দোল উৎসবের স্মৃতি – ড. শর্মিলা মজুমদার

গল্প সাহিত্য
Spread the love

মেঘে মেঘে বেলা হয়। শিশু, কৈশাের; যৌবন পেরিয়ে অনীক এখন প্রাপ্তবয়স্ক। ছােটবেলার অনেক ছবিই জ্বল জুল করছে স্মৃতিতে। ক্রমশ স্কুল ও কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে তারপর ঘুরে বেড়ানাে। চাকুরির জন্য কেউ কেউ করে ঘােরা। অবশেষে মেলে চাকুরি, দেখা মেলে মনের মানসীর নাম শুভ্রা বিবাহ হয়। গার্হস্থ্য জীবন বেশ আনন্দের সাথেই কাটতে থাকে। সকালে উঠে নববধূর সংসারের হাল ধরে। বেশ ভালােই তার দিনগুলাে কাটতে থাকে। শুভ্রার ওপর অনীক নিজের অজান্তেই কিছু দোষ করে ফেলে যার জন্য নিজেই পরে আফশােস করে।

| যাহােক প্রতি উৎসবের আগে সকলের মনেই আনন্দ আসে। উৎসবের জোয়ারে সকলে গা ভাসায়। স্ত্রী শুভ্রা ও তাই এই উৎসবগুলির আনন্দের ভাগীদার হতে চায়। কিন্তু অনীক-এর অজানিত দোষ অনাকাঙ্খিত ভাবে শুভ্রার মনে আঘাত হানে। শুভ্রা | কিন্তু অস্ত গােধূলি বেলার মতাে মনের ক্ষোভকে চঁাদের স্নিগ্ধ আলাের মতাে নিজেকে ঠান্ডা রাখে মানিয়ে নেয়। | বাঙালির বারাে মাসে তেরাে পার্বণ। তার মধ্যে শুভ্রা বিশেষ বিশেষ তিথিতে যথাসম্ভব উৎসব পালন করে নিষ্ঠাসহকারে। শ্বশুরবাড়ি, আপন লােকজন, পরিজন সকলেই আসে ও আনন্দ উৎসবে যােগদান করে। সেও তখন একটা দিন বেশ সুখে সংসার করে। তবুও শুভ্রাকে কঁদতে হয়। সব কর্তব্য ঠিকমতাে পালন করেও স্বামী নামক ব্যক্তিটির সব কথা মেনে ও যখন সে আঘাত পায় তখন তার মনে চলে নানান দ্বন্দ্ব। মন হয়ে অস্থির। মাথাটা কেমন করে। কিছুই তার ভালাে লাগে না।।

অনীক যেন আজকাল কেমন হয়ে গেছে। মনটা ওর খুবই সরল হলেও কিন্তু যেন কেমন! সাধারণ কথাকে ও কেমন ঘুরিয়ে মানে করে। সব বিষয়কে মানিয়ে নিতে চায় না। আজকাল যেন আরও বেশি। কারণটা হয়তাে শুভ্রার ব্যস্ততা। শুভ্রার মতাে মেয়ে রূপে কুৎলিত না হলেও গুণে অনন্যা। সবকিছুর মধ্যে বেশিই ব্যস্ত রাখে নিজেকে। তবুও অনীক এর সান্নিধ্যও পেতে চায়। কিন্তু

বড় লাজুক সে, তাই মনের গভীরেই চলে তার পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্ব। বড় অভিমানী সে। কিন্তু কে বােঝে তার এই অভিমান!

| অনীক এর কথায় বেশ ধার। শুভ্রা চায় যা অনীক যেন তা বুঝেও বােঝে না। তাই তার অভিমান। এমনি করেই জীবন। | অতিবাহিত হয়।

| একবার দোল উৎসবে অনীক ও শুভ্রার মধ্যে খুবই সামান্য ব্যাপারে কথা কাটাকাটি হয়। শুভ্রা প্রতিবারের মতাে | দোলপূজা সেরে নিয়ম মতাে অনীককে আবির দিতে যায়। কিন্তু

হঠাৎ অনীকের অপ্রাসঙ্গিক বিদঘুটে আচরণ দেখে সে থমকে | পড়ে ও প্রত্যাখ্যাত হয়— শেষ পর্যন্ত কেউ কাউকে আবির | দেয় না। সারাদিন কথা বুঝতে চায় না। এইভাবে বােঝা না | বােঝা, মান অভিমান সবের দ্বন্দ্ব হতে হতে শুভ্রা কেমন আনমনা

হয়ে যায়। খিদে মেটাবার তাড়না কথা বলার ইচ্ছে – সবই যেন | সে হারিয়ে ফেলে। নিজেকে একেবারে একঘরে করতে চায়। | এভাবে থাকতে থাকতে মাস ছয়েকের মধ্যে সে কঠিন অসুখে | আক্রান্ত হয়। আর শুভ্রা সকলকে ছেড়ে আট মাসের মাথায় তার | পথ খুঁজে নেয়।

| ফিরে আসে আবার আবার দোল উৎসব। সব আছে, শুভ্রা | নেই। কাকে আবির মাখাবে—! মনে পড়ে যায় কত দোলখেলার

স্মৃতি, কিন্তু সেই সেদিনের দোল-উৎসবের দিনটির কথা মনে করে অনীক-এর দুচোখ জলে ভরে ওঠে—স্মৃতির মণিকোঠায় তাকে আগলে রাখে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *