কুয়োতলা জিন্দাবাদ – দেবল চক্রবর্তী

গল্প সাহিত্য
Spread the love

স্থান : গ্রাসমেয়র-নর্দান ইংল্যান্ড। কাল : ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ।

—এ মাল এক্কেবারে বাস্তু ঘুঘু। সরেস জিনিস। কিন্তু বােঝার উপায় নেই। দেখে মনে হবে আগমার্কা সরষের তেল। বেছে বেছে নিজের বাড়িটার নাম দিয়েছে “ঘুঘুর বাসা”। পাশ থেকে আর একজন যুবক বলে উঠল,

আর ঐ যে সঙ্গে রয়েছে মহিলাটি… আর কিছু না বলে থেমে গেল সে ছেলে, সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। পথচলতি একঝাক মানুষ তাকাল উইলিয়াম আর ডরােথির দিকে। উইলিয়াম বেশ বুঝতে পারছে এসব কথা ওর উদ্দেশ্যেই বলা হচ্ছে। কিন্তু কেন? তা জানে না। এতাে লােক হঠাৎ মাটি খুঁড়ে উদয় হলই বা কোথা থেকে? কি চায় এরা ? সকালে হাঁটতে বেরিয়েছে উইলিয়াম, গ্রাসমেয়র লেকের পাড়

ধরে, ডরােথিকে সাথে নিয়ে। এরা যেই হােক না কেন, খবর টবর ঠিকঠাক রাখে। উইলিয়ামের বাড়ির নাম সত্যিই “ডাভ কটেজ”। আগে সামারসেটের অ্যালফক্সটন হাউজে ছিল। সে বাড়িটা ছিল কবি কোলরিজের বাড়ির একেবারে পাশে। কদিন। হলাে এই গ্রেসমেয়ার লেক ডিস্ট্রিক্টে “ডাভ কটেজে এসেছে। এরা তার মানে সমস্ত টাটকা খবর জানে। ছেলেটা অত্যন্ত অশালীনভাবে জিভ দিয়ে ঠোট চেটে বলল,

বন্ধুগণ, এই যে মহিলাকে ওনার সঙ্গে দেখছেন, অফিসিয়ালি উনি ওনার বােন ডরােথি। আমরা সবাই জানি ওনার লেখা বিখ্যাত কবিতা লুসি পােয়েমের “লুসি” চরিত্রটি আসলে কে। একটা চাপা গর্জন শােনা গেল, —সে আর বলতে! এ পাশে ক্রাগি মাউন্টেন, ওপাশে গ্রাসমেয়র লেক।

প্রাতঃভ্রমণের আদর্শ জায়গা। অনেকেই আসে। আজ এখনও তেমন। করে ভােরের আলাে ফোটেনি। সাদা একটা কুয়াশার চাদর চারপাশে। তৃতীয় একটা চরিত্রের আবির্ভাব ঘটল,

—এই ডরােথি কিন্তু ওনার ক্যারেন্ট একাউন্ট। বাড়িতে একটা ফিক্সড ডিপােজিটও আছে। সেটা কি কেউ জানেন? | চারপাশে একটা গুঞ্জন উঠছে। ছেলেটি হাত তুলে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলল,

—আপনারা ফিক্সড ডিপােজিটটার নাম জানতে চান? একটু সময় নিয়ে সবাইকে বেশ পর্যবেক্ষণ করে বলল,

—ওনার ফিক্সড ডিপােজিট হলাে ওনার বাল্যের লীলাসঙ্গিনী, স্কুল জীবনের সঙ্গিনী এবং অধুনা বিবাহিতা স্ত্রী—মেরী হাচিসান। ভীড়ের মধ্যে থেকে কোন এক সহৃদয় ব্যক্তি বলে উঠলেন,

—একটা মানুষের তাে বােন থাকতেই পারে। তা বলে কি সে বিয়ে করবে না?

যে ছেলেটি এতক্ষণ কথা বলছিল, সে বেশ ধীরস্থির ভাবে তার তুরুপের তাসটি বার করল,

বেশ তাে। বােন হল। বউ হল। এবার ওনাকে জিজ্ঞাসা করুন তাে এনিটি ভ্যালেন এখন কেমন আছেন? ওনাকে জিজ্ঞাসা করুন তাে ক্যারােলিন ঠিক কোন দুর্ভাগ্যের শিকার। এ দুর্ভাগ্যের জন্য ছােট্ট ক্যারােলিনের কি দোষ ?

উইলিয়াম স্পষ্ট অনুভব করছে যে সে এখন জনতার দরবারে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামীর যে অবস্থা হয়, অনেকটা সেই রকম। ছেলেটি বলে উঠল,

—ন’বছরের ছােট ক্যারােলিনাকে নিয়ে কবিতা লিখলেন, অথচ তার পিতৃত্বের দায় নিতে পারলেন না। বাঃ, বাঃ, বাঃ!

জোরে জোরে হাততালি দিচ্ছে ছেলেটা, সবাইকে শুনিয়ে।

এ যেন মাদারিকা খেল হচ্ছে। উইলিয়ামের জিভ শুকিয়ে আসছে। ঠোট নড়ছে মৃদু মৃদু। খুব নিচ স্বরে শােনা যাচ্ছে। উইলিয়ামের গলা,

—১৭৯১ সাল। অষ্টাদশ শতকের শেষ লগ্ন। ফ্রেঞ্চ রেভলিউশনের টানে ফ্রান্সে পৌঁছে গেলাম। জীবনের চোরাস্রোতে পরিচয় হলাে অ্যানিটি ভ্যালেনের সাথে। তখন আমার কতই বা বয়স? বছর একুশ হবে। বিপ্লবের আঁচ আর একুশ বছরের উদ্দামতায় বীজ বপন হলাে ভ্যালেনের দেহে। আমার বীজ। পরের বছর আমরা বাবা-মা হলাম। ফুটফুটে ক্যারােলিন এল আমাদের জীবনে।। হঠাৎ যেন ফুপিয়ে উঠল উইলিয়াম,

—বিশ্বাস করুন, পাশে থাকতে চেয়েছিলাম ওদের। কিন্তু শত হলেও আমি ইংল্যাণ্ডের নাগরিক। ওদিকে ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের কূটনৈতিক সম্পর্ক তখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। বাধ্য হলাম ইংল্যান্ডে ফিরে আসতে। | চাপা গুঞ্জন শােনা যাচ্ছে জনতার,

“বাঃ বাঃ বাঃ এই না হলে সার্থক বুদ্ধিজীবী, প্রতিষ্ঠিত। সেলিব্রিটি!

উইলিয়াম বুঝতে পারছে জনতার পারা চড়ছে। জনতা এবার | মারমুখী। ডরােথির হাত ধরে লেকের পাড় ধরে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছে উইলিয়াম। ওভারকোটটা পেছনে নিশানের মতাে পতপত করে উড়ছে। পেছনে উন্মত্ত জনতার গর্জন,

—দাঁড়ান, দাঁড়ান, দাঁড়ান বলছি। ঝপ ঝপ ঝ..

ক পড়ার শব্দ পাওয়া গেল। উইলিয়াম সাঁতার জানে না।

।। দুই।। স্থান : মিউডন, প্যারিসের শহরতলি কাল : বিংশ শতাব্দীর শুরু

চার্চবেলের শব্দ আর অর্গানের শব্দের মূৰ্ছনায় মায়াময় সমস্ত গির্জার চরাচর। মিউডনকে শহরতলি না বলে গ্রাম বললে অত্যুক্তি হয় না। এখানে শীতটা তাই একটু বেশি। বিশেষ কেউ নিমন্ত্রিত নয় এ বিয়েতে। এটা আতসবাজি ফাটিয়ে বিয়ে করার মতাে অনুষ্ঠান নয়। ফাদার আর চার্চের দু’চারজন মানুষ উপস্থিত। এটা মূলত রােজির আবদার রাখা। জীবনের শেষ প্রান্তে হলেও অন্ততঃ

একটি বারের জন্য ওয়েডিং গাউন পরতে পেরেছে রােজি। এটা | রােজির স্বপ্নপূরণের অনুষ্ঠান। অগাস্টের সারা জীবনের সুখ-দুঃখের সাক্ষী রােজি। তার এই আবদারটা ফেলতে পারেনি অগাস্ট। না হয় মৃত্যুর কদিন আগেই হল। তবু তাে হল। মৃত্যুর আগে ওরা স্বামী-স্ত্রীর সম্মান পেল ঈশ্বরের কাছে, সমাজের কাছে। এসব না হলেও কিছু থেমে থাকতাে না। সত্যি বলতে কি থেমে থাকেনি। ওদের একটা ছেলেও আছে।

অগাস্টের তখন কতই বা বয়স? বছর চব্বিশ হবে। বছর চারেকের ছােট রােজি বিউরেট নামের এক মহিলা দর্জির সাথে থাকতে শুরু করল। সেই শুরু। সেই দাঁড় টেনে চলেছে আজও। আজ এর সামাজিক স্বীকৃতি হলাে।

ধীর পায়ে নবদম্পতি বেরিয়ে আসছে চার্চ থেকে। ছিয়াত্তর বছরের কনে রােজি তার সাতাত্তর বছরের বর অগাস্টের হাত ধরে। হঠাৎই চোখে পড়ল, গুটি কয়েক লােক দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হয় নবদম্পতির অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছে। আপাদমস্তক ওভারকোটে ঢাকা। কাউকেই তেমন ঠাহর হচ্ছে না। এদেরই একজন এগিয়ে এসে একটা ফুলের তােড়া তুলে দিলেন নবদম্পতির হাতে। নবদম্পতির উদ্দেশ্যে বললেন,

—অভিনন্দন! একটু অবাক হলেন অগাস্ট। এরা কারা? জানল কী করে যে হঠাৎ আজ রােজির সাথে অফিসিয়াল বিয়েটা হচ্ছে? অগাস্ট বললেন,

ধন্যবাদ। জেনেই যখন গেছেন আমাদের বিয়ের খবর, তখন আর লুকাচ্ছি না। আপনাদের এই শুভেচ্ছা ভরা ফুলের স্তবক আমরা নবদম্পতি হিসাবে গ্রহণ করলাম।

একটু থেমে দ্বিধান্বিত চিত্তে বললেন, —আপনাদের ঠিক চিনলাম না। যদি পরিচয় দেন সুবিধা হয়। হাঁপাচ্ছেন অগাস্ট। পা কাপছে থরথর করে। শরীর আর দিচ্ছে অগাস্টের। যে ভদ্রলােক ফুলটা দিলেন তার কণ্ঠস্বর কানে এল,

—আমাদের আপনি “সময়” ভাবতে পারেন। “সমাজ” ভাবতে পারেন। “ঐতিহ্য” কিংবা “পরম্পরা”, “রীতি”, কিংবা “নীতি” ভাবতে পারেন। আপনার “বিবেক”ও ভাবতে পারেন। যেমনটা প্রাণ চায় ভেবে নিতে পারেন।

—ঠিক বুঝলাম না। সাতাত্তর বছর বয়েস। বাইরে ঐ ঠাণ্ডা শরীর আর পারছে বইতে। আর কটা দিনই বা আছে। ডাক্তার তাে বলেই দিয়েছেন দিন এখন গােনাগুনতি। এর মধ্যে এই উটকো লােকগুলাে কোথা থেকে উদয় হলাে কে জানে!

| সে একটা সময় ছিল যখন উনি কাজ নিয়ে লড়ে যেতে পারতেন, খেয়ে না খেয়ে, দিনের পর দিন। শত হলেও ভাস্কর উনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাথরের ওপর চিসেল মেরে পাথরের প্রাণটুকু বের করে আনাই ওনার কাজ। এতে দৈহিক পরিশ্রম কম নয়। শিল্পী হলেও উনি ললিত লবঙ্গলতা নন। চিলেস চালিয়ে কড়া পড়ে যাওয়া হাত ওনার। দি কিস, থিংকার, এর মতাে ভাস্কর্যের ইতিহাসে এক একটা অধ্যায় সৃষ্টি হযেছে এ হাত দিয়ে। সে সব এখন অতীত। আগন্তুকদের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠলেন,

—ওল্ড ক্যাসেলে একটা স্টুডিও আপনি কিনেছিলেন। মনে আছে? বৃদ্ধের সামনে স্মৃতির জানলা হঠাৎ দুম করে খুলে গেল, —হা, হা বিলক্ষণ মনে আছে। কি যেন একটু ভেবে বললেন, —হঠাৎ এ কথা কেন? —সেখানে কে থাকত আপনার সঙ্গে? খানিকটা ইতঃস্তত করে শেষটায় বলেই ফেললেন,

ক্যামেলির সাথে থাকবাে বলে ওটা কিনেছিলাম। একটু থেমে বললেন, —হঠাৎ আজকের এই বিশেষ দিনে এসব প্রশ্ন কেন? ক্যামেলি এখন কেমন আছে জানেন? —না তাে। —জানতে ইচ্ছে করে? —খু-উ-ব। আপনারা কি জানেন কিছু? —পাগলা গারদ তার বর্তমান বাসস্থান। কানফাটানাে চীৎকার করে উঠলেন অগাস্ট, —না, না। হতে পারে না। এটা ঠিক না। এটা অন্যায়। আগন্তুক ভদ্রলােক বললেন,

আপনার যাই মনে হােক, এটাই বাস্তব। ভদ্রলােক দৃঢ়কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন,

ক্যামেলিকে আপনি পুরােপুরি ছেড়ে দিলেন কেন? ও ঠিক

কি দোষ করেছিল?

স্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছেন অগাস্ট। স্বগগাতির মত বলে চলেছে,

আলফ্রেড বাউচার আমার বিশেষ বন্ধু। সে-ও ভাস্কর। আমারই মত। অ্যালফ্রেডের অনুরােধে ওর কটা ওয়ার্কশপ করাতে গিয়েছিলাম ওরই স্টুডিওতে। প্রথমদিন নজরে পরে মেয়েটিকে ক্যামেলি ক্লাউডেন। একটা খরস্রোতা নদী যেন। সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বলে পণ করেছে। আমি তখন বছর পঁয়তাল্লিশের প্রৌঢ়। ও অষ্টাদশী। অজগরের মতাে টানছে আমায় ক্যামেলি। এ এক পাগল পাগল ভাব। অসম বয়সের প্রেম। আশপাশের সবাই সব বুঝছে। আমিও বুঝছি। কিন্তু সংযত রাখতে পারছি না নিজেকে। | আঠারাে বছর আমাকে কোন চুলােয় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কে

জানে? একটা ঝােড়াে সম্পর্ক জন্ম নিচ্ছে দ্রুত। ও আমার ছাত্রী থেকে প্রেমিকা। প্রেমিকা থেকে মডেল। মডেল থেকে সৃষ্টি। সৃষ্টি থেকে প্রেম। নতুন করে রােজ আবিষ্কার করছি ওকে। বহুদিনের মজে যাওয়া পুকুরে কোন দুষ্টু ছেলে ঢিল ফেললে যেমন তরঙ্গ হয় অনেকটা তেমনি। আমার হেজেমজে যাওয়া দেহ মনে তরঙ্গের ওঠাপড়া। আমি তখন ঘােরের মধ্যে। ক্যামেলির অবস্থা আরােই করুণ। ইতিমধ্যে রাইনের মধ্যে দিয়ে কত জল বয়ে গেছে খেয়ালই করিনি। খেয়াল পড়ল, যখন বুঝলাম ও আমাকে রােজির থেকে | ছিড়ে নিয়ে আসতে চায়। ও আমাকে ভাগ দেবে না। আমি ওর একার। এটা তাে ভালােবাসার চিরকালের দাবী। ও ছােট মেয়ে। ও বলতেই পারে। আমিই বা কি করি? রােজি আমার যতােটা না সঙ্গিনী তার চেয়ে বড়াে সহযােদ্ধা। বহু বিনিদ্র রাতে ও আমার | শিয়রে হাত রেখেছে। সর্বোপরি ও আমার সন্তানের মা। ওকে

আমি কোন ধর্মে ছেড়ে যাই? আমার দ্বিচারিতায় দুই নারী পুড়ছে। তাদের আগুন নেভাতে গিয়ে আমি জুলছি দাউ দাউ করে। প্রেমের শ্রেষ্ঠ পরিণতি বুঝি এই পুড়ে যাওয়া। পুড়ে না গেলে বুঝি প্রমাণ হয় না—ভালােবেসেছিলাম।

হাঁপাচ্ছে অগাস্ট। আজ বুঝি সে কনফেশন বক্সে বসেছে। ধীরে ধীরে বললেন,

—যে ঝিনুকটার গায়ে বালি লাগে, সে ঐ বালির জন্য অসহ্য যন্ত্রণা পায়। সেই যন্ত্রণা এক লালা নিঃসরণ করে। সে লালা বালিকে মুড়ে রাখে। ঐ লালায় মােড়া বালিই মুক্ত। যন্ত্রণা তাে সৃষ্টির | গােড়ার কথা। সেদিনের সে যন্ত্রণা একের পর এক জন্ম দিয়ে 566165—“The kiss”, “The Thinker”, The Gate of Hell”। সুধীজন বাহবা দিচ্ছেন। আমি পুড়ে যাচ্ছি। একটু থামলেন অগাস্ট। স্বর খুব নিচু। তবু বলেই চলেছেন,

—একটা নৌকা আমাকে বাছতেই হল। রােজিকে ছাড়তে না পারার কথা শুনে ক্যামেলি পাগল হয়ে গেল। আক্ষরিক অর্থে পাগল। ডাক্তারি ভাষায় নার্ভাস ব্রেকডাউন।

অগাস্ট বসে পড়ছেন মাটিতে আস্তে আস্তে। সবাই রে রে করে এগিয়ে এসে ধরাধরি করে গির্জার ভেতরে আনছে। বিশাল একটা ক্রশের নীচে শায়িত অগাস্টের দেহ। 

॥ তিন ৷৷ স্থান : কলকাতা ও তার উপকণ্ঠ কাল : বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ

জোর আড্ডা জমেছে কুয়ােতলায়। ঠিক আড্ডা না। কেচ্ছাসংকীর্তন। আশপাশের বৌ ঝিরা সব এই সময়টায় কুয়ােতলায় জড়াে হয়। এদের পরনিন্দার বিষয় পরিবর্তনশীল। কখনাে এই বাড়ির ঝি তাে কখনাে ঐ বাড়ির বৌ। আজ হঠাৎ দাশবাবুকে নিয়ে পড়েছে। সবাই যেন এক একটা চলন্তিকা। দাশবাবু সম্বন্ধে সকলেই কমবেশি খবর রাখে। কে আগে কতটা রসিয়ে কুচ্ছ গাইতে পারে তারই প্রতিযােগিতা যেন। পালের গােদা মােক্ষদার মার গলা আগে যায়,

—তুই একটা লেখাপড়া জানা লােক। তাের অন্য মেয়ের প্রতি এত সােহাগের কি হল?

এদের মধ্যে দু একজন কিঞ্চিৎ আনাড়ি। তারা জানে কম। তাদেরই একজন বলল,

—কার ওপর সােহাগের কথা বলছাে গাে দিদি?

—কেন? লতাকে তাে আমাদের দাশবাবুর ভীষণ মনে ধরেছে। সে খবর বুঝি জানা নেই? এ তল্লাটের সবাই তাে জানে সে কথা।।

—লতাটা আবার কে?

বনলতা রে। বনলতা। যে এতক্ষণ লতাকে চিনতে পারছিল না, এবারে পুরাে নামটা শুনে ওর র্যাডারে সব ধরা পড়ে গেছে। নিশ্চিত হবার জন্য বলল,

—ঐ সেন বাড়ির মেয়ে বনলতার কথা বলছাে তাে?

—হা, হা সেন বাড়ির বনলতা। হ্যা, হঁা, শুনেছি বটে। তার। নামে একখানা গােটা কবিতা লিখেছেন আমাদের দাশবাবু।

কোন এক আগ্নেয়গিরি জেগে উঠল,

—আ মরণ! ঝটা মারাে অমন প্রেমের মুখে। ঘরে একটা বিয়ে করা বৌ রয়েছে। একটা মেয়ে রয়েছে। অথচ বনলতাকে। নিয়ে আদিখ্যেতা।।

বউ আবার কে?

—কেন, লাবণ্যপ্রভা দাশ। একটা মেয়েও তাে আছে দাশবাবুর। মঞ্জুশ্রী না কি যেন নাম।। একটা অভিজ্ঞ কণ্ঠ জেগে উঠল,

—ওই তাে বউয়ের ছিরি। টালিগঞ্জের বায়স্কোপ নিয়ে ব্যস্ত তিনি। তার স্বামীর ঘর নিয়ে মাথাব্যথা আছে নাকি? | এনসাইক্লোপিডিয়ার মনুষ্যরূপী এক মহিলার কণ্ঠস্বর ভেসে

এল,।

—দাশবাবু এমনিতে মানুষ ভালাে। পণ্ডিত মানুষ। কিছু পুরস্কার টুরস্কারও নাকি পেয়েছেন। বরিশালের বৈদ্য ব্রাহ্ম পরিবার। কট্টর ব্রাহ্ম পরিবার। এক্কেবারে রামমােহনের চ্যালা। দাশবাবুর মা, মানে কুসুম কুমারী দেবীর কবিতা আমরা কে না জানি বল?

—মা-ও কবিতা লেখে? তার কোন কবিতার কথা বলছাে? —ঐ যে “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে…”

ওদিকে মােক্ষদার মা মূল স্রোতে ফেরার চেষ্টা করছে,

—ও বাবা! এ তাে দেখছি দাশবাবুর জন্য দরদ একেবারে উথলে উঠছে।

—না না ওসব দরদ টরদ কিছু নয়। আসলে কি জান—দাশবাবু সেই যে ছােটবেলায় নিজেরই খুড়তুতাে বােন শােভনার প্রেমে পড়ল, সেই থেকেই গেরণ লাগল। না তাকে পাওয়া হল, ওদিকে বাড়িতে অকথ্য গাল-মন্দ শুনতে হল। সব নিয়ে মানুষটা ভেঙে চুরে গেল।

—ও বাবা এ যে দেখছি গুণের ঘাট নেই। নিজের বােনের সাথে এইসব। | দেখ না দেখ হঠাৎ সবার নজর পড়লাে, পাশের বাঁশবন দিয়ে দাশবাবু চলেছেন। আনমনে উদাসীন। মােক্ষদার মা আর সামলাতে পারল না,

—এই যে শিক্ষিত ভদ্রলােক। দাশবাবু নরম সরম, নির্বিকার গােবেচারা গােছের মানুষ। দাঁড়িয়ে বললেন,

—আমায় কিছু বলছেন? —হ্যা। আর কেউ কি আছেন এখানে? বলুন।

—হঠাৎ এখান দিয়ে যে যাচ্ছেন বড়? কুয়ােতলায় এতগুলাে মেয়েমানুষ, তাই একটু দেখতে সাধ জাগল বুঝি ?

—এসব আপনি কি বলছেন? —বলি এখানে একটা সমাজ বলে জিনিস আছে তাে নাকি? —হা, সে তাে আছে। কিন্তু হঠাৎ এ কথা কেন?

—কেন মানে? নিজের তাে ঘরে বউ আছে। পরের বাড়ির মেয়ে-বউ নিয়ে টানাটানি কেন?

কাকে টেনেছি? —সেন বাড়ির মেয়ে বনলতাকে নিয়ে টানাটানি করেন নি? দাশবাবু ভয়ে পিছােতে শুরু করেছেন। এদের সব যা রুদ্রমূর্তি তাতে মেরে দিতে পারে। উনি দৌড়তে শুরু করেছেন। পেছনে সমাজ সংস্কারকদের সমবেত সারমেয় চিৎকার,

—থামুন, থামুন, থামুন বলছি। খালবিল, মাঠঘাট পেরিয়ে দৌড়ে চলেছেন দাশবাবু। কলকাতা পৌঁছে গেছেন দৌড়তে দৌড়তে। পেরিয়ে গেলেনে রাসবিহারীদেশপ্রিয় পার্ক। ট্রামলাইন ধরে দৌড়াচ্ছেন। পেছনে ধাবমান ট্রামের ঘণ্টির আওয়াজ। কিছু কানে ঢুকছে না ওনার।। একটা জোরালাে আওয়াজে চরাচর বিদীর্ন হয়ে যায়, —দড়াম, দুম, ঘট ঘট। কান ফাটানাে একটা চিৎকার শােনা গেল। সব শেষ। নিথর একটা দেহ পড়ে আছে ট্রামলাইনের ওপরে।

“এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি রক্ত ফেনা-মাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতাে ঘাড় গুজি…”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *