অলিখিত – বিমান বিহারী সেন

গল্প সাহিত্য
Spread the love

বুঝতে পারলাম ফুলের ‘বােকে’টা তার খুব পছন্দ হয়েছে। ভালাে করে এদিক ওদিক দেখে নিয়ে যেখানে ছিল সেখানেই ‘বােকে’টা রেখে দিল। চোখের ভাষা, মুখের অভিব্যক্তিতে সেই নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছিল। বােকে’র সাথে জুড়ে দেওয়া গােলাপি কার্ডটা তখনও ফঁাকা। | আজ নৈঋতার জন্মদিন। একগুচ্ছ ফুল কিনলাম দোকান থেকে। দোকানের ছেলেটি জিজ্ঞেস করল— দাদা কোন অনুষ্ঠানের জন্য নিচ্ছেন? ওকে বললাম, আমার বউ-এর জন্মদিন। সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে তাকে শুভেচ্ছা জানাব। ছেলেটি ওই শুনে বিগলিত হল। সে আরও কিছু রঙিন ফুল দিয়ে বােকে’টিকে বেশ দৃষ্টিনন্দন করে তুলল। আর বােকের নীচে গােলাপি রিবন বেঁধে বেশ একটা ফুলের চেহারা তৈরি করে দিল। সেখানে একটা রঙিন কার্ড যুক্ত করে দিয়ে। আমাকে জিজ্ঞেস করল এখানে কি কিছু লিখতে হবে। একটু আশ্চর্য হলাম, বললাম—এখানে আবার কি লেখার হতে পারে। কেন লিখবেন না স্যার! ম্যাডামের প্রতি আপনার ভালােবাসা, ভালােলাগার। অনুভবের কথা কিছু প্রকাশ করতে পারেন।

এই দেখুন না স্যারকতজন কতকিছু লেখে। এই বলে আমার হাতে একটা অ্যালবাম তুলে দিল। যেখানে বিভিন্ন হাতের লেখা কাগজ পেস্ট করা। আছে। আরও বলল, বিভিন্ন রকম আছে—শ্রদ্ধা, প্রণাম, উৎসাহ, প্রেরণা, অনুপ্রেরণা, স্নেহ, আশীর্বাদ। আপনি শুধু প্রেম আর ভালােবাসারগুলি দেখুন। বুঝলাম এ ছেলে শুধু মামুলি ফুল বিক্রেতা নয়, পসার জমানাের জন্য বেশ রুচিসম্পন্ন কায়দা শিখে নিয়েছে।

আমি অ্যালবাম নিয়ে আস্তে আস্তে পাতা ওল্টাতে শুরু করলাম। মাঝে মাঝে খদ্দের আসছে ফুলের মালা, রিং, বােকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি অ্যালবামটা নিয়ে, একপাশে সরে দাঁড়ালাম। পাতা ওল্টাতেই আকর্ষণে পড়ে গেলাম। প্রথমে যে লেখাগুলি চোখে পড়ল তা হল— স্বর্গ কোথায় আছে জানিনা। মর্তে তােমায় ভুলছি না।’ ‘চলে গেলে মহারাজ আজ যে আমাদের ভিখারি সাজ। কর্মে চঞ্চল ছিল তব প্রাণ। সমাজেরে দিয়ে গেলে সেই দান। বুঝলাম এগুলি সব শেষ যাত্রার পথিককে দেওয়া অর্ঘ্য, শ্রদ্ধা জন্মদিনের শুভেচ্ছার দরজায় দাঁড়িয়ে কেন মৃত্যুর জানালায় চোখ রাখা।

খুঁজতে লাগলাম ভালােবাসা আর প্রেমের বাণী। মাঝখানে একবার থামতে হল। অন্যরকম একটা লেখা চোখে পড়ল। তব অন্দরমহলে হয়েছে বীজ অঙ্কুরিত, থেকো খুশি আর আনন্দে অবিরত। গুঞ্জরিয়া অলি বাজাল বেণু, পরাগের স্পর্শ পাইল রেণু।

বাহ বেশ ভালােতাে! রমণীর মাতৃত্বপথে যাত্রার সােপানে পা রাখার জন্য শুভাকাঙ্ক্ষী অভিনন্দন। আজকাল কত কিছুর দিকে মানুষ। খেয়াল রাখে। কত কিছুতে তাদের উৎসাহ থাকে। দিনের কত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। সময় কদম কদম পা বাড়িয়ে যাচ্ছে অগ্রগতির দিকে। আগে এই বিষয়ের সাথে থাকত শরম সংকোচ গােপনীয়তা। আর এখন অঙ্কুরেই উল্লাস। ঈশ্বরের পথতাে চিরন্তনের পথ। সত্যের পথ। যে পথে ভ্ৰূণস্থতা যে পথে প্রাণের আগমন সে তাে সত্য, পবিত্র। শরমের পথ মানুষের ভাবনায়। সংকোচ চিন্তার। দৈনতায়। অঙ্কুরে উল্লাস তাে ভালাে। শুরুতেই বৃক্ষ এবং মুকুলের যত্ন নেওয়া যায়। | পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে এসে পড়লাম প্রেম, ভালােবাসা আর ভালােলাগার মহলে। যদি কিছু মনের কথা খুঁজে পাই। দোকানিকে দিয়ে লিখিয়ে দেব। চোখ বুলাতে বুলাতে দেখছি সে এক বিচিত্র সম্ভার। প্রেম, ভালােবাসা, অনুরাগে উপচে পড়া ঝর্নার ধারা ঃ—

তুমি আমারই তুমি আর তােমাতেই আমি। ‘তুমি ছিলে বলে এজীবনে আলাে জ্বলেছিল। ‘দেখেছিনু পথে পথে হৃদয়ে রয়েছ দিন ও রাতে।

‘কে বলে তুমি অর্ধাঙ্গিনী, তুমি আমার পূর্ণ শশী’

মনে পড়ে সে দিনের কবিতা—হানিমুনে তুমি ছিলে পান। আমি চুন।

পাতা পাল্টে দিলেই আর এক অভিব্যক্তি—‘হৃদয় ছিল আমার শূন্য মরু তুমি দিলে বরষণ ধারা।

খুঁজতে খুঁজতে অনেক সময় নিয়ে নিয়েছি। দোকানের ছেলেটা একটু বিরক্ত। সেই সুরেই বলল—“কি দাদা হয়েছে। এখন যদি | কিছু না ভাবতে পারেন তবে পরে লিখে নেবেন। কার্ডটাতাে আমি সেট করে দিয়েছি।।

সত্যিই লেখাগুলি বেশ লাগছিল। কত রকম ভাবনার জন্ম হচ্ছে। কতকিছু লােকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে সব লেখাই তাে অন্তত একবার ব্যবহার হয়েছে। সেই অর্থে নতুন নয়। কেউ না কেউ তার প্রিয়জনকে উপহারের ডালিতে কথাগুলি ব্যবহার করেছে। ব্যবহৃত বাণী কেন ব্যবহার করব। একটা কিছু বউয়ের জন্য ভেবে বের করতে পারব না। আর কি ভালােবাসলাম। অনুভূতির ভাণ্ডার থেকে কিছু একটা বের করে আনতে পারব না! কিন্তু পারছি না। যাহােক যেতে যেতে ভাবব। তখন নিয়ে নেব।

অ্যালবাম ফেরত দিতে গিয়ে আবার একটা বেশ নজর কাড়ল। বেশ সুন্দর করে লিখেছে—“মিষ্টি ভ্যালন্টাইন ডে, কবে বলতাে আমাদের ভ্যালেন্টাইন নাইট হবে। এটা স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার নয়, এ কাব্যের নটনটী প্রেমিক আর প্রেমিকা। প্রেমিকার প্রতি প্রেমিকের দাবি পত্র। ভালােবাসার রঙ ধরেছে। ভালােবাসা পাকার পথে। এখন শুধু খােসা ছাড়াবার অপেক্ষা।

সত্যিই তাে ওরা ঠিক ভেবেছে। সাগরের যে কেউ চলে যায়। সেতাে আর ফিরে আসে না। ওরা ঢেউ হয়ে থামতে চায়। স্রোত হয়ে বালুকাবেলায় মিলতে চায়। মেলামেশার অবসানে স্রোত ফিরে যাবে সমুদ্র কিনারে। বালির চরে দেখা যাবে ঝিনুকের অস্তিত্ব। প্রাণে পরিপূর্ণ শুধু খােলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার অপেক্ষায়। | ‘বােকে’ কেনা হল। আরও দুটো জিনিসের দরকার। মােমবাতি আর কেক। ফুলের দোকান থেকে বেরিয়ে গেলাম মােমবাতির দরকারে। দোকানদার খদ্দের সামলাতে ব্যস্ত। ভালােই হল। এই অবসরে নিজে চিন্তাভাবনা করতে লাগলাম যদি কিছু একটা হয়।। নৈঋতার জন্য একটা মামুলি দায়সারা লেখা যায় না। আজ তার পঞ্চাশতম জন্মদিন। দেখতে দেখতে সাতাশ বছর হয়ে গেল তার। সাথে গাঁটছড়া বাঁধা হয়েছিল। যখন বিয়ে হয়েছিল তখন সে তেইশ বছরের বসন্তে রাখা যুবতী। রঙে রসে, উদ্বেলতায় উৎফুল্লতায় উল্লাসমুখী প্রাণচঞ্চলা এক রমণী। শুধু এক মাঝির অপেক্ষায় বসে থাকা। নাও তার তৈরি। মাঝিকে নির্ভর করে সংসার তরঙ্গে নিজেকে ভাসাবে। সেদিন আমাকেই পেয়েছিল তার মাঝি করে। সেই থেকে দাঁড় টেনে পাল তুলে নাও চালিয়ে ঘাটে ঘাটে ভিড়ে চলেছি। তাহলে কি লেখা যায় ? তােমার নৌকায় আমি মাঝি।

নাহ! এটাও তাে ঠিক হল না। বলতে হবে বউয়ের কথা। এ যে আমার কথার প্রাধান্য পেয়ে যাচ্ছে। ভাবনা হঠাৎ ভেস্তে গেল। মােমবাতি কেনার জন্য দোকানির ডাক পড়ল। সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। জিজ্ঞেস করল—কি রকম মােমবাতি নেবেন। বললামসরু, মােটা, মাঝারি তিন রকম দেখান। তারপরে বলতে পারব।

দোকানি জিজ্ঞেস করল—কি জন্য নেবেন। বললাম—জ্বালানাের জন্য। এ ছাড়া মােমবাতি আর কোন্ কাজে লাগে। কথাটা একটু | বিরক্তির সঙ্গে প্রকাশ করলাম।

| দোকানদার বলে, দাদা আপনি শুধু শুধু রাগ করছেন, এখন কাজে মােমবাতি লাগে। কেউ পুজোয় দেয়, কেউ কবরে দেয়, অন্ধকারে কেউ পথ দেখে। প্রতিবাদে মােমবাতি মিছিল হয়। জন্মদিন উদ্যাপিত হয়। তারপরে দীপাবলি কোজাগরী তাে আছে। আপনার কি জন্য দরকার!

বললাম—জন্মদিন। তারপরে প্রশ্ন এল—ফুল কোর্স না মেইন কোর্স। | বেশ একটু থতমত খেলাম। হােটেল রেস্তোরাঁ তাে নয়। তাহলে ফুল কোর্স না মেইন কোর্স আসছে কোথা থেকে! আমার অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে সে নিজেই বলতে লাগল—এই ধরুন কারও পনেরাে বছরের জন্মদিন, তাহলে লাগবে পনেরােটা মােমবাতি। পঞ্চাশ বছর হলে পঞ্চাশটা। মােমবাতি বসাবে জায়গা কোথায়। যদিও বসাতে পারল কতবার ফু দিয়ে দিয়ে নেভাতে হবে। আর একটা সহজ উপায় এখন আছে। আপনি জন্মদিনের সংখ্যা অনুযায়ী না কিনে বয়স কুড়ি হলে একটা ২’ এর ছাঁচ আর একটা ‘০’ এর ছাঁচ। ঐ রকমই ধরুন কারও বিয়াল্লিশ বছর বয়স একটা ‘৪’ এর ছাঁচ আর একটা ‘২’ এর ছাঁচ। দেখুন কত সহজে হয়ে গেল। আর এর সাথে একটা ব’, একটা ‘ছ’ আর একটা র’ এর ছাঁচ নেবেন। এবার জুড়ে দিলেন বছর হয়ে গেল। এটা হল মেইন কোর্স। আর যদি লিখতে চান—তােমাকে শুভ জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ভালাে থেকো, সুখে থেকো এইসব তাহলে আপনাকে ধরে ধরে সব অক্ষর বের করে নিয়ে যেতে হবে। এটা হল ফুল কোর্স। সবগুলির ভিতরে সলতে দেওয়া আছে। আপনি জ্বালিয়ে দিলে জন্মদিন আলােকিত হয়ে যাবে। আমি ৫০ বছরের মেইন কোর্স নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

| যাব এবার কেকের দোকানে। রাস্তা দিয়ে ভাবতে ভাবতে যাচ্ছি। | কি লিখব সেখানে। ভাবনা গভীর করতে রাস্তার একপাশ দিয়ে হাঁটছি। তাতেও রক্ষে নেই। অটোর হর্ন। রিকশার প্যাকযুক। সাইকেলের ক্রিং ক্রিং। ভাবনা ছিড়ে ছিড়ে যাচ্ছে। নৈঋতা আমার সাথে সাতাশ বছরের জীবন কাটাচ্ছে। একসাথে হেঁটেছি বহু পথ। স্বপ্ন দেখেছি দুজনে দুজনকে নিয়ে। স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিয়েছি দুজনে মিলে। হৃদয়ের গভীরে একজন আর একজনকে বসিয়ে নিয়েছি। তবুও কেন তার জন্য দুটো শব্দ ঠিক করতে পারছি না। ভাবলাম লিখব কেটেছে সাতাশ আরও কাটবে সাতাশ। কেমন বেরসিক গদ্য হয়ে গেল। ঠিক কাব্যিক হচ্ছে না। কবি সাহিত্যিকের কোটেশন দিলে কেমন হয়। তাই বা দেব কেন। তারা যে তাদের প্রেমিকা, অভিসারিকা, পত্নীদের নিয়ে লিখেছে। সেটা লিখলে হবে কপি পেস্ট করা।

এমন কেন হয়। ভিতরে ভাবনা, ভালােবাসা, ভালােলাগা অনুভূতি উপলব্ধি সব রয়েছে, কিন্তু মুখে ভাষা হয়ে আসছে না। যে মানুষটা জীবনের সবকিছু ছেড়ে আমাকে কেন্দ্র করে অজানা মানুষের সাথে অজানা পথে পা বাড়াল তার তরে শব্দভাণ্ডার আমার সাথে অসহযােগিতা করে চলেছে। | সে এসেছিল একদিন। পিছনে রেখে এসেছিল ছাড়ের পাহাড়।

ছেড়ে আসতে হল মা-বাবাকে। এতদিনের বাস করা বাসস্থানকে। চেনা পরিবেশকে। চেনা মানুষজনকে। অবশেষে নিজের পদবিও যুক্ত হল ছাড়ের স্তুপে। এল এক নতুন সংসারে। সংসারের কোথায় যে ‘সং’ আছে আর কোথায় ‘সার’ সেও অজানা। তবুও সবাইকে আপন করে নেওয়ার এক নিরন্তর ব্রত। সংসার সাবলীল করে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস। সবাইকে খুশি রাখার প্রচেষ্টা। আন্তরিকতায় মুগ্ধ করছে আমাদেরকে।

ধীরে ধীরে সংসারে প্রবেশ করেছে। একটু একটু করে ডালপালা বিস্তার করেছে। সময়ের স্রোত বইতে বইতে বসন্তের কামুক হাওয়া স্পর্শ করে গেল নৈঋতাকে। তিনি মুকুলিত হলেন। মুকুল থেকে গুটি। গুটি একদিন ফল হয়ে তার কোলে এল। মাতৃত্বের নবস্বাদে সে তখন আনন্দসাগরে অবগাহনরত। | কেকের দোকানে এসে পৌছালাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম। অনেক রকমের কেক। তার মধ্যে দু-চারটে দেখলাম ইতিমধ্যে জন্মদিনের জন্য উৎসর্গকৃত হয়ে আছে। গায়ে তার ব্যক্তির নাম ধরে হ্যাপি বার্থডে লেখা হয়ে আছে। উৎসবের সংসারে কেকের বােধহয় একটাই ঠিকানা। জন্মদিনে খণ্ডিত হওয়া। ফুলের মতাে তার বহুমুখী পথ নেই। তবে বড়দিনের উৎসব তার একচেটিয়া।

একটা কেক পছন্দ করলাম। দোকানদার জিজ্ঞেস করল— জন্মদিনের জন্য তাে? হ্যা বলতেই সে রঙের টিউব বের করে লিখতে শুরু করল Happy Birthday লিখে বলল—দাদা কার জন্মদিন নাম বলুন। বলতেই হল বৌয়ের নাম নৈঋতা। কেকের পালা সমাপ্ত হল। কিন্তু রঙিন কার্ড এখনও ফাঁকা পড়ে আছে।

কেক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এবার পথ বাড়ির দিকে। কি যেন ভাবছিলাম বৌকে নিয়ে। কেক নিতে গিয়ে ভাবনা এলােমেলাে হয়ে গেল। মনে পড়ল তার নবমাতৃত্ব নিয়ে ভাবনার গভীরে ডুব দিয়েছিলাম। কোলে তখন তার নবজাতক। চোখে চোখ রেখে আদরে সােহাগে তাকে নিয়ে মাখামাখি করে। আনন্দ আর আনন্দ। মাতৃদুগ্ধে নবজাতকের খিদে-তৃষ্ণা মিটতে মিটতে তার হাত-পা ছুঁড়ে আনন্দ প্রকাশের দৃশ্যে মাতৃত্ববােধের পরিতৃপ্তিতে মা আনন্দে আনন্দময়ী হয়ে ওঠে।

বাড়ির পথে আরও অনেকখানি এগিয়ে গেলাম। জন্মদিন পালনের সামগ্রী সব কেনা হয়ে গিয়েছে। নৈঋতাকে সাথে নিয়ে গিয়ে তার পছন্দমতাে একটা শাড়ি গত সপ্তাহে কিনে আনা হয়েছে। আর যা যা দরকার আজকের দিনের জন্য ফুলের তােড়া, মােমবাতি, কেক সবই নেওয়া হয়ে গিয়েছে। শুধু কার্ডের জন্য লেখাটা এখনও আবিষ্কার না করতে পেরে মনের মধ্যে একটা খচখচ্‌ অস্বস্তি বােধ হচ্ছে।

কলেজ জীবনে সিগারেট খেতাম মাঝে মধ্যে। সে জীবনে তখন সিগারেট, কবিতা আর প্রেম পাশাপাশি চলত। সিগারেট না খেলে কবিতা আসত না। আর কবিতা লিখতে পারলে প্রেম পাওয়ার একটা বাড়তি উপাদান হত। আজ আবার একটা খেলে কেমন হয়। যদি মনের মতাে দু-চারটে শব্দ বেরিয়ে আসে। দোকানে গিয়ে একটা সিগারেট চাইলাম। সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হল কিছু অপরাধ করলাম নাকি এখানেও বলতে হবে কি জন্য সিগারেট খাব। পরে বুঝলাম সিগারেটের নামটা বলিনি। বললাম—

যা থাকে একটা দিন। বলল—আপনার ব্রান্ডটা কি, সিগারেট তাে অনেক রকম পাওয়া যায়।

থতমত খেয়ে বললাম—চারমিনার। শুনতে হল সিগারেট খাবেন না ধূপ জ্বালাবেন। কেন একথা বলছেন। দাদা আপনার চারমিনারের অন্ত্যেষ্টি হয়ে গেছে বহুদিন আগে। এখনও দুটো মিনার আছে। কলকাতায় শহিদ মিনার। দিল্লিতে কুতুব মিনার। আর আমার কাছে আছে মিনার ধূপ জ্বালাবেন গন্ধও পাবেন মশাও থাকবে না। চাইলে দিতে পারি।

এখনকার ভাষায় বলতে গেলে আমাকে ভালােরকম চেটে দিল। একটা বাক্সের দিকে দেখিয়ে বললাম ওখান থেকে একটা দিন। সিগারেট ধরিয়ে একটা টান দিতে না দিতে বুদ্ধি খােলা দূরে থাকুক আমার বুকের ভিতর থেকে হৃদপিণ্ড বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা। কাশতে কাশতে দম আটকে আত্মারাম খাঁচা ছেড়ে পালাবার জোগাড়। কোনওরকমে সামলে নিলাম। জ্বলন্ত জ্যান্ত সিগারেট জলাঞ্জলি দিলাম। এক হীনমন্যতায় ভুগতে লাগলাম। জীবনের এত পথ পার হয়ে এলাম না বিড়ি, না সিগারেট না কারণবারি, তবে আজ কেন? | তবে আমার মিনার কথাটা খুব মনে ধরেছে। মিনার দিয়ে যদি একটা কিছু লেখা যায়। মিনার বলতে বেশ একটা চাকচিক্য আড়ম্বরপূর্ণ মহলে ছবি ভেসে ওঠে। যদি এরকম হয় আমার মিনারে সদা হেরি তােমার মূরতি। একটু বেশি বাড়াবাড়ি মনে হল।

যদি কিছু না লিখে তবে কেমন হয়। সবসময় সব ভালােবাসা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মনের মধ্যে বিরাজ করে। ভাষায় ব্যক্ত করতে গেলে মনে হয় ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বেঁধে ফেলা হল ভালােবাসাকে। বরং সে হৃদয়ের মধ্যে লাটাইএ সুতাে বাঁধা ঘুড়ির মতাে উড়ে উড়ে বেড়াক। চোখ দিয়ে কত সময় কত কিছু দেখি। অনবদ্য, দৃষ্টিনন্দন, চোখ জুড়ানাে। কিন্তু কোনও শব্দটাই মনে হয় যথাযথ নয় সেই সৌন্দর্যের অসীমতা প্রকাশের জন্য। আকাশের মতাে হয়। সমুদ্রের উদ্বেলতা সমুদ্রের মতাে হয়। জ্যোৎস্নারাতের মাধুরী সেই রাতের সাথেই তুলনা করা যায়। এর কোনও বিকল্প নেই। লেখা আর কিছু হল না।

বাড়িতে পৌঁছালাম অলিখিত ভাবেই। ফুলের তােড়া হাতে নিয়ে ভালাে করে দেখতে দেখতে গােলাপি কার্ডের দিকে তাকিয়ে আমায় জিজ্ঞাসা করল কার্ড ফাকা কেন কিছু লিখলে না! সারাদিনের বিষয়বৃত্তান্ত তাকে ব্যক্ত করলাম। বললাম, তােমাকে নিয়ে কিছু লেখার মতাে পেলাম না। তােমাকে কারও সাথে তুলনা করতে পারলাম

। তােমার যা খুশি লিখে নাও। কারও উপরে যখন বিশ্বাস জন্মায়, ভালােবাসা থাকে, বােঝাপড়া ঠিকঠাক থাকে তখন তাকে ব্ল্যাঙ্ক চেক দেয়। আমি বিশ্বাস, ভালােবাসা বােঝাপড়া সবকিছু নিয়ে এতদিনের সংসার করার অভিজ্ঞতা নিয়ে মনে হল কিছু না লিখে তােমাকে এই ব্ল্যাঙ্ক কার্ড দিয়ে দিলাম। তুমি লিখে নাও। | নৈঋতা কার্ডটা খুলে নিয়ে ঘরের ভিতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে বাইরে আসতে আসতে বলল তুমি যখন কিছু | লিখতে পারনি আমিও তােমার সন্ধানে কিছু লিখলাম না। তবে দেখ কার্ডটা এই বলে সে কার্ডটা আমার সামনে তুলে ধরল। দেখলাম তার নিপুণ শৈল্পিক হাতে কার্ডটাকে কাটছাঁট করে একটা হার্টের | চিত্রণ তৈরি করে এনেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *