দক্ষিণ আফ্রিকায় মহাত্মার দিনগুলি – বিশ্বজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

গল্প সাহিত্য
Spread the love

রাতের ট্রেন, ডারবান থেকে প্রিটোরিয়া যাচ্ছেন একজন মধ্যবয়সি ছােটখাটো মানুষ। মধ্যরাতে হঠাৎ তার কামরায় একজন শ্বেতাঙ্গ যাত্রী উঠে এল। কালাে বেঁটে, ছেটে রােগা লােকটাকে দেখে শ্বেতাঙ্গটি তঁাকে অন্যবগিতে যেতে বলল। লােকটি তাকে ফার্স্ট ক্লাস টিকিট দেখালে, সে একটি পুলিশ ডেকে আনল। তারপর কঠিন ঠান্ডার মধ্যে কোনওকিছু না শুনেই মালপত্রসহ লােকটিকে ছােট্ট একটা স্টেশনের অন্ধকার প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে দিল। হি হি করে কাঁপছিলেন ছােটখাটো মানুষটি, কিন্তু ওভারকোটটা লজ্জায় চাইতে পারলেন না। সেদিন শীতে কাঁপতে কাঁপতে নিরীহ মানুষটির মনে হয়েছিল, মানুষের তৈরি একটা কালাে-সাদা, জাতবেজাতের বজ্জাতিটা কি ভয়ানক নিষ্ঠুর দয়ামায়াহীন। সারারাত আকুল হয়ে কৃষ্ণকে স্মরণ করলেন। অবশেষে ছােট্ট মারিজবার্গ স্টেশনে নতুন সকালের আলাের। ঝরনাধরায় স্নাত হয়ে ভয়কাতুর মানুষটি প্রতিজ্ঞা করলেন প্রতিবাদের আগুন জ্বালাতে হবে হৃদয়ে। না বলতে হবে। এই মানুষটিই আমাদের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধি।

সেদিন প্রিটোরিয়া শহরের জনসভায় গান্ধিজি ঝাঝানাে বক্তৃতায় বুঝিয়েছিলেন সম্মিলিত হয়ে ইংরেজদের মাতৃভাষা ইংরেজি শিখে অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে হবে। শুধু উপদেশ নয়, তিনি দোকানি, কেরানি, নাপিত সবাইকে। ইংরেজি পাঠ শিক্ষা দিলেন। সাফল্য এল অল্প। কয়েকদিনেই। যে মামলার কারণে গান্ধিজির প্রিটোরিয়াতে আসা, তাতে সরকার হেরে গেল। রেল কর্তৃপক্ষ প্রথম ও | দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরায় ভারতীয়দের রেল ভ্রমণের অনুমতি দিল।

| না বুঝে গান্ধিজি সেদিন যে কাজটি করেছিলেন, শেষমেষ সেটাই যেন ভারতবর্ষে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল। আইনজীবী | হিসেবে দারুণ সাফল্যের মধ্যে একদিন এক ইংরেজ রাতের ট্রেনসফরে তুলে দিল আনটু দিস লাস্ট’। বইটি সারারাত মনােযােগ সহকারে পড়ে সকালে দূরের ধানখেত বরাবর তাকিয়ে তিনি উপলব্ধি করলেন—জীবনের এই বিলাসিতা আড়ম্বর—এ সব তুচ্ছ।

বইটাতে রাক্সিনের আদর্শ, পুঞ্জীভূত সম্পত্তিই হল মানুষকে বশে রাখার হাতিয়ার। মামলায় তিনি যেভাবে সমাজের সেবা করছেন তার থেকে অনেক অনেক বেশি উপকার করছে ওই চাষি, জেলে, নাপিত, শ্রমিকরা। নিমেষে পসারওয়ালা ব্যারিস্টার বছরে ৫,০০০ পাউণ্ডের আয় ত্যাগ করে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্যাগের বাণী গ্রহণ করলেন। তিনি বুঝলেন বিলাসবহুল জীবন ত্যাগ না করলে

আধ্যাত্মিক উন্নতি করা যায় না।।

| চুলকাটা, কাপড়-জামা ধােওয়া, পায়খানা পরিষ্কার, রান্না করা, এমনকি শেষ সন্তানের প্রসবের সময় প্রসূতি ও শিশুর সেবার কাজটাও নিজের হাতে করলেন। ডারবানের জাঁকজমক জীবনযাত্রা ত্যাগ করে মামার বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। এমনকি মাত্র ৩৭ বছর বয়সে কস্তুরীবাঈয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক শেষ করে ব্রহ্মচারী জীবনযাপন আরম্ভ করলেন। শুধু মৈথুনবর্জিত নয়, সর্ব ইন্দ্রিয়ের দমন, আহার, বিহার, আবেগ, বাক্যসংযম ইত্যাদি সমস্ত মনােবৃত্তির সংযম। অর্থাৎ কামনাশূন্য স্থিতধী অবস্থা যা গীতার ফলাশাহীন নিষ্কাম কর্মের আদর্শ স্বরূপ।

দক্ষিণ আফ্রিকা আসার এক সপ্তাহের মধ্যে গান্ধিজি বর্ণবিদ্বেষের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন এবং পরবর্তীকালে সেটাই তাকে বিশ্বখ্যাত করে দেয়। তাঁর প্রবর্তিত নীতিদুটি হল—অহিংসা ও অসহযােগ।

যা তিনি বাইবেলে এবং চৈতন্যের ধর্মীয় নির্মাণ অহিসমাত্র’ গ্রহণ করেছিলেন।

আইন অমান্য ও সত্যাগ্রহ এই দুটি গান্ধিজির যেন পালিত পুত্র ছিল। এর পেছনের কাহিনীটা সুন্দর। তখন দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার ঘােষণা করলেন প্রতিটি ভারতীয়কে হাতের টিপছাপ, নাম, ঠিকানাসহ প্রমাণপত্র কার্ড বিলি করে সরকারি ভাবে নথিভুক্ত করতে হবে। কালাে মানুষদের প্রতি এই বৈষম্য গান্ধিজি মেনে নিলেন না। জোহান্সবার্গের এমপায়ার থিয়েটার হলে সেদিন নতুন যে রাজনৈতিক যুদ্ধনীতির জন্ম হল তার নাম সত্যাগ্রহ। গান্ধিজির নেতৃত্বে সরকারি রেজিস্ট্রেশন অর্জন অবৈধ ঘােষণা করা হল। গুটিকয়েক স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে গান্ধিজি প্রতিটি সেন্টারে অবস্থান ধর্মঘট করলেন। সরকারও চুপ করে বসে থাকল না। দিন দুয়েক পরেই গান্ধিজিকে কারাদণ্ডের আদেশ দিল। সেটাই হল তাঁর প্রথম কারাবাস। | বন্দীদশায় গান্ধিজির হাতে এল হেনরি থরাের লেখা অন সিভিল ডিসেন্ডবিডিয়েন্স’ বইটি। দাসপ্রথার অবলুপ্তিতে মার্কিনিদের উদাসীনতা—সে কারণে জঘন্য প্রথাটি কিছুতেই বিলুপ্ত হচ্ছে না। এর প্রতিবাদে থরাের প্রতিবাদ। এ ছাড়া মেস্কিকোয় এক অন্যায় যুদ্ধে সরকার শাস্তি জোগাচ্ছিল। সরকারের হিংস্র দমননীতি চরমে উঠলে থরাে ব্যক্তির ন্যায্য অধিকার সাব্যস্ত করতে সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখাতে অস্বীকার করল। বইটিতে বুঝিয়েছেন বংশবদ নাগরিক হওয়ার চেয়ে ন্যায়পরায়ণ নাগরিক হওয়া অনেক সম্মানের।

জেল থেকে বেরিয়েই গান্ধিজি ১৯১৩ সালের ৬ নভেম্বর ২ হাজার ৩৭ জন পুরুষ আর ১২৭ জন মহিলাকে নিয়ে ট্রাসভাল সীমানায়’ আইনের বিরুদ্ধে অহিংস পদযাত্রা করলেন। এর আত্মিক

শক্তি যে কত প্রবল গান্ধিজি বুঝলেন ট্রাসভাল’ সীমান্তে অপেক্ষারত নির্ভীক মানুষগুলােকে দেখে। গান্ধিজি অবাক হয়ে গেলেন। হাজার হাজার মানুষ পদযাত্রায় শামিল হলেন। বলতে গেলে গান্ধিজির দক্ষিণ আফ্রিকায় ধর্মযুদ্ধ শেষ হল এক পূর্ণাঙ্গ বিজয়গৌরবে এবং তারই বিজয়পতাকা নিয়ে তিনি ভারতে ফিরে এসেছিলেন।

১৯১৪ সালের জুলাই মাস। গান্ধিজি তখন অন্য মানুষ। খাপখােলা তলােয়ারের মতন শাণিত। বুকের মধ্যে রাক্সিন-টলস্তয়থরাে, এই ৩ জন চিন্তাবিদদের আদর্শ রক্তে মিশে গেছে। একেবারে আলােয় উদ্ভাসিত মানুষ। অহিংস এবং সত্যাগ্রহ তার চিন্তার দুটি ফসল। ৩০ বছর ধরে বিশ্বের পরাক্রান্ত সাম্রাজ্যের দাম্ভিক ইংরেজদের মাথাটি নুইয়ে রেখেছিলেন।

বিখ্যাত লেখক ল্যারি কলিন্স ও দোমিনিক লাপিয়ের বলেছেন, ব্রিটিশ সরকারের কাছে গান্ধিজি সবসময় একজন ডিফিকাল্ট পারসন। তাদের ভাষায় গান্ধিজিকে বােঝা যায় না। তার সম্বন্ধে পূর্বানুমান করা যায় না। গান্ধিজি সত্যান্বেষী। সত্যই তার কাছে একমাত্র নিত্যবস্তু। কিন্তু কি এই সত্য, কেমন এই মূর্তি ? তার সত্য দ্বৈতসত্তাযুদ্ধ। একটা প্রকৃত, একটা আপেক্ষিক। মানুষ যতক্ষণ হাড় মাংসের খাঁচার মধ্যে বন্দী থাকে, ততক্ষণ সে মাঝে মাঝে অবিমিশ্র খাঁটি সত্যের নির্দেশ পায়। এই নিত্যসত্য ক্ষণস্থায়ী পারিপার্শ্বিক চাপে তা হারিয়ে যায়। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনযাপনে, যে সত্যের সঙ্গে লেনদেন হয় সে সত্য আপেক্ষিক। তার বদল হয়। অর্থাৎ অনুভবের তারতম্যের সঙ্গে সত্যের চেহারার বদল হতে পারে।

তাই অনেক ক্ষেত্রে গান্ধিজিকে পরস্পর বিরােধী মনে হয়েছে। দেশভাগের সময় তিনি মাউন্টব্যাটেনকে বলেছিলেন, পুরাে দেশটাকেই মুসলিম লিগের হাতে তুলে দিতে আপত্তি কিসের? এতে দেশভাগও বাঁচবে আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও বজায় থাকবে। পরবর্তী সময়ে মানুষই বিচার করবে দেশ কে চালাবে। এসব শুনে গান্ধিজির নিজের লােকেরাই গান্ধিজিকে মতিভ্রম বলেছিল। আসলে গান্ধিজি বুঝেছিলেন জাতিদাঙ্গা কিভাবে দুটি দেশের হাজার হাজার মানুষকে অসহায় করে তুলবে।

আর স্বাধীনতার সময় জাতির জনক বলেছিলেন, কাল থেকে আমরা স্বাধীন। ব্রিটিশ বন্ধন থেকে মুক্ত। কিন্তু আজ মধ্যরাতেই ভারতবর্ষ দুভাগ হবে। সুতরাং, আনন্দের মধ্যে দুঃখের দিনও বটে। তারপর সতর্ক করে বলেছিলেন, স্বাধীনতার একটা দায় আছে। সবাইকে তার বােঝা বইতে হবে। সবাইকে তার বােঝাতে হবে, ভ্রাতৃত্ববােধের উপলব্ধি না-হলে দেশকে বাঁচানাে যাবে না। সাম্প্রদায়িকতার বিষে সদ্যোজাত স্বাধীনতার মৃত্যু না হয়। তাই তিনি অনশন আরম্ভ করলেন। কংগ্রেস তথা ইংরেজ তখন হতবাক। স্বাধীনতার পরেও অনশন। এই হল গান্ধিজি। স্ববিরােধীতা গান্ধিজিকে সকলের থেকে আলাদা করছে। তাঁর দর্শন আর আদর্শ সেসময় পরাধীন ভারতবর্ষকে শিশুর মতাে লালনপালন করে যে স্বাধীনতার শীর্ষে পৌঁছে দিলেন আজ তার কতটুকু আমরা ভােগ করছি। সরকার পিছিয়ে-পড়া মানুষদের সেই স্বাদ দিতে পেরেছে ? এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *