কাশ্মীরে কান্না – ড. মহাদেব চন্দ্র দাস

উপন্যাস সাহিত্য
Spread the love

সােপিয়ান উৎসবের সূচনা হয়েছে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত এবং কাশ্মীরের সঙ্গীতের মাধ্যমে। এইখানে হাজার হাজার লােকের উপস্থিতিতে এই উৎসব। উৎসবে প্রধান অতিথি ছিলেন সােপিয়ানের জেলা শাসক। খুবই উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যেই এই অনুষ্ঠান। আকশার আশা শেষ হল। সমিম আর আকশার কথাবার্তাও পরিপূর্ণতা পেল না। আধাসামরিক বাহিনী। বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালালাে কিন্তু কোথাও কাউকে পেল না। চারিদিক থেকে উড়াে খবর আসছে। মােবাইল পরিসেবা টিভির কানেকশান পুরােপুরিভাবে বন্ধ হয়ে গেল। সঠিক খবর জানার পরিস্থিতিও নেই।

তাড়াহুড়ার মধ্যে কে কোথা দিয়ে পালাচ্ছে কেউ জানে না। এরই মধ্যে দেখা গেল বিপর্যয় মােকাবিলার গাড়ি বা দমকল ছুটছে। অগ্নিনিবারক গাড়িটি সােপিয়ান কলেজের মধ্যে প্রবেশ করলাে। কলেজ ক্যান্টিনের পাশেই ম্যানহােলের পাশে উপস্থিত হল দমকল, সবাই সেইদিকে গেল। বিশাল বড় গর্তের মধ্যে লম্বা মই প্রবেশ করলাে আর দুজন লােক ঐ গর্তের মধ্যে নামলাে এবং একটা গােরুকে দড়ি দিয়ে টেনে তুললাে। সেনাবাহিনীর লােকেরা গােরুর সাথে। বাঁধা হাতিয়ার উদ্ধার করলাে। কাশ্মীরি আতঙ্কবাদীরা ভেড়ার সাথে এ ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র এক জায়গা থেকে – অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। আমি একজন সেনা। অফিসার, এই কথাটা বলতে ভালােই লাগে। কোন মানুষটা কীভাবে চলছে, কেন পশুটা কী করছে সেই দিকেও নজর রাখতে পেরেছি বলেই অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। আমাদের চারিদিকে চোখ রাখতে হয়। ঐ সময় ভাই সমীর আমি যদি না দেখতে পেত তােমার অবস্থা হয়তাে পশুদের মতাে হতাে। তােমার সাথে হয়তাে মারাত্মক অস্ত্র দিয়ে, কিংবা বােম বেঁধে ওই উগ্রবাদীরা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারতাে। ওরা সব পারে।

—আসলে আমি কোনদিকে যাবাে ভেবে পাচ্ছিলাম না। যেই | দিকে বেশিরভাগ লােক যাচ্ছিল, আমিও সেই দিকে যাচ্ছিলাম।

—যাদের সাথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন ওরাই সােপিয়ানের মেলা বানচাল করলাে, বােমা মারলাে। সমীর ভাই তুমি যদি ওদের সাথে আরও কিছু যেতে তাহলে তােমার সাথেও আগ্নেয়াস্ত্র বেঁধে দিত আর ওদের কার্য সিদ্ধ হত। —আসলে আমি তাে কাশ্মীরকে জানতে এসেছি, এখানে সব

জায়গায় দেখার মতাে। মেলা দেখলাম বলেই কিনা কাশ্মীরের সাংস্কৃতিক চর্চা সম্বন্ধে জানলাম। আমার কৌতুহল সেই সময় আরও বাড়লাে, দমকল বাহিনীর সাথে সেনারা। আপনাদের পােশাক আমার কৌতূহল বাড়ালাে। আপনি আমাকে ইশারা দিলেন বলেই আপনার সঙ্গ ধরলাম আর গােরুটার দুর্গতি দেখলাম।

সমীর বানিহাল স্টেশন থেকে নেমেই রামবন যাওয়ার সুমাে ধরবে আর রাতেই রামবনের কোনও হােটেলে থেকে যাবে। বানিহাল স্টেশন থেকে মেন সড়কে এসে জানলাে, আজ আর রামবনের দিকে এগােনাে যাবে না প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সুন্দর লােকটি বলল, নিচে চলি যাও এক বড়াছা হলঘর হা আওর উহাপে শাে যাও। বহুতসারে কম্বল হ্যায়,

ইসকে লিয়ে কহি পয়সা নেহি লাগেগা। কমল আর সমীর আরও

কয়েকজনের সাথে নিচের দিকে গেল কিন্তু কোথাও কোনও ঘর খােলা নেই। লােকটি কি মারার জন্য এনেছে? কমল সর্বদা সন্দেহপ্রবণ। আসলে এটাই বােধ হয় সেনাদের বৈশিষ্ট্য।

সমীর, কমল সমেত সাতজন ফিরে যাবে এমন সময় সেই লােকটি একগােছ চাবি নিয়ে আসলাে আর দরজা খুলে দিয়ে বলল, আপনােক ইধার রহিয়ে গা। কা অসুবিধা নেহি হ্যায়।

বিশাল ঘরের মধ্যে পাশাপাশি শুয়েছিল কমল আর সমীর এবং পাশেই অজয়। কমল বলতে থাকলাে আমাদের জীবনটার কোনও মূল্য নেই। আমি কাশ্মীরের পুঞ্চে ডিউটি দিচ্ছিলাম। কত ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি তার কোনও হিসাব নেই। আজ আমরা বানিহালের সরকারি ব্যবস্থায় থাকছি কিন্তু নিরাপদ না। যখন তখন আমরা বিপদে পড়তে পারি। সীমান্ত এলাকায় বিপদ আরও অনেক বেশি। আজকে বেশি বেশি মনে পড়ছে। তােমাকে আমি বাঁচাতে পারলাম কিন্তু সেই দিন পারিনি।

—কীরকম?

সীমান্ত অঞ্চলে বরাবর আমাদের ছাওনি থাকে। এই ছাওনিগুলিতে জলের লাইন, ইলেকট্রিকের লাইন থাকে। এ ছাড়াও আর অনেক কাজ আছে তা করতে অনেক লােকের দরকার। এই দিন জলের লাইন খারাপ ছিল। ছাওনিতে সাপ্লাই লাইনের কাজ করছি তিনজন সাধারণ লােক। আমি তাদের সাথে কথা বলছিলাম।

একজনের নাম রফিক লােন, বয়স্ক মানুষ বড় পাকা দাড়ি আছে। অন্য দুজনে একসেদ আর ভজন সিং। রফিক লােন বিড়ির ধুয়াে ছাড়ছে আর বলছে আজ আমি বাধ্য হয়েই প্লাম্বারের কাজ করছি। আমারও অনেক জমিজায়গা আছে কিন্তু সব জমি তারকাটার ওপারে চলে গেছে। সংসার চলতাে চাষবাস করে। কিন্তু এখন চাষবাস করা প্রায় বন্ধ। তারকাটার ঐপারে যাওয়া যায় সকাল আটটায় আর ফিরতে হয় বিকাল পাঁচটার মধ্যে। এই এলাকায় সীমান্ত বলতে লাইন অফ কন্ট্রোল। ঐ পাশের জায়গায় বড়গাছ লাগানাে যাবে না। কলা জাতীয় বাগান এক্কেবারে নিষিদ্ধ। এই এলাকায় সমস্যার শেষ নেই। ঐ পারে কাজের লােক পাওয়া যায় না। যদিওবা দুচারজন পাওয়া যায় তারাও বেশি টাকা দাবি করে। এখন যা পরিস্থিতি ঐ জমি এখন আর আমাদের না। যদি কোনও কারণে মুনিষ পাওয়া যায় তাে দুই নম্বরি লােক ঐ কাজের মাধ্যমে ঢুকবে এবং পাকিস্তানে ঢুকে যায়। আর আসেনা তখন। আমরা পড়ি বিপদে। চারিদিক থেকে চাপ আসে। চোরাচালান আমাদের এখনকার রুটিন কাজ। আমাদের জমির পাশেই অনেকগুলাে বস্তা দেখেই আমি চমকে গেলাম। সন্ধে নামলেই এগুলাে পাকিস্তানে পাড়ি জমাবে। টহলরত নিরাপত্তা কর্মীরা মােটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এইসব চোরাকারবার চলতে থাকলাে। মুহূর্তের মধ্যেই পাকিস্তানের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি এল আর রক্তাক্ত হয়ে গেল রফিক মিয়া। একসেদ আর ভজা সিংও গুলি বিদ্ধ হয়ে ছটফট করতে থাকলাে, আমরা অসহায় মানুষগুলিকে বাঙ্কার থেকে দেখতে লাগলাম আর পাল্টা গুলি

ছুঁড়তে থাকলাম পাকিস্তানের দিকে। লাগাতার গােলাগুলির মধ্যেই আহত ভজন সিং আর একসেদকে জীবন্ত উদ্ধার করতে পারলাম না। আমাদের গুলি শেষ।

আমি পুঞ্চের ঐ সেক্টরে প্রায় একবছর ধরে ডিউটি করেছি। ভজা সিংকে রােজই দেখতাম যাচ্ছে। সকাল হলে মদ গেলা দিয়ে শুরু করতাে। ভজা সিং সবার সাথে যেচে কথা বলতাে। আমাদের ক্যাম্পের অনেক টুকিটাকি কাজ করাতাম সামান্য মদের বিনিময়ে। ভজা সিং মদ খেয়ে মাতলামি করতাে, বকবক করতাে নিজে নিজে। কখনও অন্য কারও সাথে মাতলামাে করতাে না। একদিন দেখলাম বর্ডার এলাকার ল্যাম্পপােস্টকে গালাগালি দিচ্ছে।

| সেই ভজা সিংকে পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারছি না। আমরা | বারবার চেষ্টা করেও রফিকের মৃতদেহ উদ্ধার করতে পারিনে। রক্ত ক্ষরণ হতে হতে আমার চোখের সামনে ভজা সিং আর একসেদ মরে গেল। আজও চোখ বুজলে তাদের কথা ভাবি। বডি উদ্ধার করি ও। আমরা একাধারে মর্টার চালালাম অন্যদিকে একে ৪৭ চালাতে থাকি আর সেই তিনজনের পচাগলা মৃতদেহ উদ্ধার করি। এইতাে অবস্থা সীমান্তপারের।

আমরা যখনই কোনও উল্টোপাল্টা জিনিস দেখতে পাই তখন থমকে যাই। কোনও কারণে আমাদের দুর্বলতা টের পায় শত্রুরা আমাদের টহলদারি এলাকার মধ্যে মাইন পুঁতে থাকে আর আমরা যদি সেই পাতা ফাঁদে পা দেই তাহলে মৃত্যু অনিবার্য। অনেক সময় নলের মতাে জিনিস দেখা যায় সীমান্তের রাস্তায়। কোনও কারণে কৌতূহলী জনতা যদি ঐ নলে হাত দেয় তাহলেই বিপদ। ঐ নলে সেন্সর লাগানাে থাকে। দিনমানে সূর্যের আলাে পড়ার সাথে সাথে বিস্ফোরণ ঘটে আর নিকটে যারা থাকে তারই বেশি আহত হয়।

স্বাভাবিক অবস্থায় দুই দিন দিনে ডিউটি থাকে আর একদিন রাতে ডিউটি। সকালবেলায় প্রায় এক ঘণ্টা শরীর চর্চা করতেই হবে। কোনও কারণে সীমান্ত উত্তেজনা পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তখন দিন আর রাতের ব্যাপার থাকে না। বাড়িতে যাবাে বললেই বাড়ি | যাওয়া যায় না। অনেক কষ্টে ছুটি জোগাড় হল। আমি প্লেনের | টিকিট পেলাম কিন্তু কালও কোনও বিমান শ্রীনগরে নামেনি আর

কোনও বিমান আসেনি। আমাকে আবার আসতে হল সােপিয়ানে। রিশিডিউল করে আগামীকাল কলকাতায় ফিরবাে। কিন্তু মেটেরােলজিক্যাল আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে আগামী চারদিন আবহাওয়ার কোনও পরিবর্তন হয়নি।

আগামী কাল যে প্লেন ওঠানামা করবে তা কেউ জানে না।

সমীর ও আমিও তাে বিমান ধরতে পারিনি। তাইতাে সােপিয়ানে | এসে সময় কাটাচ্ছিলাম।

| স্বপ্ন আজ বাস্তব বানিহাল থেকে রামবন একবার যেতে পারলেই জম্মুও যাওয়া কোনও ব্যাপার না। সমীর কলকাতা থেকে কাশ্মীরে এসেছে তার বান্ধবী আকশাকে একবার দেখতে। অনেক কষ্টে শ্রীনগর

এয়ারপাের্টে দুইজনার দেখা হয় কিন্তু প্রাণখুলে কোনও কথা হয়নি। খারাপ আবহাওয়ার জন্য সমীর কলকাতায় যেতে পারেনি। অন্যদিকে আশার হাতে দুটো জিনিস এসে যায় একই সাথে।। শুধুমাত্র সমীরকে দেখবে বলেই দিল্লি আগ্রায় শিক্ষামূলক ভ্রমণের জন্য তদ্বির করেছিল আকশা। এই দিকে সােপিয়ান মেলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অনেকদিন ধরে প্রস্তুতিকে নস্যাৎ করে দিল। | আকশার দিল্লি যাওয়া হল না বিমান বাতিলের জন্য। সােপিয়ান। উৎসবে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিজেকে নিয়ােগ করল আকশা কিন্তু উগ্রবাদী কার্যকলাপের জন্য তার আশা পূর্ণ হয়নি। কিন্তু এই ভাঙা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হওয়াতেই সমীরের সাথে তার দেখা হয় এবং কিছু সময় একসাথে লুকিয়ে থাকতে পেরেছিল। হই-হট্টগােলের সময় যে যার মতাে করে ছুটেছিল। সমীর আর আকশা একটা দোকানে আশ্রয় নিয়েছিল এবং দোকানদার বাইরে থেকে বন্ধ। করারও সুযােগ পায়নি। সেও তার জীবন নিয়ে পালিয়েছিল। কী করে দোকানের ঝপ পড়লাে এরা দুইজনার কেউই জানে না।

অনুষ্ঠান যদি মাঝপথে না থামতাে সমীর আর আকশা এক জায়গায় আসতে পারতাে না। আকশা সমীরের দিকে তাকিয়ে থাকলাে আর ভাবলাে, আমি কি স্বপ্ন দেখছি? যাকে এত কাছে। পাবাে কোনও দিনও ভাবিনি। আমি তাে প্রাণখুলে সব্বাইকে। বললাম, আমি ভালােবাসি কলকাতার একটা ছেলেকে যার নাম। সমীর, সমীর মানে বায়ু।

আমি আরও বলতাম, বায়ুকে ধরা যায় না, দেখাও যায় না। বায়ুকে কেবল উপলব্ধি করা যায়। আমার সমীরকে উপলব্ধি করতে পারি আমি। বায়ু যেমন অত্যাবশ্যক আমাদের জীবনে সমীরও তাই।। আমার বাবা মা কিংবা অন্য কেউ ভাবতাে, আমি মজা করি। আমি তােমার কাছ থেকে শুনতে চাই।

আমি সেই সুদূর কলকাতা থেকে এসেছি জানতে এবং তােমাকে জানাতে আমি কথার দাম রাখি। কথার দাম রাখতে গিয়ে যদি আমার প্রাণটা বলি দিতে হয় তাতেও আমার কোনও সমস্যা নেই।

তােমার হাতের কোনাে আঙুলের এই অবস্থা কী করে হলাে ? | আকশার ওড়না কাটলাে, তার আগে সমীরের হাতটা নিয়ে আঙুলটায় মুখ দিল, আঙুলটাকে জীবাণুমুক্ত করালাে আর ব্যাগের ভিতর থেকে বােরােলিন জাতীয় ক্রিম বের করে লাগিয়ে দিয়ে। ক্ষত স্থানটাকে বেঁধে দিল।

সমীর ভাবলাে, আমি তাে বুঝতেই পারিনি আমার হাতে ব্যথা লেগেছে। তাড়াহুড়াের সময় কোথা থেকে কী হয়েছে কে জানে! আমার কী ইচ্ছা তােমাকে নিয়ে চলে যাই কোলকাতায়। আমরা কল্যাণীতে জায়গা কিনবাে। ঐখানেই থাকবাে। আমাদের নান্না মুন্না হবে। তাদের নিয়ে খেলা করবাে।। | দিল্লি বহু দূর। আমিও তােমার সাথে চলে যেতে চাই কিন্তু এখন আমাকে নিয়ে যেতে পারবে না। যদি উপরওয়ালা চায় ঠিক। দেখা হবেই।

আমার প্লেন বাতিল হল, তােমারও প্লেন বাতিল। স্যার যখন বললেন, আমরা এবার দিল্লি যাবাে না, তাতে প্লেন চলুক আর

চলুক। তখন তুমিতাে কঁদছিলে। কিন্তু দেখ আশা প্লেন বাতিল -হলে তুমি কী সােপিয়ানে ফেরত আসতে? তােমার হাত যদি কাটতাে আমি কি তােমায় এই সামান্য পরিসেবা দিতে পারতাম?

সমীর আর আকশা এক্কেবারে পাশাপাশি বসল। এরা দুজন কখন যে এত কাছে চলে এল তা এরাও জানে না। সমীরের হাত আকশার পিঠে রাখলাে। আকশার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লাে সেই ছোঁয়া। আকশা এই প্রথম কোনও পুরুষের ছোঁয়া পেল। এত কাছে একাকী বসেওনি। আকশা সমীরের দিকে তাকিয়ে বললাে, আচ্ছা আরও একবার ভাবলে হয় না।

—আমি এত দিন অনেক ভেবেছি। ভাবতে ভাবতে কত রাত কত দিন গিয়েছে তা কি তুমি জান? তুমি কী ভাবছাে? | সত্যিই বলছি। আমি ভাবতাম তুমি শুধুই স্বপ্ন, ভাবনার জগতের লােক কিন্তু সেই দিন বিমানবন্দরে তােমায় যখন প্রথম দেখলাম আমার হিসাব-নিকাশ সব পাল্টে যায়। আমি এতদিন বাবা মাকে মজা করে তােমার কথা বলতাম। কিন্তু আজকাল আর সেই রকম বলতে পারি না। এখন তুমি শুধু বাস্তবের। এখন আমার মনে একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি কি তােমার কাছে, তােমার পরিবারের কাছে প্রিয় থাকতে পারবাে? আমি নিজেকে ভাবি আমি কিছুই জানি না। আমার ভাষা, আমার সংস্কৃতি আমার ধর্ম আলাদা, তাঁরা কি মেনে নেবেন?

—তােমাকে কী করে বােঝাবাে আকশা, তুমি এখনই আমাদের বাড়ির লােক হয়ে গেছে। আমার বাবা তােমার ফটো মাঝেমধ্যেই দেখে। বাবার বালিশের তলায় তােমার ফোটো। মাঝে মাঝে তােলে নিজে দেখেন আর মাকে দেখান। সমীর আর আকশা এমনভাবে রয়েছে যেন মনে হয় আমে দুধে মিশে গেছে। কিন্তু আকশা এই রকম অবস্থা তার জীবনে আসুক এটা কখনও চায়নি। আজ কাল বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানের পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজের পরিবর্তন ঘটেছে। দেশের সাথে তাল মিলিয়ে ছেলে মেয়ে মেলামেশাও বেড়েছে। কাশ্মীরের মতাে পাহাড়ি শহর গ্রামের অজগলিতেও এই মুক্ত হাওয়া ছড়িয়ে পড়েছে। এই এলাকার মুসলিম কট্টরবাদীরা যতই সক্রিয় থাকুক না পরিবর্তন গ্রাস করছে সর্বত্র। | আকশার স্কুলের পেছনের রাস্তা দিয়ে ছেলে মেয়েরা পাশাপাশি বসে গল্প করছে, অসংখ্য জুটি রাস্তাঘাটে দেখা যায়। আজকাল কাশ্মীরের সিনেমা হলগুলি হয়েছে এলাকার ছেলে মেয়েদের অবাধ মেলামেশার সেরা জায়গা। সােপিয়ানের সারে জাঁহা সিনেমা হলে বক্সে প্রায় পাঁচশাে সিট আছে। বক্সের সমস্ত টিকিট নিয়ে নেয় এলাকার দাদারা। কালু মস্তান এবং তার চেলারা এই টিকিট ব্ল্যাকে বিক্রি করে। একশাে টাকার টিকিট পাঁচশাে টাকায় বিক্রি করে, মােটা টাকার কামাই করে। আকশা এইসবকে কখনােই মেনে নেয়নি। আজ সে হিসাব মেলাতে পারছে না। এইরকম অবস্থা যাতে তার জীবনে না আসে তার জন্য ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে

চেয়েছে। কলকাতার ভাষা ধর্ম আলাদা এমন ছেলের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকার জন্য। ধর্মবিরােধ হলে তার সাথে কেবল বন্ধুত্ব হবে, এরকম অবস্থায় কোনাে চান্স থাকবে না। এই সব পরিস্থিতি না আসার জন্য তার কত হিসাব নিকাশ। কিন্তু আকশার সমস্ত হিসাব নিকাশ ভেঙেচুরে ছারখার হয়ে গেছে। আমাদের সমাজে একটা কথা প্রচলিত আছে যেখানে বারণ সেখানেই গমন।

| কিন্তু কেন? আকশার এই ভয় শুরু হয়েছিল শৈশব থেকে। আজও সেই ভয় তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। শৈশবে তাকে নিয়ে ঘুমােতাে তার বাবা ও মা। যেই মায়ের সাথে সে ঘুমােয় অনেক রাতে ঘুমের ঘােরে দেখতে পায় একটা মাকড়সা কীভাবে জাল। বুনছে, কীভাবে তার পাগুলাে ছড়িয়ে দিচ্ছে? কীভাবে সে তার খাদ্যকে ধরছে, কীভাবে তাকে আঁকড়ে ধরতে তার দিকে আসছে। ভয়ের মধ্যে সে তার বাবা ও মায়ের খোঁজ করছে, শিশুর সব থেকে বড় শান্তির জায়গা বাবা ও মায়ের আঁচল। মাকড়সা একনজরে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে! | আকশা এই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাে। পাশের ঘরে গিয়েই তার চক্ষু চড়কগাছ। সেই মাকড়সাটা এখানে মায়ের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে। মায়ের উপর চেপে ধরে হাত-পা মায়ের শরীরটাকে নিংড়ে নিচ্ছে।

সেই থেকে আমি আমার বাবাকে ক্ষমা করতে পারিনি। বাবা মায়ের ঝগড়াঝাঁটি হল, আমি তখন মায়ের পক্ষ নিতাম। মায়ের হয়ে বাবাকে খুন করার মনও তৈরি হয়েছিল সেটি মেয়েবেলা থেকেই। বিয়ে নামক বস্তুটাকে ভাবতাম ঐ ভয়ঙ্কর মাকড়সার আক্রমণ। কিন্তু সেই আমি কেমন করে চলে এলাম সামিমের কাছে।

আমার বাবা মায়ের মধ্যে এত ঝগড়াঝাঁটি মারামারি হয় তবুও তারা দুইজনার এক বিছানায় ঘুমােয়। আমি মাকে বলতাম চলাে আমরা মামার বাড়ি চলে যাই। এই অত্যাচারীর হাত থেকে রেহাই পাবাে। মামার বাড়িতে এত আদর আবদার আর বাবার শুধুই অবিচার শাসন। কিন্তু আমার মা ঘুরে ফিরে আবার বাবার কাছে আসে।

আমার শৈশবের ভাবনা চিন্তার আজ সবই অতীত। আমার সেই জেদ আর নেই। প্রথমত পুরুষ জাতটাকে আমি খারাপ চোখে দেখতাম, তাদের থেকে দূরে থাকতাম। আজ আমি পরিবর্তিত। আমার কাছে পুরুষ আর নারীকে সেইভাবে ভাবি না। আজ আমার পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলতে ভালাে লাগে। সমীর তােমার কাছে আমি কোনও জিনিস গােপন রাখবাে না। তুমি আমার সব। তােমার জন্যই আমার চোখ খুলে গেছে। আমি এখন নিজেকে কেবলমাত্র কাশ্মীরের কন্যা ভাবি না। আমি একজন ভারতীয়। পুরাে ভারত আমার, যে কোন জায়গায় যাওয়ার অধিকার আমার আছে, আমার এই ভাবনার পরিবর্তন করেই কেবল তুমি। তােমার চোখেই আমি পুরাে ভারতকে দেখতে পেয়েছি বলেই আমার ভাবনার পরিবর্তন এসেছে।

বানিহাল থেকে রামবন অসময়ে বিয়ের বাজনা সকাল সাতটার সময় বিছানা ত্যাগ করে জম্মু শ্রীনগর রাজপথে দাঁড়ালাম। যেদিকে চোখ যায় বরফ আর বরফ। কাল রাতেও যেখানে ছিটেফোটা বরফ ছিল না আজ সেখানে চার ইঞ্চি বরফ। আমি বরফের অবস্থা দেখে ভাবলাম এখান দিয়ে গাড়ি কি করে | যাবে? আমাকে হাঁটতেই হবে। একটাই সান্ত্বনা আমি নিচের দিকে

যাচ্ছি। একটু কিছুদূর গেলে রাস্তায় বরফের আধিক্যতা কমে যাবে। | ইতিমধ্যে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে থাকা দুটো গাড়ির মধ্যে একটা গাড়ির ইঞ্চিন চালু হল। এই দুটো গাড়ির ছাদে তিন চার ইঞ্চি পুরু বরফের চাদরে ঢাকা। এই গাড়ির ছাদের লাগেজগুলির উপরেও বরফ। এই গাড়িতে যেসব যাত্রী কাল রাতে তারা বুক করেছিল। অগত্যা পাশের দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে যদি জায়গা পাওয়া যায় তাহলে তাে আর সমস্যা নেই। এই সুমােটা ইঞ্জিন গরম করছে আর সবাই গিয়ে বসল। আমি ভাবলাম এখানেও আমার স্থান হবে না। এই গাড়ির ড্রাইভার সামনের কাচের উপর জমে থাকা বরফ পরিষ্কার করতে করতে বলল, আমার এই গাড়ি ফুল, তবে একজন কখন বেরিয়েছে, যদি তিনি না আসেন আপনি আসতে পারবেন। আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি স্টার্ট দিল আর আমি পেছনের সিটে গিয়ে বসলাম।

সুমােটি চলতে থাকলাে বরফের উপর দিয়ে। একটু দূরে যাওয়ার পর গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়লাে এবং জানতে পারলাম, আটটার সময় চেকপোেস্ট খুলে দেবে।

ইতিমধ্যে আরও কয়েকটি ফোর্ট গাড়ি চেক পােস্টের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড় করিয়েদিল এবং আটটা বাজার অপেক্ষায় থাকলাে। ইতিমধ্যে আটটা বেজে গেলাে কিন্তু কোনও গাড়ি আর ছাড়লাে

। | গাড়িতেই বসে থাকলাম। যে দিকে দুচোখ যায় পাহাড় আর পাহাড়। প্রতিটি পাহাড়ের মাথায় বরফের চাদর। এদিকে তুষারপাতের কোনও বিরাম নেই। গাড়ি থেকে নামারও সুযোেগ নেই। এখানে এই বরফের রাজত্বে বিভিন্ন পাখির কলতান শােনা যাচ্ছে। রাস্তার কুকুর লম্বা লােমশযুক্ত। তারা বরফের উপর দিয়ে তুষারপাতকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বরফের উপর দিয়ে খেলাধূলা করছে। আমি অবাক হচ্ছি বরফের তলায় কোথায় খাবার আছে খুঁজে বের করে বরফ আর সেই খাবার খাচ্ছে। এইগুলাে দেখে সুভাষদার কথাগুলাে মনে পড়ছে, সুভাষদা বলেছিল, আমি একটা সুন্দর লােমশযুক্ত কুকুরের বাচ্চা নিয়ে এসেছিলাম কাশ্মীর থেকে। আমার বাড়িতে ফ্যান চালিয়ে ঠান্ডার ব্যবস্থা, এসির ব্যবস্থা করলাম। সবাই আদরযত্ন করলাম, কিন্তু একদিন হঠাৎ মৃত্যুর কবলে পড়ে। কুকুরটা মারা গেল। আমি সেই সময় জানলাম কোনও পাহাড়ি বরফের কুকুর একবার যদি বরফ খেয়ে ফেলে, তাকে যতই আদরযত্ন কিংবা ঠান্ডায় রাখুক তবুও তাকে বাঁচানাে যায়

আমাদের চোখের সামনে দিয়ে অনেক লােক হাঁটা শুরু করলাে

রামবনের দিকে। আমি হাঁটতে থাকলাম। চেকপোেস্ট পার করলাম আর কমল নামক ফৌজির সাথে সাথে হাঁটতে থাকলাম।

তুষার ঝড়ে বানিহাল থেকে রামবন | বানিহাল থেকে কীভাবে এগােবাে? কতদূর যেতে পারবাে বুঝতেই পারিনি। কোনও চিন্তা ভাবনার অবকাশ নেই। আমার পিঠে সামান্য একটা ব্যাগ। কতলােক নিচের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে অনেক ব্যাগ নিয়ে। এরা যদি যেতে পারে আমিও পারবাে। আমার মনের মধ্যে বার বার উঠে আসছে আসার কথা। যেই আশা কেবলমাত্র ভাবনা করার, চিন্তার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা সেই আশা আমার বাস্তব। আকশাকে বাস্তবতায় আনতে গিয়ে আমাকে কতবড় ঝুঁকি নিতে হয়েছে সে কেবল আমিই জানি। যে আকশাকে ভাবনার জগৎ কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবের জগতে টেনে আনতে পেরেছে সমীর, সে কী রামবন যেতে পারবেনা, তাকি হয়!

বানিহালে সমীর যখন বসেছিল, কখন গেট খুলবে আর কখনই বা সে রামবনের দিকে যাবে। আকাশের দিকে তাকালেই ঘন কালাে মেঘে সূর্যকে ঢেকে দিচ্ছে। কিছুক্ষণের পর ঝনঝন শব্দ শােনা গেল। পেছন থেকে দুটো (লরি) গাড়ি আমাদের সামনে দিয়ে নিচের দিকে নেমে গেল। এখানকার ট্রাফিক সেনাদের এই গাড়িকে কোনও বাধা দিল না। যত বাধা কেবল আমার ক্ষেত্রে। আমি হলাম সাধারণ আর বাদবাকি ছয়জন সেনা। যদিও এই ক্ষেত্রে সবাই সাধারণ। চাকায় চেন থাকাতে বরফের মধ্যে দিয়ে এগােতে কোনও সমস্যা হচ্ছে না।

আর কতক্ষণ এইভাবে এক জায়গায় বসে থাকা যায়? আমি একাই বেরিয়ে পড়লাম চেক পােস্ট অতিক্রম করলাম ভয়ে ভয়ে, যদি না যেতে দেয়? চেনওয়ালা গাড়িগুলির জন্য বরফের উপর একটা রাস্তা তৈরি হল। হাঁটতে থাকলাম রামবনের দিকে। রামবন যেতে যেতে কত পথ হাঁটতে হবে তার সঠিক পরিমাপ জানি

। রাস্তার বামদিকে বিশাল খাড়া পাহাড় আর ডানদিকে চেনাব নদী। নদীর বিপরীত পাড়ের পাহাড় এবং পাহাড়ের মাথায় বরফের চাদরে রােদ যখন পড়ে বেশ সুন্দর ঝিলিক দেখার অনুভূতিই ভিন্ন ধরনের। দুই পাশের প্রকৃতি কী সুন্দর! এই হাঁটাকে আর হাঁটার মধ্যে ফেলা যায় না।

মাঝে মধ্যে আকাশ ভাঙছে আর কানফাটা আওয়াজ কানে আসছে। তুষার ঝড়ের পরিমাণ বাড়ছে। ইতিমধ্যে আমার পিঠের ব্যাগের উপর কয়েক প্রস্থ বরফ জমে গেছে। হাঁটছি আর এস্কিমােদের জীবনের কথা ভাবছি, তারা এইরকম বরফের রাজত্বে থাকে। আমি হাঁটছি আর আমার হাত-পা বরফ হয়ে যাওয়ার জোগাড়।।

রাস্তা মাঝে মধ্যে বাঁক পড়ছে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম যারা আমার আগে চলে গেছে তাদের সাথে আমার দেখা হবে না। হাঁটতে হাঁটতে দূর থেকে দুইজনকে দেখতে পেলাম। তাদের সাথে হাঁটলে হয়তাে সঙ্গী পেয়ে যাবাে। আমার সাথে থাকা কমলদের

কোথায় কখন হারিয়েছে বুঝতে পাচ্ছি না। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার দুপাশে তাকাচ্ছি কোথাও মাইলস্টোন আছে কিনা? আমি কতদূর এসেছি জানতে ইচ্ছা করে। আর কত পথ পার হলে রামবন আসবে। অবশেষে একটা মাইলফলক দেখলাম যেখানে লেখা আছে রামবন নয় কিমি।

হাঁটছি আর হাঁটছি দুই পাশের দৃশ্যাবলী দেখছি। এক জায়গায় একটা খুঁটির সাথে একটা মরা গােরুর পড়ে আছে। দুই পাশে কোথাও বসতি নেই। হয়তাে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আগে বাঁধা হয়েছিল গােরুটাকে। এই তুষারপাত সহ্য করতে না পেরেই গােরুটার মৃত্যু হয়েছে।

রাস্তায় দোকানপাঠও খুব একটা দেখা যায় না। যদি কোনও কারণে দোকানপাঠ দেখাতে পাই মন উৎফুল্ল হয়। রাস্তার পাশে একটা দোকান থেকে ছােটখাটো জিনিস কিনলাম। তুষারপাতের মধ্যে সামান্য বিরতি হল। আবার পথচলা শুরু। এই পথচলা শেষ হবে কখন জানিনা। পাকদণ্ডি পথ কিন্তু দুই পাশে বরফের দৃশ্যাবলী দেখে কোথাও কষ্টই কষ্ট মনে হয়নি।

রাস্তায় লােকজনের গমগম্য নেই বললেই চলে, যদিও দুই একজন লােক সরকারি কাজে যাচ্ছে আর আসছে। আমার ভাবনা যদি একবার রামসু অতিক্রম করতে পারি তাহলে আর চিন্তা নেই। আমরা রামবন পৌছে যাবাে। আমি প্রথম দিকে ভেবেছিলাম কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তার উপর বরফের কারপেট থাকবে না। কিন্তু দুই তিন ঘণ্টা পথ পার করার পরও বরফের কম নেই। রাস্তার বামদিকে পাহাড় থেকে বড় বড় পাথর খসে পড়ছে। যদি ভালাে করে দৃষ্টি না দিই তাহলেই বিপদ! | রাস্তা তাে নয় এত বরফের দেশ। শরীরের নিচের দিক ঠান্ডায় জমে গেছে। পদযুগল ঠান্ডায় বরফ হয়ে গেছে। হাতের আঙুলের অবস্থাও একইরকম। দূর থেকে একটা ঝাঁক দেখা গেল এবং কিছু দোকানপাট আছে বলে মনে হল। ঐ জায়গাটাই হল রামসু। রামসুর যত কাছে যাচ্ছি বাজি পটকার আওয়াজ তত পাচ্ছি। অসময়ে বিয়ের বাজি! রামসুর দিকে যত যাচ্ছি এই আওয়াজকে মনে হল ডিনামাইট বা করে পাহাড়ে স্থিত পাথর কয়লা তােলার শব্দ, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই এক জায়গায় কয়েকটি দোকান। এইখানেই দশ বারাে জন লােক বিশাল এই অভিযানে বিরতি নিচ্ছে। আমিও দাঁড়িয়ে পড়লাম এবং ডানদিকে তাকিয়ে দেখি পাহাড় ভাঙছে আর বড় বড় পাথরের চাই সমেত নিচে গড়িয়ে পড়েছে রাস্তার উপর। এই জন্যই এত বড় আওয়াজ।।

রামসুতে বস্তি আছে, মনে হল থাকার জায়গাও আছে। এইখানে কিছু স্থানীয় লােকজনকে সাহায্য করার জন্য তৈরি হয়ে আছে। ব্যাগটা বয়ে নিয়ে যেতে কত টাকা লাগবে তা নিয়ে দামাদামি করছে। সামনের বিশাল ধসের জায়গাকে অ্যারানাের একটা বিকল্প ব্যবস্থা অস্থায়ীভাবে করা হয়েছে।

লােকজন এই পথ দিয়ে রামবন থেকে রামসুর এই মােড়ে আসছে, এইভাবেই তারা বানিহাল পৌছে যাবে। উল্টো দিক থেকে যেই সব লােকজন আসছে আর আমরা জানতে চাইছি আর কত

পথ পার করলে রামবন আসবে। যারাই উপরে উঠেছে তারা। একটাই বলছে, চলতে রহাে। আমি ভাবলাম রামসুর কোনও হােটেলে খেলে আর এগােতে পারবাে না। মেন রাস্তা থেকে ডানদিকে এগােতে থাকলাম। একটু নামার পর নদীর উপর দিয়ে। সরু লম্বা লােহার সেতু। দেখলেই ভয়ে জিভ শুকিয়ে যাবে। এক পা দুই পা করে অতি সাবধানে এই সেতু পার করলাম। এইবার পাহাড়ের ওপরের দিকে উঠতে থাকলাম। সকাল থেকে যেই নদীকে দূর থেকে দেখে আসলাম সেই নদী একবার পার করলাম আবার পার করতে হবে তবেই আসবে মেন রাস্তা। হাঁটতে থাকলাম। এই রাস্তা পাহাড়ি বস্তির জন্য। অবশেষে রাস্তা আর নেই। পাহাড়ে স্থিত পাথর, বােল্ডার, কাদা বালি মাটির ভিতর দিয়ে পথচলা শুরু। ধীরে ধীরে হাঁটছি কিন্তু এখানকার লােকেরা দ্রুতগতিতে আমাকে অতিক্রম করছে। আমি ধীরগতিতে কচ্ছপের হাঁটা ধরলাম। নিচের দিকে তাকাতে ভয় করছে!

সেই ধসের জায়গাকে কাছ থেকে দেখলাম। পাহাড় ভেঙে রাস্তা এবং অবশেষে নদীতে পড়ছে আর বিকট আওয়াজ শােনা যাচ্ছে। জীবনে এত বন ধস আমি কোনওদিন দেখিনি। পাথর বােল্ডার খসে পড়ার কোনও বিরাম নেই।

ধসের চোটে এই এলাকায় রাস্তা আর রাস্তায় নেই। নদীতে। এমনভাবে পাথর পড়ছে যেন মনে হয় বাঁধ দিচ্ছে।

পাহাড়ের উপর দিয়ে হাঁটতে গেলে বারে বারে পা পিছলে। পড়ছি আর জঙ্গলের কাটা গাছকে আঁকড়ে ধরছি। কাটার গুতাে খাচ্ছি কিনা আমার হাতে সেই বােধ হওয়ার ক্ষমতাও নেই। এক ঘণ্টার বেশি সময় হাঁটার পর নদীর কাছে আসলাম। এখানেও। সমস্যা, লােহার সরু ব্রিজ পার হয়েই যেন রাস্তায় আসলাম।

জম্মু শ্রীনগর জাতীয় সড়কের উপর উঠলাম মনের মধ্যে আলাদা অনুভূতি এল। আর কিছুদূর পরই আমি চলে যাবাে রামবন। ইতিমধ্যে রাস্তার উপরে বরফের স্তর কিছুটা হলেও কমেছে। রাস্তার বামদিকে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একটা জায়গা পাঁচ সাতজন যাত্রী আগুন পােয়াচ্ছে আর চা খাচ্ছে। আমিও সামান্য বিশ্রাম নিলাম, চা খেলাম। এইখানেই একটা পােড়া আটা রুটি চিনি দিয়ে তৈরি, দাঁত দিয়ে ছেড়া যায় না, তবুও গিললাম। দুপুর একটা বাজলাে কিন্তু সকালবেলা ও দুপুরবেলার মিলিত খাবার একটা মিষ্টি আটারুটি আর এক কাপ চা। আবার হাঁটা শুরু। তুষারপাতের বিরাম নেই। রাস্তার ডানদিকে এক চালার তলায় দুটো লােক বাংলায় কথা বলছে। আমিও তাদের সাথে। আলাপ করলাম। একটা ছেলে বলল, ভাই আপনাকে পেয়ে বেশ। ভালাে লাগছে। আমরা একসাথে যাবাে।

—ঠিক আছে। আমরা তিনজন হলাম। একসাথে হাঁটতে থাকলাম। আমি পিছিয়ে পড়লাম। লােকদুটো আমার আগে চলে গেল। আমি কচ্ছপের গতি নিয়ে তাড়াহুড়াে না করে রামবনের দিকে এগােতে থাকলাম। ছেলে দুটো রাস্তার ডানদিকে একটা সেনা দপ্তরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লাে। আমিও সামান্য বিশ্রাম নিলাম আর

আগুনের হালকা গরম করে নিলাম। এরই মধ্যে লম্বা ছেলেটি একটা ফৌজিকে অনুরােধ করছে এখানে থাকার জন্য। আমি ভাবলাম বেলা এখনও অনেক বাকি, রাস্তাও বেশিদূর না। এই ছেলেদুটোর বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায়। শ্রীনগরে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। এর আগে কাজ করতাে সােপিয়ান জেলায়। এরা এখানে অনেক বছর থাকার জন্য বরফের মধ্যে হাঁটতে অসুবিধা হয়নি।

আমি হাঁটতে থাকলাম। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম, দেখলাম বৃহৎ বড় একটা পাথরের চাক এসে পড়লাে আমার সামনে। একটু যদি অসতর্ক হতাম তাহলে আমার মৃত্যু ছিল অনিবার্য। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, রাখে হরি মারে কে? কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর খুবই তৎপরতার সাথে সামনের দিকে এগােতে লাগলাম। | যত এগােচ্ছি ততই রামবনের দিকে এগিয়ে চলেছি। মনের মধ্যে আনন্দ যে কী তা বলে বােঝাতে পারিনি। আবার থমকে দাঁড়ালাম। রাস্তার বামদিক থেকে লাগাতার ল্যাণ্ডস্লাইট হচ্ছে। রাস্তার উপর বন বড় বােল্ডার দেখলেই ভয় লাগে। আঁতকে উঠি!

আমি ভাবলাম, এখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেবল দেখতে হবে।

কিছু সময়ের মধ্যেই ধসের পরিমাণ কমতে থাকলাে। হালকা | বিরতি যেই না হল দৌড়াতে থাকলাম এবং পাথরের বােল্ডারে ধাক্কা লাগলে ব্যাগ নিয়ে একবার দুইবার পড়লাম এবং এইবারের ফাড়া থেকে নিজে বাঁচলাম। তাড়াহুড়াের সময় ভুল বােধ বেশি হয়।

যাকগে বড় বাঁচা বাঁচলাম। এগােতে থাকলাম। এক হাঁটু বরফ কাদা জলে পা ডুবে গেল। পিছনের দিকে তাকালাম আর দেখলাম আবার ধস নামছে আর পাথরে পাথরে ঘর্ষণের আওয়াজ আসছে তীব্র আকারে। কিছুদূর এগোেনাে গেল। এইখানেও রাস্তার উপর আরও বেশি বােল্ডার। অনবরত বৃষ্টি শুরু হল আর সাথে সাথে বড় বড় পাথর বালি কাদা একসাথে নিচে ধেয়ে আসছে। এখানকার অবস্থা আরও মারাত্মক। রাস্তা বােঝার উপায় নেই। ডানদিকে তাকালাম নদী এত কাছে, এত খাদ ইতিপূর্বে দেখিনি। মনে হল আর সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারবাে না। ধস্ এত তীব্র বরফযুক্ত পাহাড়ের চাই ভেঙে জাতীয় সড়ক সমেত পুরােটাই নদীগর্ভে বৃষ্টির সাথে ধসের বিরাম নেই। এমন একটি জায়গায়। দাঁড়িয়ে আছি সামনেও বিপদ পেছনেও বিপদ। দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া গত্যন্তর নেই। পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখি কোনও লােক আমার পেছনে নেই। সামনের দিকে তাে শুধুই বােল্ডার আর ভাঙা রাস্তার অংশ। | পাহাড়ের ধসের দিকে তাকিয়ে ভাবছি, ঐ ছেলেটার কথা না শুনে কি ভুলই না করেছি। ঐ ছেলেটা বার বার বারণ করেছিল, ভাই সামনে আর যেও না। বৃষ্টি হচ্ছে না তাে শুধুই বড় বড় | শিল, তুষারের তীব্রতাও বেড়েছে। তুষারপাতের বরফ নরম। | যেদিকে পা বাড়াচ্ছি প্রায় হাঁটু সমান বরফের মধ্যে পা ঢুকে যাচ্ছে। হাঁটা চলার ধরন ভিন্ন ধরনের। এখন তাে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। যা পরিস্থিতি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেমনভাবে সেই গােরুটা

মারা গেছে আমার অবস্থাও তাই হবে। বৃষ্টিটাও থামছে না।

অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম কতক্ষণ অবধি পারবাে বলতে পারবাে না। ইতিমধ্যে দক্ষিণ আকাশের সূর্য উঠলাে সাথে সাথে বৃষ্টিও পড়ছে, আমরা গ্রাম বাংলায় যাকে বলছি, খাক শিয়ালের বিয়ে। মনের মধ্যে ভাবনা সূর্য যখন দেখা গেল বৃষ্টিও থামলাে।

| ধস বন্ধ হয়ে গেল আর তিনজন লােক বিপরীত দিক অর্থাৎ রামবন থেকে শ্রীনগর অভিমুখে আসছে। এদের দেখামাত্র আমার সম্বিত ফিরলাে, আমিও এই বিপদের হাত থেকে মুক্তি পাবাে। পাথর, বােল্ডার কাদার ভিতর দিয়ে সঙ্কীর্ণ রাস্তা দিয়ে এই বিপদ থেকে উতরে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়াে করতে থাকলাম। আমি বিপদ থেকে এই যাত্রায়ও রক্ষা পেলাম।

যুদ্ধজয় করলাম। কয়েকজন লােক উল্টোদিক থেকে আসছে। আর বলছে, চলতে রহাে, জিন্দেগী আওর মউত খােদাকে হাতমে হ্যায়, হাম কেয়া কর সেকতা হ্যায়; মরনা হ্যায়তাে মরাে নেহিত আগে বাড়াে।

—আর কত কিমি পর রামবন? —দশ কিমি। —সামনে কেমন রাস্তা? —এক জাগা খারাপ হ্যায়, বাকি সব ঠিকঠাক। মনের মধ্যে আনন্দ, আর মাত্র দশ কিমি রাস্তা! ইতিমধ্যে রাস্তার উপর থেকে বরফ বেশিরভাগ সরে গেছে। রাস্তা দিয়ে পথও এগােচ্ছে। দূরের পাহাড়গুলির মাথায় তখনও সাদা বরফে আবৃত। হাঁটারও গতি বাড়ছে। আবার থমকে গেলাম। এখানে পাহাড়ের গায়ে সবুজের সমারােহ। পাহাড় মানে নরম মাটির পাহাড়। এতক্ষণ অবধি শুধুই পাথরের ধস দেখেছি এবার পাথর কাদা মাটি, বরফ মিলে মিশে দালান বাড়ি তৈরির সিমেন্টের মশলা ভর্তি—পুরাে রাস্তা। বামদিকে পাথরবৃষ্টি আর ডানদিকে কাদা। কী করবাে বুঝতে পারছি না।

সামনে বিপদ! পেছনে যে কত অনিশ্চয়তা তা তাে কিছুক্ষণ আগে নিজেই প্রত্যক্ষ করেছি। একদিন আগেও যা ভাবনা চিন্তা ছিল এই মুহুর্তে সেই সবই নগণ্য। সামনে শুধুই পাথর আর কাদা। বামদিকে পাহাড় লাগােয়া জায়গায় পাথর যে দুই একটা ঝরে পড়ছে একটা যদি আমাকে আঘাত করে কো-কা করার অবকাশ থাকবে না। আর ডানদিকের কাদা এমনভাবে থাকছে একটু ভুল করলেই নদীতে চলে যাবাে। কত নিচে যাবাে তার পরিমাপ করা রীতিমতাে দুঃসাধ্য ব্যাপার। অন্যদিকে পেছনেও মারাত্মক ঝুঁকি। তিন নম্বর হল ভিজে শরীরে তীব্র তুষারপাতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাও বিপদ! | সামনের দিকেই রওনা দিলাম। প্রথমে একটু কাদা আস্তে আস্তে কোমর পর্যন্ত চলে গেলাম। আমার প্যান্ট, জামা নিয়ে ভাবছি না। এই কাদা থেকে নিস্তার পেতে হবে। সামনের দিকে এগােতে থাকলাম। আমি কেবলই নিচের দিকে চলে যাচ্ছি। আমি ভাবছি একি চোর বালির মতাে চোরা কাদায় ঢুকে যাচ্ছি? বাঁচতে

হবে। জলে সাঁতার কাটার মতাে এগােচ্ছি কিন্তু জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার মতাে অবস্থা। আমি ক্রমেই নদীর কিনারার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি! প্রাণপণ চেষ্টা করছি নিজেকে বাঁচানাের। | হঠাৎ একটা মােটা প্লাসটিকের বাণ্ডিল আমার সামনে নজরে আসলাে, বর্ষাকালে যেমনভাবে কলাগাছকে আঁকড়ে ধরে গভীর জলে সাঁতার কাটি তেমনিভাবে আমি চোরা কাদা থেকে বাঁচলাম।

এতক্ষণ অবধি আমাকে নিয়ে ভাবার অবকাশ ছিল না। কয়দিন আগেও ভাবতাম আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, গবেষণাকে আবার নতুন উদ্যমে শুরু করতে পারবে। | এ যাত্রায়ও বেঁচে গেলাম কিন্তু এরকম বিপদ যে আমার আসবে আমি ঘুণাক্ষরেও যদি জানতে পারতাম তাহলে বানিহাল থেকে এগগাতাম না।

আবার হাঁটাশুরু। কিছু লােক তখনও কাশ্মীরের দিকে এগােচ্ছে। এরাও বলছে আর অসুবিধা হবে না। আমার কারও প্রতি বিশ্বাস | নেই। এর আগেও অনেকে বলেছিল সামনে বিপদ নেই বিপদে অর্থাৎ কাদায় পড়লাম।

আসলে রােদ ওঠার সাথে সাথেই নতুন নতুন জায়গা ধসের কবলে পড়ছে, জানিনা আর কত কষ্টভােগ করতে হবে! | শরীরের নিচের দিকে জামাপ্যান্ট, উলিকটের ইনার সবই ভিজে। জুতাের ভিতরে পাথৱ জাতীয় কিছু একটা বারবার অসুবিধা করছে তবুও আমি রামবনের দিকে এগিয়ে চলেছি। আমি হাঁটতে পারছি না। আমার শরীরের যে সমস্ত পােশাক ছিল সবই ভিজে। ওজন বেড়ে গেছে। ব্যাগেরও ওজন বেড়ে গেছে। ব্যাগের ভিতরে | যে সামান্য বস্ত্র আছে সবই ভেজা। এই জলে কাদায় বরফে আমি যখন হাবুডুবু খাচ্ছি আর প্রাণ বাঁচানাের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি তখন দুজন পথ যাত্রী আমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে অসহায়ভাবে তাকিয়েছিল। আমি যখন ঠাই পেয়ে গেলাম তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এগােতে থাকলাে। ঐ দুই যাত্রীও কাদার সাথে লড়াই করেই এগিয়ে চলেছে। তারা একটু পাথরের দিক ঘেঁষে এগােচ্ছিল বলে আমার মতাে বেশি কাদায় পড়েনি।

আমি ঠক্ঠক্ করে কাঁপছি। হাঁটতে পাচ্ছি না। খুব ধীরে ধীরে এগােচ্ছি। কিছুদূর যাওয়ার পর পাহাড়ের কোলে একটা দোকানে অনেক যাত্রী চা-জল খাচ্ছে আর আগুনের কাছে গিয়ে শরীর গরম করছে। এতক্ষণ অবধি আমি ভাবতাম আমার অবস্থাই কিম্ভুতকিমাকার, আর কারও অবস্থা হয়নি অমন, কিন্তু এই আগুনের জায়গায় এসে আর লজ্জা লাগছে না। সবারই আমার মতাে অবস্থা। আমার জুতাের ভিতরে পাথরের মতাে কীসের খোঁচা লাগছে কিন্তু আমার হাতের ক্ষমতা নেই জুতাে খুলে ঐ বস্তুটা বের করার। ভাগ্যিস আমার পায়ে বােধগম্য নেই তা না হলে একপাও এগােতে | পারতাম না। এইখানে আমার অবস্থা আর রামায়ণে হনুমানের মুখ | পােড়ার কথা মনে পড়ছে। লঙ্কায় যখন হনুমানের লেজের আগুনে

জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে আর আগুন নেভানাের জন্য লেজ মুখে দিয়ে নেভালাে। হনুমান চিন্তিত সবাই আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে। বিদ্রুপ করবে। হনুমানকে বলা হয়েছিল, তােমার মতাে

মুখ পুড়বে প্রত্যেকের।

আগুনের কাছে কিছুসময় থাকার পর এগিয়ে চললাম রামবনের দিকে। এখনও সাত আট কিমি রাস্তা হাঁটতে হবে। রাস্তায় আগত লােকদের কাছ থেকে জানতে পারলাম আর বিপদ নেই। হাঁটছি তাে হাঁটছি, এবার রাস্তার পাশে অনেক কয়টি দোকান আর দূর থেকে বাড়িঘর এবং একটা লােকজনের কোলাহলের আওয়াজ কানে আসছে আর আনন্দ লাগছে, একটা জায়গায় দেখলাম রাস্তার পাশে একাধিক যানবাহন। লােকজনকে রামবন থেকে এই অবধি নিয়ে আসছে। গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। আবার হাঁটাশুরু করলাম। মাত্র এক কিলােমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লাগলাে। এসেই জানতে পারলাম এখান থেকে যান চলাচল স্বাভাবিক।

| রামবনে লঙ্গরখানা তখন বিকাল পাঁচটা ছয়টা হবে, খোঁড়াতে খোঁড়াতে রামবন বাস স্টপেজের দিকে এগােচ্ছি। এত ভিজা গায়ে আর থাকা যাচ্ছে

। ঠান্ডায় কাঁপছি, কথা বলার ক্ষমতা নেই। এখন যদি হােটেল পাওয়া যায়, গিয়েই লেপের তলায় চলে যাবাে। সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। বাসস্টপের পাশে ঘরভাড়া পেলে আগামীকাল সকালে বেশি একটা বেগ পেতে হবে না। হয়তাে আজকেই জম্মু চলে যাওয়া যাবে।

হােটেল নিতেই হবে তাতে যদি বেশি টাকা লাগে তাতেও চলবে। বাসস্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে অনেক বাস। হােটেলের খোঁজ করাতে জানলাম, রাস্তার পাশেই কয়েকটা হােটেল।

—হােটেল কঁহা হেয়?

—উধার হােটেল হ্যায়। কোনছা হােটেল? খানে কেলিয়ে ইয়া রহেনে কেলিয়ে।

—রাহনে কেলিয়ে। হােটেল হিমালয় চলি যাও। রুম বহুত হ্যায়।

—এক পা দুপা করে হােটেল হিমালয়ের রিসেপশানে গিয়েই বললাম, রুমি চাহিয়ে।

—ইধার নেহি হ্যায়। আপ উধার যাকে দেখাে। সাহিদ ঘর নেহি মিলেগা।।

পাশ থেকে একজন পথচারী বললাে, আপ এক কাম করাে উধার চলি যাও। লঙ্গর লাগি হুয়ি হ্যায়।

মনে মনে ভাবলাম, সরকারি খাবার কেন খাবাে? আমার এখন থাকার জায়গার দরকার।

আমি এগােতে থাকলাম থাকার জায়গার খোঁজে। আবার হােটেলে রামবনে গেলাম।

—ভাই সাহাব ঘর হ্যায়?

—নেহি হ্যায়। কহি হােটেল খালি নেহি। উধার হায়ার সেকেণ্ডারি স্কুল চলি যাও সরকারি ব্যবস্থা হ্যায়। কম্বল মিলেগা। কহি পয়সা নেহি চাহিয়ে।

একবার ঘুরে আসি। থাকার জায়গা যদি বানিহালের মতাে হয়

তাহলেও চলবে।

যেখানে যাবােনা বলে ঠিক করেছিলাম গুটি গুটি পায়ে সেইদিকে অগ্রসর হলাম। দেখে তাে আসি, রামবন জম্মু কাশ্মীরের জম্মু ডিভিশনের একটি জেলা। পাহাড়ি শহর। যেদিকে দুচোখ যায় পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় শুধুই সাদা বরফে আবৃত। পাহাড়ের নিচেই এই শহরের অবস্থান। বেশ সুন্দর শহর। এখানে সেখানে মনে হয় লবণ রাখা আছে। আসলে বরফ। রাস্তাঘাট প্যাচপ্যাচে। আমার হাঁটাচলা দেখেই লােকজন বলতে থাকলাে, ডানদিকে রাস্তা উপরে চলে গেলেই রামবন হায়ার সেকেণ্ডারি হাইস্কুল। লােকজনের কথামতাে একটা বিশাল বিল্ডিংএর দিকে অগ্রসর হলাম।

রামবন হায়ার সেকেণ্ডারি হাইস্কুলের ভিতরে বড় একটা মাঠ। কোথাও কোনও লােকজনের দেখা নেই, কিন্তু স্কুলের বিশাল এই মাঠের ভিতরে কতগুলি প্রাইভেটকার দাঁড়িয়ে রয়েছে। গাড়িগুলিকে মনে হয় এখানে গ্যারেজ করেছে। স্কুল মাঠ পুরােপুরি বরফে আবৃত। গাড়িগুলির ছাদেও বরফ জমেছে।

ভাবলাম ভুল জায়গায় এলাম না তাে? কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ভুল ভাঙলাে। মাঠের একপাশ থেকে একজন লােক আমাকে ডাকলাে, তিন তলায় চলে যান। ওখানেই আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

| দোতলায় উঠতে হবে ভাবতেই কষ্ট লাগছে তবুও ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে প্রথমে দোতলায় উঠলাম এবং দেখলাম দশ বারাে জন লােক অস্থায়ী কাঠের উনানের চারিদিকে দাঁড়িয়ে গা গরম করছে। আমিও আগুনের কাছে যেতে থাকলাম এবং সাথে সাথে লােকেরা আমায় বললাে, তিনতলায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। তিন তলার বিশাল হলঘরে প্রচুর লােক শুয়ে আছে। আমাকে দেখা মাত্র আজাদ বলতে থাকলাে, ভালােই হয়েছে, আমাদের পাশের ফাকা জায়গায় আপনি থাকতে পারবেন। | জামা-জুতাে খুলে একটা কম্বলের তলায় নিজেকে আবদ্ধ করলাম। পাশ থেকে একজন বললাে, আপনি কোথা থেকে এসেছেন?

—আমি আজ সকালে বানিহাল থেকে রওনা দিয়ে এই পর্যন্ত এলাম।

—আপনি কোথায় যাবেন? —আমি তাে শ্রীনগরের দিকে যাবাে।

—প্রথমত আমি বাঁচলাম। শ্রীনগরের দিকে মানে কোথায় ? প্রথমত আপনি আমার বাড়ি (সােপিয়ান জেলার সােপিয়ান দরবারে

—আমি তাে সােপিয়ান দরবারে গিয়েছিলাম। খুব ভালাে জায়গা।

—ঐ ভিতরে কী করতে গিয়েছিলেন? সােপিয়ান দরবারকে কেন্দ্র করেই তাে প্রতি বছর মেলা হয়। দরগার পাশেই যেই বিশাল মাজার আছে, তার এক্কেবারে বিপরীত দিকের বাড়িটা আমাদের। আমি যতই দিল্লি থাকিনা কেন সােপিয়ানের সব্বাইকে চিনি।

—তাহলে তাে রাইস স্যারকে চেনেন?

—চিনবাে না কেন? ওনার উদ্দেশ্য আজ কয়েক বছর সােপিয়ান মেলা হচ্ছে। রাইস স্যার একদিকে গার্লস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক অন্যদিকে ওনাকে ঘিরে চলতে থাকে একটা সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। যদিও এবার একটা বাজে পরিস্থিতির জন্য সােপিয়ান মেলার পূর্ণতা প্রাপ্তি ঘটেনি।

—আমি ঐ উৎসবে গিয়েছিলাম। গণ্ডগােলের সময় ঐ মাঠে ছিলাম। ঐখানকার কালচারাল অনুষ্ঠানের অন্যতম অভিনয় সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। আবেগ তাড়িত হয়ে মাঠভর্তি হাজার হাজার লােক কান্নাচোখের জল ফেলছিল।

ঐ মুহুর্তেই ঘটেছিল যত গণ্ডগােল! আমি তাে ভাগ্যের জোরে বেঁচে আছি।

—যেই মেয়েটা আসর মাতাচ্ছিল তার নাম আকশা। ওর বাবার নাম ওদের চোদ্দোগুষ্টির নাম জানি। তুমি আমার কথা বলাে, বলবে, দিল্লিতে যে ফলের ব্যাবসা করে দিল্লুর রহমান বললেই হবে।

—দিলুর ভাই আপনি দিল্লিতে কোথায় থাকেন? ওইখানে আমার এক বন্ধুও থাকে।

—দিল্লিতে আজাদপুর মাণ্ডিতে আমার ব্যাবসা। আমি মূলত আপেলের ব্যাবসা করি। যেহেতু আমার বাড়ি সােপিয়ান এই ব্যাবসাটা আমার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক। সােপিয়ান, পুলওয়ামা, কুলগাম এবং অনন্তনাগ এলাকার হাঁড়ির খবর রাখি। বলতে আমার | দ্বিধা নেই এই সময় আমাদের কাশ্মীরের লােকেদের কোনও কাজকর্ম নেই, কিন্তু সংসারের খরচ তাে বন্ধ হয় না অর্থাৎ পেট তাে আর কথা শুনবে না। এই সময় আমাদের পয়সা ঢালতে হয় তবেই তাে আপেলের সময় আপেল কিনতে হয়। কাশ্মীরের লাগােয়া আফগানিস্থান। ঐসব এলাকা থেকে কাবুলিওয়ালারা দাদন দিতে আসতাে। আমরা প্রকৃত পক্ষে কাবুলিওয়ালা কিন্তু বর্তমানে আমরা কাশ্মীরি। বয়স্ক মানুষদের কাছ থেকে আজ কাল দুইদিন ধরে রামবনে আটকে আছি। সােপিয়ানে না পৌঁছাতে পারলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।

—দিলুর ভাই, আপনাকে আমার পরামর্শ রাস্তার অবস্থা আরও দুইদিন এখানে থেকে যান, যদি অসুবিধা না থাকে।

—আমার খুব দরকার। দেখছেন বারবার ফোন আসছে। তােমাকে একটা কথা বলবাে যদি তােমার আপত্তি না থাকে। এই বিপদের মধ্যে তুমি গেলে কেন? আমরা তাে প্রতি মুহুর্তে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করতে করতে আজ জীবনের অন্তিম পর্যায়ে অবতীর্ণ হয়েছি।

—আপনার কাছে বলতে আমার কোনও দ্বিধা নেই। আমি পশ্চিমবঙ্গের কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করি। বিভিন্ন রাজ্য, বিভিন্ন দেশের লোেক আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। বিভিন্ন লােকের সাথে আলাপ হয়…তাই বন্ধুত্ব হয়।

বুঝেছি, আজকাল ইন্টারনেট দুনিয়ায় সবকিছুই সম্ভব। এখন গােটা দুনিয়া একটাই দেশ হয়েছে। ঘরে বসেই রাশিয়ায় বসবাসকারী লােকের সাথে বন্ধুত্ব হয়। সেটা কোনও ব্যাপার না।

তাছাড়া তােমরা এখন যুবক, তােমাদের জোশই আলাদা।

—তােমার মুখ চোখই বলে দেয় তুমি কেন এত কষ্ট করতে যাবে। আমাদের রুজিরুটির প্রয়ােজনে কখনও দিল্লি আবার কখনও শ্রীনগর ছুটে বেড়াতে হয়। যাই হােক তােমাদের বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় হােক।

—আকশার সাথে যােগাযােগ প্রায় দুই বছর। আমাদের বন্ধুত্ব শুরু হয় ফেসবুকের মাধ্যমে, তারপর ফোনাফুনি। আসলে আমি ঘুরতে ভালােবাসি। নেটে কাশ্মীরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান খুঁজতে খুঁজতে আকশার ফেসবুকে কাশ্মীরের পাহাড় পর্বত দেখলাম, আর ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট পাঠালাম এবং বন্ধুত্ব।

—ভাই সমীর তােমার ইচ্ছাশক্তির তারিফ না করে পারবাে না। আকশা খুবই ভালাে মেয়ে। সােপিয়ানের নামকরা স্কুল থেকেই মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়। আমার বােন মুনিরা একটা লাল চাদ স্কুলের শিক্ষিকা। মাধ্যমিক পরীক্ষার গার্ড দিচ্ছে। গার্ড একটু ঢিলেঢালা ছিল। প্রথম পরীক্ষা উর্দু ছিল। দ্বিতীয় দিন লালাদ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা বললেন, মুনিরা তােমরা যে হলে গার্ড দিচ্ছাে ভালাে গার্ড দাওনি। একটি মেয়ে অভিযােগ করেছে, ঢিলেঢালা গার্ডের জন্য তার পরীক্ষায় ব্যাপক হ্যাম্পার হয়েছে। | মুনিরা বলল, আমরা যখন জানলাম আমাদের জন্য মেয়েটির ক্ষতি হচ্ছে। আমরা কড়া গার্ড দিলাম, ইংরেজি পরীক্ষাও কোনও কথা বলার সুযােগ দেয় নাই। | আমরা সেই মেয়েটাকে দেখলাম। পরীক্ষা শেষ করলাে আধঘন্টা আগে। বাকি সময় খাতা মেলালাে। অঙ্ক পরীক্ষাও দেখলাম এক ঘণ্টা আগে শেষ করলাে। আশপাশে একবারও তাকালাে না।।

আমরা অবাক হলাম! এরকম হয়? মেয়েটির গার্জিয়ান স্কুলের পরিচালন সমিতির সম্পাদককে স্থানীয় বিধায়ককে পর্যন্ত ফোন করে এই অভিযােগ জানাল। আমরা সবাই বললাম, ন্যাকামাে, যত সব আদিখ্যেতা!

কিন্তু যখন পরীক্ষার রেজাল্ট বের হল উর্দু বাদ দিয়ে বাকি সব বিষয়ে সেরা নাম্বার, অঙ্কে একশাের মধ্যে একশাে পেল। শুধুমাত্র উর্দুতে কম পাওয়ার জন্য মেয়েটি জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে | কোনও পজিশন পায়নি তখন আমরা খুব কষ্ট পাই। | এবার বলি, সেই মেয়েটি হল আকশা। লড়াই তার রক্তে। কথার দাম রাখে। মাধ্যমিকে ভালাে রেজাল্ট করেছে। ফাস্ট ল্যাঙ্গুয়েজে যদি ভালাে নাম্বার পেত তাহলে ও হত প্রথম। ঐ ঘটনার পর থেকে আমাদের এলাকায় আকশা সবার নজরে আসে। আকশাদের পরিবার ব্যতিক্রমী। আমাদের জেলা জঙ্গিবাদের শিরােনামে থাকে। এলাকার বেশিরভাগ মানুষ কোনও না কোনওভাবে জঙ্গিদের সহায়তা করে। আকশাদের গােটা পরিবার ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আকশাদের বেশিরভাগ আত্মীয়বাড়ি পাশের জেলা পুলওয়ামায়। ত্ৰাল এলাকায়ও ওদের নিজের লােক বাস করে। | ত্রালের নিকটে আচান গ্রাম। এই গ্রামে কাশ্মীরি পণ্ডিতরা যেমন

থাকতাে তেমনি থাকতাে মুসলমানরা। বিভিন্ন কারণে পণ্ডিতরা আচান গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। এখানকার অন্যতম পুরানাে শিবমন্দির অব্যবহৃত থাকে।

আচান গ্রামের বাসিন্দা সঞ্জয় কুমার মুসলিম আওকফ কমিটির অন্যতম কর্মধার আকশার বাবার দ্বারস্থ হন। গ্রামের সমস্ত বাসিন্দা মিলেমিশে চাঁদা তুলে এই শিবমন্দিরের পুনর্নির্মাণ করে। একসময় মসজিদের আজান আর শিবমন্দিরের আরতি একসাথে ভেসে আসতাে আবার নতুন করে শুরু হয়েছে আজান আর আরতি। এটাই হল কাশ্মীরিয়ত।

শীতে কম্বল

রামবনে আজ আকাশে সূর্যের আলাের ছটা পড়ছে বরফে বেষ্টিত পাহাড়ের উপর। কি চমৎকারই না লাগছে! মনে হয় যেন কাশ্মীরের পাহাড়ে আজ শান্তি মিত্রতার ফ্ল্যাগ সাদা পতাকা ওড়াচ্ছে। যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটায় শান্তির পতাকা ওড়ানাের মাধ্যমে।

কাল রাত যখন রামবন হায়ার সেকেণ্ডারি বিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। একবারও ভাবিনি আমি আজ সকালে হেঁটে আসবাে বাসস্ট্যাণ্ডে। আমার শরীরের যেই সব বস্ত্র ছিল সবই ভিজে গেছে। আমি যখন আকশার থেকে বিদায় নেই তখন একটা কাশ্মীরি শাল আর একটা সােয়েটার আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে দেয়।

আমার ব্যাগের ভিতরের যা কিছু ছিল সবই ভেজা, ব্যতিক্রম। আকশার দেওয়া শাল আর সােয়েটার। প্লাস্টিকে মােড়া থাকাতে পুরােপুরি ভেজেনি। তবে ভেজা ভেজা ভাব ছিল। গায়ের সমস্ত পােশাক খুলে স্কুল ঘরের বিভিন্ন জায়গায় মেলে দিলাম। আমি আকশার দেওয়া শালটা গামছার মতাে পরলাম আর সােয়েটার গায়ে দিয়ে কম্বলের তলায় ঢুকলাম।

আধ ঘণ্টা কম্বলের তলায় থাকলাম শাল আর সােয়েটারের ভিজা ভাব কাটলাে। ইতিমধ্যে একজন লােক আসলাে এবং বলল, আরে কী ব্যাপার আমার কম্বল কোথায় গেল? আরে ভাই আমার কম্বল। আপনি নিচে যান আর কম্বল নিয়ে আসুন। সারারাত কাটাতে হবে তাে!

—আমার অবস্থা কাহিল। এতক্ষণ ভালােই ছিলাম। যাই হােক কম্বল ছেড়ে সােয়েটার গায়ে দিয়ে শাল পেঁচিয়ে নিচে যাওয়ার আগে আজাদকে বললাম, ভাইসাহেব আমি খুব ক্লান্ত। আপনি একটু আমাকে সাহায্য করুন। | আজাদ—ভাই তুমি নিচে গেলেই কম্বল পেয়ে যাবে। আমরাও ক্লান্ত।

এই শীতের ভিতরে নিচে গেলাম। একজন লােক কম্বল বিতরণের জায়গায় নিয়ে গেল। আমি অতীব কষ্টে গেলাম আর আইকার্ড জমা দিয়ে তিনটে কম্বল নিয়ে আসলাম। | কম্বলের তলায় আকশার শালটা নিয়ে মাথা গুঁজলাম। হাতপা ঠান্ডাই থেকে গেল, সারারাতে ঘুমােতে আসবে না আর লঙ্গরে খাবারও খাবাে না ঠান্ডা, তার উপর আকশার দেওয়া শাল আর

সােয়েটার ছাড়া আর কিছুই শুকনাে নেই।

কাশ্মীর রাত তখন দশটা এগারােটা। আম হালকা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় ছিলাম। একজন লােক চিৎকার করে বলছে, আপনাদের জন্য গরম খাবারের ব্যবস্থা করেছেন আমাদের জেলাশাসক স্বয়ং। আপনারা আসুন।

বাইরে থেকে মেঘের গর্জনের সাথে ভারী বৃষ্টির শব্দ শােনা যাচ্ছে। আবার হয়তাে এই স্কুল থেকে কোথাও যেতে হবে খাবার | খেতে। কম্বল আনতে যেতে হয়েছিল স্কুল ছাড়িয়ে দুশাে মিটার দূরের একটি সরকারি বাড়িতে। আবার ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকলাম।

আবার একটা লােক আসলাে এবং একটু জোরে চিৎকার করতে থাকলাে, আপনাদের জন্যই এত কষ্ট করে আমরা রান্না করলাম; আর আপনারা খাবেন না? আপনাদের বেশিদূরে যেতে হবে না। এই বিল্ডিং এর দোতলায় খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

—আমি ভাবলাম শীত যত বেশি হােক না কেন জৈবিক ডাকে সাড়া দিতেই হবে। ধড়ফড় করে উঠলাম এবং বারান্দায় যাওয়ার সাথে সাথেই একাট লােক আমাকে নিয়ে গেল খাবারের জায়গায়।

এই শীতের রাতে গরম ভাত আর রাজমার ডাল কী চমৎকার লাগলাে তা বলে বােঝাতে পারবাে না। সারাদিন একটা রুটি আর | এক কাপ চা ছাড়া কিছুই জোটেনি।

সকাল বেলায় বেশ ভালাে খবর পেলাম। রাস্তায় কোনও সমস্যা হবে না। সামান্য ধস আর বরফ আছে নাশিরি অবধি। যতই রাত্রে বিশ্রাম নিই না কেন সকাল বেলায় হাঁটতে ভীষণ কষ্ট লাগছে। তবুও বলবাে আজ অনেকটা সরগর, আজ আর হাঁটতে হবে না। অথচ কাল রাত যখন আমি কম্বলের খোঁজ করছিলাম, ঠান্ডার ঠ্যালায় স্পষ্ট করে বলতে পারছিলাম না, কোথায় কম্বল পাওয়া যাবে।

তখন কতকগুলাে লােক আমায় বলেছিল, ইয়ে তাে পিয়ে হুয়ে হায়।

—আমি শুনেই বললাম, নেহি সাহাব, আমি সারাদিন ধরে, তুষারপাতের মধ্যে দিয়ে এখানে এসেছি বলেই কথা বলতে পারছি না।

বাস ছাড়লাে সাড়ে আটটায়। রামবন শহর থেকে সামান্য দূরে | এগােলেই পাহাড়ি রাস্তায় আবার ছােটখাটো ধস দেখলেই আঁতকে উঠি, আবার হাঁটতে হবে? আবার হাঁটতে হাঁটতে যেতে হবে। হাঁটুসমান বরফকে এক নিমেষে সরালাে গাড়ি। এক ঘণ্টার মধ্যেই নাসিরি টানেলের সম্মুখীন হলাম। টানেলের গেট গন্ধ। এখনও পর্যন্ত কোনও গাড়ি এই টানেল দিয়ে জম্মু যায়নি। তবে দুই একটি গাড়ি উল্টোদিক থেকে আসলাে। ইতিমধ্যে একটা সিকিউরিটি জেনারেটারের কাছে গেছে এবং টানেলের ভিতরের সমস্ত লাইট | জ্বাললাে।।

নয় কিমি দীর্ঘ নাসিরি টানেল অতিক্রম করলাম নয় মিনিটে।

খুব সহজেই জম্মু চলে আসলাম আমি।

কাশ্মীরের আলাদা রেভিনিউ ভ্রমণপাগল লােক বলেই এরকম ভাবে ঘােরা যায়। সমীর যে। কেন এত ঝুকি নিয়েছে তা কেবল সেই জানে। সে যখনই চোখ বােজে তখনই দেখতে পায় কাদা, বালি, বরফ পাথরে লুটোপুটি খাওয়ার দৃশ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের যার সাথে দেখা হয় তখনই তার অভিজ্ঞতার কথা বলে। কিন্তু তার সফরের যাওয়ার মূল লক্ষ্যের। কথা জানে একমাত্র দুলাল। | দুলালকেই একমাত্র সত্যি কথা বলে। ইতিমধ্যে টিভির সামনে জড়াে হচ্ছে লােকজন। বিয়াল্লিশ জন জওয়ান শেষ করেছে আত্মঘাতী জঙ্গি। অঘটন ঘটেছে উত্তর কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার মধ্যে অবন্তিপুরায়। সমীর খবরটা শুনেই তাৎক্ষণিকভাবে বলতে। থাকলাে, কয়দিন আগেই আমি ঐ অবন্তিপুরার উপর দিয়ে বাড়ি আসি।

দুলালের ফোন আসে, কীরে খবর দেখেছিস? তুই তাে কাশ্মীরে একাই চলে গেলি। বিয়াল্লিশ জন সি আর পি এফ জওয়ান মেরে দিল আর তুই তাে ছারপােকাও না। তুই আবার প্রেম করতে জায়গা পেলি না। ওই সব পাগলামি ছাড়। এইখানে মেয়ে দেখে বিয়েথা কর।।

-শােন ভাই আমি কাশ্মীরে গেছি বিপদে পড়তে পারতাম। এটা ঠিক কিন্তু তুমি এখানে থেকেও বিপদে পড়তে পারাে। আসলে বিপদ যখন আসে তখন বলে কয়ে আসে না।

—তবে জেনে শুনে বিপদের জায়গায় যাবাে কেন? কাশ্মীরে কত মরছে? আমাদের দেশের অনেক নেতা ওখানে গিয়ে মরলাে, শ্যামাপ্রসাদের দলের প্রতি আমার কোনও সহমর্মিতা নেই কিন্তু তার মৃত্যুটা আমি আজও মানতে পারছি না। আমি ঐ জাতটাকে কিছুতেই মানতে পারছি না। এই প্রথম কোনও প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বললেন, সেনাদের হাতে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া আছে। আমরা এর জবাব দেব।

—আজ বিয়াল্লিশ জন সেনা মারা গেল আত্মঘাতী হামলায়। | কিন্তু আমার কথা কাশ্মীরের যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে সেনা। জোয়ানরা আগ্নেয় অস্ত্র উঁচিয়ে রাখছে। প্রতি পদে পদে চেক। এই চেকের মধ্যে কিভাবে প্রবেশ করলাে? তাহলে কোনও এক জায়গায় নিশ্চিত করে ফাক ছিল তা না-হলে এত গােলাবারুদ সমেত এত বড় একটা দুর্ঘটনা হতাে না। আমাদেরও নিরাপত্তায় খামতি ছিল।। | পাকিস্তান তাে আমাদের ঘােষিত শত্রু। একাত্তরে ভারত-পাক যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হল আর স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরি হল, অর্থাৎ আমরা ওদের ঘর ভেঙেছি ওরা তাে চাইবেই আমাদের ভাঙতে। কোনও দেশ সক্রিয় সহযােগিতা না থাকলে তিনশাে কেজির মতাে আর ডি এক্স একত্র করা কী সম্ভব! এগুলাে নিশ্চয় আমদানিকৃত, আশিটা সেনার কনভয় যাবে একত্রে আর। তার মাঝে অন্য গাড়ি ঢুকে যাবে কেন?

শােন তাের ভাগ্য ভালাে। তুই যদি এই সময় থাকতিস তাের দুর্ভোগের সীমা থাকতাে না। জম্মু শহরে গণ্ডগােল হয়েছে। কাফু লেগে গেছে। সারা দেশ নিঃস্তব্ধ। শােকের ছায়া লেগে সারা দেশে সেনাদের ক্ষতবিক্ষত দেহ যাচ্ছে আর মানুষ ক্ষোভে ফুসছে, কঁদছে। কাশ্মীরিদের ধীরে ধীরে মেরে ফেলা উচিত। শালারা | সেনাদের গায়ে পাথর ছুড়বে, এটা কোনও সভ্যদেশে চলতে পারে

। এই প্রথম কোনও প্রধানমন্ত্রী বলতে পারলেন, ভারতীয় সেনারা মুখের উপর জবাব দেবে। সেনাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই পরিস্থিতি মােকাবিলার জন্য। এখনই একটা ব্যবস্থা না নিলে হবে

। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম দিনরাত দেখাচ্ছে কাশ্মীরকে। আমাদের দেশের কাশ্মীর সমস্যার জন্য দায়ী তকালীন জাতীয় নেতারা। নেহরু পরিবারের জন্য এই অবস্থা। একটা রাজ্য সরকার সেখানে আলাদা নিয়ম কেন থাকবে।

কাশ্মীর আর বাকি ভারতবর্ষ এক না। এই রাজ্যের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে গেলে অতীতে যেতে হবে। আমাদের অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্ত হয় ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালে। কিন্তু কাশ্মীর তখনও একটা স্বতন্ত্র দেশ ছিল। পাকিস্তানি হানাদাররা পাকিস্তান তৈরী হওয়ার পর থেকে সচেষ্ট। পাকিস্তান তৈরী হওয়ার পর থেকে সচেষ্ট। পাকিস্তানী আদিবাসী ৪০ হাজার হানাদার কাশ্মীরের গিলগিট, বালাকোট সহ বারামুলা অবধি অগ্রসর হয়ে শ্রীনগরে প্রবেশ করবে করবে অবস্থা। পাকিস্তানী আদিবাসীদের পেছনে পেছনে পাক সেনারাও পেছনে আসতে থাকে। তখন কাশ্মীরের রাজা ছিল হরি সিং, তার গদি টলমল। হরি সিং তড়িঘড়ি যােগাযােগ করে নেহরুর সাথে। ১৯৪৯ সালে ৩৭০ ধারার মাধ্যমে কাশ্মীর ভারতভুক্ত। কাশ্মীরের কর্মরত একজন সেনা অফিসার বললেন, আমরা যখন ওখানে কর্মরত অবস্থায় ছিলাম তখন আমরা কাশ্মীরের আলাদা রেভিনিউ ব্যবহার করতাম। ঐ ধারার বলেই কাশ্মীরের বিধান সভার মেয়াদ পাঁচ বছরের বদলে ছয় বছর। কাশ্মীরের প্রশাসককে বজির আলা বলতাে। ঐ ধারার বলে আমরা ওখানে থাকতে পারবাে কিন্তু জমি কিনতে পারবাে না। | তখনকার দিনে স্বায়ত্ত শাসনের কথা বলেছিল কিন্তু বাস্তবে তা করেনি। | বিশাল ভারতের উত্তর দিকে চিন, নেপাল ও ভুটান, পূর্বদিকে বাংলাদেশ ও মায়ানমার এবং পশ্চিম দিকে পাকিস্তান। কাশ্মীর ছাড়া বাকি অংশকে নির্দিষ্ট বর্ডার দ্বারা চিহ্নিত করা হয় কিন্তু কাশ্মীরের ক্ষেত্রে এল ও সি অথবা লাইন অফ কন্ট্রোল দ্বারা বেষ্টিত। এইখানেই কাশ্মীরের সাথে তফাত।

আমি জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছিলাম ঐখানে। লাইন অফ কন্ট্রোলে সেনা ছাড়া আধা সেনার ডিউটি থাকে। বি এস এফের মতাে আধা সেনা ডিউটি করে।

| কাশ্মীরে আত্মঘাতী হামলা ১৪ ফেব্রুয়ারিতে আত্মঘাতী হামলায় বিয়াল্লিশ জন সি আর | পি এফ জোয়ান মারা যায় তার মধ্যে দুই জন পশ্চিমবঙ্গের।

একজনের নাম বাবলু সাঁতরা আর অন্য একজনের বাড়ি তেহট্ট থানার হাঁসপুকুরিয়ায়। | এই হামলাকারী আত্মঘাতীর নাম হিলাল। যেই হিলাল আমাকে সাহায্য করেছিল বলেই আমি সােপিয়ানের মতাে দুর্গম জায়গায় যেতে পেরেছিলাম।

আমি আকশার কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলাম। আকশা ভালাে গায়িকা হতে পেরেছিল হিলালের জন্য। সেই হিলালকে টিচার হিসাবে মহান জায়গা দিয়েছিল বলেই আশা তার এঁটো খেয়েছিল। | হিলাল আত্মঘাতী হয়েছে ওর প্রতি আমার কোনও সহানুভূতি নেই কিন্তু ওর মতাে এত বন কুখ্যাত আততায়ীর সাথে এত সময় কাটলাম। কিন্তু ওর মতাে একজন ডরপােক লােক কীভাবে ঐ পর্যায়ে যেতে পারে?

হিলালের যে সামান্য পড়াশুনা করেছিল পুলওয়ামার ত্রালে। এই বেসরকারি মডার্ন স্কুলেই আনাগােনা থাকতাে জয়েশ-ইমহম্মদের নেতাদের।

হিলালের বক্তব্য ছিল, আমি ভালাে হতে চাই, কিন্তু ভালাে হতে পারলাম না। আমি একটা মেয়েকে ভালােবাসি কিন্তু মেয়েটি আমায় ভালােবাসে না, ভালােবাসা জোর করে পাওয়া যায় না। জোর করে নিতেও চাই না। আমি আমার দেশ কাশ্মীরকে ভালােবাসি। আমাদের বাড়ি ছিল বর্তমানে পাকিস্তানের ভাওয়ালপুরে। ঐখানে আমাদের জমি জমা-ব্যাবসাবাণিজ্য এখনও আছে। আমরা বিভিন্ন দিক দিয়ে ঐ দেশে যাই। সব থেকে বেশি যেতাম কুপওয়াড়া হয়ে। | আমি এবং এক দালাল সমেত যাচ্ছি পাকিস্তানে। কুপওয়াড়া এলাকায় অনেক দালাল ছিল। সবথেকে বেশি নামডাক ছিল সাবিনা নামক এক মহিলা। ঐ মহিলাকে আমি বলতাম দাদি।

লাইন অফ কন্ট্রোল পার করলাম, একটা নদী পার করার সাথে সাথে। জঙ্গল এলাকায় পারাপার করা সুবিধাজনক। আমরা পাহাড় জঙ্গল এলাকা দিয়ে পাকিস্তানে যাচ্ছি। আমার সাথি টম ফিফিস্ করে বলল, চুপ চুপ লুকিয়ে পড়। আমরা দুইজন লুকোলাম। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা চলে গেলাে। ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। যদি ধরা পড়ি তাহলে ভারতের গুপ্তচর ভেবে সারাজীবন জেলের ঘানি টানতে হবে। কত ধরনের শাস্তি হবে তারও কোনও হিসাব নেই।

এই নদীর এক পাড়ে ভারত আর এক পাড়ে পাকিস্তান। দুই। পাড়ের সেনাদের সাহায্য সহযােগিতা ছাড়া চোরাচালান সম্ভব নয়। উরি কুপওয়াড়া এলাকায় অনেক দালাল আছে কিন্তু সাকিনার নামডাকই আলাদা। দালাল হলেও তার সম্মান আছে। অন্যান্য দালালের থেকে সাকিনার মাধ্যমে পারাপার হলে ব্যাগপত্তর বলতে গেলে চেক হয় না। আমরা তাকে অপেক্ষাকৃত বেশি টাকা দিতাম।

সাকিনার কথা, আমি লােকজন পারাপার করি অনেক টাকা যেমন লােকেদের কাছ থেকে নিই তেমনি আমি ঢালিও অনেক

বেশি। অন্যান্য দালালরা যেটা এক হাজার টাকায় পার পাবে আমি সেখানে দুই হাজার টাকা দেব। | হিলাল, আমার সামনে দিয়ে যখন পাকসেনার কাছে যাচ্ছিল একবার যদি আমার দিকে টর্চ মেরে দিত আমি ধরা পড়তাম।

সাকিনা ? ধরা পড়লে ছাড়িয়ে আনার দায়িত্ব আমার যত টাকা লাগবে অমি পিছপা হই না। তবে মারের হাত থেকে অনেক সময় বাঁচাতে পারি না। এখানে আমার বড় সুবিধা দুই পারের ভাষা আমি জানি। দুই পারেই আমার বাড়ি আছে। দুই পারেই | ভােট দিই। আমি এই ব্যাবসা করতে পারলাম দুই পারের লােকজনদের জন্য। হিলাল তুমি আমার সাথে থাকো চোখ কান খােলা রাখাে সব কিছু টের পাবে।

হিলাল ও সাকিনা দাদি তােমার কাছে কোনও কিছু গােপন রাখবােনা। একটা মেয়েকে আমি ভালােবাসি। আমার বাবার অনেক পয়সা কিন্তু তিনি কানাকড়িও খরচ করবেন না, শুধু জমাবেন। আমার টাকার দরকার কিন্তু টাকা পাই না। আমার বাবা ধর্মপ্রাণ। তাই তিনি আমাকে পুলওয়ামার ত্রালের এক মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে আসেন। ঐখানে কী পড়ানাে হয় এসব জানার কোনও উপায় নেই।

ঐ ত্রালেই পয়সার বিনিময়ে পড়ানাে হয়। থাকা খাওয়ার জন্য একপয়সাও খরচ হয় না। আমাদের অনেক কয়টি আপেলের ব্যাগ আছে। প্রচুর আপেল উৎপাদন হয়। আমি আরও ছােটবেলা থেকেই বাবার পকেটমারতে থাকি। বাবার অমতে চুরি করে আপেল বিক্রি শুরু করি।

আমার বাবার কিপটেমির কথা লােকের কাছ থেকেই শুনতে পাই। পারিবারিক ভাবে আমরা সম্পন্ন পরিবার। পয়সার জন্য আমাকে বিক্রি করতেও দ্বিধা করবেন না আমার বাবা।

| কাশ্মীরি পণ্ডিতের ছড়ি ঘােরানাে

কাশ্মীরে তিনটি ধারা স্পষ্টরূপে বােঝা যায়। একদিকে | ভারতপন্থী আর অন্যদিকে পাকিস্তানপন্থী এবং কাশ্মীরিপন্থী। | কাশ্মীর ভারতভুক্তির সময় যেই প্রতিশ্রুতির কথা বলেছিল তার | কোনও কিছুই পালন হয়নি। এই জন্যই কাশ্মীরের আমজনতা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতােই শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে পিছিয়ে। কাশ্মীরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য,

অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়ার পেছনে অন্যতম বড় অন্তরায় | এই রাজ্যের ভূপ্রকৃতি। গরিবিকে হাতিয়ার করে গড়ে উঠেছে। অসংখ্য এন জি ও।

| এইসব এনজিও-এর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠন। | এই সব সংগঠনের মূল কর্ণধার মাসুদ আজাহার। কুখ্যাত আজাহার

সংবাদের শিরােনামে উঠে আসে অনেক বছর আগে ভারতীয় বিমান অপহরণ করে নিয়ে যায় আফগানিস্থানের কান্দাহার বিমানবন্দরে। তৎকালীন সময়ে মাসুদ আজাহারকে মুক্তিপণ হিসাবে ছাড়া হয়। কালক্রমে এই কুখ্যাত অপরাধী হয়ে যায় জয়েস-মহম্মদের

সুপ্রিমাে। পাকিস্তান সরকার এবং পাকিস্তানি জনতার প্রশ্রয়ে | ফুলেফেঁপে কলাগাছ হয়ে যায়। পাকিস্তানের ভাওয়ালপুরকে সদর

দপ্তর করে ভারতে নাশকতামূলক কাজ করে যাচ্ছে। পাকিস্তানে শুধু থাকাই নয় রীতিমতাে প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কাশ্মীরের ডাললেকের ডালগেট মােড়। এই তিন মাথা থেকে একটি রাস্তা সােজা চলে গেছে টি আর সি বাসস্ট্যাণ্ড হয়ে বটমালাে এবং লালচোখ, অন্য একটা পথ ডাললেকের পাশ দিয়ে মােগল গার্ডেন নিশাদ গার্ডেনের দিকে এবং তিন নম্বর রাস্তা সােজা চলে গেছে হজরতবাল মসজিদ এবং শ্রীনগর সরকারি হাসপাতালের দিকে।

ডালগেটের মােড় অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ মােড়। হিলাল জীবনে প্রথম বেড়াতে আসে ডালগেটে এবং এখান থেকেই নিশাদে যায়। রাস্তার কয়েকটি জায়গায় লেখা দেখে, নাে সিলেকশান, নাে ইলেকশান শুধু চাই ফ্রিডম। নিশাদের এই মসজিদের পাশেই লেখা, আপনি যদি জান্নাতে যেতে চান যােগাযােগ করবেন এই ফোনে।

হিলাল যখন দেখে তার পরিবারে অশান্তি, তার দাদার সংসারে অশান্তি, তার বাবা-মায়ের মধ্যে চরম অশান্তি শুধুমাত্র টাকা পয়সার জন্য।

হিলালের দাদা সারাদিন রাত পরিশ্রম করে তবুও তার দাদার সংসারে শান্তি নেই। সালাউদ্দিন চায় পরিবার ভালাে থাকুক কিন্তু তার স্ত্রী সামান্য কৃষকের স্ত্রী হয়ে বাড়ির সবার অমতে হাজার হাজার টাকার জিনিস বাকিতে কিনতে থাকে। সালাউদ্দিনের স্ত্রী টিরি এন সব অপবাদ দিল তা মানা দুঃসাধ্য। সালাউদ্দিন আত্মহত্যা

করতে যায়। হিলাল সেই দিন ফোন করে এবং যােগাযােগ করতে যােগাযােগ হয় মৌলবি আজাহারের সাথে।

| মৌলবি আজাহারই কাশ্মীর তথা ভারতের কোথায় কাকে নিযুক্ত করবে ঠিক করে। মাসুদ আজহার ভাওয়ালপুরে বসেই ঠিক করে কোন অ্যাকশান কীভাবে করতে হবে। ২০১১ সালে মুম্বাই হামলার মূল দায়িত্ব দিয়েছিল মার্কিন নাগরিক ডেভিড কোলম্যানকে। সে আমেরিকা থেকে মুম্বাইতে এসে বিভিন্ন হােটেলে থেকে এলাকার যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে। সহযােগী কাসব ধরা পড়াতে আজহার ভেঙে পড়েছিল। | আজাহারের নির্দেশ মতাে কাশ্মীরের চিফ নিযুক্ত হয় সাজ্জাদ আফগানিকে। সাজ্জাদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কুপওয়াড়াগামী

সেনা কনভয়ে গুলি মারার। সেই | যাত্রায় সফল হয়। ভারত এবং পাকিস্তানের দুটি ট্রেড রুট আছে | একটি উরি হয়ে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের চকোটি আর অন্যটি কুপওয়াড়া হয়ে পাকঅধিকৃত মুজফ্ফরাবাদ। এই রুট দিয়ে শুকনাে লঙ্কা ও অন্যান্য আনাজ ভারতে আসে। অন্যদিকে ভারত থেকে। আপেল আখরােট পাকিস্তানে যায়। এই ট্রেড রুটকে কেন্দ্র করে | পটাশিয়াম নাইট্রাইট এবং আর ডি এক্স কাশ্মীরে আনতে হবে।

কীভাবে আনবে সেটা তােমার ব্যাপার। | মৌলবি মাসুদ আজাহারের নির্দেশমতাে বিস্ফোরক উত্তর কাশ্মীরের পুলওয়ামার ত্রালে এল ঠিকই তার আগেই সমস্ত তথ্য চলে যায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে। মুকসুদ নামক ছােকরাকে ধরা হল এবং শাস্ত্রী হিসাবে প্রকাশ্যে গুলি করা সাজ্জাদ আফগানি। ত্রালের ক্যাম্পের চারিদিক দিয়ে ঘিরে ধরে ভারতীয় সেনাবাহিনী। | সাজ্জাদের বাঁচার রাস্তাবন্ধ তবুও সাজ্জাদ বাহিনী পাহাড় থেকে গ্রেনেড ছােড়ে। এনকাউন্টারে মারা যায় সাজ্জাত আফগানি৷

সাজ্জাদের পর জয়েশ-এর কাশ্মীর শাখার চিফ দায়িত্ব দেওয়া হয় ইয়াসিরকে। ইয়াসিরও এনকাউন্টারে মারা গেল। মাসুদ আজাহার হতাশ হল, আমরা আজাদি চাইছি, কাশ্মীরকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে গেলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মনােবলকে দুরমুশ করতে হবে। দায়িত্ব দেওয়া হল হিলালকে। কাশ্মীরের লাইফলাইন হল জম্মু-শ্রীনগর রাজমার্গ জম্মু শ্রীনগর রাজমার্গের অনন্তনাগ, পুলওয়ামা, সােফিয়ান অঞ্চলে একসময় কাশ্মীরের পণ্ডিতরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। এইখান থেকে গােটা কাশ্মীর এলাকায়

ব্যাবসাবাণিজ্য করতাে তারা। কয়েক দশক আগেও পণ্ডিতদের বসবাস ছিল এইসব এলাকায়। যদি ভালাে করে খোঁজ নেওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে অনেক মন্দির ছিল এইসব এলাকায়। কাশ্মীরের রাজকার্য পরিচালনা করতে কাশ্মীরি পণ্ডিতরা কিন্তু বাড়ির কাজ থেকে শুরু করে সমস্ত কাজ করতাে অব্রাহ্মণরা, নিম্নবর্ণের জনতা আর মুসলিমরা রাস্তাঘাট তৈরি করা, বাড়ি তৈরি করতাে। পাহাড়ে ধাপে ধাপে যেই সমস্ত ঝুমচাষের এলাকা ছিল চাষবাস করতাে নিম্নবর্ণের হিন্দু অথবা দলিতরা এবং মুসলমানরা। এমনকি জমি জায়গা চাষবাস করতাে দীনমজুররা। মুষ্টিমেয় কাশ্মীরি পণ্ডিতরা ছড়ি ঘােরাতাে নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং মুসলমানদের ওপর। এক সময় জমি যার লাঙল তার এই নীতিতে ভূমিসংস্কার হল কাশ্মীরে। নিম্নবর্ণের হিন্দুরা আর মুসলমানরা ধীরে ধীরে পয়সার মালিক হতে থাকলাে আর কাশ্মীরি পণ্ডিতরা নতুনভাবে ধনসম্পত্তির কাছেও পরাজিত হতে থাকলাে।।

পণ্ডিতরা ব্যাবসাবাণিজ্য থেকে হটতে থাকলাে সেই জায়গা দখল করে নিতে থাকলাে নিম্নবর্ণের হিন্দু আর মুসলমানরা। নিম্নবর্ণের হিন্দু আর মুসলমানরা লড়াই করেছিল পণ্ডিতরাজের বিরুদ্ধে। নিম্নবর্ণের হিন্দুরা প্রতিশােধের জ্বালায় মুসলিম ধর্মগ্রহণ করলাে। পণ্ডিতরাজের বিরুদ্ধে একত্রিত হল। পণ্ডিতরা অত্যাচারিত হল এবং পালিয়ে গেল অন্য জায়গায়। হিলালরা এই নিম্নবর্ণের হিন্দুদের উত্তরসূরি।

| ধর্মের বেড়াজাল মুক্ত চিন্তা? কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, দাবি করছে ভারত। পাকিস্তান দাবি করছে কাশ্মীর পাকিস্তানের অংশ, জোর করে দখল করে রেখেছে ভারত। অন্যদিকে কাশ্মীরে বসবাসকারী মানুষরা বলছে, কাশ্মীর ভারতের না পাকিস্তানেরও না। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত স্বাধীন হয় তখন কাশ্মীর ভারতের সাথে ছিল না। তখন কাশ্মীরের আলাদা প্রশাসক ছিল, তাদের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সব কিছু স্বতন্ত্র ছিল। | ভারত স্বাধীন হওয়ার পরই কাশ্মীরের বিস্তীর্ণ অংশ পাকিস্তান কজা করে নেয়। শ্রীনগরের দিকে অগ্রসর হয়। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ অত্যাচারিত হতে থাকে। কাশ্মীরিদের ভাষা কাশ্মীরি ভাষাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে থাকে, উর্দুভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। যেমনভাবে পূর্ববঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষি মানুষের উপর উর্দুভাষ চাপিয়ে দেওয়ার কাজ করতে থাকে। পূর্ববঙ্গের বাংলাভাষিরা আন্দোলন করতে থাকে। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে ও কাশ্মীরি ভাষাকে পরিত্যাগ করে উর্দুর চাপিয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তান প্রশাসক বাংলাকে সরিয়ে উর্দুকে সরকারি ভাষা হিসাবে চালায় পূর্ববঙ্গে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে, কাশ্মীরি ভাষাকে হত্যা করছে। পাকিস্তান যদি সমস্ত কাশ্মীরের ক্ষমতা কায়েম করে তাহলে একই ভাবে কাশ্মীরি ভাষা, কাশ্মীরের সাহিত্যকে কাশ্মীরি মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করবে।

কাশ্মীরিরা দেখলাে, তাদের পক্ষে পাকিস্তানি হানাদারদের | প্রতিহত করার ক্ষমতা নেই। একমাত্র বিকল্প পথ ভারত। তারা | দেখলে ভারতে অনেক ভাষা, অনেক ধর্ম মিলে থাকার ক্ষমতা

আছে, ভারত সবাইকে নিয়ে চলতে চায়, ভারতের ছাত্রছাত্রীদের | জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে একটাই শেখায়, আমরা সবাই ভারতীয়,

আমাদের বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন প্রাকৃতিক ভিন্নতা, সমস্ত | ভিন্নতাই আমাদের সম্পদ।

আমরা কাশ্মীরিরা যদি ভারতের সাথে যুক্ত হতে পারি তাহলে আমরা ভারতের কাশ্মীরি ভাষা, সংস্কৃতি, ভারতের মধ্যে অঙ্গীভূত হতে পারবাে, যেমনভাবে শক, হুণ, পাঠান, মােগল তারাও ভারতের মধ্যে মিশে গেছে। সমস্ত কাশ্মীরিরা ভারতের পক্ষে দাঁড়ালাে একরাশ আশা নিয়ে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার কাশ্মীরি (অধিকাংশ মুসলিম) লড়াই করেছে বীরের মতাে, শহিদ হয়েছে। পাকিস্তান পর্যদস্ত হয়েছে। | আকশা একটি মেয়ে, পড়াশুনা করে, প্রগতিশীল ভাবনা চিন্তা। উত্তর কাশ্মীরের সােপিয়ানে তার বাড়ি। বৈজ্ঞানিক ভাবনা চিন্তা তার মজ্জাগত। সে যুক্তিতর্কে পারদর্শী। আকশার এলাকারই ছেলে | হিলাল। গানবাজনা নিয়ে থাকতে ভালােবাসে। হিলাল প্রাইমারি

স্কুলে পড়ার সময় থেকে টেবিল বাজিয়ে গান গাইতাে। তার গানে | এলাকার সবাইকে মােহিত করতাে। হিলাল টেবিল, চেয়ার, থালা বাজিয়ে গান করতাে আর সব্বাইকে আনন্দ দিত।

হিলালের গান মনােমুগ্ধকর হত আকশার কাছে। আকশার ইচ্ছাতেই হিলাল হয়ে যায় তার গুরু। হিলালকে ভালাে লাগতে থাকে তার। | শৈশবে হিলালও অন্য ধরনের ছিল, কিন্তু যেইনা ত্রালের মাদ্রাসায় চলে যায় অমনি হিলাল পরিবর্তিত হয়ে যায়। হিলালকে এক শিক্ষক পড়াতে থাকেন ভাতের সংস্কৃতি মানে কাশ্মীরের সংস্কৃতি, ভারত আমাদের দেশ, নানা ভাষা নানা মত, বৈচিত্র্য আমাদের সম্পদ। হিলালের মধ্যে এতটাই কাশ্মীরিয়ত, সে সেই জায়গায় অন্য কাউকে স্থান দিতে পারবে না। তাই হিলাল সেই শিক্ষককে পাথর মেরে কপাল ফাটিয়ে চলে যায়। এর বেশি কাশ্মীরিয়তই তাকে আরও বেশি খারাপের দিকে ঠেলে দেয়।

এই পরিবর্তন আকশার মন মানতে চায় না। আকশা ছােটবেলা থেকে জেনে এসেছে তার ঠাকুরদাদার বাবা পাকিস্তানের হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শহিদ হয়েছিল। পাকিস্তানিরা তার ঠাকুরদাদার বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। | আকশার আগের ভাবনাচিন্তা আজ আর নেই। আজ মুক্ত দুনিয়া, ফেসবুক, হােয়াটস্ আপ, ট্যুইটারের যুগ। দুনিয়া পাল্টে | গেছে। এক জায়গায় থাকলে হবে না, দুনিয়াকে দেখতে হবে, জানতে হবে। আকশার বন্ধু সামিম কলকাতায় থাকে। দূর থেকে অনেক কিছু দেখতে পায়। সামিম আজ তাকে ভালােবাসে। আকশার কাছে তথাকথিত হিন্দু-মুসলমান ধর্মের থেকে বড় ধর্ম মানব ধর্ম। তবু কী করবে ভেবে পাচ্ছে না সে। | হিলালও নাছােড়বান্দা, আকশাকে ছাড়ার পাত্র নয়। হিলাল

আর আকশা প্রায় এক বয়সি। আকশার বাবা ব্যতিক্রমী, যেমন কিপটে তেমন লােভী। লেখাপড়া জানা লােক যে এত লােভী তা আকশার বাবাকে না দেখলে জানা যেত না। আকশার বাবা দেখেছে হিলাল দামি দামি গাড়ি চড়ে, পােশাকআশাকও হাই ফাই। কিন্তু কোথা থেকে এত বাহার আসছে তার খোঁজ নেই। হিলাল এই বয়সে দাড়ি রাখা শুরু করেছে, ইসলাম ধর্মের কথা খুব সুন্দর বলে আর আসতে যেতে আকশার বাবাকে সালাম করে। আজ। আকশা চায়না তার জীবনে হিলাল আসুক। | আকশাকে জীবনে অনেক লড়াই করতে হয়েছিল। ঘরে বাইরে লড়াই করেই সে পড়াশুনাটা চালিয়ে গেছে। আকশা নিকা হিলালের সাথে একবার দিয়েই ফেলে সেই সময় ও রিয়াস স্যার তাকে রক্ষা করেছিল কিন্তু এখন তাে তার বয়স আঠারাে পার করেছে এখন তার বাবার নিকা দিতে কোনও সমস্যা হবে না। আকশা হিলালকে বিয়ে করলে কোনও অসুবিধা নেই। কিন্তু হিলাল আজকাল মাঝেমধ্যে গায়েব হয়ে যায়।

এরই মধ্যে খবর এল ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে পুলওয়ামায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে এক আত্মঘাতী জঙ্গির জন্য। বিয়াল্লিশ ভারতীয় আধা সামরিক জওয়ান শহিদ হয়েছে।

খবরে জানা গেল এই আত্মঘাতী যুবকের বয়স আঠারাে-উনিশ। হিলালের বাড়িতে কান্নার রােল পড়ে গেছে। সােপিয়ানের বিভিন্ন মসজিদে শহিদ হিলালের আত্মার জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন চলছে। এই কথার সত্যতা স্বীকার করা হয়েছে খােদ পাকিস্তানের ভাওয়ালপুর জয়িশ-ই-মহম্মদের সদর দফতর থেকে। জয়িশপরদান আজাহার খুশিতে সবাইকে মিষ্টি বিলােচ্ছে এবং বলছে, আমরা একজন খােয়ালাম এটা ঠিক, ভারত নামক শত্রু শিবিরের বিয়াল্লিশ জন আধা-সেনাকে হত্যা করতে পেরেছি। আজ সারা ভারতে শােকের ছায়া নেমে এসেছে। মুম্বাই আক্রমণকে সারা পৃথিবীতে ছড়াতে যেমন পেরেছি, এই আক্রমণ হল আমাদের জেহাদ। হিল্লাল আজ জান্নাতে পৌঁছে গেছে। আরও হাজার হাজার হিলাল তৈরি হওয়া দরকার। ভারতের বর্তমান শাসকের নিষ্ঠুরতাই এই সব হিলালদের জন্ম দেবে। আজ আমাদের ওয়াররুমে সত্যিই আনন্দের জোয়ার আসছে।

এদিকে ভারতের মিডিয়া যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখাচ্ছে। ভারতের মানুষ ক্ষোভে ফুটছে। তারা আন্তরিকভাবে এই ছায়াযুদ্ধ বন্ধ করতে চাইছে যুদ্ধের মাধ্যমে। | ভারতের বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে গত বছরের কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের রেজাল্ট।

সেনা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা অফিসার বললেন, ভারতীয় জওয়ানরা গত কয়েকদিন ধরে শ্রীনগরে যেতে পারছিল

জম্মু শ্রীনগর জাতীয় সড়ক বন্ধের জন্য। এ বছর তুষারপাতের মাত্রা ছিল অতিরিক্ত। শ্রীনগর ও জম্মুর জাতীয় সড়কের বিভিন্ন জায়গায় ধসের জন্য যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

জমে থাকা সেনারা ভারত সরকারের কাছে বার বার আপিল। করেছিল, তাদের জন্য আলাদা বিমানের ব্যবস্থা করতে।

যাত্রীবাহী বিমান চলাচল গত কয়েকদিন বন্ধ ছিল শ্রীনগর ও জম্মু রুটে। তুষারপাতের জন্য কোনও বিমান শ্রীনগর, জম্মু ও | লে লাদাকে যাতায়াত করছিল না। হঠাৎ করে বিমান ও সড়ক খুলে যাওয়াতে চাপ বেড়ে গেছে। কিন্তু ভারত সরকার সেনাদের কথা মানলেন না।

শ্রীনগরের দিকে প্রায় আশিটা গাড়ির কনভয় এগিয়ে চলেছে। রাস্তায় আলাদা কোনও নজরদারি রীতিমতাে ছিল না। এই সড়কে একটা গাড়ি থেকে অন্য গাড়ির একটা একশাে মিটার দূরে থাকার কথা। আশিটা গাড়ি প্রায় গায়ে গায়ে থেকেছিল।

অন্যদিকে জম্মুগামী সড়কও যথারীতি সবার জন্য খুলে রাখা হয়েছিল। যখন এত বড় সেনা কনভয় জম্মু-শ্রীনগর রাজমাৰ্গ দিয়ে যাবে তখন একটা লাইন বন্ধ রাখার নিয়ম। কাশ্মীরের যে কোনও জনবহুল এলাকায় সেনা জওয়ানরা একে ৪৭ উঁচিয়ে থাকতে দেখা যায়। প্রতিটি জায়গায় চেকিং-এর ব্যবস্থা থাকে। আজকাল | বিজ্ঞানের এত উন্নত ব্যবস্থা কিন্তু কারও চোখে পড়ল না।। | ভারতীয় টাওয়ারে ধরা পড়েছে এই হাইওয়েতে অনন্তনাগ আর শ্রীনগরের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটবে। তবুও কেন সতর্ক হল

। কোথায় কখন নিরাপত্তা বাহিনী কী করছে, কোথায় আছে | পাকিস্তানে ভাওয়ালপুর বসে শয়তান মাসুদ আজাহার সব দেখছে।

আর নির্দেশ দিচ্ছে তবুও কেন কোনও ব্যবস্থা নিল না? অনেকেই বলাবলি করছে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়, সর্ষের মধ্যে ভূত দেখতে পেয়েছে। যদি ব্যবস্থা নিত এতগুলাে লােকের প্রাণ যেত না। | ভারতের প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ঘােষণা করে দেন, আমরা ভারত সরকার সেনাবাহিনীর হাতে সমস্ত ক্ষমতা সমর্পণ করে দিয়েছি। সেনারা এর উত্তর দিয়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবে তা হতে পারে না। কোন ফাক দিয়ে ঢুকলাে | এত বিস্ফোরক তার বিচার-বিশ্লেষণ হল না। আমরা প্রতিরক্ষার ত্রুটির কথা বললেই লােকজন রে রে করে তেড়ে আসছে। পাকিস্তানি মদতপুষ্ট হানাদাররা মুখিয়ে থাকে কখন আমাদের ফাক ফোকর আসে।

ভারতের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে একটা উন্মাদনা তৈরির সুযােগ আসলাে ছাপান্ন ইঞ্চির বুকের প্রধানমন্ত্রীর। আগামী লােকসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় আসাটা দুরূহ ব্যাপার। দেশের ক্ষমতায় আসার আগে যেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার অনেকটাই অধরা রয়ে গেছে।

ভারতের উন্নয়ন হয়েছে বৃহৎ পুঁজিপতি থেকে শুরু করে কর্পোরেট সংস্থার। অন্যদিকে দেশের বেশিরভাগ জনতা উন্নয়নের বাইরে থেকে ঋণের দায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। কৃষককুলকে সাহায্যের নাম করে এগিয়ে আসছে কাবুলিওয়ালারা। চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। ঋণ শােধ করতে না পেরে কৃষক আত্মহত্যায় শামিল হচ্ছে। এই আত্মহত্যা পথ নয় বলে এক শ্রেণীর সুস্থ চেতনাসম্পন্ন লােকেরা ভাবছে। | আকশা একটি কৃষক পরিবারের কন্যা। আকশার বাবা আলি

ধনী, কিপটে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আলি একজন চাষি। আলির মূল চাষ আপেল, আপেল চাষে খরচ অনেক গুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু আপেলের দাম পায়নি। আপেল চাষে ব্যবহৃত কীটনাশক, সার, হার্বিসাইড-এর দাম অনেকগুণ বেড়ে গেছে। | কাশ্মীরের অন্যতম ফসল ধান। ভারতের সবথেকে দামি চাল দেরাদুন থেকে শুরু করে বাসমতী, সুগন্ধী চালের মূল উৎপাদন স্থান হল কাশ্মীর। এই ধনের বাজারদর পাওয়া যাচ্ছে না। আলি সংসারে নতুন করে অভাব অনটন বেড়ে যাওয়াতে কিপটে হতে বাধ্য হয়েছে। আলির কন্যা আকশা স্কুলের গণ্ডি অতিক্রম করে কলেজে পড়ছে। আকশা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কলেজে ভর্তি থেকে শুরু করে বইখাতা কেনার খরচ এক লাফে বেড়ে যাচ্ছে দেখে সব ছাত্রছাত্রীদের সাথে আকশাও পথে আন্দোলনে নামে। কলেজে পড়ার সময় ছাত্র আন্দোলনেই দেখা হয় ইউসুফ তারিগামী নামক একজন জননেতার সাথে। তারিগামীর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা আকশার চিন্তা ভাবনার মধ্যে প্রসারিত হতে থাকে।

আকশার ভাবনা, কলেজে যেমনভাবে আন্দোলন করেছি, কর্তৃপক্ষের স্বৈরাচারী মনােভাবের বিরুদ্ধে। কাশ্মীরের এই গণ্ডগােলের মধ্যেই কলেজ কর্তৃপক্ষ টিউশন ফি অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। ছাত্রছাত্রীদের সংগঠিত আন্দোলনের কাছে সরকার পরাজিত হয়।

এই শিক্ষাই সে তার পরিবারের মধ্যে সঞ্চারিত করে। বাবাকে এলাকার সমস্ত চাষিকে একত্রিত হতে বলে। আত্মহত্যা পথ না। চাষিরা আমাদের কলেজের মতাে একত্রিত হােক। যেমনভাবে নাসিকের কৃষকরা একত্রিত হয়ে প্রায় দুশাে কিমি হেঁটে মুম্বাইতে চাষ, দাবি আদায় করতে সমর্থ হয়েছে।

কাশ্মীরের অন্যতম ফসল হল আপেল। কৃষকদের রাস্তায় নামা ছাড়া বিকল্প রাস্তা নেই। কুলগ্রাম, অনন্তনগর, সােফিয়ান ইত্যাদি এলাকার সমস্ত চাষিদের একত্র করে অধিকার যাত্রার মাধ্যমে। আকশা আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে লড়াকু নেত্রী রূপে রূপান্তরিত করে। আজ তার চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বকে হারিয়ে ফেলেছে। আকশা আজ একজন এমন জায়গায় উত্তীর্ণ হয়েছে তথাকথিত হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান ধর্মের বেড়াজাল দিয়ে তাকে আর বেঁধে রাখা যাচ্ছে না। সে আজ ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছে বলেই সমীরের সাথে ভালােবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হতে পেরেছে। | কুলগাম, সােপিয়ান এলাকার মানুষ যখন হিন্দুবিদ্বেষী কথা বলে। উত্তেজিত করছে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপরে পাথর বৃষ্টি করছে। তখন আকশা তার প্রতিবাদ করছে, আকশা তার প্রতিবেশী করিম চাচাকে বলল, তুমি তাে নিজেকে ইসলামি বলে দাবি করছাে তবুও মারামারি, খুনােখুনির কথা বলছাে, আর বাচ্চা বাচ্চা ছেলেদের মগজ ধােলাই করছাে? তুমি তাে ইসলামের কথা বলে, জেহাদ। করছাে, পুলিশের উপর পাথর ছুড়ছাে, পাথর ছুড়তে প্ররােচিত করছাে অন্যদের, তুমি কি ইসলাম প্রকৃত ইসলাম মানছাে?

করিম চাচা : কেন বলবাে না? ভারতীয় সেনারা আমাদের

হয়রানি করছে। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় কাশ্মীরি নিরপরাধ ছেলে | মেয়েদের উপর অত্যাচার করছে এর কি কোনও প্রতিকার হচ্ছে?

আকশা ও চাচা লক্ষ্ণৌতে যেই ছেলে দুটোকে মারলাে তারা | সত্যিই নিরীহ, নিরপরাধ। আমাকেও কষ্ট দিয়েছে। তুমি বললে, | হিন্দুরা মেরেছে। আমিও দেখেছি হিন্দু ধর্মীয় পতাকাধারী একদল | যুবক দুটো নিরপরাধ কাশ্মীরি যুবককে অত্যাচার করলাে। কিন্তু | ঐ পতাকাধারীরা প্রকৃতই হিন্দু কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।

করিমচাচা রেগে বলতে থাকলাে, আমি টিভিতে দেখলাম ওরা | সবাই হিন্দু। এই জন্যই তাে আমার রাগ হয়। আমার শক্তি কম | তা না-হলে আমিই নেমে পড়তাম এর যােগ্য জবাব দিতাম।

—করিমচাচা ঐ পতাকা নিয়ে থাকলেই হিন্দু হয়ে যায় ? মৌলবি সাজলেই মৌলবি হওয়া যায় ? মৌলবি হওয়া এত সহজ নয়গাে চাচা। আমিও কোরান শরিফ, হাদিস কমবেশি পড়েছি। ধর্মগ্রন্থেই আছে প্রকৃত মানুষ হতে হবে। দয়ামায়াহীন লােককে মৌলবি করা যায় না। অসৎ লােক মৌলবি হতে পারে না। ঠিক তেমনিভাবে হিন্দু ধর্মেও সেই একই জিনিস আছে। হিন্দু ধর্মগ্রন্থের মধ্যে গীতা, রামায়ণ ও মহাভারত টিভিতে দেখার সুযােগ হয়েছিল। গীতার বক্তব্য অনুযায়ী যেই লােকটির মধ্যে ক্রোধ, লােভ, হিংসা, নিন্দা মধ্যে বর্তমান সে অন্তত হিন্দু অর্থাৎ সনাতনি হতে পারে না। আসলে হিন্দু তাে ধর্ম না আসলে ধর্মতাে সনাতনি। কারওমধ্যে সনাতনি ভাবধারা না থাকলে তাকে সনাতনি বলবাে কী করে? অর্থাৎ যারা কাশ্মীরি যুবকদের মেরেছে তারা কী ? এরা হল শয়তান, সন্ত্রাসী।

করিমচাচা আমি অন্য কারও সম্পর্কে না বললেও আপনার সম্পর্কে বলবাে। আপনি তাে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসাবে

পরিচিত। আপনি এই বয়সেও দিনে পাঁচবার নমাজ পড়েন। মুখে | দাড়ি রেখেছেন। আপনি মুসলমানি পােশাক পরেছেন। সর্বোপরি

আপনি একজন বয়স্ক ব্যক্তি। আপনার জায়গা আলাদা আপনার চিন্তাভাবনা আলাদা। ঐ যে ছেলেরা পাথর ছােড়ে, মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে, আপনি তাদের মতাে করলে তাে হবে না। বাইরে থেকে আপনাকে সবাই শ্রদ্ধা করবে। আপনি যদি মারামারির কথা বলেন, আপনি যদি হিংসার কথা বলেন, তাহলে আপনিতাে পাপ করেন।

করিমচাচা—আসলে আমি সেইভাবে ভাবিনি।

—করিমচাচা আপনাকে ভাবতে হবে অনেক কিছু। অগ্রপশ্চাৎ ভাবতে হবে। আপনি যদি সঠিকভাবে ভাবতেন তাহলে আপনার মতাে সুখী কে হতাে? করিমচাচা আপনি কোরান পাঠ করেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন, ভালাে লাগাকে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেই হবে না। ঐ অনুষ্ঠানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ | আপনাকেই করতে হবে। আপনি আমাকে সেইদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমার নিজের বােনের ছেলে সৌকত কোনও বিচার করলাে না। সৌকতের ছেলে আমাকে যা নয় তা বললাে। কিন্তু

ও কোনও বিচার করলাে না। চাচা আপনার সাথে কথা বলার | সময় পাইনি। সেইদিনই সৌকতের বাড়ি যাই এবং ওর ছেলে

জাকিরের সাথে দেখামাত্রই বলতে থাকলাে, আমার ঐ নানি আমার বােনের নামে উল্টোপাল্টা বললাে কেন?

—কে বলেছে? —আমার নানি।

-তাের কথা শুনলাম। তাের নানির অনেক বয়স। আমি যেই সাইকেল চালাই তুমি দেখেছাে ?

—হ্যা দেখেছি।

—এখন ঐ সাইকেলের না আছে বেল, না আছে ব্রেক সাইকেলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাই, যখন তখন ব্রেক ধরে না, বেল নেই। কিন্তু যখন নতুন সাইকেল ছিল তখন এর মধ্যে বেল ব্রেক দুটোই ছিল। তােমার নানির এখন বয়েস হয়েছে, কী বলতে কী বলেছে। ওনার কথায় রাগ করলে হবে না। উনি ঐ বয়স্ক মানুষ।

করিমচাচা আপনাকে কী বলেছিলাম মনে আছে? মনে আছে।

—আমি আপনাকে বলেছিলাম সােহাগ আপনার বােনের ছেলে। আপনার বােনের ছেলে সৌকত আর আপনার ছেলের মধ্যে কোনও তফাত নেই। আপনাকে আমি আরও বলেছিলাম, চাচা সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনি মানে আপনার ফল। আপনার বােন যদি না থাকতাে তাহলে কী ছেলে পেতেন? ছেলেপুলে না থাকলে কি নাতিপুতি থাকতাে? আপনি আপেল গাছগুলাের দিকে তাকান, আপনি বেদানা গাছগুলাের দিকে তাকান। ফলের ভারে গাছগুলাে কেমন ঝুকে যাচ্ছে। যেই আপেল গাছে আপেল নেই সেই গাছগুলাে ঝুকছে না। আপনাকে সহ্য করতে হবে। এই কথা আমি আজও বলছি। ভবিষ্যতেও বলবাে।

—আকশা তাের কথা তাে শুনলাম। কিন্তু বাস্তবের সাথে মেলাতে পারছি না।

—চাচা আপনি যদি প্রকৃতই ধর্মের কথা শােনেন আপনার সমস্যা থাকবে না। আপনার নিজের ছেলে বৌ আমাকে বলল, আপনার ছেলে হােসেন তাকে মেরে ফাটিয়ে দিয়েছে। দিদি তুমি বিচার করাে। আপনার চাচা ছেলেকে কিছুই বলেনি।

আমি তখন তানিয়াকে বলি বৌদি এখন তােমরা বড় হয়েছে, তােমাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়ে। তােমরা এখন যদি ঝগড়া ঝাটি মারামারি করাে সেটা অশােভন। লােকে হাসাহাসি করবে। হিসাব করে চলবে।

—তােমার দাদা হােসেন তােমার কথা শােনে, তােমাকে খুব ভালােবাসে। আমি জানি তােমরা এত ভালাে। তােমার দাদা এরকম

কেন?

—শােন তানিয়া বৌদি আমাদের হােসেনদাকে বােঝাতে পারি, কিন্তু সে বুঝলে তাে মানলে তাে? আর আমার আলি চাচার কথা বলছাে, ওনার কথা শুনছে কে? চাচাকে বলি তােমার ছেলে আছে বলেই নাতি-নাতনি আছে। নাতি-নাতনিকে আদর করাে ভালােবাসাে বৌমা যদি ভালাে না থাকে নাতি-নাতনি কি ভালাে থাকবে? এদের সহ্য করতে হবে। আমি সবাইকে বােঝাতে পারি

কিন্তু বুঝতে হবে তাে।

তানিয়া বৌদি তােমরা তাে ধর্মপ্রাণ মানুষ, কোরান পড়াে, নমাজ পড়াে, বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাও। সব জায়গায় তাে একটা জিনিস দেখায় ধরাে ধরাে, যখন রাগ হবে মাটির দিকে তাকাবে আর ভাববে আমাকে মাটির মতাে করাে। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। যখন কেউ তােমায় কটু কথা বলবে তখন রাগ করে উল্টোপাল্টা | না বলে ভাববে এটা আমার প্রাপ্তি ছিল। তােমরা তাে পাপ পুণ্যের কথা বলাে, শােন, ভালাে কাজ করলে পরের জন্মে ভালাে জায়গা পাবে। | তােমায় যদি গালাগালি করে আর তুমি যদি তাকে বলাে, আমায় তুমি গালি দিচ্ছে। এটা আমার প্রাপ্তি ছিল। আমি হয়তাে আগের জন্মে পাপ করেছি। তােমার বকা, নিন্দার মাধ্যমে আমার | সেই পাপ খণ্ডন হল। তােমাকে ধন্যবাদ। দেখবে তার ভূমিকা। আর যদি বুদ্ধি থাকে তাহলে সে আর একবার গালাগাল দিতে ভাববে।

তােমরা তাে ধর্ম করাে, রাগের সময় তুমি যদি বার বার ইনশাল্লা বল, দেখবে তােমার ক্রোধ, রাগ বাতাসে উড়ে যাবে।।

তানিয়াবৌদি তুমি বলছাে কথা আমার দাদা শােনে। আমি বলছি একদম শােনে না। যদি শুনতাে তােমাদের সংসার আরও ভালাে চলতাে। দাদা সেই সময় আমায় বােঝালাে, বােন আকশা তুই একটা ইনকামের জায়গা পেয়ে যাবি আল ইনকাম কোম্পানি করিস।

—আমি তখন আমার এই দাদাকে বলি, দাদা তুই এসব করিস না। এগুলাে চিটফাণ্ড। কী করে এক বছরে ডাবল টাকা দেবে?

—শােন বড় বড় বাগান করেছে আমাদের কোম্পানী। আর। বি আই এর অনুমতি আছে আমার হাতে। তাছাড়া জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে সরকার আমাদের সাথে আছে। কোনও ভয় নেই। তাের বন্ধু নেমে গেছে এই ইনকামে। দেখ চার চাকার গাড়ি বড় বাড়ি করেছে।

—দাদা তােকে একটা কথা বলবাে। ব্যাঙ্ক, পােস্ট অফিস কোথাও এত তাড়াতাড়ি টাকা ডবল হয় না। আর তাের কোম্পানি। দিয়ে দেবে! এগুলাে মানুষ ঠকানাে ব্যাবসা, করিস না। | তানিয়া বৌদি দাদা আমার কথা শােনে না। শুনলে দাদাকে ঐরকম ভাবে দেনার দায়ে পড়তে হতাে না। কোম্পানি তাে পগাড়পার হবেই। এটা জানার কথা। আমার একটি কাজ করা মানে চিন্তাভাবনা করবাে না তাই হয় নাকি? আমি আমার দাদাকে অনেকবার বারণ করেছিলাম, কিন্তু শােনেনি। কিন্তু ভুগলাে কে? আমার দাদাই। সেই থেকে ভাইয়ের সংসারে গণ্ডগােল এবং পরিণতিতে কত সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে। ভাইয়ের বাঁচা মরা একটা বড় প্রশ্নের সম্মুখীন হল। হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছিল | কে? আমার ভাই। সেই যে শরীরে বিষ ঢুকে ছিল আজও তাকেই ভুগতে হয়। সর্দি কাশি থেকে শুরু করে শ্বাসকষ্ট আমার দাদাকেই ভুগতে হচ্ছে।

আমার তখন পড়াশুনা চলছে, আমাদের গােটা পরিবার

অর্থনৈতিক সঙ্কটে ভুগছি এটা ঠিকই। এই অবস্থা দেখে আমার। দাদার ভালাে লাগার কথা না। নিজের চাচারে ভাই বােলে কথা। | হােসেন—শােন আকশা তাের অর্থের দরকার কিন্তু আমার চাচার অবস্থা বর্তমানে ভালাে না। চাচা শুধু ভাত খাচ্ছে, আর আমি দেখছি আর বলছি, চাচা তুমি শুধু ভাত খাচ্ছাে, সামান্য। ডালও হলাে না।

—শােনরে ভাইপাে আমার তাে বয়স হয়েছে এখন আমার হাঁটুতে ব্যথা, গিটে গিটে ব্যথা। ডাল খেলে ব্যথা বাড়ে, তাই ডাল খাচ্ছি না। কাঁচা রসুন আমার খুব প্রিয়। তাছাড়া রসুন দিয়ে ভাত খেলে নানাবিধ রােগের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। | আমি চাচার সব কথা শুনলাম। আর ভাবলাম তাের যদি কোনও একটা হিল্লে হয়ে যেত তাহলে তােদের সংসার সেই আগের মতাে সুন্দর চলতাে। তুই কী জানিস তােদের কলেজে ক্যাজুয়ালে লােক নিচ্ছে। আমি খবর পেয়েছি যারা ঐ মহাবিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যখন স্থায়ী নিয়ােগ প্রক্রিয়া চলবে। তুই তােদের কলেজের কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাদের ধর তাহলেও তােরও একটি চান্স থাকবে।

—আমি আমার দাদার কথা শুনলাম, কিন্তু তার মুখের উপর কিছু বললাম না। দাদার কাছে সব বলা যায় না, তবে কীভাবে কর্মচারী নিয়ােগ হয় তা তাে আমি জানি। আমাদের এলাকার যে মেয়ের ঐ কলেজে চাকরি হয়েছে আমি সবাইয়ের খবর জানি। কর্মচারী ইউনিয়ন ঘরে যেতে হবে। আজ কলেজ কর্তৃপক্ষ গত সাত-আট বছর কোনও স্থায়ী নিয়ােগ নেই। যদিও যে দুই চারটে জায়গায় নিয়ােগ হবে মােটা টাকার দরকার। শুধু টাকার কথা বলবে না। রীতিমতাে অবাকও হতে পারে! মেয়েদেরকে ইউনিয়নের বাবুদের ঘরে ঘুমােতে হবে। আমি ঐ কাজটা করতে পারলাম , আমার তাতে কোনও দুঃক্ষেপ হয়নি।

আমিও ভাবলাম, কলেজে এই সিলি ম্যাটার। আমি চাকরি পাইনি। অনেক সংগ্রাম করেই বাকি দিনগুলাে কাটাতে হবে। আমি জানি আমাদের এলাকার যারা একসময় গুণ্ডাগৰ্দি করতাে তারা আজ নেতায় রূপান্তরিত হয়েছে। আজ আমাদের সােপিয়ান, গুলগ্রাম এলাকায় যারা শাসক শ্রেণীর মাথায় রয়েছে আমি তাদের জানি। এদের কাছে আমার চাকরির আবেদন করা মানে অন্যায়ের সাথে আপস করা। আমি এতদিন অবধি সেই শিক্ষাদীক্ষা পেয়েছি তার কোনও মূল্য নেই?

আমি আবারও বলবাে চাচা আপনি সুখী হতে চাইছেন, সুখ। চাইলেই কী পাওয়া যায় ?

—মা আকশা আমি পরিষ্কার কথা বলতে ভালােবাসি। আমি এই পরিবারে ব্রাত্য। আমার ঔষধে জল দিয়ে দেয় আমার নাতি নাতনিরা। আমার আত্মীয়স্বজন যদি আসে তাহলে এক কাপ চাও করে খাওয়াতে চায় না আমার ছেলের বৌ। তখন কার ভালাে লাগে ?

—আলি চাচা আমি সব জানি। তােমার বৌমা কখন গালাগাল করে? কখন বলে পাশের বাড়ির বুড়ির সাথে তােমার সরু লাইন

আছে? যখন মাথাটা বিগড়ে যায়। একটা মানুষের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাব থাকে। কোনও কারণে তার মাইণ্ড যদি ঠিক না থাকে চলার ছন্দ, বলার ছন্দ তার মধ্যে যদি না থাকে, তখন সে হিসাব ছাড়া কথাবার্তা বলে। সেই কথা শুনলে তাে রাস্তাঘাটও চলা যাবে না। তখন তার সাথে তর্ক করা কথা কাটাকাটি করা উচিত নয়। আমি চাকরি বাকরি পাইনি, চাকরি পাবাে কোথা থেকে? আমাদের দক্ষিণ কাশ্মীরের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হবে। সােপিয়ান জেলার দরবার শরিফের সবথেকে কাছে একটা প্রাইমারি স্কুল রয়েছে, | তিন তিনটে বড় সুন্দর এখন এখানে স্কুল ঘটা রয়েছে কিন্তু শিক্ষক নেই ছাত্রছাত্রী নেই। অর্থাৎ কোথাও কোনও নিয়ােগ নেই। আমার মতাে মেয়ে মানুষের চাকরি হবে কী করে? | আমাদের রাজ্যে অর্থনীতির মূলভিত্তি হল পর্যটন ব্যাবসা। এত | গণ্ডগােলের জন্য পর্যটক আসছে না। এই ব্যাবসা মার খাচ্ছে।

অর্থনীতি তলানিতে যাওয়ার জন্য লােকের হাতে পয়সা নেই। অর্থনীতি খারাপ হওয়ার মূলে ফসলের দাম না পাওয়া একটা বড় কারণ। মানুষ আজ খেতে পারছে না, শরীর খারাপ হলে চিকিৎসা করাতে পারছে না। শিক্ষা হচ্ছে না, যার পয়সা তার শিক্ষা। কাজে দুর্নীতি। অনেক বরাদ্দ কিন্তু যারা উপকার পাবে তারা উপকৃত হতে পাচ্ছে না। গণ্ডগােলের সুযােগে তারাও ফুলে ফেঁপে বড়লােক হয়ে যাচ্ছে। মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ছে কোথাও কোনও খাবার পাওয়া যায় কিনা।

এই সুযােগটা কাজে লাগাচ্ছে উগ্রবাদীরা। ধর্মের নাম করে তারা টাকা তুলছে, রাজ্যেরই মানুষের সীমাহীন দুর্গতিকে বলছে। একদিকে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে উগ্রবাদী মাদ্রাসার আগমন ঘটছে, তারাই ধর্মের আড়ালে মানুষকে ভারতবিরােধী মুসলিম বিরােধী তৈরি করছে। | চাচা আপনি যদি যথাযথ পথে চলতেন আপনি আপনার পরিবারে ভালাে চলতে পারতেন, আপনি যদি এইসব উগ্রবাদকে প্রশ্রয় না দিতেন আপনার এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা হতাে। আমি শুধু করিমচাচা আপনাকে একা বলছি না। আপনাদের মতাে সবাই যদি একটি শৃঙ্খলার লাইনে কথা বলতে পারতেন সমাজের উপকার। হতাে আপনার পরিবারকেও ভালাে রাখতে পারতেন।

ধর্ম একটা বড় হাতিয়ার। চারিদিকে মেঘের গর্জন। সকাল সাতটা এখন সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। ঘন কালাে অন্ধকারে, গাছপালা সবই চুপচাপ আছে, কোনও পাখির শব্দ শােনা যাচ্ছে না, হয়তাে বা ঝড় উঠবে, গাছপালা ভেঙে পড়বে। বৃষ্টিতে ভেসে যাবে। রাস্তা দিয়ে যাওয়া দুষ্কর হবে।

কিছুক্ষণের মধ্যে হাওয়ায় গাছপালাগুলাে নড়তে থাকলাে, ধুলােগুলাে উড়তে থাকলাে চটকা গাছের শুকনাে ফলগুলাে একটা ছন্দে বাজনা বাজাতে থাকলাে। সমীর এরই মধ্যে দিয়ে রানাঘাট

ছয় নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসলাে দশটা দশের রানাঘাট লােকাল ধরার | জন্য। ফঁাকা ট্রেন। এক জায়গায় বসে বসে ভাবছে, আজ সব

কিছুই বৃথা মনে হচ্ছে কেন? আমাদের বাড়ির পাশের গণেশের ভাই বিয়ে বিয়ে করেছে বাদল শেখের মেয়ে শম্পাকে। দুই দুটো ছেলে মেয়ের বাবা হল গণেশের ভাই কার্তিক। নােকাড়ী রানাঘাট এলাকার অন্যতম জাগ্রত মন্দির মাঝের গ্রাম কালীবাড়ি। কার্তিক আর শম্পা অনেক বছর ধরে সেখানে তারা পুজো দেয়। বলতে গেলে এই মন্দিরে মানত করেছিল বিয়ের আগে থেকেই। কার্তিক আর শম্পা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে। দূরের কোনও এক জায়গায় তারা গােপনে থাকতে শুরু করে। বাদল শেখ বিয়ে ভাই রে অনেক চেষ্টা করে, নাবালিকা হিসাবে কেস করে কিন্তু দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াতে এই কেস ধােপে টেকেনি। গণেশের বাড়ির সবাই তাদের বয়কট করে।।

এইদিন মাঝের গ্রাম কালীবাড়িতে তারা দুই জনা বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে যায় কালীপূজা দিতে। কিন্তু কয়েক মত্ত যুবক এসে শম্পাকে মন্দির থেকে বের করে দেয়, অকথ্য গালিগালাজ দিয়ে, শালা মিয়ার বাচ্চা এসে মন্দিরটাকে অপবিত্র করে দেয়। কার্তিক বলতে থাকে আমরা মায়ের কাছে প্রতিবার আসি। মায়ের ইচ্ছায় আমরা দুইজন দুইজনাকে বিয়ে করেছি।

আরে শয়তানের বাচ্চা। তাের কপালে কোনও হিন্দু মেয়ে জোটেনি।

সমীর খবরের কাগজ ওল্টোচ্ছে আর ঘটনাটি দেখছ আর ভাবছে, আমিও আকশাকে ভালােবাসি। আমার স্ত্রী আকশার পরিচয় যদি জানতে পারে এই সমস্ত ছেলেছােকরারা এরকম ঘাড়ধাক্কা খেতে পারি।।

হঠাৎ করে লােকজনের দৌড়াদৌড়ি বেড়ে গেল। বনগাঁ লােকাল চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে, আর লােকজন চলন্ত গাড়ি থেকে নেমেই দৌড়াচ্ছে। কয়েকটি ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে পেছনের দিকে গেলাে। হঠাৎ করে চিৎকার, জায়গা পেলিনা? হঠাও এইসব জিনিস।

আমি পেছনে তাকিয়ে বসার জায়গা থেকে লােকটা নামিয়ে দিল। বয়স্ক ফর্সা লােকটির মুখে লম্বা পাকা দাড়ি। পেয়ারার ঝুড়িটাকে বেঞ্চের তলা থেকে টেনে বাইরের দিকে টানছে আর বলছে, শালা পাকিস্তানে চলে যা। জায়গা পাওনা। শালাদের জন্য দেশে এতাে হানাহানি।

আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি। এই ছেলেগুলাে রােজ ঐ জায়গায় বসে, উল্টোপাল্টা কথাবার্তা, তাস খেলতে খেলতে কাজে বের হয়। | আমি চুপচাপ থাকতে পারলাম না, আস্তে আস্তে বলতে থাকলাম, বয়স্ক লােকটাকে এই রকম ব্যবহার? গরিব মানুষ, দেবগ্রাম পলাশি থেকে পেয়ারা নিয়ে আসে আর কল্যাণী নিয়ে গিয়ে খুচরাে ও পাইকারি বিক্রি করে বাড়ি চলে যায়। পাশের লােকটা বিরক্ত বােধ করছে এবং বলছে, এটা ঠিক হল না। গরিব মানুষ ব্যাবসা করে খায়।

দূর থেকে একটা লােক আমাদের দুইজনার কথা কেড়ে নিয়ে বলতে থাকলাে, আপনাদের মতাে নীতিকথার জন্যই দেশের

এই অবস্থা। লালগােলার লাইনে যাওয়া যায় না। ঐ শালার মিয়ার জাতের জন্য বসার উপায় নেই। —খানে কী হয় তার জন্য আমরা নিন্দা করি।

আজ হিন্দুরা কমে গেছে আপনাদের মতাে নীতিকথার জন্য। ওদের বিরুদ্ধে একজোট হতে হবে।

—তাহলে দাড়িওয়ালা লােকটাকে মারার দরকার ছিল না।

—আমি ঐ লােকটাকে এরকম আচরণের সমর্থন করি না। | কিন্তু ঐ জাতটাকে আমার অসহ্য। আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই | হিন্দুরা সংখ্যালঘুতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। পৃথিবীর যেখানে গণ্ডগােল সব ওরাই করে। সব হিন্দুদের সংগঠিত হতে হবে, আপনাদের মতাে কিছু নীতিবাগীশ লােকের জন্য আজ হিন্দুরা সংখ্যালঘুতে রূপান্তরিত হচ্ছে। আর যেই দিন মিয়ারা পঞ্চাশের কাছে চলে যাবে তখন আপনাদের মুখে আর কোনও কথা বের হবে না। আপনি দেখুন পৃথিবীর যত গণ্ডগােল সব করে ওরা। | হিন্দুরা হল শান্ত জাত। আপনি দেখাতে পারবেন কোন হিন্দু সন্ত্রাসবাদী বা জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত আছে? দেখাতে পারবেন না।

—এতক্ষণ আপনার কথা শুনলাম মনােযােগ দিয়ে। আপনাকে আমার কথাও শুনতে হবে। আপনি বললেন ঐ জাত। আমার প্রশ্ন জাত আর ধর্ম কী এক? এক জাতের লােকের মধ্যে অনেক | ধর্মের লােক থাকে। আমি উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি। আমাদের | পাশের রাজ্য আসাম এবং তার পাশের রাজ্য মেঘালয়ে মূলত খাসিয়া, জয়ন্তি এবং গারাে জাতের লােক বাস করে। মেঘালয়ের গারাে জাতি সম্পর্কে যদি আলােচনা করি তাহলে দেখবাে, এরা | বেশির ভাগ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। অল্প কিছু সংখ্যক লােক আছে তারা আজও হিন্দু ধর্মাবলম্বী। আজ থেকে একশাে বছর আগে মূলত ব্রিটিশ রাজত্বকালে এরা পুত্তলিকা বাদ থেকে খ্রিস্টান হতে | থাকে তাদের সুবিধার জন্য। এই এলাকার কিছু মানুষ আজও মূর্তি | পুজো করে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি পুজো করে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মূর্তির সাথে জিশুখ্রিস্টের মূর্তি বানিয়ে পুজো করে। আপনি যদি শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতিবিজড়িত কামারপুকুর | জয়রামবাটিতে যেমন দেখতে পাবেন মন্দিরের ভজন স্থানে মা

কালী যেমনভাবে পূজা পায় তেমনি জিশু খ্রিস্টও পূজা পায়। | তিনিও ফুল তুলসি পাতা পান। কিন্তু কেন তিনি পাবেন আপনার | প্রণাম? আমরা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং স্বামী বিবেকানন্দকে শ্রদ্ধার চোখে দেখি। তাঁদের পথটাকে মানতে চেষ্টা করি। এই সমস্ত লােক এই সমাজেই তৈরি হয়েছে এবং এরাই সর্বজনগ্রাহ্য হয়েছেন। কেন তাদের কথা আমরা স্মরণ করি? তারা সবাইকে | গ্রহণ করতে পেরেছেন বলেই তাকেও সবাই একান্ত আপন

করেছে। এখানেই উঠে আসে স্যার আইজ্যাক নিউটনের কথা। | প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে। আমি যদি

একটা প্লাস্টিকের বল পৃথিবীতে ছুড়ি পৃথিবীও আপনাকে একটি | বল ফেরত দেবে। আমরা এই সমস্ত মহান ব্যক্তিদের কথাই বলছি | এতে আমি যদি আপনার মতাে লােকের বিরাগভাজন হই তাতে | আমার কিছু যায় আসে না। স্বামী বিবেকানন্দের অন্যতম মূল বক্তব্য

ভুখা পেটে ভক্তি হয় না, নীতি কথা শােনা যায় না। তিনি আরও বলেছেন, জীবে প্রেম করে যেই জন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।। মনীষীদের কথা, যত্র জীব তত্র শিব। অর্থাৎ জীবের সেবাই পরম । ধর্ম। আপনি মানুষ হয়ে মানুষের সেবা করতে পারছেন না। আপনার কথার মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে মুসলমানরা হিংসা করে, অন্যায় করে, অত্যাচার করে, সুতরাং ওদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, সবাইকে একত্র হতে হবে, সংগঠিত হতে হবে। হিংসার বিরুদ্ধে হিংসাই প্রাপ্য। তাহলে আপনি চৈতন্য মহাপ্রভুর কথা মানছেন? তিনি তাে বলেছেন যদি দাও কলসির কানা তাই বলে কী প্রেম দেব না? ইংরাজিতে একটা কথা আছে, Charity begins at home। আপনাকে ঘর থেকে শুরু করতে হবে। আপনি নিজের লােককেই শত্রু বানাচ্ছেন। যতই আপনি সন্ধের সময় গজু ঘঘাষের চায়ের দোকান থেকে দুটো বিস্কুট কুকুরকে খাওয়ালেই, জীবকে সেবা হল না।

—আপনি এর কী উত্তর দেবেন। পাকিস্তানের হিন্দুরা কমতে কমতে মাত্র দুই শতাংশে নামলাে কেন? বাংলাদেশে হিন্দুদের প্রতি অত্যাচার হবে কেন? আপনারা তাে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন । যখন হিন্দুরা মার খায় আপনাদের প্রতিবাদ আসে না?

—দাদা, আপনি তাে তুলসির মালা গলায় পরেছেন, মাথায় টিকিও দেখতে পাচ্ছি, তাহলে ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে অনেক বই। পড়েছেন।

—অবশ্যই পড়েছি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রায় সব বই আমি পড়েছি, ভাগবত গীতা, চৈতন্যচরিতামৃত পড়েছি।

—আপনি জানেন না আপনার মধ্যে কী আছে। আমার যেই । চশমা আছে আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। আমরা ছােটবেলা থেকে দেখে এসেছি বৈষ্ণব, সাধু। এরা অন্য আর দশজন থেকে আলাদা। সাধুরা আলাদা পােশাক পরে। এদের আমরা শ্রদ্ধা করি, নমস্কার করি। এদের চিন্তাভাবনাও আলাদা। এদের মুখ দিয়ে যদি হিংসা, নিন্দা, লােভ, লালসার কামনা, বাসনা, ক্রোধের কথা উঠে আসে তখন আমরা অবাক হই। আমাদের বারােধ হয়ে যায়। আমাদের মুখের ভাষা হারিয়ে যায়।

একজন সাধারণ মানুষ যখন হিংসার কথা, নিন্দার কথা বলে, আমরা শুনি কিন্তু একজন সাধু পােশাক পরা লােক যদি এরকমটা। করে তাহলে সে তার পােশাকের অবমাননা করে।

বয়স্ক মুসলমান লােকটা একজন ছােট ব্যবসায়ী, সে সামান্য পেয়ারা বিক্রি করে খায়। সে কেন বসার জায়গায় বসবে? তাকে ধাক্কা মেরে বসার জায়গা থেকে সরিয়ে দিল, তার পেয়ারার ঝুড়িটা ফেলে দিল। কোনও কথা বলার উপায় নেই। ঐ ছেলেগুলাে জায়গা নেওয়ার জন্য এই কাজ করলাে। এটা কী ন্যায়? আমার কাছে এটা ভালাে লাগলাে না। লােকটির গালে যদি দাড়ি না থাকতাে, লােকটার পরনে যদি লুঙি না থাকতাে তাহলে ছেলেগুলাে এমন। খারাপ আচরণ করতাে কী?

আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি পরে দেখলাম ধাক্কার ঠ্যালায় লােকটির পা থেকে গলগল করে রক্ত ঝরছিল। লুঙি ভেদ করে

বাইরে পরছে। গামছা দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে চোখ দুটো রক্তজবা হয়ে গেছে। একী সহ্য করা যায়? এর প্রতিবাদ যখন করলাম তখন আপনার মতাে ভেকধারী বৈষ্ণব পর্যন্ত ঐ | ছেলেগুলাের ঐ অপকর্মকে সমর্থন করলেন। দয়া করে আপনি

আপনাকে দেখুন, আপনার গায়ে যে আবরণ আছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করুন। | আপনিও আমাকে বললেন, আমি শুনলাম। বাংলাদেশে একসময় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল কিন্তু পরবর্তীকালে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হল আর গণ্ডগােলের সূত্রপাত হল। আমরা আমাদের | ভিটেমাটি ছাড়লাম কেন?

—আমাদের দেশ ভারতবর্ষে নানা জাতি এসেছিল, তারা কেউ পর্যটক হিসাবে আবার কেউ ধনসম্পত্তি লুঠ করে চলে গিয়েছিল, আবার কেউ এই দেশে রাজত্ব করে এই দেশের লােক হয়েছিল। আমাদের দেশে সবার শেষে এসেছিল ব্রিটিশরা। যেমন জম্মু ও কাশ্মীরে ডাল লেকে, মােগল রােডের পার্শ্ববর্তী লেকে হাজারও পাখি ছুটে আসে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে। বেশিরভাগ মাইগ্রেটরি পাখি চলে গেছে নিজের দেশে আর সামান্য কিছু পাখি এইখানেই

থেকে যায়। এই দেশের জলবায়ুকে নিজের দেহ মনপ্রাণে নিয়ে | আজ তারা এই দেশের পাখিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। মানুষ বিভিন্ন যুগে যেভাবেই হােক আসে এবং এই দেশের হয়ে যায়। বিভিন্ন ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটে আমাদের ভাষায়। আমরা ছােটবেলায় আমাদের জন্মদিনে মা আমাদের পায়েস রান্না করে খাওয়াতাে। কিন্তু আজ কী দেখি? আজ জন্ম দিনে কেক কাটি হ্যাপি বার্থ ডে বলি। এগুলাে সবই আমাদের হয়ে গেছে। | আমাদের ট্র্যাডিশনাল পােশাক ছিল ধুতি কিন্তু আজ আমরা সবাই শার্ট পরিধান করি। আমাদের ছােটবেলায় প্যান্টি শার্ট পরা লােক দেখলে আমাদের বড়ােরা বলতাে, খ্রিস্টান পাড়া থেকে এসেছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আমরা আজ পরিবর্তিত। আজ আমরা সবাই প্যান্ট শার্ট পরি। আজ আমাদের দেখলে কেউ বলবেনা, খ্রিস্টান পাড়ার লােক। | আমাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত। আগে আমাদের বিবাহ অনুষ্ঠানে সাধারণ ভাত, ডাল, মাছ, মাংস ইত্যাদি স্বাভাবিক খাবার খেতাম। কিন্তু আজ অনুষ্ঠানে আমরা খাই চিকেন স্যাটে, | মানুচিরিয়ান, চিলি চিকেন, সিক কাবাব, চিকেন বিরিয়ানি, আরও অনেক ধরনের আইটেম। অর্থাৎ আমাদের খাদ্যের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। এই খাবারগুলাে এখন আমাদের হয়ে গেছে।

এবার আসি ভারতীয় ভাষায়। আমাদের যশােরের ভাষারও পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলা ভাষায় হিন্দি, ইংরেজি, ফার্সি ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটেছে তাই আমাদের বাংলা ভাষায় হিন্দু, উর্দু, ইংরেজির অনুপ্রবেশ স্পষ্ট। টেবিল, চেয়ার এখন আমাদের ভাষা হয়ে গেল।

আমাদের প্রতিবেশী গণেশের বয়স চল্লিশ। গণেশ নিয়ে এনেছে | বাদল শেখের মেয়েকে এদের ছেলেমেয়ে আজ বড় হয়ে গেছে,

স্কুলে পড়ে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক শিক্ষিকারা

বিয়ে করেছে হিন্দু মুসলমানে। তাদের ছেলেমেয়েরা আজ প্রতিষ্ঠিত। এদের আপনি কীভাবে দেখবেন? নাকি তাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলবেন। আগে এই সমস্ত মানুষগুলােকে আপনাদের নিদান নিদত। সমাজ থেকে তাড়িয়ে দিতেন আর আশ্রয় দিত মুসলমানরা। তৎকালীন যুগে গ্রামের মাতব্বররা এদের উপর অত্যাচার করতাে, দমন পীড়ন করতাে, শান্তিপ্রিয় বিশ্বভ্রাতৃত্ববাদী অহিংসার প্রতীক মুসলমানরা নিজের করে নিত। ওদের সংখ্যা বাড়বে না কমবে? সতীদাহ প্রথার কথা আজও বাংলা থেকে উঠে যায়নি। আজ থেকে একশাে বছর আগে এই ভয়ানক নিষ্ঠুর প্রথার কারণে কত নারীকে আত্মহত্যা করাতে প্ররােচনা দিত। একজন পুরুষের পাঁচটি স্ত্রী। যদি ঐ বৃদ্ধ মারা যেতাে তাহলে সব কয়টা বউকে আগুনে নিক্ষেপ করাতাে বাবুরা। তৎকালীন সময়ে ঐ প্রৌড়ের স্ত্রীরা, ছেলেমেয়েরা অসহায় বােধ করতে থাকে। ঐ প্রৌড়ের সন্তানরা, স্ত্রীরা যদি মৌলবির দারস্থ হয়, তাহলে কি অন্যায়? ঐ সময় দলে দলে মানুষ ধর্মান্তরিত হয়।

রাজা রামমােহন রায় যদি না আন্দোলন করতেন তাহলে এক সতীদাহ প্রথার প্রয়ােগের মাধ্যমে আর আরও অনেক লােক মুসলমান হয়ে যেতাে, তােমরা যদি সংখ্যালঘুতে রূপান্তরিত হও তা কেবল তােমাদের জন্য।

—আমরা ভারতের ইতিহাস একটু হলেও জানি। ব্রিটিশ রাজের আগে নবাবি, সুলতানি আমলে হিন্দু মন্দিরে আক্রমণ হয়নি? নবাব বাদশা, সুলতানরা মুসলমানরা জোর করে ধর্মান্তরিত করেনি?

—এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই আছে। নবাব বাদশা যারা দেশ শাসন করতাে তারা কতদূর মুসলমান ছিল এটা আমার কাছে সবথেকে বড় প্রশ্ন। আমি ইতিহাসবিদদের সাথে কথা বলে জেনেছি নামেই তারা মুসলমান ছিল। প্রকৃত মুসলমান কখন মিথ্যার আশ্রয় নেয় না। প্রকৃত মুসলমান মানুষকে ঠকায় না। কিন্তু ইতিহাস বলছে সুলতান, সম্রাট হয়েছে বিশ্বাসঘাতকতা করে, খুন করে। তাহলে অঙ্কের হিসাব কী বলছে রাজা বাদশা হওয়া মানে বিশ্বাসঘাতকতা, শঠতা, বেইমানি মির্জাকরী কার্যকলাপ। ইসলাম মানে শান্তি, সততা, অহিংসা। সৃষ্টির সময় থেকেই সমগ্রবিশ্বে ইসলাম শান্তি আর অহিংসার বাতাবরণ প্রতিষ্ঠা করে চলেছে।

মুসলমান হওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার। একজন লােক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে মুখে লম্বা দাড়ি রাখলেই মুসলমান হওয়া যায় না।

| আমরা জানি কোনও ব্যক্তি হজ করে আসলেও নামে হাজি হল, এটা ঠিক, কিন্তু সে যদি হজ করে আসার পর তার বাবা মাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিল, ইসলামের ব্যাখ্যায় সেই ব্যক্তির মধ্যে ইসলাম থাকতে পারে না। নবাব বাদশা, সুলতানরা নিজেরাই মুসলমান না, তাহলে সে কী করে মুসলিম তৈরি করে?

আপনি বলবেন নবাব বাদশারা মন্দির আক্রমণ করেনি? তারা মন্দির ভেঙেছে শুধুমাত্র তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে।

যেমন কুতুবউদ্দিন আইবক, বখতিয়ার খলজি, আওরঙ্গজেব, নাদির শা। তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে যেখানে যেমন দরকার হয়েছে সেখানে তারা তাই করেছে। যেমন আকবর। কোথাও মন্দির ভেঙেছে, আবার কোথাও মন্দির গড়েছে। আজকের দিনে আমাদের দেশে রামমন্দির বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে যা কাণ্ডকারখানা হচ্ছে তা যদি সূক্ষ্মভাবে দেখা যায় সবটাই রাজনৈতিক স্বার্থ। এখানেও ধর্মটা আসলে মােড়কে আসল উদ্দেশ্য হল ক্ষমতায়ন। ধর্মের ভাবনাচিন্তা আর রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তা আলাদা। রাজনীতির সাথে ধর্মকে মেশানাে হচ্ছে, প্রকৃত ধর্ম সেখানে থাকতে পারে না। সত্যি আর মিথ্যা একসাথে থাকতে পারে না। সত্যি আর মিথ্যা একসাথে থাকতে পারে না।

সুলতানি ও নবাবি শাসকদের মুখেই শােনা যায়, যদি সঠিক ধর্ম পালন করা হয় তাহলে সাম্রাজ্য বিস্তার, ধরে রাখা কস্মিনকালেও সম্ভব না। ধর্মটাকে কেবল একটি হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে হয়। যেমন সম্রাট আকবর করেছিলেন। নয় কি?

—তাহলে তাে কোনও কিছুই বলা যাবে না। দাদা আপনার হিসাবে আমরা যারা দেশান্তরিত হয়েছি তার কী ব্যাখ্যা ? এখন কী আজকে পাকিস্তান আর ভারত দুই রাষ্ট্রের ঝগড়া কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে। আমরা জানি ভারত (!!) ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে ধর্মকে কেন্দ্র করে। তাহলে কেন পাকিস্তান হল? সেই সময় কাশ্মীরটা যদি ভারত নিয়ে নিত তাহলে আজ এত সেনার মৃত্যু হত না। ভারতও যােগ্য জবাব দিতাে না। আজ আমার মনে হয় ভারত যে সার্জিকাল স্ট্রাইক করছে তা সম্ভব হয়েছে ছাপ্পান্ন ইঞ্চির প্রধানমন্ত্রীর জন্য।

আজ ভােরেই বালাকোটে জয়িশ-মহম্মদের ঘাঁটি ধ্বংসের দরকার ছিল। তিন চারশাের বেশি জঙ্গি খতম করা কী সহজ ব্যাপার! দুই দিক দিয়ে বিমান হানা, মধ্যপ্রদেশের গােয়ালিয়র থেকে গেছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বালাকোটে হানা দিয়ে ভারতে ফিরে আসলাে। কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। দেশের প্রধানমন্ত্রী দিল্লির নর্থ ব্লকের ওয়ার রুমে জেগে ছিলেন। ভারতের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। পাকিস্তানিদের এক যােগ্য জবাব। আমি জানতাম এরকমটা হবে। যখন দেখলাম দশ হাজার সেনা মােতায়েন হচ্ছে কাশ্মীরে তখনই হিসাব পরিষ্কার। কুপওয়াড়ার কাছে মুজাফফরাবাদ থেকে বালাকোট কাছেই। ঐ একই সময় উরি সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানের চাকোটিতে বিমান হানা দেয় ভারতীয় বায়ুসেনা। আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাজিপটকা ফুটছে, যেন মনে হয় দেওয়ালি এসে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর বুকের পাটা আছে। এই জাতটাকে উচিত শিক্ষা দিতে পারে একমাত্র এই প্রধানমন্ত্রী। এবারও ছাপান্ন ইঞ্চির জায়গায় পাক্কা। মাসুদ আজাহারের বালাকোটের প্রশিক্ষণ বর্বাদ করে দেওয়া হয়েছে, শয়ে শয়ে উগ্রবাদী মারা গেছে। বাড়িটাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। বারােখানা যুদ্ধবিমান একযােগে ভােরবেলায় অ্যাটাক করে আবার ফিরেও আসে।

ভারত পারে পাল্টা আঘাত করতে, ভারতের ক্ষমতাও

আছে। উগ্রবাদী ঘাঁটি ধ্বংস করেছে আমরাও আনন্দিত। বায়ু সেনারা পাক অধিকৃত কাশ্মীরের পঞ্চাশ কিমি ভিতরে ঢুকে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করা হিম্মতের ব্যাপার। ভারতের বায়ুসেনাদের অভিনন্দন প্রাপ্য। তাদের জন্য আমি একজন ভারতবাসী হিসাবে গর্বিত। ভারতের প্রতিটি সংবাদ মাধ্যম সফলতার বন্যা হইয়ে দিচ্ছে, যতটা বায়ু সেনার কৃতিত্বের কথা বলছে তার থেকে বেশি। বলছে প্রধানমন্ত্রীর বুকের পাটার। হয়তাে একটু বাড়াবাড়িই। তবে একথা স্বীকার করতেই হবে স্বাধীনতার পর থেকে রাজনৈতিক তথা সরকারের দৃঢ়তার অভাবে অতীতে ভারতীয় সেনা পাল্টা মার। দেওয়ার সুযোেগ পায়নি। একমাত্র ব্যাতিক্রম বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় ইন্দিরাগান্ধি। তারপর এবার মােদিজি সেই দৃঢ়তা প্রদর্শন করলেন—সেনাবাহিনীকে অল ক্লিয়ার সিগনাল দিলেন। তাই দেশবাসীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী মােদি অবশ্যই বাহবা ও অভিনন্দন। পাবার যােগ্য। | ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম ছাড়াও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম যেমন রয়টার, বিবিসি (ব্রিটিশ বাের্ড কর্পোরেশন) ওয়াশিংটন টাইম, আলজাজিরার মতাে সংবাদ মাধ্যম তিনশােজন জঙ্গি হত্যার সিলমােহর দিচ্ছে না। এখন সােশ্যাল মিডিয়া যেমন ফেসবুক, হােয়াটস আপ, টুইটার ইত্যাদিতে ভেসে আসছে ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ১৯ এর শিকার হয়েছে বালাকোটের কিছু কাক। যেখানে পাহাড়ের টিলায় এই ধস হয়েছে সেখানে কিছু গাছ ধ্বংস হয়েছে। তখন আমার মনে প্রশ্ন জাগে, জানতে ইচ্ছে করে প্রকৃত সত্য কী? পাকিস্তান বেস সংবাদ মাধ্যম লাগাতার দাবি করছে তাদের দেশে এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

এদিকে গুগল জিয়ােগ্রাফি চ্যানেল দাবি করেছে যেই বাড়ি ধ্বংসের কথা ভারত সরকার দাবি করছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বালাকোটের সেই প্রশিক্ষণ শিবির আজও অক্ষত। আমার মনে ভারতীয় সেনা মিথ্যা বলছে! মানুষ দ্বন্দ্বে রয়েছে। ভারতবাসী হিসাবে আমার প্রকৃত খবর জানার ইচ্ছা তাে অমূলক নয়। এদিকে সােশ্যাল মিডিয়া বলছে, ভারতীয় বায়ু সেনার একটি বিমান পাকিস্তান ভূপতিত করে। তার ধ্বংসাবশেষ পাকিস্তান দেখাচ্ছে।

—পাকবিমান ধ্বংস হয়েছে এবং প্যারাসুটে পাকিস্তানে নেমেছে পাইলট। পাকিস্তানি জনতা ভেবেছিল ভারতীয় লাইলট। পাকিস্তানি জনতার গণপ্রহারে পাক পাইলট মারা গেছে। পাকিস্তানিরা কী নিষ্ঠুর! ভারতীয় পাইলট যদি পাক ভূমিতে পড়ে তবে বাঁচিয়ে রাখতে পারে? এখন যুদ্ধের সময় মিথ্যা খবর বের হবেই। ভারত পাক যুদ্ধে একত্তর সালে যখন স্বাধীন বাংলা তৈরি হয় তখনও মিথ্যা সংবাদ আমরা শুনতে পেতাম। রেডিয়াে বাংলাদেশ বলছে আগরতলা থেকে আর প্রকাশ করছে স্বাধীন বাংলায় আমতলা থেকে।

সােশ্যাল মিডিয়ার খবর চলে যায় আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে। আলজাজিরা জানাতে থাকে, ভারতীয় পাইলট অভিনন্দন বর্তমান পাকসেনার হাতে বন্দী, পাক সেনার গুলিতে ভারতীয় বিমান আকাশ পথেই আক্রান্ত হয় তখনই অভিনন্দন প্যারাসুটে।

পাকভূমিতে অবতরণ করে। এখানকার আদিবাসীরা তাকে কিল ঘুষি মারে আসে সােশ্যাল মিডিয়ায় খবর চলে যায় এবং পাক সেনারা ক্ষুব্ধ জনতার কাছ থেকে তাকে উদ্ধার করে বন্দী করে। ভারতীয় মিডিয়া তখনই খবরটা নেয় এবং অভিনন্দন সম্পর্কে বলতে থাকে। ভারতীয় বিদেশ দপ্তর তারপরেই স্বীকার করে ভারতের কোনও বিমানপাক গুলিতে ধ্বংস হয়নি। | ভারতবর্ষের বায়ুসেনার তরফ থেকে কোনও বিমান ভূপতিতের কথা কিংবা কোনও নিখোঁজ হওয়ার কথা স্বীকার করা হয়নি। কিন্তু ফেসবুকে যখন অভিনন্দের মার খাওয়া, পাকসেনারা ক্রুদ্ধ জনতা থেকে উদ্ধার হওয়া ঘটনা দেখায়। পাকিস্তান ও ভারতের গােপন রহস্য উন্মােচিত হয়।

এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থায় জানা যায় ভারতীয় বায়ুসেনা ক্যাপটেনকে পাকসেনারা বন্দি করে, হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। কী করে তাকে ভারতে ফেরানাে যায় তার পরিকল্পনা চলছে। ভারতীয় দূতাবাস যােগাযােগ করে পাক সরকারের সাথে। পাক প্রশাসকের মতামত জানা যায়নি। কী হবে কে জানে? নাকি কূলভূষণের মতাে পাক জেলে বন্দি থাকে নাকি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে, নাকি তাকে গায়েব করে রেখেছে। এরকম হাজারও প্রশ্ন আমার সামনে আসতে শুরু করেছে। ভারতের টেলিভিশন সংবাদপত্র তাকে নিয়ে গুরুগম্ভীর চর্চা চালায় সবার মুখে অভিনন্দন বর্তমানের ভবিষ্যৎ চর্চা চলছে।

—দাদা আপনার যুক্তিতর্ক আমি শুনলাম। আমরা যেভাবে যুক্তিতর্কের কথা বলি ভাবি ওরা তা ভাবে না। আজ সারা পৃথিবীতে যত গণ্ডগােল হয় সব মিয়াদের নাম উঠে আসে। আরও তাে কত ধর্মের লােক পৃথিবীতে আছে, তাদের ক্ষেত্রে এরকম হয় কেন?

আজকের পৃথিবী আর কালকের পৃথিবী এক না। সােভিয়েত রাশিয়া ভেঙে যাওয়ার পর দ্বিমুখী বিশ্বের বদলে একমুখী বিশ্বের আবির্ভাব হয়। একমুখী বিশ্বের সর্বোময় কর্তা হল মার্কিন দেশ। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডােনাল্ড ট্রাম্প। কিছুদিন আগে তার গায়ে রাজনৈতিক তকমা লাগেনি। তিনি ছিলেন একজন বড় ব্যবসায়ী। তাকেই করা হল মার্কিন প্রশাসক। পুঁজিবাদী দুনিয়ার সম্রাট। কর্পোরেট দুনিয়ার মূল মাথা আমেরিকা। মিডিয়া সাম্রাজ্যও তাদের হাতে। মিডিয়া সাম্রাজ্যও মার্কিন স্বার্থে পরিচালিত হয়। সেইজন্যই যদি কোনও শােনা যায় বন্দুকবাজ, আর জেহাদি। যদি কোনও সাদা চামড়ার লােক আত্মঘাতী হামলা চালায় তাকে অভিহিত করা হয় বন্ধুকবাজ কিংবা অন্য কোনও তকমা। যদি কোনওভাবে সেই নামটা মুসলিম নামের সাথে যুক্ত থাকে তার গায়ে তকমা লাগানাে হয় জেহাদি কিংবা ঐ ধরনের হামলাকারী হিসাবে। | মিডিয়া সাম্রাজ্য কয়েক বছর আগেও বলতাে আলবেনিয়া, রাখাইন, চট্টাগায়ী, পাকিস্তানি ইত্যাদি ইত্যাদি। আজ আলবেনিয়া, কিংবা তুর্কি হামলাকারী নাম না বলে সরাসরি মুসলিম জেহাদি হিসাবে বলা শুরু করেছে। অত্যন্ত সুচতুরভাবে সন্ত্রাসবাদীদের ইসলামিকরণ করা হচ্ছে।

আমরা সবাই অবগত প্যালেস্টাইন নামক দেশ আছে কিন্তু। তার অস্তিত্ব কেবল কাগজপত্রে। এই দেশটা ইজরায়েলের মধ্যে রাখা আছে। ইজরাইল আমেরিকার অঙ্গুলি হেলনে চলে। ইজাইলের সাম্রাজ্যবাদী নীতির ফলে প্যালেস্তাইন নামক দেশের মানুষ আজ অমানবিকতার কবলে রয়েছে। প্যালেস্তাইনিরা এত বেশি শােষিত হওয়ার জন্য প্রতিবাদে শামিল হয়। অত্যাচার। শােষণের ফলে এরা আত্মঘাতী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ধর্মে মুসলিম হওয়ার কারণে আত্মঘাতী মানেই মুসলিম জেহাদি।

সম্প্রতি নিউজিল্যাণ্ডে এক মসজিদে নামাজের সময় একজন। দুষ্কৃতির গুলিতে আটচল্লিশ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। এই দুষ্কৃতকারী ধর্মে খ্রিস্টান এবং সাদা চামড়ার মিডিয়ার ভাষায় দুষ্কৃতকারী বন্দুকবাজ হিসাবে অভিহিত হল।

মার্কিন মুলুকে একজন দুষ্কৃতিকারী কয়েকজনকে প্রকাশ্য। দিবালােকে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে মারলাে দুষ্কৃতিকারী মিডিয়ার ভাষায় বন্ধুকবাজ। সাদা চামড়ার দুষ্কৃতকারীকে এইভাবে লঘু করে | চিহ্নিত করা হল।

| কোনও কারণে দুষ্কৃতিকারী যদি মুসলিম নামের সাথে যুক্ত হয় তাহলে এসে যাবে জেহাদি, এসে যাবে কোনও না কোনও মুসলিম উগ্রবাদী কোনও না কোনও জেহাদি গ্রুপ।

মিডিয়া যেভাবেই হােক এই সমাজে খারাপ ও ভালাে ধারার মানুষ বর্তমান। দুষ্কৃতিকারীকে দুষ্কৃতি হিসাবেই দেখানাে যুক্তিযুক্ত। একটা ব্যক্তির মধ্যে দুটি বিপরীতধর্মী ধারা প্রবাহিত হয়। যখনই তার মধ্যে ভালাের থেকে খারাপের পরিমাণ বেশি থাকে তখন। তার পরিচয় সমাজবিরােধী।

কাশ্মীরি শিশুর জানালায় হাজার হাজার মানুষ শামিল

কাশ্মীরের পরিস্থিতি থমথমে। পুলওয়ামা বিস্ফোরণের পর পাকঅধিকৃত কাশ্মীরের বালাকোটে অবস্থিত জয়েশ-ই-মহম্মদের উগ্রবাদী প্রশিক্ষণ শিবির গুড়িয়ে দিল ভারতীয় বিমান হামলায়। ভারত সরকারের দাবি প্রশিক্ষণরত উগ্রবাদী ঘাঁটিতে যারা যারা ছিল তারা প্রত্যেকেই নিহত। ভারত সরকারের বিভিন্ন মুখ বিভিন্ন সংখ্যা বলতে থাকলাে এবং কৃতিত্বের দাবি করলাে। জম্মু কাশ্মীরের শ্রীনগর, জম্মু, লে-লাদাক সহ পাকিস্তান সংলগ্ন অনেক কয়টি বিমানবন্দর সাধারণ জনতার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। মােবাইল। পরিষেবা সহ ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বন্ধ। হয়ে গেছে আকশা আর সামিমের কথাবার্তা। আকশার শিক্ষক গতকালই বলেছিলেন, সমীরবাবু আমরা কাশ্মীরের মানুষরা আজ কাল আবার চিন্তায় আছি। এতদিন পরিবেশ পরিস্থিতিতে আমরা নাস্তানাবুদ হয়েছিলাম কিন্তু এখন আমরা রাজনৈতিক কারণে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে গেছি। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় আর উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। আমাদের এখানে যারা বাস করি তারা আজ ভারতের সবপ্রান্তে কাজ করে। কেউ শালবিক্রেতা আবার কেউ ফলের ব্যাবসা করে খায়। এখানে আমরা স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরি উগ্রবাদীদের সন্দেহের তালিকায় যেমন রয়েছি তেমনি ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনী আমাদের তল্লাশি করছে। আমরা সবাই সন্দেহের

তালিকায় রয়েছি।

| এইরকম পরিস্থিতির মধ্যেই আপনাদের থাকতে হয়। কবে যে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে কে জানে? আমিও দেখছি সর্বত্র একটা হিংসাত্মক আবহাওয়া বিরাজ করছে। কলকাতার এক নামী ডাক্তার সারা জীবন বাংলায় চিকিৎসা পরিসেবা দিয়ে গেল, তাকেও পর্যন্ত হিংসার বলি হতে হয়েছে।

আমরা ঘরে বাইরে সংকটের সম্মুখীন হয়েছি। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পড়াশুনা করে অনেক কাশ্মীরি যুবক-যুবতি। তারা ভয় সংশয় উপেক্ষা করে পড়াশুনা করছে।

—বাইস সাহাব আজকাল আমাদের এলাকার সবাই অভিনন্দনকে নিয়ে চিন্তায় আছে। সবাই টিভির সামনে থাকছে।

অভিনন্দন বর্তমানকে ভারতীয় সেনাদের হাতে তুলবে আন্তর্জাতিক | অ্যাক্ট অনুযায়ী। পাকিস্তানের সবাই চুপচাপ রয়েছে। আমাদের

এখানে চায়ের দোকানে ক্লাবে ক্লাবে টিভির সামনে ভিড় করছে জনতা সাধারণ মানুষ বলছে, পাকিস্তানির কোনও বিশ্বাস নেই। ওরা নাও ছাড়তে পারে। | সমীরবাবু আপনি প্লেনের টিকিট কেটেছিলেন ডাললেকের পাশে অবস্থিত আরিয়ান ট্যুর অ্যাণ্ড ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকে। আপনার বিমান ক্যানসেল হয়েছিল কাশ্মীরে প্রবল তুষারপাতের জন্য। বিমান সংস্থা টাকা ফেরত দেবে আরিয়ান ট্রাভেলিং এজেন্সির কাছে। | আমি সত্যিই উদ্বিগ্ন বিভিন্ন কারণে, শ্রীনগরে গিয়ে টাকার জন্য যাওয়া সম্ভব না। আমার কাছে কোনও ডকুমেন্টও নেই।

আমি সেইদিন যখন বৃষ্টি বর্ষা এবং প্রবল তুষারপাতের মধ্যে দিয়ে | বানিহাল থেকে রামবন যাচ্ছিলাম, কোমর সমান চোরা বালি কাদার | ভিতরে ঢুকে যাচ্ছিলাম, জীবন নিয়ে ফিরতে পারবাে কিনা। আমি যখন ফিরলাম আমার প্লেন টিকিট পুরােপুরিভাবে বাতিল হওয়ার পর আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্লেন টিকিটের কোনও কিছুই বােঝা যাচ্ছিল না তবুও অনেক কষ্টে দুটো ফোন নাম্বার উদ্ধার করলাম। আমার বলতে বাধা নেই পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি আমার উপর বিস্তর প্রভাব পড়েছে। আমি অল্প হলেও ভেবেছিলাম আরিয়ান ট্রাভেলিং সংস্থার আমার টাকা ফেরত দেবে না। মুসলমান মানে মির্জাফর এই কথা আমাকেও প্রভাবান্বিত হয়েছে। কিন্তু যখন আরিয়ান টুর অ্যাণ্ড ট্রাভেলিং সংস্থার প্রধান মস্তাক আমায় বললেন, আরে সমীরদাদা আপনাকে বার বার চিন্তা করতে করতে ভাবলাম, সব ঠিক হয়ে যাবে। তারপর কী দেখলাম পরপর দুইদিন কোনও বিমান শ্রীনগর থেকে ওঠানামা করেনি। ফেরার টিকিট নতুন করে টিকিট কেটেছেন?

—নানা আমি যেই দেখলাম বিমানের গণ্ডগােল হচ্ছে, বরফের কমার কোনও লক্ষণ নেই। আমি অনেক কষ্টে বাড়ি ফিরলাম। আপনার কাছে গেলে সেই দিনই টাকাও পেতাম না।

আপনি আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নাম্বার আর ব্যাঙ্ক কোড | হােয়াটস অ্যাপে ছবি তুলে পাঠিয়ে দিন। আপনার টাকা পেয়ে যাবেন।

সমীর অল্প সময় পরে মেসেজ গেল এবং সাত হাজার টাকা ফেরত পেল।

রাইস আর সমীরের কথাবার্তা চলছে। রাইস স্যার হাসতে হাসতে বললেন, সমীরবাবু আপনি ভেবেছিলেন আপনার টাকা ফেরত পাবেন না। কিন্তু আপনি পেয়ে গেছেন।

—আমি বার বারই ভেবেছিলাম ট্রাভেলিং এজেন্সি আমার টাকা যদি গায়েব করে দিতাে আমার কোনও কিছুই করার ছিল। এই সামান্য টাকার জন্য কাশ্মীরও যাওয়া হতােনা। আমার মাসতুতাে ভাই দুলাল বলেছিল, তুই এই টাকার আশা ছাড়। মিয়ার জাতের উপর আমার কোনও ভরসা নেই।

সমীর ঃ আমি তখন বলেছিলাম, ভালােমন্দ লােক সবার মধ্যেই আছে। যদি প্রকৃতই ব্যবসায়ী হয় টাকা ফেরত দিয়ে দেবাে। আমার চেষ্টা করতে আপত্তি কোথায় ?

| রাইস ঃ যাকগে আমিও বেশি খুশি হয়েছি। সর্বোপরি কাশ্মীরি মানে বিশ্বাস, পরিষ্কার এই বিশ্বাস আপনার নষ্ট হতাে। আমি একটা কথা বলছি, মানুষের উপর ভরসা রাখবেন। আপনাকে একটা কথা বলবাে বলবাে করে বলতে পারিনি।

সমীর ও কী কথা স্যার?

রাইস ঃ আকশা আর তার এক বান্ধরী রেশমা টিউশন পড়তে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি।

সমীরের সারা শরীরকে নাড়িয়ে দিল। তাৎক্ষণিকভাবে তার বারােধ হয়ে গেল! ধীরে ধীরে বলতে থাকলাে, কেন স্যার!

রাইস ঃ এরা দুইজন আমার ছাত্রী। আমি এদের ভীষণ ভালােবাসি। এরা বারাে ক্লাস পাস করার পর কলেজে ভর্তি হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে ওঠে এরা দুইজনা। | সমীর ও আকশাকে আমি জানি কিন্তু রেশমা সম্পর্কে আমি বিন্দুবিসর্গ জানিনা।

রাইস : সমীরবাবু আপনি রেশমাকেও জানেন, চেনেন। সেই দিন এয়ারপাের্টে একটু খাটো করে যে মেয়েটি ছিল তার নামই রেশমা। আকশা ও রেশমা আমার গর্ব। ওদের দুইজনকে আমি অনেক আগেই বলেছিলাম, তােরা সামলে চল, তােদের শত্রু ঘরে বাইরে। কলেজে ভর্তি হতে গেলে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিতে ছাত্রসংসদের দাদারা। রীতিমতাে এজেন্ট লাগিয়ে এই টাকা নিতাে। আগে ভর্তির প্রক্রিয়া হতাে মেরিটের উপর। এখন মেরিট থাকলেই হবে না। মােটা অঙ্কের টাকা লাগবেই। টাকা যেমন লাগতাে, ছাত্র সংসদের ঘরে গিয়ে নেতাদের চা খাওয়াতে হবে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে কলেজে কলেজে।

সমীর ও ঐ রকম প্রতিবাদী মন থাকার জন্যই আমি আকশাকে ভালােবাসি। স্যার আকশাকে খুঁজে বের করতেই হবে। | রাইস ঃ তুমি আকশাকে ভালােবাসাে, আমি ওদের দুইজনকে ছােট থেকেই চিনি জানি। ওরা খুবই সাধারণ মেয়ে। ওদের মধ্যে এত প্রতিবাদ প্রতিরােধের ভাষা আসলাে কোথা থেকে? আমি এতদিন অবধি হিসাব করেও হিসাব মেলাতে পারছিলাম না। কিন্তু সমীরবাবু আজ সব পরিষ্কার। আকশা ছােটবেলা থেকে একটা

ইসলামি রীতিনীতির মধ্যে বড় হয়েছে। তবুও সে কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হল তার কাছ থেকে আমিও অনেক কিছু শিখলাম। এই জন্যেই ইসলামি মৌলবাদ এবং হিন্দু মৌলবাদ থেকে নিজেকে আলাদা করার চেষ্টা করতাে।

সমীর ও কাশ্মীর সংক্রান্ত খবর আমি সব থেকে বেশি দেখি। | কিন্তু কাল মায়ের সাথে নবদ্বীপ মায়াপুর নামক ধর্মীয় স্থানে গিয়েছিলাম এবং খুব ব্যস্ত থাকার জন্য খবরের কাগজ পড়তে পারিনি। গতকালই কে যেন বলেছিল এইরকম একটা বাচ্চা | ছেলেকে মারার মতাে অন্যায়! এটা সহ্য করা যায় না। | রাইস ও বাচ্চা ছেলেটাকে তাে কেউ মারতে আসেনি। উগ্রবাদী দলের সদস্য ঐ বাড়িতে ঢােকে। বাড়ির মধ্যে তখন কেবল ঐ বাড়ির যুবতী মেয়েটি ছিল আর তার ভাই এবং এদের মা। উগ্রবাদী দলের মাথা এর আগেও কয়েকবার ঐ মেয়েটিকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু মেয়েটি বার বার প্রত্যাখ্যান করে। মেয়েটি রাজি হয়নি। মেয়েটির শিশু ভাইটি, তার দিদি এবং মা ছিল বাড়িতে। উগ্রবাদী যুবকটি মেয়েটির সাথে ধস্তাধস্তি করার সময়ে কখন যে পালিয়ে গেছে কেউ বুঝতে পারেনি।

বাড়িতে থাকলাে ছেলেটা আর মেয়েটার মা। এদিকে মেয়েটি সেনা ছাউনিতে চলে যায় এবং ঐ বাড়িটি জওয়ানরা ঘিরে রাখে। সেনারা যতবার মাইক্রোফোনে ঘােষণা করছে আমরা আপনাদের কাছে অনুরােধ করছি আমরা আপনাদের কোনও ক্ষতি করবাে না। আপনারা আত্মসমর্পণ করুন। উগ্রবাদীদের বার বার সময় দেওয়া হচ্ছে কিন্তু তাতেও কোনও কাজ হয়নি। উগ্রবাদীরা ঐ বাচ্চাটা নিয়ে সামনের দিকে আসে ঢাল হিসাবে। অনেক অনুরােধ উপরােধ উপেক্ষা করেও উগ্রবাদীরা চুপচাপ থাকলাে। সকাল সাতটা থেকে শুরু হয় গােলা উগ্রবাদী কাজ। আকশার ভাইটাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছিল উগ্রবাদীরা। ভারতীয় সেনারা সারাদিন ধরে অপেক্ষা করতে করতে যখন সন্ধে হবে এমন সময় পুরাে বাড়িটাকে বিস্ফোরক দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। উগ্রবাদীদের সাথে সাথে আকশার ভাইকে মরতে হল। আমরা সােফিয়ান জেলার মানুষরা ভয়ের মধ্যে রয়েছি উদ্বিগ্নতার মধ্যে। বাচ্চা ছেলেটার জানাজা হয়। হাজারও মানুষ শামিল হয়। মানুষ এই ঘটনার নিন্দা করে।

এদিকে আকশাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সােশ্যাল মিডিয়ায় খবরটা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায়। শিশুটি ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। উগ্রবাদীরা অন্যায় করেছে। স্থানীয়ভাবে হুরিয়ত দক্ষিণ কাশ্মীরে বন্ধ ডাকা হয়।

সমীর ঃ রাইস স্যার এখন আমার আর ভালাে লাগছে না। | কোথায় আছে আকশা? আমাকে যেতে হবে আকশার খোঁজে। | রাইস ? আমি বলছি এত উদ্বেগ হওয়ার কারণ কী? আকশা ঠিক সময়ে ফেরত আসবে। আমাদের ধৈর্য নেই। আমরা অল্পেতে | ধৈর্য হারিয়ে ফেলি। সব ঠিক হয়ে যাবে।

| সেইদিন তাে অভিমান বর্তমানকে নিয়ে কত কাণ্ডই না ঘটলাে। পাকিস্তান ছাড়তে পারেনা টালবাহানা হল অভিমান ফেরত

আসলাে। আকশাও ফেরত আসবে। তাছাড়া আকশা জানে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায়। আমাদের এখানে চারিদিকে বিভ্রান্তি। কেউ বলছে আকশাকে ভারতীয় সেনারা অ্যারেস্ট করেছে আবার কেউ বলছে উগ্রবাদীরা তাকে অপহরণ করেছে ভারতীয় উর্দিধারী উগ্রবাদী। আচ্ছা সমীর তুমিতাে মিলিটারির একজন বড় অফিসার বিষয়টাকে বুঝতে পারবে।

সমীর ঃ স্যার আপনি আমাকে ধৈর্য ধরতে বলছেন কিন্তু আমার মনে আজ শুধুই হাহাকার। আকশাকে কাছে পেয়েছি খুবই কম সময় কিন্তু ও আমার জীবন জুড়ে রয়েছে। আমার গবেষণা বােধ হয় আর হবে না। আমি ডিফেন্স রিসার্চ অ্যাণ্ড ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশন (DRDO) এর হেড কোয়ার্টার দিল্লিতে এখানে প্রায় পাঁচ হাজার বিজ্ঞানী কাজ করছে। আমি লাইফ সায়েন্স বিভাগে আছি। এখানে আরাে অনেক বিভাগ আছে যেমন অ্যারােনেটিক্স, আরনামেন্টস, ইলেকট্রোনিক্স, ইঞ্জিনিয়ার, মিসাইলস, ন্যাভাল সিস্টেম। আমি ডিফেন্স বিভাগে আছি তার মানে আমি মিলিটারিতে নেই। আমাকে ভাবে আমি এন ডি এ করেছি। আমার অনেক পাওয়ার আমার পােস্ট ডক রিসার্চ দারুণ

গতিতে এগােচ্ছিল। ভারতবর্ষের প্রতিটি এরিয়ায় ডি আর ডি ও-র শাখা আছে। কিছুকিছু এলাকায় চাকরি করা মানে সাজা পাওয়া। শ্রীনগরে পােস্টিং কেউ নিতে চায়

। আমি চাওয়ার সাথে সাথে শ্রীনগরে পােস্টিং পেয়ে যাবাে।

প্রতিবাদী আন্দোলনে কাশ্মীর সমীর কাশ্মীরের শ্রীনগরে পােস্টিং। তার বান্ধবী আকশা কোথায় গেছে সে জানে না। আকশার প্রতিবাদী আন্দোলন পুরাে কাশ্মীরকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সে আজ মুসলিম মৌলবাদীদের কাছে কাফের। তার চলাফেরা, চিন্তাভাবনা কাশ্মীরের আকাশ-বাতাস পাহাড়-পর্বত সর্বত্র ছেয়ে গেছে। সে আজ হিন্দু মৌলবাদের চক্ষুশূল হয়ে গেছে। তবুও জম্মুর মতাে হিন্দুপ্রধান এলাকায় তার ফেসবুক ফ্রেণ্ডের অভাব নেই। যেখানে সেখানে আকশার ফোলােয়ার টিম গড়ে উঠেছে। লে-লাদাখের মতাে দুর্গম বরফের রাজত্বে আকশা হল একমাত্র শান্তির প্রতীক। রাইস সাহেব বলেছেন, আকশা আজ গােটা ভারতে দৃষ্টান্ত। | ভারতবর্ষের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা আকশার কাছে আবেদন করেছেন, আকশা তুম লড়াই করাে, হাম তােমারা সাথ হ্যায়। আকশা গুম

হয়ে যাওয়ার পেছনে একটা বড় ষড়যন্ত্র কাজ করছে। নিষিদ্ধ উগ্রবাদী জয়েশ-ই-মহম্মদের যেমন ভূমিকা থাকতে পারে তেমনি ভারতীয় সেনাবাহিনীও তাকে কিডন্যাপ করতে পারে। কাশ্মীরের আপামর জনতার বিশ্বাস, আকশাকে গুম

করতে পারে ভারতীয় সেনারা। আবার এক শ্রেণীর লােক ভাবছে, | কাশ্মীরের মুসলিম উগ্রবাদীরাই ওকে কিডন্যাপ করেছে। কিন্তু ওকে

ধরে রাখার ক্ষমতা কারও নেই। | সমীরের বন্ধু সুভাষ বলেছিল, আকশাকে কিডন্যাপ করার পর আমরা হতাশ! আমি কত দূরইবা ভাবতে পারি? সেই দিন যখন অভিমান মুক্তি পায়নি। তখন সারা ভারত উদ্বেগের ভিতরে ছিল। সংবাদ মাধ্যম তাকে হিরাে হিসাবে দেখালাে। আজ আকশার মতাে সমাজসেবি যখন কিডন্যাপ হয়ে গেল কোনও সংবাদমাধ্যম তা প্রকাশ করছে না কেন, দুইমুখাে রাজনীতি থাকবে? কিন্তু প্রকৃত ঘটনা আমরা জানি। আমি প্রতিরক্ষা বিভাগের কোর গ্রুপের সাথে থাকার জন্য অনেক কিছু জেনেছি। অভিনন্দের চাকরি পুনর্বহাল হবে না।

সমীর—সে কীরকম কথা? যেই অভিমান দেশের জন্য

লড়াই করে আজও বেঁচে আছে। আমার কাছে কেমন কেমন ঠেকছে।

সুভাষ ঃ আমরা মানুষরা কিছু বলি বা করি সব কিছু প্রকৃতিপ্রাপ্ত। আজ যদি কোনও এক হনুমানের বাচ্ছা গাছ থেকে পড়ে যায় তাহলে সেই হনুমানের বাচ্ছা যদি কয়েকদিন মানুষ পােষ মানায়, আবার তাকে যদি তার পুরােনাে গ্রুপের কাছে ছাড়া হয় তাকে তারা আর নিজেদের দলে নেবে না। | সেনাবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় কোনও সেনা যদি শত্রু সেনা শিবিরে বন্দি করে রাখা হয় তারপর তাকে ফেরত পাওয়া যায়। সেই সেনা থাকে সন্দেহের চোখে।

অভিনন্দনকে চিকিৎসার জন্য পাক সেনা হাসপাতালে নিয়েছিল। বন্দিদশা অবস্থায় পাকসেনারা যা যা বলতে বলবে, ও বলতে বাধ্য।

গৌর তােমরা ওকে কতই হিরাে বানাও না কেন ও ভারতীয় সেনার কাছে প্রতিরক্ষার কাছে সন্দেহের চোখে থাকবেই। | গৌর তাই হয় নাকি? যে এত বড় কাজ করলাে তার কী এটাই প্রাপ্য? শত্রু শিবিরের এয়ার ক্র্যাক্ট ধ্বংস করেছে। তার পর যান নিয়ে ফিরে এসেছে। বীর না হলে কী সম্ভব?

সুভাষ ও গৌর তুমি একটা জিনিস ঠান্ডা মাথায় ভাবাে। প্রত্যেক বায়ু সেনার সাথে একটা সার্ভিস রিভলবার থাকে, কেন থাকে?

গৌর ঃ অভিমান বর্তমান যখন প্যারাসুট থেকে নামে তখনই গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলি চিবিয়ে চিবিয়ে একটা নালায় ফেলে দেয়। তাছাড়া যখন ওকে ঘিরে ধরে পাকিস্তানি আদিবাসীরা তখন ও বাঁচার জন্য কয়েক রাউণ্ড গুলি চালিয়ে নিজেকে বাঁচায়। বর্তমান কত মার খেয়েছে শুধুমাত্র দেশ সেবার জন্য। এমন মহান ব্যক্তিকে পুনর্বহাল করবে না কাকে করবে? ওকে তাে মন্ত্রী করা দরকার। দেখ গিয়ে আগামী লােকসভায় ওকে হয়তাে ভােটে দাঁড় করাবে। বর্তমান দেখবি ড্যাং ড্যাং করে জিতে যাবে। | সুভাষ ঃ আমি ডিফেন্সের লােক। তবে তুমি জেনে রেখাে অভিমানকে আর পুনর্বহাল করবে না। ভারতের মানুষ যতই ওকে নিয়ে লাফালাফি করুক না কেন? ভারতীয় সেনার কাছে ও এখন কেন সারাজীবন সন্দেহের চোখে থাকবে। অভিমানকে আমাদের দেশে আনার পর কত দিন ধরে প্রশ্ন পর্ব চলবে সে কেউ জানে

। একটা ছেলের পাইলট হওয়া মানে ওর মধ্যে ট্যালেন্ট কোন পর্যায়ের আছে তা না জানলে বিশ্বাস করানাে যায় না। ওর আই কিউ একশাে শতাংশ না দুশাে শতাংশ থাকবে। এই রকম একটা ব্রেনকে পেয়ে পাক সরকার চুপচাপ থাকবে, জামাই আদর করে খাওয়াবে। ও যে কী বলেছে সব কথা কী আর ভারতীয় সেনার কাছে বলবে? বলবে না, বলতে পারে না। অভিমান বর্তমান আজ পরিবর্তিত। অভিমান বর্তমান আমাদের চিন্তার থাকতাে না যদি সে শহিদ হতাে। ওকে পাক সেনারা সংঘর্ষে যদি মেরে ফেলতাে তাহলে আমাদের নিরাপত্তার ক্ষতি হতাে না? পাক সেনারা অনেক জেনে গেলাে।

অভিমান যদি প্রকৃতই দেশসেবক হতাে তাহলে তার সার্ভিস | রিভলবারটাকে কাজে লাগাতাে। নিজে নিজেকে খুন করতাে কিন্তু সে নিজেকে বাঁচার জন্য ঝপাল, দেশের কথা একবারও ভাবলাে না। সমীর কিছু মনে করাে না তােমাকে বলবাে তােমার আকশা

| আগের আকশা আর আজকের আকশার মধ্যে বিস্তর তফাত। | গৌর ঃ শােন সুভাষ সমীর কত আশা নিয়ে কাশ্মীর এসেছে। আকশা আর দশজনের মতাে নয় বলেই সমীর এসেছে কাশ্মীরের শ্রীনগরে। যতই মগজ ধােলাই করুক তার থেকে ও বেরিয়ে আসবেই। আকশাকে কিডন্যাপ করেছে হিলাল বাহিনী। হিলাল আজও মরেনি। যদিও পুলওয়ামা বিস্ফোরণে হিলালের মরে যাওয়ার খবর ছড়ায়। দেখগা হিলাল ওকে নিয়ে ঘর সংসার করছে। আর সমীর তােমার কথা ভুলেই গেছে। হিলালের মুখের গ্রাস কেড়ে নেবে তুমি আর ওকী এমনি এমনি ছাড়বে?

সমীর শ্রীনগরে এসেছে আশার জন্য। লােকে অনেক কথা বলতে পারে, ভাবতে পারে কিন্তু এই মুহুর্তে আকশাকে খুঁজেই | বের করতেই হবেই। সমীর শ্রীনগরে ডাললেকের বােটে বসে আছে আর পাহাড়ের চূড়াকে দেখছে। ঐ রকম একটা চূড়াতেই স্বামী শংকর আচার্যের মন্দির। এইখান থেকে কী সুন্দর লাগবে। ঐখানে পৌছাতে অনেক পথ হাঁটতে হবে কিন্তু এখন বরফের যা অবস্থা | এত সহজে ওখানে যাওয়া যাবে না। আকশার কাছে পৌঁছানাে যাবে না। সবাই একথাই বলে। কিন্তু আমি কারও কথা শুনিনি। আমি চেষ্টা করলাম যাওয়ার জন্য। যতদূর যাওয়া যায় তত দূর তাে যাবােই। আমি পাহাড়ি পথে যাত্রাশুরু করলাম। প্রথমে অটোয় করে। এবার হাঁটা শুরু করলাম, ধীরে ধীরে যখন শঙ্করাচার্য মন্দিরে পৌঁছলাম। পুরাে শ্রীনগর শহরকে আরাে ভালাে করে দেখলাম। বারবারই মনে হচ্ছিল আমি হেলিকাপটারে চড়ে শ্রীনগর ঢাল লেক | দেখলাম। পাহাড়ের চূড়া থেকে শ্রীনগরের হজরথ বাল মসজিদ | দেখলাম। কত নাম না জানা সুন্দর সুন্দর বাড়ি দেখলাম। এই চূড়া থেকে কত পাহাড়ের চূড়া দেখলাম। এই মন্দির থেকে বারবারই মনে পড়ে গেল আমি মনে মনে দক্ষিণ ভারতে রয়েছি। এখানে প্রতিটি পাহাড়ের মাথায় সাদা সাদা বরফের মালা। এখানে অসংখ্য দক্ষিণ ভারতীয় কন্যারা এসেছে। পাহাড়গুলাে কালাে পাথরের। | আমি লােকের কথা মতাে যদি শঙ্করাচার্য মন্দিরে না আসতাম তাহলে কী শ্রীনগরকে এত সুন্দর করে দেখতে পেতাম? | আজ আমি যদি ভয় পাই তাহলে আকশার কাছে পৌছাতে পারবাে না। আকশাকে পাওয়ার মাধ্যমেই আমি পুরাে ভারতকে জানতে পারবাে। ভয় পাওয়ার লােক যদি হতাম তাহলে কী ডাল | লেককে শ্রীনগরকে এত ভালাে করে দেখতে পেতাম?

আমাদের রক্ত মাংসে মিশ্র ধারা | আমি আকশা হতভাগা। আমার জন্য আমার নিজের ভাইকে

হারালাম। আমি তাে চাই মনুষ্যত্বের বিকাশ হােক প্রতিটি মানুষের

মধ্যে। আজ বারবারই মনে হচ্ছে সামিমের কথা। ও আমাকে বলেছে, ওপরে না উঠতে পারলে নিচের জায়গাকে ভালাে করে দেখা যায় না।

আমি অমাবস্যার মতাে কালাে ঘুটঘুটে অন্ধকার জায়গা থেকে আলাের জগতে আসলাম। উগ্রবাদীরা আমাকে নিয়ে গেল কোনও অন্ধকার জগতে আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। ঐ উগ্রবাদী লােকগুলাের মধ্যে যুক্তবাদী লােকজন আছে এবং সেই জন্য আমি বাঁচতে পারলাম। হিলাল আজ অন্ধকারের সম্রাট, জেহাদি। সে আজও আমায়ে পেতে পাগল। কিন্তু আমি তাকে ভালােবাসি না। এই খারাপ লােকগুলাের মাঝেও ভালাে লােক আছে। তা খুঁজে বের করতে হবে আমাকেই। সব লােক খারাপ হতে পারে না। আমরা ছােটবেলা থেকে এসেছি, রাজহাঁস হতে হবে। রাজহাঁস দুধ আর জল মেশানাে থাকলে দুধটা আলাদা করে খেতে পারে। জল আর দুধ একসাথে থাকলে হাঁস ঐ মিশ্রিত জলের মধ্যে এক ধরনের কেমিক্যাল ডালে এবং দুধের ফ্যাটটা জমতে থাকে। এবং হাঁস সেই থকথকে জেলির মতাে অংশ খেতে থাকে। আমি তাে লেখাপড়া জানা মেয়ে মানুষ। এই রকম উগ্রবাদীদের কাছ থেকে নিস্তার পাবােই।

আকশা উগ্রবাদী ডেরায় অবস্থানকালে গালে হাত দিয়ে ভাবছে, আমি বাঁচার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে গেলাম, সেনাবাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেললাে, আমার ভাইকে উগ্রবাদীরা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করলাে এবং একটা সময় তারা আমার ভাই সমেত উগ্রবাদী দলটাকে মেৱে ফেললাে এবং তারা ভারত সরকারের কাছে হিরাে হল। কিন্তু তারা একবারও আমার ভাইয়ের কথা শুনলাে না। আমার জীবনে ভাইয়ের অবদান অনেক। আত্মসম্মান অর্থাৎ ইজ্জত বাঁচানাের জন্য আমার ভাইকে আমি হারালাম। আমি আর বাঁচতে চাই না।

ভারতীয় সেনারাও ঐ একই দোষে দুষ্ট। তারা আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। আমি এখান থেকে পালালাম এবং আবার সেই লম্পটদের কাছে এসে পড়লাম। হিলালটা আবার এসে গেল। এটা মরছে না। হিলালের টিমের বাকিদের সাথে বেশি মিশতে হবে এবং দলটাকে আল্লা আল্লা বলতে আলাদা করলাম। আমি বাঁচলাম।

| হিলালের দলের সুকরালীর বয়স বেশি। সুকুরালী দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে বলল, আকশা তােমার জন্য আজ আমরা যারা স্বাধীনতার জন্য, আজাদির জন্য লড়াই করছি, তারা খুবই সমস্যায় পড়েছি। সাধারণ মানুষ অর্থ দিয়ে শ্রম দিয়ে আমাদের জামাই আদর করতাে তারা আজ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তােমার মতাে আল্লা বিরােধ ইসলাম বিরােধরাই কাফের। তুমি সবাইকে যুক্তিবাদীতে রূপান্তরিত করেছাে। তােমাকে আমরা হত্যা করতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি যদি মরে যাও তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না। তােমার যুক্তিবাদী ধ্যানধারণা আরও দীর্ঘজীবী হােক। তাই তােমাকে বাঁচতে হবে। তােমাকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে যুক্তিবাদী মনকে প্রতিহত করতে হবে।

আকশা । আপনারা আমাকে ইসলামবিরােধী বলছেন কিন্তু আমি ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমি যতদূর জানি আপনারা ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। আপনারা কার জন্য অস্ত্র তুলে নিয়েছেন, মানুষের জন্য। সেই মানুষ সম্পর্কে ভাবতে হবে। আপনারা মানুষকে ভাগ করছেন বিভিন্ন ভাগে। এই ভাগের পরিণতি হল মারাত্মক। আপনারা কত কষ্ট করছেন, কত ঝুঁকি নিবেদন করছেন কার জন্য? সবটাই মানুষের জন্য। এই সুন্দর পৃথিবী আজ বহু দেশে বিভক্ত। একদেশ অন্য দেশের প্রতি অত্যাধুনিক অস্ত্র প্রয়ােগ করছে। কোনও কোনও দেশ হুমকি দিচ্ছে, আমাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে। এক পারমাণবিক অস্ত্র পৃথিবীকে শেষ করার ক্ষমতা রাখে। | আজ আমার মনে পড়ছে সেই মেয়েটির কথা। মেয়েটি ছাত্রসংসদের ঘরে আসলাে। আমি সিনিয়ার ছাত্রী। এই মেয়েটি। বিএতে ভর্তি হবে। ফর্ম ফিলাপ করতে পারছে না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম তােমার নাম কী?

আরতী দেবী। —তােমার বাবার নাম কী ? —সিকান্দার ভাট। আকশা ঃ আমি থমকে গেলাম। আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।

তােমার নাম আরতী দেবী তােমার বাবার নাম সিকান্দার ভাট, কেমন হল না?

আসলে আমার বাবা মুসলমান আর আমি হিন্দু পণ্ডিত। কী করে হবে। বাবার সূত্রে সবাই পরিচিত হয়।

—এই পৃথিবীতে নারীপুরুষ সবাই সমান। নারী পুরুষের মধ্যে একজনকে বাদ দিলে কী নারী কিংবা পুরুষ কিছুই পাওয়া যায় কী? আপনি বলবেন আমি আমার মায়ের টাইটেল ব্যবহার করলাম কেন? আমার বাবা বাড়িতে থাকেই কতক্ষণ? সংসারের প্রয়ােজনে তাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়। আমি বেশিরভাগ সময় মায়ের কাছেই থাকি। মায়ের ভাবধারাটা অটোমেটিক্যালি আমার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে। ছােটবেলা থেকে আমি দেখে এসেছি আমার মা সকাল সন্ধ্যায় ধূপবাতি দেন, আমিও তাই করি।

আমার বাবার কথা যদি বলেন, তিনি নমাজ পড়তে যান। বাবার সাথে মায়ের বিবাহ হয় স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্টে। আমাদের দুই ভাইবােনের মধ্যে মিশ্ৰধারা বইছে। | তবে আমি যত সহজে আপনার কাছে বলে ফেললাম বাস্তবটা অনেক কঠিন। বাবাকে মাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে।

বাবা ও মা মূল বাড়ি ছেড়ে চলে যান জম্মুতে। সেখানে থাকতে থাকতে আমার ঠাকুরমা ঠাকুরদাদার প্রতি কর্তব্য করতে থাকেন। ঠাকুরমা গােপনে আসতেন আমাদের আদর করতেন। বিষয়টা জানাজানি হতে চারিদিকের আত্মীয়-স্বজনরা চাপ দিতে থাকে। মূলত ঠাকুরমায়ের তদারকিতে আমার বাবা মা চলে আসে পেহেলগাঁওতে। আমার বাবা সংসারের সব দায়িত্ব মায়ের উপর

অর্পণ করে। আমাদের ভর্তি থেকে শুরু করে সব কিছুই মা নিজের হাতে সামলান। মায়ের টাইটেল আমার টাইটেলে রূপান্তরিত হয়েছে। আমার ভাইয়ের নাম অমরনাথ ভাট। ভাই বাবার সাথে যখন মসজিদে যায় তখন নমাজ পড়ে। অমরনথে পূজা দেয়। আমাদের সংসারে কোনও সমস্যা নেই।

সুকুরালী ভাই এই হল ভারতের প্রকৃত চিত্র। এই সংসারটাকে আপনি কেমনভাবে দেখবেন?

—আকশা তােমার কাছে এই ঘটনার কথা শুনলাম। সিকান্দার দুনিয়ায় আর মেয়ে পেলাে না? | আকশা — প্রেমেতে মজিলে মন প্রেম কীবা হাড়ি কীবা ডােম। এই কথাতাে চিরন্তন সত্য। জাত ধর্ম ভাষার বাদ মানে

। প্রেম ঈশ্বরপ্রদত্ত। প্রেম কীভাবে আসে সে নিজেও জানে না। এগুলাে স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার। প্রেম আসে ভালােলাগা থেকে। আমরা কাকে ভালােবাসি যার মধ্যে আমি আমাকে দেখতে পাই। আমরা যদি বাইরে যাই সেখানে আমরা কাশ্মীরি ভাষি লােক পাই তার কাছে ছুটে যাই। যার মধ্যে আমার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাই তার কাছে ছুটে যাই। অর্থাৎ যার মধ্যে আমার আয়না আছে সেই কেবলমাত্র আমার আপন।। | আজকাল শহর গ্রাম সব জায়গায় উঁচু টাওয়ার দেখতে পাই। এই লম্বা টাওয়ার মানে অসংখ্য জোড়ালাগানাে। আমরা যদি দুটো বাঁশকে জোড়া লাগাই তাহলে দুটো বাঁশের শেষ অংশ পাতলা করি এমনভাবে যাতে খাপে খাপ হয়। আমাদের দেশ ভারতবর্ষ দুশাে বছর ব্রিটিশরা রাজ করেছিল। কিন্তু প্রবল স্বাধীনতা আন্দোলনে তারা বাধ্য হয়েছিল চলে যেতে কিন্তু তারা অনেক কিছু দিয়ে গেছে যেগুলাে আমাদের বেশভূষা, শিক্ষা চেতনার সাথে মিশে গেছে। আমরা আজকে প্যান্ট শার্ট পরিধান করি এগুলি ব্রিটিশ দ্বারা প্রাপ্তি। অথচ এক সময় ভারতীয়রা পরিধান করতে লেঙটি, লুঙি, ধুতি জাতীয় পােশাক। ব্রিটিশরাজ চলে যাওয়ার পরও আমরা আমাদের ট্র্যাডিশনাল বস্ত্র পরিধান করতাম। স্বাধীনােত্তর ভারতবর্ষে আমাদের পরিবারেই একজন আমার সম্পর্কে নানা হয়। নানা একাট প্যান্টশার্ট কিনে এনেই পরলেন। নানার বাবা চিৎকার করে বললেন, আমরা ব্রিটিশ শাসকদের তাড়ালাম, কত বীর যােদ্ধা শহিদ হল আর তুমি সেই সাহেবি পােশাক পরবে? নানার বাবা প্যান্টশার্টকে একত্রে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিলাে। কিন্তু সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে আমরাও আজ পরিবর্তিত, প্যান্টশার্ট আমাদের পােশাকে রূপান্তরিত। ওদের ভাষা আজ আমাদের ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। যতই আমরা বলি ব্রিটিশ তাড়িয়েছি কিন্তু বাস্তবিকভাবে ব্রিটিশদের ঐতিহ্য আমাদের রক্তে মাংসে বইছে।

ব্রিটিশ শাসনের অনেক আগেই এই দেশে এসেছিল শক, হুণ, দল, পাঠান মােগল এ দেশ আক্রমণ করে ধনসম্পত্তি রেখে গেছে। সেগুলাে এখন আমাদের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

সুকুরালী ও সবকিছু মিলে যায় না। হিন্দুরা আলাদা আমরাও

আলাদা, মেলানাে যায় না।

আকশাঃ ব্রিটিশরা এই দেশে আসার আগে অষ্টম শতাব্দীতে মুসলমান হানাদার যেমন মহম্মদ বিন কাশিম থেকে মােগলরা এদেশ শাসন করে কিন্তু তারা আর পালিয়ে যায়নি। তারা ভারতের সাথে মিশে যায়। এটাই তাদের জন্মভূমিতে রূপান্তরিত হয়। আরও আগের দিকে যদি তাকাই তাহলে শক, হুণ, কুষাণরা এদেশ শাসন করে এবং তারাও মিশে যায়, তারা পালিয়ে যায়নি। | আর্যরা শতাব্দীজুড়ে এদেশে এসেছে, নানা বৈশিষ্ট্য, বৈচিত্র্য নিয়ে তারা বিলীন হয়ে যায়। এরকম বিভিন্ন জাতি এদেশে মিশে যায়। আজ এদের আলাদা করা যাবে না।

প্রতিকূলতাই বড় শিক্ষা সমীর আকশার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল সােশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। সমীর পাহাড়-পর্বত ভালােবাসে। হিমালয় পর্বতের বিশেষ করে কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে মােহিত করে এবং এখান থেকেই আকশাকে ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট পাঠালাে। সদ্য যৌবনে পা দেওয়া আকশা জানার কৌতূহল বন্ধুত্ব সুদৃঢ় হতে থাকে। এই

দুইজনার বন্ধুত্ব ভালােবাসায় রূপান্তরিত হয়। যদিও দুইজন | দুইজনাকে কোনও দিনও দেখেনি। ইন্টারনেট জগতের মাধ্যমে

প্রেম ও বিরহ লাগাতার ঘটতে থাকে। এদের দুইজনার মাঝখানে

উঠে আসে হিলাল নামক প্রতিবেশি যুবকের নাম। হিলাল দেখতে | শুনতে, গান বাজনায় নাটকে অত্যন্ত পারদর্শী।

আকশা অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশুনাটাকে এগিয়ে নিয়েছে যদিও আকশার পড়াশুনা মাঝে মধ্যে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে হিলালের জন্য আর এই হিলালের জন্যই আকশা গানবাজনা, নাচে, সবদিক দিয়ে থাকতাে সামনের সারিতে। এই এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাকিটিভিজের জন্য সে থাকতাে আনন্দে। এর মধ্যে দিয়েই আকশা বাইরের জগতের সাথে আরও বেশি পরিচিত হয়।

আকশার ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী হিলাল। হিলালের জন্যই আকশার মন আরও শক্তিশালী হয়। সে দুনিয়াকে দেখতে পেয়েছে। লােভ লালসা আকশার জীবনের উচ্চাশাকে আটকাতে পারেনি। | আকশা সি বি আই অফিসার হয়ে যায়। বিয়ের বয়স উত্তীর্ণ হয়।

আকশা ভাবে আমি আজ যেইভাবে দুনিয়াকে ভাবছি তা কেবল সামিমের জন্য। আমার জীবনে যা কিছু হয়েছে সবটাই তার জন্য। তার শিক্ষা আমার মধ্যে ছিল বলেই আমি উগ্রবাদী ডেরা থেকে | বের হতে পেরেছিলাম। তাছাড়া কাশ্মীরের বাইরের জগৎ সম্পর্কে

যা কিছু জানলাম সবটাই তার জন্য। | আকশা জীবনে অনেক সন্ধিক্ষণ এসে গেছে তবুও বিবাহের | বন্ধনে আটকা পড়েনি। তার গার্জিয়ানরা যখনই বিবাহের প্রস্তাব

আকশাকে দিয়েছিল, আমি আগে কোনও একটা চাকরি পাই। | চাকরি যখন হল তারপর থেকে বলা শুরু করলাে, আমি এই তাে সবে চাকরি পেলাম, বাড়িঘর করবাে তারপর বিবাহ।

আসলে আকশার মনে একজনই বিরাজ করে সে হল সামিম। বিয়ে যদি করি তবে সামিমকেই। আমি আর কারও প্রতি মন

দিতে পারিনি। সামিমকে খোঁজার জন্য কত চেষ্টা করলাম তবুও পেলাম না। আমি আমাকে জানি। আজ আমার চল্লিশ বছর বয়স, আমার চুলে পাক ধরেছে, গালটাও সামান্য ভেঙে পড়েছে। আমার শরীরে শিথিলতা এসে গেছে। তবুও সামিমকে খুঁজে বের করবােই, কিন্তু আমি কোথায় আছি ওর তাে জানার কথা। ও নিশ্চয়ই আমার কাছ থেকে পালাচ্ছে। ভারতের বড় বড় জায়গা আছে সব জায়গায় ওকে খুঁজেছি। ডি আর ডি এর সমস্ত জায়গায় সবার সাথে যােগাযােগ করেছি কিন্তু ওকে পাওয়া যায়নি। আজ আমি যেখানে যাই মনে হয় সামিম লুকিয়ে আছে।

আমি যেহেতু কাশ্মীরের মেয়ে। আমাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুলওয়ামা বিস্ফোরণের অন্যতম পাণ্ডা আনসারকে ধরতে। আমি অনেক বড় বড় তদন্তের কূলকিনারা করতে পেরেছি। উরিতে সাতাশজন সেনাকে হত্যা করেছিল। তার রহস্য অতি সহজে উদঘাটন করতে পেরেছি। আমি একটার পর একটা তদন্তে সফলতা পেয়েছি আর ভারত সরকার আমার উপর নতুন দায়িত্ব অর্পণ করেছে। | সামিম ছাড়া আমার জীবনের কোনও দাম নেই। এই জন্যই মৃত্যুর ভয় আমাকে হার মানাতে পারেনি। আমি জানতাম আত্মহত্যা মহাপাপ কিন্তু আমি মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করতে করতে মরি তাহলে পাপ হয় না। ভয়ডরহীনতা আমাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। আমার প্রােমােশন হল বলেই কুখ্যাত আনসারকে ধরার দায়িত্ব পেলাম।

আনসারের ডেরা বারমুলায়। পাহাড়ের কোলে আলিফ মসজিদের পাশেই। শহর থেকে দূরে পাহাড়ের গায়ে তার আস্তানা। নারী বিদ্বেষী এই জঙ্গির ডেরার আশপাশে নারীদের দেখা যায় । আকশা একদিন ছদ্মবেশে আনসারের ডেরায় হাজির।

পাহাড়ের কোলে বিশাল জলাশয়। এই ডেরায় আনসারের কাছে যেতে গেলে অনেকগুলি নিরাপত্তা বলয় টপকাতে হয়। আনসারের বিলাসবহুল ঘরে কক্ষের একপাশে একটা টেবিলের উপর সাজানাে আছে অসংখ্য ম্যাগাজিন। মদের বােতল ও নানা রঙের ফল সজ্জিত। এই জঙ্গির ধারে কাছে কেউ ঘেঁষতে পারে না। আকশা ভিতরে ঢােকার সাথে সাথেই আনসার বক বক করতে থাকলাে এবং নিরাপত্তাবাহিনীর দায়িত্বে থাকা কর্মীর পায়ে গুলি মারলাে। আকশা ভয় পেয়ে গেলাে। নিরাপত্তাকর্মীকে আনসার বলল, আমি গুলি মারলাম এই কারণে আমার ঘরে নারী আসলাে কী করে?

—হ্যা আমি নারী। —আমি মেয়ে মানুষকে দেখতে চাই না। ওরা খুব খারাপ। —আমি একজন ভালাে মানুষের সাথে কথা বলছি। —না আমি আনসার। আমি কাশ্মীরিদের আজাদি চাইছি। আনসার মদ খেয়ে চুর। চোখ দুটো রক্ত জবার মতাে। হাতে অসংখ্য আংটি, দেখলে ভয় করবে।

—আমি কথা বলছি আনসারের মধ্যে লুকিয়ে থাক সামিমের সাথে।

—আনসারের কথা বন্ধ হয়ে গেল। —আপনি কোন সামিমের কথা বলছেন?

—আমি বাংলা থেকে আসা একজন উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞানীর কথা বলছি।

—আপনি কে বলছেন?

—আমি হলাম আকশা। শুধু সামিমের আকশা। আমিতাে এরকমটা চাইনি। আমি ভেবেছিলাম সামিম সমাজসেবী, সামিম দেশপ্রেমী, কিন্তু একী অবস্থা!

—আমি যা ছিলাম তাই আছি। আমি আজও দেশপ্রেমী। —আমি তােমার জন্য বাংলা বলতে শিখলাম।

—আমি আমার আকশার জন্য কাশ্মীরি হয়ে গেলাম। আমি যখন ডি আর ডি এর কাশ্মীর শাখায় রিসার্চ করতে থাকলাম তােমার মিসিং আমাকে পাগল করে তােলে। তরিঘড়ি কাশ্মীরে পপাস্টিং হয়। সরকারের উচ্চপদস্থ অফিসারের দ্বারস্থ হতে থাকলাম প্রত্যেকটি সরকারি জায়গায় যােগাযােগ করলাম, তােমাকে উদ্ধার করতে পারলাম না। সরকারি ভাবে চেষ্টা করলে তােমাকেও নিরাপত্তা বাহিনীরা মেরে ফেলবে। যেমন ভাবে তােমার ভাইকে মরতে হলাে। আমি হিলালের ডেরায় গিয়েছি। সরকারিভাবে তােমাকে উদ্ধারের পথ খুঁজে পাবাে না। আমি একসময় দিশাহীন হয়ে গিয়েছিলাম।

আকশা ? আমি বলবাে তুমি তাে ভেবেছিলে হিলালের সাথে আমার নিকা হয়েছিল। আমার নিকাটিকা হয়নি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর বিয়ে করবাে না। কিন্তু সামিম ছাড়া আমি আজও আর কাউকে চাইনি।

—আমি তাে আজ আনসার। একজন কুখ্যাত টেরােরিস্ট। —তুমি আমার সামিম। দুইজন দুইজনার কাছে আসলাে, জড়িয়ে ধরলাে।

আনসার বললাে, আমি প্রকৃতই তােমার সামিম। যদি না হতাম কাশ্মীরের উগ্রবাদীদের সান্নিধ্য পেতাম না। আমার ডেরা আমার। আনসার হওয়া সবটাই ভারত সরকারের ব্যবস্থাপনা। কাশ্মীরের উগ্রবাদকে সমূলে উৎপাটনের জন্য আমি হলাম আনসার। এবারই কাশ্মীরের কান্না থামবে। ময়লা পরিষ্কার করতে গেলে শরীরে ময়লা লাগবেই। আর কতকাল কাশ্মীর কঁদবে আর কাদবে গােটা ভারতবর্ষ।

আজ কাশ্মীর অনেক শান্ত, কাশ্মীরে যত উগ্রবাদী ঘাঁটি ছিল সবার মাজা ভেঙে গেছে আকশার মতাে নির্ভীক অফিসারের জন্য। সামিম ল্যাবরেটরিতে বায়ােলজিতে গবেষণা করেছিল কিন্তু যখন ডি আর ও এতে আসলাে তখন বায়ােলজি আর ক্রিমিনােলজিকে এক করে গবেষণা করতে থাকলাে বলেই আকশা এত বড় অপারেশান করতে পারলাে। উগ্রবাদী ডেরায় ঢুকে অপারেশন অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। সামিম ভাবছে, আজকে যদি আমি মুখ খুলি তােমার সফলতার মূলে রয়েছে আমার ভূমিকা তাহলে তুমি ছােট হয়ে যাবে। আমি চাই আমার আকশা অতীব আনন্দে থাকুক। আমি কখনই দাবি করবাে না। আকশা আজ তােমার আনন্দই । আমার আনন্দ, তােমার কান্না মানেই আমার কান্না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *