়ছে উড়ক। নেহাতই বাইরের ওপরের জিনিস। তেমন বিপদজনক কিছু নয়। ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের তীক্ষ গভীর শব্দের চেয়ে নারকোল ঝটার ছপছপ শব্দটাও অনেক বেশি মােলায়েম, সহনীয় মৃদু।

হিরন কালকের রাতটাকে ভুলে যাবার চেষ্টায় একটা গভীর শ্বাস বাতাসে মিশিয়ে দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *