গরিবের ঘাড়া রােগ – কুমার

গল্প সাহিত্য
Spread the love

—দাদা আপনার কে ভর্তি আছে? আমার মেয়ে ভর্তি, আপনার কে আছে?

—আমার মা ভর্তি আছেন, বয়স্ক মানুষ, কিছু না কিছু লেগে আছে, দুদিন আগে কলের পাড়ে পড়ে গিয়ে কোমরে ব্যথা পেয়েছে তাই সকালে ভর্তি করেছি, ডাক্তার বললেন বেশি ভাবনা নেই চোট সামান্য তবু রাতে থাকুন বয়স হয়েছে কোথা থেকে কি হয়, তাই আছি আর কি। আপনার মেয়ের কি হয়েছে দাদা?

—আমার মেয়ের বড় সাংঘাতিক রােগ দাদা, যে রােগের চিকিৎসা করা ডাক্তারেরও অসাধ্য।

-বলেন কি দাদা! তাহলে এখানে ভর্তি করলেন কেন, কলকাতার কোনও হাসপাতালে করতে পারতেন, তাহলে অন্তত চেষ্টাটা করতে পারতেন।

বললাম না কোনও ডাক্তারই চিকিৎসা করতে পারবে না, তাে কি কলকাতা কি বারাসাত সবই সমান।।

—দাদা বুঝেছি, তার মানে আপনি আশা ছেড়ে দিয়েছেন, ভগবানকে ডাকুন কোনও চমৎকার যদি করতে পারেন!

—ঠিকই বলেছেন ভগবানই পারবেন এর সমাধান করতে। —দাদার বাড়ি কোথায়, বারাসাতেই? —না দাদা আমার বাড়ি দেগঙ্গায়। আপনার কোথায় ? —আমার হাবড়াতে বাড়ি।। আপনার মেয়ের কি বিয়ে হয়েছে? —না তা হয়নি ক্লাস ইলেভেনে পড়ছে। —এগারাে ক্লাসে পড়ছে তার এমন কি অসুখ করল যার

চিকিৎসা ডাক্তাররা করতে পারবে না ?

—দাদা, লােভের চিকিৎসা আর গরিবির চিকিৎসা কি কোনও ডাক্তার করতে পারে?

—দাদা আপনার কথা বুঝতে পারছি না কেমন হেঁয়ালির মতাে লাগছে আপত্তি না থাকলে বলুন সারারাত তাে বসেই থাকতে হবে।

—তা ভায়া ঠিক। চিন্তায় ঘুম আসছে না, আবার যদি ঘুম আসে মশায় ঘুমুতে দেবে না তার চেয়ে কথা বলে রাত পার করাই ভালাে। শুনুন দাদা আমার কাহিনী— | করি ড্রাইভারি, সংসারে লােক ছজন, বড় তিনজনেই পড়াশােনা করে, আজকালকার পড়াশােনার খরচ তাে জানেন। দুশাে টাকার কমে কোনাে কোচিংয়ে পড়ায় না, তার ওপর আবার দুটো তিনটে করে কোচিংয়ে দিতে হয়। দশ-এগারাে হাজার টাকার মাইনাতে কি আর সংসার চলে! তবু আমার বউ খুব

হিসেব করে চালায়, তাই ডালভাত জুটছে।। আমি তাে ভাই গরিব মানুষ, কিন্তু আমার ছেলেমেয়েরা বড়লােক; মাছ ছাড়া ভাত খাবে না টিফিনে চাউমিন চাই, পাস্তা চাই; মুড়ি, রুটি, পান্তা ওসব কেউ খায় নাকি! নিদেন পক্ষে ডিমটোস্ট চাই।

দাদা সংসারের চাহিদার সঙ্গে স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে দৌড়ে পারছি না, নিজের জামাকাপড় কেনাতাে ভুলে গিয়েছি। ডিউটি করার ড্রেস পরে; বাড়িতে লুঙি আর গেঞ্জি, বউকে দুবছর আগে আমি লাস্ট শাড়ি কিনে দিয়েছি, তারপর আর না, বউ চালাক হয়ে গেছে। আজকাল নাইটি পরার অভ্যাস করেছে, তাতে নাকি খরচ বাঁচে। আমার মেয়ের এক একটা ড্রেসের দাম নাকি পনেরােশাে থেকে দুহাজার টাকা। তার নিচে নাকি পরে ভদ্রসমাজে যাওয়া যায়।

। তার পিছনে পিছনে আমার পরের মেয়ে তৈরি হচ্ছে শুনলাম। সে এখন ক্লাস থ্রি-তে পড়ে, তারও পছন্দমতাে জামাকাপড় হতে হবে, ছেলে ক্লাস ফোর-এ পড়ে এখনও তার চালচলন শুরু হয়নি, জানিনা কি হবে সে বড় হলে!

দুই বােনে মিলে প্রতিদিন কোনও না কোনও বিষয় নিয়ে অশান্তি। দিদির জামা বােনকে পরতে দেবে না, যেগুলাে পরতে দেয় সেগুলাে পরবে না কারণ সেগুলাে পুরনাে ওল্ড ফ্যাসান নাকি! ক্লাস ইলেভেনের মেয়ে আর ক্লাস এইটের মেয়ে তাে ছােট নয়। বাবা মায়ের ক্ষমতা তাে বুঝবি তােরা! তা নয় বাবা কোথা থেকে পাবে জানেনা, চেয়েছে তাে দিতে হবে। কোনওদিন রাগ করে বড়মেয়ে না খেয়ে থাকে, কোনওদিন ছােটমেয়ে না খেয়ে থাকে। দাদা এভাবে কি পারা যায় প্রতিদিন! আমার বউ গ্যাস বার করে 

সকালবেলায় চা আর রাতের রুটির জন্য। দিনের রান্না কাঠ জ্বালিয়ে করে; ছেলে মেয়েরা মুড়ি খায় না বলে গুড় জ্বাল দিয়ে মুড়কির মতাে করে, তাতেও ওদের হবে না। এ স্কুলে যাবার জন্য যদি দুএক টাকা নেয় তাহলে ছােটটাকে কুড়ি টাকা দিতে হবে, এত বড় বড় মেয়ে মায়ের একটা কাজেও হাত লাগাবে না, সারাদিন শুধু টিভি দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা; আমি বাড়ি থাকি না, মাকে একটুও ভয় পায় না, যার যা খুশি করে। মাঝে মাঝে বউ কান্নাকাটি করে, আমি আর কি বলব কপালের দোষ দাদা। শুনেছি মেয়েরাই নাকি বাবার দুঃখ বেশি বােঝে। আমার মেয়েদের ক্ষেত্রে উল্টো, আশপাশের বড়লােকের মেয়েদের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে চলবে, আমরা জামাপ্যান্ট ছিড়ে গেলে সেলাই করে পরতাম, আর এরা পয়সা দিয়ে ছেড়া জামাকাপড় কেনে, এটা নাকি আজকালকার ফ্যাসান হয়েছে।

আমরা সিনেমা দেখতাম সাধারণ সিনেমা-হলে পাঁচ-সাত টাকা টিকিট, এরা দেখে একশাে-দেড়শাে টাকা টিকিটে, মাল্টিপ্লেক্সে; সাধারণ সিনেমা হলে আবার মানুষ যায় নাকি! জামা কাপড় যে কোনও দোকান থেকে কিনলে হবে না, বড় বড় শপিং মল থেকে কিনতে হবে, বলুনতাে দাদা সাধারণ একজন ড্রাইভার আমি, এদের এই বিপুল চাহিদা কোথা থেকে মেটাব?

আমার বউকে নাকি ছেলেমেয়েরা বলে খাওয়াতে পরাতে পারবে না যখন জন্ম দিয়েছিলে কেন? দাদা ভাবতে পারেন, এখনকার ছেলেমেয়েরা বাবা-মাকে এইভাবে কথা বলছে, বেঁচে থাকব না মরে যাব—তাই বুঝে উঠতে পারছি না। পেটের ভাত জোগাড় করব নাকি এদের ফ্যাসানের জোগাড় করব?

মেয়েরা বড় হচ্ছে তাদের বিয়ে-থা দিতে হবে, দুপয়সা জমাতে হবে ভবিষ্যতের জন্য। আমার ছেলে মেয়েরা বর্তমানেই বাঁচতে দিচ্ছে না, তাে ভবিষ্যতে কি করব বলতে পারেন দাদা!

—দাদা এ রােগ শুধু শহর না, গ্রামেও শুরু হয়েছে। সবই দাদা ভােগবাদের খেলা-সমাজের চেহারাটাই ধীরে ধীরে বদলে গেছে, আর যাচ্ছেও। বাবার ট্র্যাকের জোর থাক আর নাই থাক বাইক কিনে দিতেই হবে। সব মানুষের পক্ষে কি সম্ভব! আপনার মতাে আমিও পড়েছিলাম বিপদে, ছেলেকে বাইক কিনে না দেবার জন্য বাড়িতে নানা রকম অশান্তি করতে লাগল বাড়িতে, শেষে মায়ের কথায় বাইক কিনে দিলাম। বলেছিল তাহলে সুন্দর করে পড়াশােনায় মন দেবে।

—যাক দাদা, তবু তাে আপনার ছেলে আপনার মান রেখেছে শুনেও শান্তি।

—না দাদা আগেই শান্তি দেখছেন, পুরােটা শুনুন আগে! ছেলেকে বাইক কিনে দেবার পর প্রথম যে কাজটা করল পড়াশােনা, সেটাকেই ছেড়ে দিল। তারপর বাইকের পিছনে গার্লফ্রেণ্ডকে বসিয়ে হিল্লি-দিল্লি করে টহল! যত-রাজ্যের বখাটে ছেলেদের সাথে আড্ডা, রাত দশটায় ফেরে না দুটোয় ফেরে ভগবান জানেন! পয়সা আগে চেয়ে নিত, আজকাল চুরি করতে শিখেছে, কখনাে ওর মায়েরটা চুরি করে কখনাে আমার মায়েরটা চুরি করে; মাঠের ফসল পাকার আগেই নাকি বিক্রি হয়ে যায়। মদ গাঁজা আরও কি সব নেশার জিনিস খাওয়া শিখেছে, আমি অশান্তি করে করে হাঁপিয়ে গেছি। আর কিছু বলি না, আমার মায়ের আদরের নাতি কিছু বললে সে

অশান্তি করে, না কিছু বলতে পারি না সহ্য করতে পারি! তাে দাদা আপনার কাহিনী আর আমার কাহিনীর মধ্যে কোনও তফাত নেই বুঝলেন!

তাইতাে দেখছি!!

—দাদা জানার কি শেষ আছে, কয়েকদিন আগে পাড়ার দুই ভাইয়েরা বলল, আপনাকে বড় ভাইয়ের মতাে শ্রদ্ধা করি, ছেলে আপনার আমাদের মেয়েদের ওপর যেভাবে উৎপাত করছে তাতে আপনার ক্ষতি হবে না, কিন্তু বদনাম হয়ে গেলে কি আমরা মেয়ে | বিয়ে দিতে পারব দাদা? আমাদের দিকটা একটু দেখবেন!

বুঝলেন দাদা অপমানের একশেষ। তবু মনকে বােঝালাম ছেলে বােধহয় বিয়ে করবে, আমার মাকে দিয়ে বললাম, ঐ মেয়েদের কাউকে পছন্দ হলে, বিয়ের ব্যবস্থা করে দেব। উত্তর যা দিয়েছে শুনলে আপনি আশ্চর্য হয়ে যাবেন।

বলে মাথা খারাপ নাকি ওদের বিয়ে করব, না-না এখন ও ঝামেলায় জড়াব না, একটু খেলছিলাম আরকি! কোনও বাড়ির উপযুক্ত মেয়ের সঙ্গে খেলছিল। অবশ্য পাড়ার লােক একটা উপকার করেছে, একদিন ধরে খেয়েছি সবাই মিলে, আর বাইকটাকে পুড়িয়ে দিয়েছে, এত খুশি হয়েছি দাদা কি বলব! দিন পনেরাে খবর বাড়িতে আছে, পা আর হাত ভাঙা তাে বের হতে পারছে না। দাদা সবাই ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে ছেলেমেয়ে সুস্থ হয়ে উঠুক। আমি প্রার্থনা করি সকাল বিকাল, আমার ছেলের হাত এবং পা যেন কোনওদিন ভালাে না হয়, ও খোড়া হয়ে থাক সারাজীবন, ভাত মেখে খাইয়ে দেব। কিন্তু যে যন্ত্রণা ও ভােগ করায় আমাকে আর ওর মাকে, সে যন্ত্রণার কাছে এ যন্ত্রণা কিছু না দাদা, কিছু না।

—দাদা কাঁদবেন না, শান্ত হােন, বুঝলাম আপনার পয়সা আছে। তবু আপনার শান্তি নেই, আমার পয়সা নেই তাতেও শান্তি নেই। দুঃখ আপনার আর আমার সমানই।

—তা এখন আপনার মেয়ের সমস্যা কি?

—যােলাে হাজার টাকা দামের মােবাইল কিনে দিতে হবে, কন্যাশ্রীর টাকা পেয়েছিল, নিজে টিউশনি পড়ায়, সব টাকা গুলােই ঐ ফ্যাসানের সামগ্রী কিনতে কিনতে চলে যায়। দিদিকে যদি যােলাে হাজার টাকা দামের মােবাইল কিনে দাও, তাহলে আমাকেও দশ হাজার টাকা দামের মােবাইল কিনে দিতে হবে বলে ছােটো মেয়ে হুমকি দিয়েছে, কারণ ওদের সব বন্ধুদের ওর চেয়ে দামিদামি মােবাইল আছে। দিতে পারব না বলার পরে মায়ের সঙ্গে তুমুল অশান্তি লেগে থাকে। ওর মা পঁচিশশাে টাকা দিয়ে ড্রেসিং টেবিল মেয়েদের সাজার জন্য কিনে দিয়েছিল, রাগ করে সেটা ভেঙেছে আমার গুণধর ছােটো মেয়ে। শেষে ব্লেড দিয়ে নিজের হাতের শিরা কেটেছে। আমি বাড়ি ছিলাম না, ওর মা বুঝতে পেরে দরজা ভেঙে পাড়ার লােকজন নিয়ে এসে ভর্তি করেছে এখানে। আমি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যাবেলা। আগে ফিরতে পারিনি, তারপর থেকে আপনার সামনে। দাদা এর নাম সন্তান-সুখ! শাস্ত্রে নাকি আছে, মেয়েরা বাবাকে নরকের দরজা পার করতে সাহায্য করে, আর আমার মেয়েরা আমাকে জীবিত অবস্থায় নরক যন্ত্রণা ভােগ করাচ্ছে।

—দাদা দুঃখ করবেন না, আপনার মেয়ের মতাে অবস্থা আর ছেলের মতাে অবস্থা প্রায় প্রতি ঘরে ঘরে। জানিনা আমাদের | ছেলেমেয়েরা কবে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *