চিলে নদীর সাঁকো – ষষ্ঠী পদ চট্টোপাধ্যায়

গল্প সাহিত্য
Spread the love

ট্রেন থেকে নেমে মেঠো পথে মাঠে মাঠে এগিয়ে চলেছি। আশপাশে কোনও গ্রামের চিহ্ন নেই। যতদূর চোখ যায় শুধু মাঠ আর মাঠ। ধূ ধূ করছে মাঠ। এবড়াে খেবড়াে মাটির চাঙড়ে ভরা এক অসমতল প্রান্তর। বীরভূমের বৃক্ষবিরল এই অনুর্বর মাটিকে চষে তবুও ফসল ফলাবার চেষ্টা করা হয়েছে। তাই আঁটিসার বাঁকা বেঁটে খেজুর গাছ অথবা কালাে কালাে তালগাছের সৈকতেও ধানের শীষগুলি শরতের। রােদুরে ঝলমল করছে। আকাশের দিকে ? তাকালাম। গাঢ় নীলের মাঝে শ্বেতশুভ্র মেঘপুঞ্জগুলি যেন উদাসভাবে ভেসে চলেছে। | বর্ষায় ভেজা মাটি এখনও ভালভাবে শুকোয়নি। কেননা শরতের মেঘ মাঝে মাঝে বৃষ্টিধারায় মাটিকে নতুন করে ভিজিয়ে দেয়। তাই কাদার রাস্তাগুলি পার হতে পায়ের হাঁটু-পর্যন্ত ডুবে যেতে লাগল আমার। এখনও অনেক পথ যেতে হবে আমাকে। পথ ভুল হল কিনা তাও জানবার উপায় নেই। এক আধটি মেটে ঘর বা মাটির মানুষ বলতে যাদের বােঝায় তাদের কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না। শুধু দেখতে পাচ্ছি আকাশ আর মাটি। ধানের শীষগুলি বাতাসে দুলে দুলে কাকে যেন প্রণাম জানাচ্ছে দেখতে পাচ্ছি। আর দেখতে পাচ্ছি প্রকৃতির সবুজগুলি রােদের ছটায় উজ্জ্বল হয়ে হাসছে। কত পাখি নিজের মনেই গান গেয়ে চলেছে। সাদা সাদা বকগুলাে সেই প্রান্তরে নাবাল জমির জমে থাকা জলে পােকামাকড় কিংবা ছােট ছােট মাছের লােভে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কুঁচলে বকগুলাে ডাকছে কক্‌কক্‌কক্‌। দু’একটা মানিকজোড় পাখিও চোখ পড়ল। আর এক পাখি, কী যেন নাম, ডেকে উঠল করুণ সুরে। মন কেঁদে উঠল। আমি কাদায় গেঁথে যাওয়া পা টেনে সেই নির্জনতায় আপন মনেই পথ চলতে লাগল।

এইভাবে চলতে চলতে হঠাৎ একসময় আবিষ্কার করলাম। সাঁকোটাকে। সেই অন্তহীন প্রান্তরে খালের মতাে এঁকে বেঁকে বয়ে চলা একটা নদীর ওপর পাকা বাঁশের সাঁকোটা পটে আঁকা ছবির মতাে স্থির হয়ে আছে। এই অজানা প্রান্তরে অচেনা নদীর ওপর বাঁশের এই সাঁকোটা এক অপূর্ব দৃশ্য হয়ে ধরা দিল আমার চোখে। কয়েকটি সাদা বক সাঁকোর মাথা ছুঁয়ে দূরের দিকে উড়ে গেল।

একটু আগে এখানে বােধ হয় দু’এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে।

সেই বৃষ্টিতে ভেজা বাঁশের গায়ে সূর্যের আলাে তখন ঠিকরে

পড়ছে। | আমি কাদার রাস্তাটা পেরিয়ে পায়ে পায়ে সাঁকোর কাছে চলে এলাম। সাঁকোর বাঁশে পা দিতেই মচ মচ্ করে উঠল সাঁকোটা। তারপর খুঁটি ধরে টলমল করতে করতে সাঁকোর মাঝামাঝি এসে নীচের দিকে তাকালাম। নদীটা সরু হােক, কিন্তু বেশ গভীর বলে মনে হল। নদীর দু’পাশে ঘন কাশের বন। বাতাসের দোলায় দুলে | যেন অবিরাম ঢেউ খেলে যাচ্ছে। নদীর জল গিরিমাটি গােলা। লাল। রক্তবর্ণ। সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে নদী দেখতে দেখতে আমি তন্ময় হয়ে গেলাম। তন্ময়তা কাটলে যখন এপারের মাটিতে পা দিলাম তখন মনে হল কে যেন পেছন থেকে বলে উঠল— পারান পয়সা ট দিয়ে যান গাে মশয়। | ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম সাঁকোর এধারে একটু জংলা জায়গায় কালাে বেঁটে একফালি ময়লা কাপড় পরা মাঝারি চেহারার মধ্যবয়সী একজন লােক হাতে একটা কোদাল নিয়ে চুপচাপ বসে রয়েছে। লােকটি এমন একটি জায়গায় বেছে বসে আছে যে। সচরাচর কেউ তাকে দেখতে পাবে না। আমি থমকে দাঁড়িয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম কে তুমি?

| লােকটি এবার ধীরে ধীরে উঠে এল সেখান থেকে। বলল— | হেই চাষিমজুর মানুষ বটে। চিলে নদীর সাঁকোর মালিক। ই সাঁকোটা আমিই বানিনছি৷৷ পারানির পয়সা ট দ্যান।

আমি হেসে বললাম—সাঁকো পেরােতে পয়সা দিতে হয় নাকি আজকাল?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *